ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২০ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯

পরীক্ষামূলক

দেশে-বিদেশে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ ॥ ৮ প্রতিষ্ঠানের কারসাজির প্রমাণ মিলেছে

ভোজ্যতেলের অবৈধ মজুদে চাপের মুখে ব্যবসায়ীরা

প্রকাশিত: ২৩:১৬, ২১ মে ২০২২

ভোজ্যতেলের অবৈধ মজুদে চাপের মুখে ব্যবসায়ীরা

এম শাহজাহান ॥ সারাদেশে অবৈধভাবে মজুদকৃত ভোজ্যতেল উদ্ধার ইস্যুতে চাপের মুখে পড়েছেন দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। বিশেষ করে প্রতিদিন অবৈধভাবে মজুদকৃত লাখ লাখ টন ভোজ্যতেল উদ্ধারের ঘটনায় সারাদেশে তোলপাড় শুরু হয়েছে। অথচ এসব তেল ঈদের আগে ও পরে নির্ধারিত দামে ভোক্তাদের কাছে বিক্রি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বেশি মুনাফার আশায় দোকান থেকে তেল সরিয়ে গোপনস্থানে মজুদ করা হয়। বাজার তেল শূন্য হয়ে পড়ে। এখন অভিযানের মুখে বেরিয়ে আসছে বিপুল পরিমাণ ভোজ্যতেল। একদিকে ভোক্তাদের কষ্ট, অন্যদিকে তেলের অবৈধ মজুদ-কালোবাজারি হয়েছে ! এ অবস্থায় দেশে-বিদেশে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ‘ইমেজ’ সঙ্কট তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানে ব্যবসায়ীরাই ভূমিকা রাখছেন। কিন্তু মূল্যবোধের সমস্যা, গোষ্ঠী স্বার্থ এবং সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে কিছু ব্যবসায়ী পণ্যের অবৈধ মজুদ-কালোবাজারি করছেন। সৎ ব্যবসায়ী এবং বাণিজ্য সংগঠনগুলোকে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। একইসঙ্গে দেশের প্রচলিত আইনে শাস্তির যে বিধান রয়েছে তাও শতভাগ বাস্তবায়নের তাগিদ দেয়া হয়েছে। জানা গেছে, ভোজ্যতেল উদ্ধার অভিযান নিষ্ক্রিয় করে দিতে বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠনের পক্ষ থেকে মজুদকারী ব্যবসায়ীদের রক্ষায় বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করা হচ্ছে। তাদের পক্ষে সাফাই গাইছেন কেউ কেউ। কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর ও অধিদফতর থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয়েছে, তেল মজুদকারীদের কোন ছাড় নয়। জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতর স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় সারাদেশে ব্যাপকভাবে তাদের অভিযান পরিচালনা করছে। এসব অভিযানে প্রতিদিন লাখ লাখ টন ভোজ্যতেল বেরিয়ে আসছে। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সম্প্রতি তেল সংক্রান্ত এক প্রেসব্রিফিংয়ে আক্ষেপ করে বলেন, ব্যবসায়ীদের বিশ্বাস করে ভুল করেছিলাম। তাদের ওপর আর আস্থা রাখা যায় না। এ কারণে অসাধু সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে। তবে সরকারের এ অভিযানকে প্রথমদিকে সাধুবাদ জানালেও ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই থেকে এখন ঢালাওভাবে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান ও মামলা না করে শুধুমাত্র সুনির্দিষ্ট ব্যবসায়ীকে জেল-জরিমানা করার আহ্বান জানাচ্ছে। তবে অভিযুক্ত ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে এফবিসিসিআই। ভোজ্যতেল সংক্রান্ত এক বৈঠক শেষে সম্প্রতি সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট মোঃ জসিম উদ্দিন জানান, এফবিসিসিআই চোর ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব করেনি, করবে না। তিনি নিজেও অসাধু ও চোর ব্যবসায়ীদের নেতা নন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সম্প্রতি ভোজ্যতেল নিয়ে এফবিসিসিআই একটি জরুরী বৈঠকের আয়োজন করে। ওই বৈঠকে সরকারী বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা টিসিবিকে দায়ী করে বলা হয়, সংস্থাটিকে বিপুল পরিমাণ ভোজ্যতেল সরবরাহ করা হয়েছে স্থানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও বাজার থেকে। এ কারণে তেলের সঙ্কট তৈরি হয়েছে। বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। টিসিবিকে