ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২০ আগস্ট ২০২২, ৫ ভাদ্র ১৪২৯

পরীক্ষামূলক

দ্বারে দ্বারে ঘুরেও অর্থ পাননি গ্রাহকরা ফের ১০ দিনের রিমান্ডে কলকাতায় দেশে ফিরিয়ে আনা সংক্রান্ত রুলের শুনানি ১২ জুন আইনী প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ফেরত দেবে ভারত

লুটপাটে নিঃস্ব গ্রাহক ॥ পি কে হালদারের থাবা

প্রকাশিত: ২৩:১১, ১৮ মে ২০২২

লুটপাটে নিঃস্ব গ্রাহক ॥ পি কে হালদারের থাবা

রহিম শেখ ॥ পনেরো বছরের প্রবাস জীবনে উপার্জিত অর্থের বড় অংশই আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিংয়ে ফিক্সড ডিপোজিট রেট বা স্থায়ী আমানতে সুদের হার (এফডিআর) করে রেখেছিলেন আমির হোসেন। তিন বছর ধরে বিভিন্ন সংস্থার দ্বারে দ্বারে ঘুরেও জমানো অর্থ না পেয়ে এখন ক্ষুধা, অভাব আর দুশ্চিন্তায় মানবেতর দিন কাটাচ্ছে তার পরিবার। আমির হোসেনের মেয়ে রাফসানা হোসেন জনকণ্ঠকে জানান, ‘পিপলস লিজিংয়ে জমানো টাকা কবে ফেরত পাবেন সেই দুশ্চিন্তায় বাবা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছেন।’ আমির হোসেনের মতো প্রায় ৬ হাজার আমানতকারী রয়েছেন যারা পিপলস লিজিংয়ে অর্থ জমা করেছিলেন। পি কে হালদারের থাবায় নিঃস্ব শুধু গ্রাহকই নয়, চুষে নিয়েছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অর্থ। লুটপাট করেন পিপলস লিজিংসহ চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ। তার বিরুদ্ধে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ লোপাটের অভিযোগ তদন্ত করছে দুদক। এর মধ্যে ৬ হাজার ৮০ কোটি টাকার তথ্য পাওয়া গেছে। বাকি টাকা কোথায় পাচার করেছেন তা জানতে পি কে হালদারকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে একসঙ্গে কাজ করছে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সংস্থা। অর্থ পাচারও সম্পত্তির খোঁজে পি কে হালদারকে মঙ্গলবার আবারও ১০ দিনের রিমান্ডে দিয়েছেন কলকাতার একটি আদালত। এদিকে হালদারকে দেশে ফিরিয়ে আনা সংক্রান্ত রুলের শুনানির জন্য আগামী ১২ জুন দিন ঠিক করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। যদিও ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার মঙ্গলবার গণমাধ্যমে বলেছেন, আইনী প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই পি কে হালদারকে ফেরত দেবে ভারত। বসবাসের জায়গা বলতে একটি ছোট খুপড়ি ঘর। যার নিত্যসঙ্গী ছিল দরিদ্রতা। কিন্তু পড়াশোনায় কিশোর প্রশান্ত ছিলেন একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। পঞ্চম শ্রেণীতে বৃত্তি পান প্রশান্ত। সেখান থেকে দীঘিরজান উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। পঞ্চমের মতো অষ্টম শ্রেণীতেও তিনি বৃত্তি পান। মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় (এসএসসি) ফার্স্ট ডিভিশন অর্জনের পাশাপাশি বৃত্তি পান প্রশান্ত। ততদিনে তার প্রতিভার খবর ছড়িয়ে পড়েছে পিরোজপুর গ্রামে। এসএসসি পাস করার পর প্রশান্ত বাগেরহাটের পিসি কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ইঞ্জিনিয়ারিং বাংলাদেশ প্রকৌশল টেকনোলজিতে (বুয়েট) পড়ার সুযোগ পান তিনি। নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে প্রশান্ত এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অফ বিজনেস এ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ) থেকে এমবিএ করেন। এমবিএ করে তিনি যোগ দেন ব্যাংকিং পেশায়। তার নিয়োগকর্তারা ভেবেছিলেন যে দেশের এক উজ্জ্বল লক্ষত্রকে নিয়োগ দিয়েছেন তারা। কিন্তু পিরোজপুরের নি¤œ-মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী প্রশান্ত নামের সেই ছেলেটি একসময় দেশের চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে পথে বসিয়ে দেন। জন্ম দেন দেশের আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারির। প্রশান্ত থেকে হয়ে ওঠেন পি কে হালদার। ধুঁকছে ৪ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ॥ পি কে হালদার মাত্র ১০ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা নিয়েই ২০০৯ সালে রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের এমডি হয়ে যান। এরপর ২০১৫ সালের জুলাইয়ে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের এমডি পদে যোগ দেন। ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে মাত্র ১০ বছরেই ইন্টারন্যাশনাল লিজিং এ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, পিপলস লিজিং এ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স এ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ও বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি) থেকে ১১ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেন নানা কৌশলে। চারটি প্রতিষ্ঠান দখলে নিলেও কোন প্রতিষ্ঠানেই পি কে হালদারের নিজের নামে শেয়ার নেই। এই সময়ে হালদার তার বিশ্বস্ত লোকজন, বন্ধু-বান্ধবকে কৌশলে ওইসব প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে বসিয়েছেন। বিশ্বস্ত লোকদের প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ দিয়ে নিজের জালিয়াতির কাজে লাগিয়েছেন। এছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কিছু কর্মকর্তা যারা এসব তদারকিতে ছিলেন তাদেরও তিনি নানাভাবে ম্যানেজ করেছেন। প্রশান্ত কুমার হালদার প্রতিষ্ঠান দখল ও অর্থ আত্মসাত করেছেন নিয়ন্ত্রক সংস্থার চোখের সামনে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সমর্থনও পেয়েছেন। সব শেয়ার অন্যদের নামে হলেও ঘুরেফিরে আসল মালিক পি কে হালদারই। নিজেকে আড়ালে রাখতে এমন কৌশল নেন তিনি। নিজের নামের সঙ্গে মিল রেখে পি কে হালদার গড়ে তুলেন একাধিক প্রতিষ্ঠান, যার বেশির ভাগই কাগুজে। কাগজে-কলমে এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় ছিলেন পি কে হালদারের মা লীলাবতী হালদার, ভাই প্রীতিশ কুমার হালদার, প্রীতিশ কুমারের স্ত্রী সুস্মিতা সাহা, খালাতো ভাই অমিতাভ অধিকারী, অভিজিৎ অধিকারীসহ বিভিন্ন আত্মীয়স্বজন। সাবেক সহকর্মী উজ্জ্বল কুমার নন্দীও ছিলেন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানায়। ১০ বছরে ১০ হাজার কোটি লোপাট ॥ মূলত শেয়ারবাজার থেকে শেয়ার কিনে চারটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেন পি কে হালদার। এভাবে নিয়ন্ত্রণ নেয়া চারটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পিপলস লিজিং ও বিএফআইসির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ধরনের সহায়তা ছিল। এই দুই প্রতিষ্ঠানের আগের পরিচালনা পর্ষদের একাধিক সদস্য আইন ভেঙ্গে নামে-বেনামে ঋণ নেয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। আর এই সুযোগে এসব কোম্পানির শেয়ার কিনে প্রতিষ্ঠান দুটির নিয়ন্ত্রণ নেন পি কে হালদার। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং একসময় ভাল চলছিল। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পরই প্রতিষ্ঠানটি ভেঙ্গে পড়ে। প্রায় ৩০টি প্রতিষ্ঠানের নামে বের করে নেয়া হয় ২ হাজার ২৯ কোটি টাকা। এই টাকা ব্যয় হয় অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে শেয়ার কেনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে নেয়ার জন্য। একই বছর পিপলস লিজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ নেয় হালদারের প্রতিষ্ঠান আনান কেমিক্যাল। এফএএস ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট ও রিলায়েন্স ব্রোকারেজের মাধ্যমে এই শেয়ার কেনা হয়। বিভিন্ন মাধ্যমে টাকা আত্মসাতের পর হালদার পাচার করেছেন কানাডা ও ভারতে। সেখানে আগেই নিজের ও ভাইয়ের নামে কোম্পানি খুলেছিলেন তিনি। ২০১৮ সালে ভাই প্রীতিশ হালদার ও নিজের নামে ভারতে হাল ট্রিপ টেকনোলজি নামে কোম্পানি খোলেন হালদার। কলকাতার মহাজাতি সদনে তাদের কার্যালয়। কানাডায় পিএ্যান্ডএল হাল হোল্ডিং ইনক নামে কোম্পানি খোলা হয় ২০১৪ সালে, যার পরিচালক পি কে হালদার, প্রীতিশ কুমার হালদার ও তার স্ত্রী সুস্মিতা সাহা। কানাডা সরকারের ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, কানাডার টরন্টোর ডিনক্রেস্ট সড়কের ১৬ নম্বর বাসাটি তাদের। দীর্ঘদিন ধরে সবার নাগের ডগায় বহাল তবিয়তে থাকলেও হালদারের নাম সামনে আসে ক্যাসিনোবিরোধী সাম্প্রতিক শুদ্ধি অভিযানের সময়। এ সময় দুদক যে ৪৩ জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে, তাদের মধ্যে পি কে হালদার একজন। তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হাজির হতে নির্দেশ দিলেও দুদকের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই দেশ থেকে পালিয়ে যান হালদার। দীর্ঘ তিন বছর পর ভারতে গ্রেফতার হন গত শনিবার। পি কে হালদারের বিরুদ্ধে ৩৭ মামলা ॥ ২০১৯ সালের মাঝামাঝিতে হালদারের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ পায় দুদক। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং এ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (আইএলএফএসএল ) গ্রাহকরা তাদের অর্থ ফেরত চেয়ে অভিযোগ করতে থাকলে অনুসন্ধানে নামে তারা। আইএলএফএসএল কেলেঙ্কারি খতিয়ে দেখতে কমিশনের উপপরিচালক মোঃ সালাহউদ্দিনকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। পাশাপাশি অন্যান্য আর্থিক কেলেঙ্কারি নিয়ে আলাদাভাবে অনুসন্ধানের জন্য দুদক দায়িত্ব দেয় আরেক উপ-পরিচালক মোঃ গুলশান আনোয়ার প্রধানকে। এর মধ্যেই ২০২০ সালের জানুয়ারিতে দেশ ছেড়ে পগারপার হন পি কে হালদার। তাকে ঠেকাতে না পারার কারণে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে ওই বছরের ২৫ জানুয়ারি তার বিরুদ্ধে পৌনে ৩০০ কোটি টাকা অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে প্রথম মামলা করে দুদক। সেই মামলায় গত বছরের নবেম্বরে আদালতে অভিযাগপত্র দাখিল করা হয়। তাতে তার বিরুদ্ধে ৪২৬ কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জনের প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হয়। পাশাপাশি পি কে হালদারের বিভিন্ন ব্যাংক এ্যাকাউন্টে ৬ হাজার ৮০ কোটি টাকা লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দুদকের তদন্তে উল্লেখ রয়েছে। পি কে হালদারের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৩৭টি মামলা করেছে দুদক। এর মধ্যে তদন্ত শেষে কেবল জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলার অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে। দুদক কর্মকর্তারা জানান, আরও তিনটি মামলায় অভিযোগপত্র অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে নামে-বেনামে বিভিন্ন কাগুজে প্রতিষ্ঠানে ঋণ দিয়ে শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আরও কয়েকটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। দায়ের হওয়া ৩৭টি মামলার মধ্যে সবগুলোতে পি কে হালদারকে প্রধান করা হয়েছে। তার স্বজন ও সহযোগীসহ এসব মামলার আসামি ৬৪ জন। তাদের মধ্যে পি কে হালদারের ব্যক্তিগত আইনজীবী সুকুমার মৃধা ও তার মেয়ে অনিন্দিতা মৃধাসহ ১৩ জনকে গ্রেফতার করেছে দুদক। এসব মামলায় ১১ জন আসামি আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দী দিয়েছেন। অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ও আসামিসহ শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ৩৭ মামলায় আসামিদের মধ্যে রয়েছেন- ইন্টারন্যাশনাল লিজিং এ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস সাবেক চেয়ারম্যান এম এ হাশেম, সাবেক এমডি মোঃ রাশেদুল হক, পি কে হালদারসহ নয় বোর্ড সদস্য, পিপলস লিজিংয়ের চেয়ারম্যান উজ্জ্বল কুমার নন্দী, এফএএস ফাইন্যান্সের সাবেক চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম, এমডি রাসেল শাহরিয়ার। এছাড়া হাজার কোটি টাকা কেলেঙ্কারির অভিযোগের অনুসন্ধানের মধ্যে গত বছরের জানুয়ারিতে পি কে হালদারের মা লীলাবতী হালদার, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গবর্নর এস কে সুর চৌধুরী, সাবেক সচিব ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের চেয়ারম্যান এন আই খানসহ ২৫ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয় উচ্চ আদালত। অন্যদের বিরুদ্ধে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে বিচারিক আদালত থেকে আদেশ পেয়েছে দুদক। পি কে