ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২০ মে ২০২৪, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

সঙ্কটে রাজধানীবাসী শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত

দেশে দৈনিক গ্যাসের ঘাটতি ১০ কোটি ঘনফুট

স্বপ্না চক্রবর্তী

প্রকাশিত: ২৩:৪৩, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২

দেশে দৈনিক গ্যাসের ঘাটতি ১০ কোটি ঘনফুট

গ্যাসের ঘাটতি ১০ কোটি ঘনফুট

দেশে গ্যাসের মোট চাহিদা ৩৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। সঙ্কট শুরুর আগে সরবরাহ করা হতো ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক সঙ্কটের কারণে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২৭৫ থেকে ২৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। যার মধ্যে ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আসছে দেশীয় উৎস থেকে। আর আমদানি করা এলএনজি যোগ হচ্ছে ৪৮ কোটি ঘনফুট। যা কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির ভিত্তিতে আসছে।
চাহিদার ৭০ থেকে ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আগে স্পট মার্কেট থেকে কেনা হলেও বর্তমানে উচ্চ মূল্যের কারণে কেনা বন্ধ রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ফলে চাহিদার চাইতে অন্তত : ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সঙ্কট হচ্ছে প্রতিদিন। ২০২৫ সালের আগে এই সঙ্কট কাটার কোন সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। তবে সঙ্কট মোকাবেলার উপায় খুঁজতে সম্প্রতি বিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ কাতার সফর করে এসেছেন। একই কারণে গত বুধবার পেট্রোবাংলাসহ জ্বালানি বিভাগের উর্ধতন কর্মকর্তারা গিয়েছেন কাতারে।
এদিকে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় তীব্র গ্যাস সঙ্কটে ভুগতে হচ্ছে মানুষজনকে। রাজধানীর বেশিরভাগ এলাকার আবাসিক চুলাগুলোতে গ্যাসের চাপের অভাবে জ্বলছে না চুলা। উৎপাদন বন্ধ রয়েছে শিল্প কারখানাগুলোতে।
জ্বালানি বিভাগ বলছে, বর্তমানে কাতার থেকে বার্ষিক ১.৮ থেকে ২.৫ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানির চুক্তি রয়েছে বাংলাদেশের। ২০১৭ সাল থেকে ১৫ বছর মেয়াদী চুক্তির আওতায় কাতার থেকে এলএনজি আমদানি করে আসছে বাংলাদেশ। কাতারের রাশ লাফান লিক্যুফাইড ন্যাচারাল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে ওই চুক্তির আওতায় বার্ষিক ১.৮ থেকে ২.৫ মিলিয়ন টন এলএনজি পাওয়ার কথা বাংলাদেশের। সাইড লেটার চুক্তির মাধ্যমে এর অতিরিক্ত হিসেবে বছরে আরও ১ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানির জন্য বিদ্যুত ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় এর আগে প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু কাতার তাতে সাড়া দেয়নি।
তা সত্ত্বেও সম্প্রতি কাতারের দোহায় দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ের বৈঠকে (এফওসি) বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতা পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম কাতারকে আরও বেশি পরিমাণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ করতে অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু কাতার জানিয়েছে, ২০২৫ সালের আগে বিদ্যমান চুক্তির আওতায় অতিরিক্ত এলএনজি সরবরাহ করতে পারবে না।
এর আগেও চলতি বছরের মার্চে কাতারের রাজধানী দোহায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে অতিরিক্ত এলএনজি নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল বাংলাদেশের বিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। কিন্তু তখনও কাতার অস্বীকৃতি জানায়। পেট্রোবাংলার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, দেশের গ্যাস সঙ্কটের বিষয়টি কাতারকে জানিয়ে এলএনজি সরবরাহ বাড়াতে তাদের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল।