সরাসরি আমদানি করারও পরামর্শ দেয় এফবিসিসিআই। এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআইয়ের সহ-সভপাতি মোহাম্মদ আমিন হেলালী জনকণ্ঠকে বলেন, বরাবরই এফবিসিসিআই অসাধু সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। শুরুতে ভোজ্যতেল বিরোধী অভিযানকে স্বাগত জানানো হয়, কিন্তু এখন দেশের বিভিন্ন স্থানে ভুল বুঝাবুঝি তৈরি হচ্ছে। রাজশাহীর একটি ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে ভোজ্যতেল উদ্ধারের ঘটনাটি অতিরঞ্জিত রয়েছে। একজন পাইকারি ব্যবসায়ীর কাছে কমপক্ষে সাতদিনের পণ্য মজুদ থাকে। এটাই ব্যবসায়ী কৌশল ও নীতির অংশ। কিন্তু এবারের অভিযানে অনেক স্থানে এসব মানা হয়নি। তেল পাওয়া গেলেই ঢালাওভাবে জরিমানা ও মামলা করা হচ্ছে। এসব জায়গায় আরও সঠিক সুক্ষ্ম তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, সারাদেশে ৫৪ লাখ দোকান এবং ৪ কোটি ব্যবসায়ী রয়েছেন। দেশের কর্মসংস্থানে ৮৫ ভাগ অবদান রাখছে বেসরকারীখাত। সুতরাং গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর কারণে পুরো ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হতে পারে না। এফবিসিসিআই থেকে আগে সতর্ক করে বলা হয়েছে, তারা কোন চোর ও অসাধু ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব করছে না। ভবিষ্যতেও করবে না। জানা গেছে, ভোজ্যতেল নিয়ে দেশের ইতিহাসে এর আগে কখনও এত বড় সঙ্কট তৈরি হয়নি। সর্বোচ্চ রেকর্ড দামে বাজারে এখন ভোজ্যতেল বিক্রি হচ্ছে। বর্তমান সঙ্কটের জন্য দায়ী দেশের ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। এর আগেও বহুবার দেশে ভোগ্যপণ্যের বাজার নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা বাজে খেলায় মেতে উঠেছেন। অভিযোগ রয়েছে ’৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের জন্য এ দেশের কালোবাজারি ও অসাধু সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা দায়ী ছিলেন। আর স্বাধীনতার ৫০ বছরেও সেই গোষ্ঠীর অপতৎপরতা বন্ধ হয়নি। আর এ কারণে এবার দেশের প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদ-উল- ফিতরের আগে ভোজ্যতেলের বাজার তেলশূন্য হয়ে পড়ে। দেশের সাধারণ ভোক্তারা তেল না পেয়ে কষ্ট পেয়েছেন। এমনকি উৎসবের খাবার-দাবার তৈরি করতে সমস্যায় পড়তে হয়েছে ভোক্তাদের। আর এটি ছিল কৃত্রিম সঙ্কট ও অতি মুনাফাখোর ব্যবসায়ীর কারসাজি। সরকারী এজেন্সি ও সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে ভোজ্যতেল নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজির প্রমাণ পেয়েছে। এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ জনকণ্ঠকে বলেন, মূল্যবোধের সমস্যা গোষ্ঠী স্বার্থ চরিতার্থ এবং আরও চাই, আরও চাই মনোভাবের কারণে ব্যবসায়ীরা বেশি মুনাফার জন্য এ ধরনের সঙ্কট তৈরি করছেন। তারা কোনভাবেই লোভ সামলাতে পারছে না। অথচ দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলোতে তারাই (ব্যবসায়ী) সবচেয়ে বেশি অবদান রাখতে সক্ষম হচ্ছেন। তিনি বলেন, ভোজ্যতেল ইস্যুতে ব্যবসায়ীদের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে এটা যেমন সত্য ঠিক তেমনি এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্ব। তিনি বলেন, সৎ ব্যবসায়ী এবং বাণিজ্য সংগঠনগুলোতে এদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। অসাধু সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের পাশে না থেকে তাদের প্রতিহত করার উদ্যোগ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। এদিকে, ভোজ্যতেল নিয়ে অসাধু সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের কারসাজির প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন। উৎপাদন কমিয়ে সরবরাহ চেইন ভেঙ্গে দেয়ার কারণে দেশের ভোজ্যতেল আমদানিকারক আট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে সরকারী এ সংস্থা। স্বাধীন অনুসন্ধানের পর গত