ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০ ফাল্গুন ১৪৩০

পাতাল মেট্রোরেলে ২৫ মিনিটে উত্তরা থেকে কমলাপুর

ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থা হবে সুবিন্যস্ত

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ২৩:২৩, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থা হবে সুবিন্যস্ত

উড়াল ও পাতাল পথে ছয়টি মেট্রোরেলের মাধ্যমে সুবিন্যস্ত হবে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থা

উড়াল ও পাতাল পথে ছয়টি মেট্রোরেলের মাধ্যমে সুবিন্যস্ত হবে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থা। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে রাজধানীর মতিঝিল পর্যন্ত চালু হবে মেট্রোরেল লাইন ৬। ২০২৬ সালের মধ্যে চালু হবে উড়াল-পাতাল সমন্বয়ে ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন ১। দেশের প্রথম এই পাতাল মেট্রোরেল নির্মাণ হলে ১২টি ভূগর্ভস্থ স্টেশনে বিরতিসহ মাত্র ২৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে রাজধানীর উত্তরা বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ভ্রমণ করা যাবে।

এ ছাড়া উড়ালপথে সাতটি স্টেশনে বিরতিসহ নতুনবাজার থেকে পূর্বাচলে মেট্রোরেলে সময় লাগবে মাত্র ২০ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড। পাশাপাশি নতুনবাজার ইন্টারচেঞ্জের মাধ্যমে ১৬টি স্টেশনে বিরতিসহ মাত্র ৪০ মিনিটের মধ্যে কমলাপুর থেকে পূর্বাচলে যাতায়াত করতে পারবে মেট্রোরেলের যাত্রীরা। 
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৫ মিনিটে রাজধানীর পূর্বাচলের নতুন শহর প্রকল্প এলাকায় দেশের প্রথম এই পাতাল মেট্রোরেলের নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এ সময় তিনি এমআরটি লাইন-১’র ডিপো নির্মাণকাজের উদ্বোধনী ফলক উন্মোচন করেন। উদ্বোধনী ফলক উন্মোচন অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূত ইওয়ামা কিমিনোরি, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নূরী, ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমটিসিএল) এমএএন সিদ্দিক, জাইকার বাংলাদেশ অফিসের প্রতিনিধি ইচিগুচি তোমোহাইড ও এমআরটি-১ প্রকল্প পরিচালক আবুল কাশেন ভূঁইয়া প্রমুখ।  
পরে সুধী সমাবেশে বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, পাতালরেল বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় আরেকটি মাইলফলক যুক্ত হলো। নতুন যাত্রা শুরু করল বাংলাদেশ। এর আগে আমরা পদ্মা সেতু, উড়াল সেতু, মেট্রোরেল উপহার দিয়েছি। উড়াল মেট্রোরেল সেটা মাটির ওপর দিয়ে যাচ্ছে, এবার মাটির নিচ দিয়ে পাতাল রেল যাবে।’ 
প্রধানমন্ত্রী জানান,  মেট্রোরেল নির্মাণের সবচেয়ে বড় দিক হলো এটায় পরিবেশ দূষিত হবে না। বিদ্যুতে চলবে। এটা পরিবেশবান্ধব। শব্দদূষণ থাকবে না। পাতাল রেলের কাজ করার সময় মাটির নিচ থেকে বোরিং মেশিন দিয়ে গর্ত করে টানেল করা হবে। এখানে জনগণের চলাচলের কোনো সমস্যা হবে না। ভূপৃষ্ঠের ১০ মিটার নিচে কাজ হবে, ফলে ওপর থেকে বোঝা যাবে না যে মাটির নিচে কাজ চলছে। এই পাতাররেলের পূর্বাচল অংশ হবে উড়ালপথ। এ ছাড়া বিমানবন্দর রুটে ১২টি পাতাল রেলস্টেশন নির্মাণ করা হবে। খননকাজের সময় মানুষের যাতে কোনো সমস্যা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব কাজ হবে।
অনুষ্ঠানে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ছয়টি মেট্রোরেলের মাধ্যমে ঢাকায় সুসজ্জিত আধুনিক ও স্মার্ট গণপরিবহনে নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে। ঢাকা আধুনিক গণপরিবহনে সাজবে। মেট্রোরেলের আকর্ষণ দুর্দমনীয়। উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু হয়েছে। সারা বাংলাদেশ থেকে মানুষ এটায় একবার উঠতে এসেছে। কী আকর্ষণ, কী ক্রেজ! চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবে না। এ বছরই আমরা মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল লাইন-৬ নিয়ে আসবো।

পূর্বাচলে এমআরটি লাইন-১ যেটা ২১ কিলোমিটার পাতাল রেল, ১০ কিলোমিটার এলিভেটেড। দুটি রুটের নির্মাণকাজ বৃহস্পতিবার উদ্বোধন করা হলো। এই প্রকল্প নির্মানে ৫২ হাজার কোটি টাকার ৪০ হাজার কোটিই জাপানের টাকা। জাপান আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী।’ তাই জাপানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সড়ক ও সেতু মন্ত্রী।  
অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নূরী বলেন, ‘২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকা শহরে উড়াল ও পাতাল মিলে ৬ টি মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ শেষ হবে। এছাড়া গত ৩১ জানুয়ারি থেকে চট্টগ্রামে মেট্রোরেল নির্মাণের সমীক্ষার কাজ শুরু হয়েছে। ঢাকাসহ সারাদেশের যানজট নিরসনে ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু জন্য কাজ করছে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ।’ 