এ লক্ষ্যে সম্প্রতি বিদ্যুত ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ কাতার সফরও করেছেন। এখন আবার পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানসহ জ্বালানি বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তাও কাতার সফরে রয়েছেন। কিন্তু তারা জানিয়ে দিয়েছেন, ২০২৫ সালের আগে আমাদের কাছে অতিরিক্ত এলএনজি সরবরাহ করতে পারবে না। তার মানে গ্যাসের এই সঙ্কট এখনই কাটছে না।
বর্তমানে দেশটি থেকে মাসে ৫টি করে এলএনজি কার্গো আসছে। যার ইউনিট প্রতি গ্যাসের দাম পরছে ১৫ মার্কিন ডলার। যুদ্ধের আগে এই দাম ছিল ১০ ডলারের কম। কিন্তু খোলাবাজারে এই দাম ৬০ ডলারের বেশি। তাই দাম না কমা পর্যন্ত খোলাবাজার থেকে কোন গ্যাস কেনা হচ্ছে না জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুত, জ্বালানি খনিজসম্পদ উপদেষ্টা ড. তৌফিক ই ইলাহী চৌধুরী সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আওতায় কাতার বছরে আমাদের ৪০টি এলএনজিবাহী কার্গো দিচ্ছে। ওমান দিচ্ছে ১৬টি এলএনজিবাহী কার্গো।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে জ্বালানির বাজারের যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে তার ফল সব দেশকেই ভুগতে হচ্ছে। আমরাও ভুগছি। আশা করছি শীতে বিদ্যুতের চাহিদা কমবে। তখন গ্যাস দিয়ে যে বিদ্যুত কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন হতো সেখানে উৎপাদন কমিয়ে অন্যান্য খাতে ব্যবহার বাড়ানো যাবে।
কিন্তু ফার্নেস অয়েল এবং ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুত উৎপাদনে বা সার কারখানায় গ্যাসের যে ব্যবহার হতো তাও কমানো যাচ্ছে না। বিশ্ববাজারে সারের দাম চড়া, আমদানিতে বাড়তি খরচ লাগছে। তাই দেশী সার কারখানা চালু রাখতে হচ্ছে।
জানা যায়, দেশের গ্যাসের মোট চাহিদার ৩৮০ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে বিদ্যুত উৎপাদনেই ব্যবহৃত হয় ২২৫ মিলিয়ন ঘনফুট। সার কারখানায় লাগে ৩২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। কিন্তু এর বিপরীতে সরবরাহ করা যাচ্ছে বিদ্যুতে মাত্র ১০৬ মিলিয়ন এবং সারে ১৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। আবাসিকে ঠিক কত পরিমাণ গ্যাসের সঙ্কট হচ্ছে এ বিষয়ে ঠিক করে বলতে না পারলেও পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান সাংবাদিকদের বলেন, চলমান সঙ্কট মোকাবেলায় আমাদের চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত এলএনজির জন্য কাতারের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলাম।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউরোপের দেশগুলোতে তাদের এলএনজির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আমাদের অতিরিক্ত এলএনজি দিতে পারবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে কাতার। এর পরও আমরা কাতার থেকে অতিরিক্ত এলএনজি আনতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
এই সঙ্কট মোকাবেলায় আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় কূপগুলোতে খননের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম জনকণ্ঠকে বলেন, এখন কাতারের এলএনজির দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও চীন নিয়ে যাচ্ছে। সামনে কাতার থেকে এলএনজি পাওয়াটা বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কাতার আমাদের কাছের দেশ হওয়ায় এলএনজি আমদানিতে খরচ কম হতো। বর্তমানে আমাদের সক্ষমতা রয়েছে সাত মিলিয়ন টন। কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে এলএনজি আনা হয় প্রায় চার মিলিয়ন টন।