হালদারের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় গত মার্চে সাবেক ডেপুটি গবর্নর এস কে সুর চৌধুরী ও বর্তমান নির্বাহী পরিচালক শাহ আলমকে জিজ্ঞাসাবাদও করেছে দুদক। আর পি কে হালদারের মা লীলাবতী, স্ত্রী সুস্মিতা সাহা ও ভাই প্রীতিশ কুমার হালদার আগেই ভারতে পাড়ি জমান। পি কে হালদারের অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলার তদন্ত করতে গিয়ে তার নামে রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকায় ৪৫০ শতক জমির সন্ধান পায় দুদক। এছাড়া ধানম-িতে দুটি ফ্ল্যাট, উত্তরায় একটি ১০ তলা ভবন, গ্রিন রোড, উত্তরা, দিয়াবাড়ি, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও নরসিংদীসহ বিভিন্ন এলাকায় বিপুল জমি থাকার প্রমাণ পায় দুদক। পরে গত বছরের মার্চে দুদকের আবেদনে এসব সম্পত্তি জব্দ করার আদেশ দেয় আদালত। নিঃস্ব হাজার হাজার গ্রাহক ॥ বেসরকারী চাকরিজীবন শেষে রফিকুল ইসলাম প্রভিডেন্ড ফান্ড থেকে পাওয়া দশ লাখ টাকা জমা করেছিলেন পিপলস লিজিংয়ে। জনকণ্ঠকে তিনি জানান, ‘ভেবেছিলাম জমানো টাকা পেয়ে গ্রামে বাড়ি করব। দুই মেয়েকে বিয়ে দিব। আমার এখন সবই শেষ। এই বয়সে কেউ চাকরিও দেয় না। জানিনা বেঁচে থাকা পর্যন্ত টাকা পাব কি-না?’ আমানতকারী আমান উল্ল্যাহ জনকণ্ঠকে জানান, ‘১২ লাখ টাকা জমা করেছিলাম পিপলস লিজিংয়ে। মুনাফার টাকায় আমার সংসার চলত। হঠাৎ মুনাফা দেয়া বন্ধ, কোম্পানিও বন্ধ। বহু দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। কোথাও কোন সান্ত¦না পাইনি। করোনাভাইরাসের কারণে সংসার চালাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত শহর ছেড়ে গ্রামে চলে এসেছি।’ আমানত হারিয়ে পথে বসার উপক্রম রোমানা ইয়াসমিন জানান, আমরা নিদারুণ কষ্টে আছি। বাচ্চাদের স্কুলে দিতে পারছি না। নিজের চিকিৎসা করাতে পারছি না। সংসারের খরচ চালাতে পারছি না। আমানত খোয়ানো আব্দুর রহিম বলেন, বছরের পর বছর টাকা ফেরত না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছি। আমরা যাতে টাকা ফেরত পাই সেজন্য সরকারের কাছ থেকে যথাযথ ভূমিকা আশা করছি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিপলস লিজিংয়ের আমানতকারী সামিয়া বিনতে মাহবুব জনকণ্ঠকে জানান, ‘গত তিন বছরের বেশি সময় আমরা আমানতের অর্থ ফেরত পাচ্ছি না। আমাদের করুণ অবস্থা, দেখার কেউ নেই। অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে গিয়েছি তারা আমাদের কোন ব্যবস্থা করেনি। আমাদের জমানো টাকা ঋণের নামে লুট করেছে পরিচালকরা। তারা এখন খেলাপী হয়ে আয়েশি জীবনযাপন করছে। আর আমরা আমানতকারীরা অর্থাভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরছি। আমাদের কী দোষ? করোনার কারণে আয় উপার্জন বন্ধ। এদিকে জমানো অর্থ আটকে আছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটাই আবেদন, আমাদের বাঁচান। আমারা সাহায্য চাই না, আমাদের জমানো অর্থ ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা করেন।’ পি কে হালদারকে ফেরানো নিয়ে রুলের শুনানি ১২ জুন ॥ প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারকে গ্রেফতার এবং দেশে ফিরিয়ে আনা সংক্রান্ত রুলের শুনানির জন্য ১২ জুন দিন ঠিক করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। মঙ্গলবার বিচারপতি মোঃ নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কাজী মোঃ ইজারুল হক আকন্দের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী খুরশীদ আলম খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, এ সময়ের মধ্যে পি কে হালদারের বিরুদ্ধে হওয়া মামলার সর্বশেষ তথ্য জানাতে বলেছেন আদালত। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি এ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন মানিক। আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই পি কে হালদারকে ফেরত দেবে ভারত ॥ দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম বড় কেলেঙ্কারির হোতা ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গ্রেফতার হওয়া পি কে হালদারকে আইনী প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার বিক্রম কুমার দোরাইস্বামী। মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে সাক্ষাতে আসেন ভারতীয় হাইকমিশনার। সচিবের সঙ্গে সাক্ষাত শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এ তথ্য জানান তিনি। ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, তার বিষয়ে (পি কে হালদার) পররাষ্ট্র সচিবের (বাংলাদেশের) সঙ্গে কথা হয়েছে। এটি দুই দেশের নিয়মিত সহযোগিতার একটি অংশ। গত সপ্তাহে ছুটির দিনে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বুঝতে হবে, এটি কিন্তু বড়দিনের কার্ড বিনিময় নয়। আমি মনে করি, এ ধরনের বিষয়ে আইনী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। তাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়টাও আইনী প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই করতে হবে। দোরাইস্বামী বলেন, বাংলাদেশ সরকার ভারতের সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে তথ্য দিয়েছে। আমরা তা যাচাই করছি। এ ক্ষেত্রে আইনী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। আমাদের কাছে যা তথ্য আছে তার ভিত্তিতে একটা সময় বাংলাদেশকে জানানো হবে। সেটি আস্তে আস্তে হতে দিন। হাইকমিশনার বলেন, দুই দেশের মধ্যে অপরাধমূলক তৎপরতা দমনের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা রয়েছে।এ নিয়ে আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করছি। ১০ দিনের রিমান্ডে পি কে হালদার ॥ হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাত ও পাচার করে দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে গ্রেফতার প্রশান্ত কুমার হালদারকে (পি কে হালদার) আবারও ১০ দিনের রিমান্ডে দিয়েছেন কলকাতার একটি আদালত। মঙ্গলবার কলকাতার আদালতে তোলার পর পি কে হালদারের ১৪ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়। পরে আদালতের বিচারকরা তার ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মঙ্গলবার পি কে হালদারের মামলার অগ্রগতির বিষয়ে আদালতকে অবগত করেছেন ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের তদন্তকারী সংস্থা ইনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) আইনজীবীরা। এ সময় তারা আদালতকে বলেছেন, ভারতে অবৈধভাবে বসবাস ও ব্যবসা পরিচালনাকারী বাংলাদেশী নাগরিক পি কে হালদারকে জিজ্ঞাসাবাদে বিপুল সম্পত্তির খোঁজ মিলেছে। প্রাথমিক ইডি ভারতে তার ১৫০ কোটি টাকার সম্পত্তির সন্ধান পেয়েছে। সকালের দিকে ইডির কার্যালয়ে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে পি কে হালদারসহ পাঁচ জনকে আদালতে হাজির করে রিমান্ডের আবেদন করা হয়। স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে তাকে আদালতে নেয়া হয়। শুনানির পর আদালত রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করেন। তবে তার স্ত্রীকে ১০ দিনের জন্য বিচারিক হেফাজতে পাঠানো হয়েছে। সেখানে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অরিজিৎ চক্রবর্তী সাংবাদিকদের বলেছেন, তাদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের মামলা করা হয়েছে। সেই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড দেয়া হয়েছে। ইডির কর্মকর্তারা বলেছেন, অবৈধভাবে বাংলাদেশ থেকে ভারতে অর্থপাচারের সঙ্গে প্রদেশের কোনও রাজনীতিক জড়িত আছেন কি-না, সে বিষয়ে পি কে হালদার এখন পর্যন্ত কোন তথ্য দেননি। ইডি বলেছে, ব্যক্তিগত আইনজীবী সুকুমার মৃধার সহায়তায় পি কে হালদার পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের একাধিক রাজ্যে বিপুল সম্পদ করেছেন। বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে অর্থপাচারের মাধ্যমে ভারতে একাধিক অভিজাত বাড়িসহ বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে খোঁজ পেয়েছে ইডি। দেশটির কেন্দ্রীয় এই তদন্ত সংস্থা বলছে, তারা ইতোমধ্যে পি কে হালদারের কাছ থেকে বেশ কিছু নথি উদ্ধার করেছেন। এসব নথিতে প্রাথমিকভাবে ভারতে তার ২০ থেকে ২৫টির মতো বাড়ির মালিকানার তথ্য মিলেছে।