ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

পিতৃভক্ত সাহসী কন্যা

অপরাজিতা প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০০:৫৯, ১৪ জুন ২০২৪

পিতৃভক্ত সাহসী কন্যা

ঊর্মি রানী আচার্য্য

ঊর্মি রানী আচার্য্য। সাগরের ঢেউয়ের নামটা সার্থকই শুধু নয় উদার, মানবিক ছাড়াও পিতৃভক্তের এক অনন্য নজিরও। পিতা নারায়ণ চন্দ্র আচার্য্য। কর্ম জীবনে যিনি সুপরিচিত ছিলেন গ্রামের চিকিৎসক হিসেবে। মা অর্চনা রানী আচার্য্য একজন সুগৃহিণী এবং মাতৃহৃদয়ের  অপার মহিমাও বটে। ঊর্মির লেখাপড়ার হাতে খড়ি হয় নিজ বসতবাড়ির আঙিনার অনন্য পরিবেশে।

সেখানে বাবা-মাই শিক্ষকের ভূমিকায় সন্তানদের পড়াশোনার দায়ভাগ নেওয়া  ও পারিবারিক আবহের পরম নির্মাল্য। তবে আর্থিক সচ্ছলতার কিছু ঘাটতি থাকার কথাও ঊর্মির সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে আসে। ৩ বোন আর ১ ভাইয়ের মিলিত সরোবরে সাঁতার কেটেছেন আশৈশব সাহসী কন্যাটি। পিতা-মাতার আকাক্সক্সক্ষা আর আদর্শ ছিল সন্তানরা মানুষের মতো বড় হবে। নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে স্বাবলম্বী হতে যেন পিছু হটতে না হয়।

ঊর্মি এমন এক গ্রামের বাসিন্দা যেখানে মাধ্যমিক পেরুতে না পেরুতেই কন্যাকে বিয়ের আসরে বসতে হয়। অর্থাৎ গ্রামটি ছিল বাল্যবিয়ের প্রবল ঝুঁকিতে। কিন্তু উদার, আধুনিক পিতা-মাতার স্নেহাতিশয্য আর নিজেদের পরম উৎসাহ-উদ্দীপনায় লেখাপড়ার সমৃদ্ধ পাঠ চালিয়ে নিতে খুব বেশি থমকে দাঁড়াতেই হয়নি এবং অভাবনীয় সহযোগিতার হাত বরাবরই প্রসারিত থাকত পারিবারিক আলয়ের নিভৃত গৃহকোণটি। 

কুমিল্লা জেলার শাহাবৃদ্ধি গ্রামের বাসিন্দা ঊর্মির পুরো পরিবার। বংশ পরম্পরায় পৈত্রিক ভিটাও বলা যায়। জন্মদাত্রী মায়ের গল্পে উচ্ছ্বসিত ঊর্মি। মা শুধু ভালো মনেরই নয়, বরং সহজ-সরল, সাধারণ এক গৃহবধূর মর্যাদায় জীবন কাটানো অসাধারণ স্ত্রী ও মাতা। যা আবহমান বঙ্গ ললনার চিরায়ত রূপশৌর্য। জটিলতা, কুটিলতা কখনোই মাকে বিন্দুমাত্র স্পর্শই করতে পারেনি।

সেটাই সন্তানদের জন্য পরম আরাধ্য বিষয়। মা যেন দেবী প্রতিমার মতো এক অনন্য শক্তিময়তায় সংসার, ধর্ম পালন করে যান। সেখানে মা দশভুজার মতো সব কিছু আগলাতেও যেন পরম আরাধ্যের মহিমান্বিত রূপের আধার। মেধাবী ছাত্রী ঊর্মি মাধ্যমিকে সংশ্লিষ্ট তিতাস থানায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে মেধা তালিকায় প্রথম হয়ে নিজেকে অভিষিক্ত করেন। পুরস্কারস্বরূপ বৃত্তিও পেয়ে যান।

উচ্চ মাধ্যমিকেও জিপিএ-৫ পেয়ে নিজের কৃতিত্বকে ধরে রাখেন। বাণিজ্য বিভাগের ছাত্রীকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে কোনো বেগই পেতে হয়নি। সেটা নির্দিষ্ট গ্রামীণ এলাকায় দুই বোনের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার উজ্জ্বল নজিরও। অবাক বিস্ময়ের আরও কত যে বাকি আছে সেটাই বড় চমক। এক অসাধারণ দুঃসাহসী কন্যার পিতার জন্য অনমনীয় ভক্তি, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর নিঃশর্ত নিবেদন।

