ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০

সময়ের ব্যাকুল বাস্তবতা

জোবায়ের মিলন

প্রকাশিত: ২২:৫৯, ৩০ মার্চ ২০২৩

সময়ের ব্যাকুল বাস্তবতা

সময় মানুষকে তাড়িয়ে বেড়ায়, নাকি মানুষ সময়কে তাড়িয়ে বেড়ায়

সময় মানুষকে তাড়িয়ে বেড়ায়, নাকি মানুষ সময়কে তাড়িয়ে বেড়ায়? এ এক বিরাট প্রশ্ন। তবে সময়ের নিগূঢ় বাস্তবতায় কোনো কোনো মানুষ তাড়িত হয় বিদ্যুতায়িত তরঙ্গের মতো। সেসব মানুষের মধ্যে একজন কবি সবার আগে উড্ডিন; উজানে উপস্থিত সকল কালে, সকল সময়ে। সমকালে সেই তাড়িত মানুষের মধ্যে রাজসাক্ষীরূপে বলায় বক্তব্যে নিষ্ঠাবান তরুণ কবি ফখরুল হাসানকে পাওয়া যায় তার কবিতার অন্তর্নিহিত অন্তর্জালে প্রবেশ করলে।

তার কবিতায় সময়ের রক্তপলাশ, টকটকে লাল শিমুলের দস্তানা দাগাঙ্কিত শব্দে, বাক্যে, বলিষ্ঠ-উচ্চারণে। তার প্রসূত ‘বীভৎস চিৎকার’ কাব্যগ্রন্থে তাকে সমান্তরাল পাওয়া যায় যখন এই গ্রন্থটিতে সন্নিবেশিত ৫৬টি কবিতা একটানে পড়ে শেষ করা হয়।
এখানে একটি কবিতা থেকে আরেকেটি কবিতাতে যাওয়ার পথে কিছুটা সময় থামতে হয়। এই কারণে যে, প্রতিটি কবিতাতে চলতি সময়ের ব্যাকুল বাস্তবতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অঙ্কিত, যেন কবিতাগুলো সময়ের নিপুণ চিত্রপট। কিংবা সময়ের নিভাঁজ পরিভ্রাজক। অথবা সময়সঞ্জ। কোনো কোনো একটি কবিতার একটি লাইনই যেন একটি বহুদর্শী উক্তি। যেমন, ‘মৃত্যুর এই শহরে রক্ত দেখে কেউ আর হতাশ হয় না। (শহরগ্রন্থ)’ আবার অন্য একটি কবিতা যেন প্রত্যক্ষ বিচরণের প্রগাঢ় বিশ্লেষণ। যেমন, ‘শোষিত মানুষের চোখ এক বাষ্পীয় ইঞ্জিন/ প্রলোভনের কুয়াশাজালে আটকে সাময়িক/দপ করে জ্বলে উঠে পরে পোড়ায় প্রতিদিন। (আমরা অপেক্ষায়)’। কবিতাগুলোতে চিত্রকল্প যতটা আদৃত তারও চেয়ে সমাদৃত সময়-অভিজ্ঞ বাস্তব নিনাদ। তাই তো আরেকটি কবিতাতে পরিস্ফুট হচ্ছে, ‘এই শহর আমার নয়; কা-জ্ঞানহীন মাতালের আশ্রম/অথচ আমরাই কুমিরের হাঁ-মুখ/সমাধির চিত্রকল্প গড়ে তুলি আঙুল টিপে!/চারদিকে আর্তচিৎকার- বাঘের সুতীব্র গর্জন/গুমোট অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে নাগরিক মন/ভুলের প্রায়শ্চিত্তে বিনম্র লজ্জায়. . .(লজ্জা)। এখানে বিচরণটা প্রবল। এখানে দেখাটা নির্লোভ। এখানে ধারণটা মেদহীন।

এখানে ব্যথায় কোকিয়ে ওঠার চিৎকারটা চিরন্তনের মতো বলেই আমরা খানিক অগ্রসর হলে ‘দংশন’ কবিতাটিতে পাই রঙ আর রঙিন ফানুসময় আমাদের যাপনযজ্ঞে জারি হওয়া মুখ আর মুখোশের নিত্যচর্চায় বলিয়ান এক বদনের নিংড়ানো ছবি, ‘গুচ্ছগ্রামের ছনঘরের মতো/হারিয়ে যাচ্ছে নিরন্তর সময়-/রাজকীয় শহরের ম্যানহোলে,/পরিবর্তনের এসব খেলায়/সবাই পাকাপোক্ত অভিনেতা।’ 
আমরা যখন এই গ্রন্থন্থ কবিতাগুলো এক এক করে পড়ি তখন বিঁধিয়ে উঠতে হয় কোথাও কোথাও, কোথাও কোথাও এমন করে স্থির হতে হয় যে, অস্থির হয়ে ওঠে ভেতর দরবারের দশদিক। আমরা যেন তখন আস্ত একটি দেশ দেখতে পাই, যেন একটি রাষ্ট্রের অবকাঠামো দেখেতে পাই, যেন ব্যথায় মুড়িয়ে ওঠা একজন কবিকেও দেখতে পাই তার নিবেদিত কবিতার পঙক্তির ভেতর, ‘ধানক্ষেতে ইঁদুরের দৌড়- রক্তফেনায় ভেসে যায় মাটি/ অনবরত খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ছিন্ন-ভিন্ন করে যায় তীক্ষè দাঁতে/ সবখানে অভিজাত ইঁদুর- গোগ্রাসে গিলতে থাকে শস্যবীজ/পিঁপড়ে বড় হয়ে উঠে ভেঙে দিয়ে যায় প্রজাপতির ডানা!/সমূহ আলোকবাতি তিমিরমুখে ঢুকে যেতে থাকে একে একে. . .(নিষিদ্ধ ভোর)।’

সত্যি কি আলোকবাতি তিমির মুখে ঢুকে যাচ্ছে একে একে? নাকি কবি অত্যোক্তি করেছেন! সময়ের নিদাঘে তাকালে প্রতিটি প্রশ্নের কিংবা প্রতিটি পঙক্তির উত্তর যেন আমাদের চারপাশেই আছে আমাদের চোখের সমনে। যখন আমরা চোখ বুজি তথন যেন পঙক্তিগুলো মিলে যায় আমাদের অধিত দৃশ্যের সঙ্গে। আর তখনই আমরা বলতে পারি কবি এখানেই সার্থক। এখানেই কবি ব্যতিক্রম। এখানেই ‘বীভৎস চিৎকার’ গ্রন্থটির বিজয়। যদিও কয়েকটি শব্দের বানানে বিভ্রাট ধরা পড়ে, কয়েকটি শব্দে অসম্পূর্ণতা দেখা যায় এবং কয়েকটি কবিতায় শব্দঝঙ্কার সুরহীন বহতায় ম্লান মদির তবু ভবিষ্যৎ-প্রতিশ্রুতি বিদ্যমান। পরবর্তীতে কবি নিশ্চয়ই আরও শিল্পোত্তীর্ণ কবিতা-গ্রন্থ নির্মাণে উদ্যোগী হবেন, প্রত্যাশা।

×