বাকিটা স্পট মার্কেট (খোলাবাজার) থেকে কেনা হয়। আমাদের বছরে আরও দুই মিলিয়ন টন এলএনজির দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি বাড়াতে হবে। কাতার যদি এখন অতিরিক্ত এলএনজি দিতে না চায়, তাহলে আমরা অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে এলএনজি চুক্তির বিষয়ে কথা বলতে পারি। বর্তমান সঙ্কট থেকে শিক্ষা নিয়ে এসবের বাইরে আমদানির দিকে না তাকিয়ে পেট্রোবাংলাকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদানের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
এদিকে তীব্র গ্যাস সঙ্কটের কারণে রাজধানীর অধিকাংশ এলাকার বাসা-বাড়িতে জ্বলছে না চুলা। প্রতিদিনই তিতাসের অভিযোগ কেন্দ্রে আসছে হাজার হাজার অভিযোগ। গ্যাস সঙ্কটে সবচেয়ে বেশি ভুগছে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বাসাবো, পুরান ঢাকার বাসিন্দারা। এমনকি সঙ্কট রয়েছে অভিজাত এলাকা বলে খ্যাত ধানম-ি, গুলশানেও। রাজধানীর ধানম-ি ১৫ নম্বর রোডের বাসিন্দা সেঁজুতি ভট্টাচার্য বলেন, দিনের বেলা বেশিরভাগ সময়ই চুলায় গ্যাসের চাপ কম থাকে। রাত দশটার পর কিছুটা চাপ পাওয়া গেলেও তা মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য থাকে। এর ওপর রয়েছে লোডশেডিং। এভাবে কিভাবে চলে বলেন।
দিনে মাত্র দুই ঘণ্টা চুলায় গ্যাসের চাপ থাকছে বলে অভিযোগ করেন মিরপুর ১০ এর বাসিন্দা হিরা তালুকদার। তিনি বলেন, আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চাকরি করি। কিন্তু বাসায় ফিরে চুলায় গ্যাস না থাকায় বেশিরভাগ দিনই বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে হয়। এমনিতে দ্রব্যমূল্যের এমন উর্ধগতি তার ওপর যদি বেলায় বেলায় বাইরের খাবার কিনে খেতে হয় তাহলে আমাদের মতো মধ্যবিত্ত মানুষেরা টিকে থাকবে কিভাবে?
একই অবস্থা শিল্পাঞ্চলগুলোতেও। তবে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পোশাক শিল্প-কারখানার মালিকদের। বিজিএমইএ এর সাবেক সভাপতি ও সংসদ সদস্য শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন জনকণ্ঠকে বলেন, আমাদের বেশিরভাগ কারখানাতেই গ্যাসের চাপ পাওয়া যাচ্ছে না চাহিদামাফিক। যদি এ রকমটি চলতে থাকে তাহলে তো গার্মেন্টস মালিকদের পথে বসে যেতে হবে। এমনিতেই করোনার কারণে দীর্ঘ দুইটা বছর আমাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। এরপর যদিও আমরা অনেক অর্ডার পেয়েছি। এখন যদি গ্যাস সঙ্কটের কারণে এগুলো ডেলিভারি করা না যায় তাহলে কি হবে বলা মুশকিল।
নিজের কারখানায় গ্যাসের প্রেসার প্রায় দিনই জিরো থাকে জানিয়ে বিকেএমইএ এর সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান জনকণ্ঠকে বলেন, আমার কারখানাটা পুরনো হওয়ায় মেশিনগুলোতে ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে। জরুরী কাজ করি ফার্নেস অয়েল কিনে। কিন্তু এভাবে কতদিন চলবে? ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের ৬৪টি কারখানায় গ্যাস সরবরাহ ও পোশাক উৎপাদন পরিস্থিতি জানতে একটি জরিপ করেছে নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ। এ তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, জরিপে উঠে এসেছে, গত দুই মাসে কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। গড়ে ১ দশমিক ৮ পিএসআই করে গ্যাস পেয়েছে তারা। এতে কারখানার উৎপাদন ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কমে গেছে।
শুধু নারায়ণগঞ্জ নয় গ্যাস সঙ্কটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে গাজীপুর, টঙ্গী, সাভার, আশুলিয়ার কারখানাগুলোতেও। এসব এলাকার কোন কোন কারখানায় উৎপাদনও বন্ধ রাখতে হয়েছে জানিয়ে বিজিএমইএ এর সহ-সভাপতি মোঃ শহীদুল্লাহ আজিম জনকণ্ঠকে বলেন, আমাদের কাছে সব এলাকা থেকেই প্রতিদিন খবর আসে গ্যাসের চাপ নেই। কেউ কেউ তো মেশিনই চালু করতে পারে না। এরকম চলতে থাকলে কিভাবে কারখানার কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে?
তবে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী। এতে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ও তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন কমার পরিস্থিতি বৈঠকে তুলে ধরেন ব্যবসায়ী নেতারা।

×