বুধবার প্রতিষ্ঠানটি প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করার স্বার্থে কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে স্বপ্রণোদিত হয়ে এ মামলা করে। এরমধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে মামলার শুনানিতে অংশ নিতে নোটিসও পাঠানো হয়েছে। কোম্পানিগুলো হলো সিটি এডিবল অয়েল লিমিটেড (তীর), বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেড (রূপচাঁদা), মেঘনা ও ইউনাইটেড এডিবল অয়েল রিফাইনারি লিমিটেড (ফ্রেশ), বসুন্ধরা অয়েল রিফাইনারি মিল (বসুন্ধরা), শবনম ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (পুষ্টি), এস আলম সুপার এডিবল অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (এস আলম), প্রাইম এডিবল অয়েল লিমিটেড (প্রাইম) ও গ্লোব এডিবল অয়েল লিমিটেড (রয়্যাল শেফ)। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসন মোঃ মফিজুল ইসলাম বলেন, শুধু ভোজ্যতেল নয়, অন্য যেকোন পণ্যের ক্ষেত্রেও যদি সিন্ডিকেট বা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ পাওয়া যায়, আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এর পাশাপাশি সারাদেশে কয়েক হাজার পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী ভোজ্যতেলের অবৈধ মজুদের ভা-ার করে বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করেছে। তবে বাজারের এ সঙ্কটের জন্য ঢালাওভাবে ব্যবসায়ীদের দায়ী করা ঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির শীর্ষ কর্মকর্তারা। তাদের মতে, মজুদের একটি সংজ্ঞা নির্ধারণ হওয়া প্রয়োজন। পাইকারি পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা কমপক্ষে সাত থেকে দশদিনের ভোজ্যতেল মজুদ করে রাখেন। এখন স্বাভাবিকভাবে গুদামে রাখা তেলও অবৈধ মজুদ ঘোষণা দিয়ে জরিমানা ও মামলা করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাজী মোহাম্মদ আলী ভুট্টো জনকণ্ঠকে বলেন, যেভাবে ব্যবসায়ীদের জরিমানা ও মামলা করা হচ্ছে তাতে ভবিষ্যতে অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে পারেন। এবারের তেল নিয়ে কোথায় সঙ্কট তৈরি হয়েছে সেই জায়গায় কিন্তু এখনও হাত দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সরবরাহ কমিয়ে দিলে বাজারে সঙ্কট তৈরি হবে। এটাই এবার হয়েছে। তিনি আরও জানান, ঈদের পরে দাম সমন্বয় কিংবা বাড়ানোর ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এটাও কতটা যৌক্তিক এবং কৌশলী ছিল সেটাও কিন্তু ভেবে দেখার বিষয়। এসব জায়গায় কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, নির্ধারণ করে দাম কার্যকর করা কঠিন বিষয়। এছাড়া অতীতে বিভিন্ন সময়ে কোন কোন পণ্যে মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের মজুদদারির ঘটনা ঘটলেও এবারের রমজানের সময় ভোজ্যতেলের মজুদদারির ঘটনা বিরল। তাই দাবি উঠেছে বাংলাদেশ থেকে মজুদদারি সমূলে বিনাশ করতে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের। কারণ, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, দুই বছরের সাজা ও জরিমানাতেও অসাধু ব্যবসায়ীদের লাগাম টানা যাচ্ছে না। অপরাধীরা অপরাধ করেও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। সে কারণেই কারসাজি ও মজুদদারের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের আইন বিশেষজ্ঞগণ। এ প্রসঙ্গে প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও আপীল বিভাগের সাবেক বিচারপতি নাসিমুল হক নাসিম বলেছেন, মজুদদারের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন আছে, সেটা প্রয়োগ করা যায়। ভোক্তা অধিকার আইনেও করা যায়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে জরিমানা করছে। বিশেষ ক্ষমতা আইনেও জেল আছে, ফাঁসিও আছে। আমার বক্তব্য হলো তেল পাওয়া যাচ্ছে এটার বিরুদ্ধে সবার একত্রে এগিয়ে আসা উচিত। ভবিষ্যতে যাতে আর কেউ এ কাজ না করতে পারে। তা না হলে দেশের সর্বনাশ হয়ে যাবে।