অনুষ্ঠানে ডিএমটিসিএল’র এমডি এমএএন সিদ্দিক জানান, উড়াল ও পাতাল রেলপথ নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। ঢাকা মহানগরী ও তৎসংলগ্ন পার্শ্ববর্তী এলাকার যানজট নিরসনে ও পরিবেশ উন্নয়নে অত্যাধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা এই মেট্রোরেল সার্ভিস। দীর্ঘ দ্রুতগামী, নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, সময় সাশ্রয়ী, বিদ্যুৎচালিত, পরিবেশবান্ধব ও দূরনিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক এই মেট্রোরেল সার্ভিস ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকায় একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে।
গত বছর ২৮ ডিসেম্বর এমআরটি লাইন-৬’র উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত চালু করা হয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে এই লাইনের মতিঝিল পর্যন্ত চালু করা হবে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের কমলাপুর পর্যন্ত চালু হবে এমআরটি লাইন-৬। পরে ২০২৬ সালে চালু হবে উড়াল ও পাতাল পথের সমন্বয়ে এমআরটি লাইন-১। ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩১ দশমিক ২৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ এ মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এটি দৈনিক ৮ লাখ যাত্রী পরিবহন করা যাবে।

তিনি বলেন, মেট্রোরেলের লাইন-১ এর ডিপো নির্মাণে জাপানের টোকিও কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড ও দেশীয় ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করেছে ডিএমটিসিএল। পুরো প্রকল্পটির কাজ ১২টি প্যাকেজের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হবে। এমআরটি লাইন-১ নির্মাণে জনসাধারণের যাতে ভোগান্তি না হয়, সে কথা মাথায় রেখে এখানে আমরা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছি। আমরা চেষ্টা করছি মাটি খনন করার টানেল বোরিং মেশিন (টিবিএম) আমাদের এখানেই প্রস্তুত করার।

তাহলে আমাদের নিজেদের ক্যাপাবিলিটি বাড়বে। এই কাজটি কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত মাটির নিচে ১০-২০ মিটার আবার কোথাও কোথাও ৩০ মিটার নিচে করা হবে। টিবিএম মেশিন যখন মাটির নিচে কাজ করবে, তখন রাস্তার ওপর বোঝা যাবে না যে, মাটির নিচে কাজ হচ্ছে। সমস্যা একটু হবে স্টেশন নির্মাণের সময়।’
ডিএমটিসিএল’র তথ্যমতে, এমআরটি-১-এর প্রাথমিক কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। এরপর ২০২২ সালের ২৩ অক্টোবর এমআরটি-১ প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাপানের বহুজাতিক কনসোর্টিয়ামের নিপ্পন কোয়াই করপোরেশন কোম্পানি জেভির সঙ্গে চুক্তি সই হয়। এই কনসোর্টিয়ামে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে দেশি-বিদেশি আটটি প্রতিষ্ঠান। সেই চুক্তিতে সই করেন ডিএমটিসিএলের এমডি এম এ এন সিদ্দিক এবং নিপ্পন কোয়াই কোম্পানি লিমিটেডের প্রতিনিধি নাও কি কুদো।
এরপর গত বছরের ২৩ নভেম্বর এমআরটি লাইন-১-এর ডিপো এলাকার ভূমি উন্নয়নের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ হয়। তখন বলা হয় এর আওতায় নারায়ণগঞ্জের পিতলগঞ্জ ও ব্রাহ্মণখালী মৌজায় প্রায় ৯২ দশমিক ৯৭২৫ একর জমি অধিগ্রহণে গেজেট প্রকাশ হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫ দশমিক ৯০ হেক্টর বা ৮৮ দশমিক ৭১ একর ভূমিতে উন্নয়নকাজ করা হবে। এ কাজের ঠিকাদারিতে রয়েছে জাপানের টোকিও কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড ও বাংলাদেশের ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড।
ডিএমটিসিএল সূত্রে জানা যায়, রাজধানীবাসীকে যানজট থেকে স্বস্তি দিতে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকা মহানগরী ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ছয়টি মেট্রোরেলের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে। এরই মধ্যে ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট-৬ (এমআরটি-৬)-এর উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত উদ্বোধন হয়েছে। এবার কাজ শুরুর হচ্ছে এমআরটি-১। ২০৩০ সালের মধ্যে এই ছয়টি মেট্রো রেলের নির্মাণকাজ পর্যায়ক্রমে তিন ধাপে শেষ হবে। দ্বিতীয় পর্যায়ে ২০২৮ সালের মধ্যে এমআরটি লাইন-৫ নর্দান রুটের নির্মাণকাজ শেষ করা হবে। তৃতীয় পর্যায়ে ২০৩০ সালের মধ্যে এমআরটি লাইন-৫: সাউদার্ন রুট, এমআরটি লাইন-২ এবং এমআরটি লাইন-৪ এর নির্মাণকাজ শেষ করা হবে।

×