২০১৬ সালে সম্মান পর্বে দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী থাকার সময় বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এক সময় যখন রক্ত বমি করা শুরু করলেন তখন সবাই হতবাক। বিপন্ন এমনকি দিশেহারাও। এক অসহনীয় মরণব্যাধি লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হওয়া। ভয়ে সবার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার চরম দুঃসময়। অসময়ের দুর্বিপাকে পুরো পরিবার শোকে-দুঃখে হতাশ হওয়া ছাড়া সামনে কিছু না দেখারই দুরবস্থা।

প্রাথমিকভাবে লড়াইয়ে নামতে হয় সংসার চালানোর খরচ নিয়ে। বাবা অসুস্থ, শয্যাশায়ী। বড় দুই বোনোর শিক্ষার্থী পড়ানোর রোজগারে পরিবারটি আলোর মুখ দেখলেও অসুস্থ পিতাকে নিয়ে প্রত্যেকের হিমশিম খাবার চরম আকাল। 
পিতার চিকিৎসার জন্য গ্রাম থেকে শহরে চলে আসাও আধুনিক পদ্ধতির নবতর সংযোজন তো বটেই। ২০১৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত পারিবারিক বহু ঘটনা-অঘটন দেখে ঊর্মির হৃদয় মন পীড়িত, আলোড়িত ছাড়াও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ভরে ওঠে। ২০১৯ সালেই চরম বিপণœতায় বাবা হঠাৎই পেটের ব্যথায় কাতর, পরিশ্রান্ত হতে থাকলেন। চোখ মেলে তাকিয়ে থাকা ছাড়াও কিভাবে সর্বোত্তম চিকিৎসা দেওয়া যায় তেমন প্রচেষ্টাও সবাই মিলে ভাবতে থাকে।

লিভার সিরোসিসের সর্বশেষ আর সর্বোত্তম চিকিৎসাই লিভার প্রতিস্থাপন করা। এর ব্যত্যয় রোগীর অবস্থা খারাপ হতে থাকে। সঙ্গত কারণে পিতার শরীর ক্রমশ খারাপ আর দুর্বল হওয়ায় পরিবার দিশেহারা, অস্থির এক দুঃসময়ের সাগর পাড়ি দেওয়ার চরম দুর্যোগ। পেটে পানি জমে ফুলে যাওয়া, হাত-পায়ে পানি এসে কি যে দুর্বিষহ অবস্থা। ইঞ্জেকশন দিয়ে সে পানি বের করার কষ্টও দেখতে হয়েছে ঊর্মিকে। অজ্ঞান হয়ে যেতেও সময় লাগত না।

পিতার অসুস্থতার বর্ণনায় ঊর্মির যে নাভিশ্বাস হওয়ার উপক্রম তাও এক বেদনাহত কন্যার চরম দুর্ভোগ। পিতার চেনা-জানা চার পাশের মানুষদের অজানা, অপরিচয়ের বিস্ময়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা আজও কন্যাকে কষ্টের সাগরে ভাসিয়ে নেয়। বাবাকে সুস্থ করার জন্য দেশের সব ভালো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ঢাকা মেডিক্যাল, বারডেম, পিজি, ল্যাবএইডসহ আরও  কিছু হাসপাতাল।

কিন্তু সব চিকিৎসা কেন্দ্রের একটাই পরামর্শ লিভার প্রতিস্থাপন সার্জারিতে জীবিত ও সুস্থ দাতার লিভারে একটি অংশকে বের করে এনে রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। আর কোনো আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার হয়নি। তখন থেকেই ঊর্মিসহ সবাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে বাবাকে কিভাবে বাঁচানো যাবে। লিভারের যুদ্ধের জন্যই লাগবে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা। সঙ্গে একজন ডোনার। প্রত্যেকের মাথায় হাত।

ডোনার কিভাবে জোগাড় হবে? কে দেবে এমন সেবা পিতাকে। চিকিৎসা পদ্ধতির খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ আর হরেক অনুসন্ধান, যাচাই-বাছাইয়ের ফলস্বরূপ যা সামনে দৃশ্য হয় সেটা শুধুমাত্র লিভার প্রতিস্থাপন। ক্রমান্বয়ে বের হয়ে আসল পরিবারের যে কেউ হচ্ছে কবলে এমন অসাধারণ কাজটি করা কোনো ব্যাপারই নয়। ভাবতে আর সময় নষ্ট করেননি কন্যা ঊর্মি। নিজেই স্বতপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসলেন পিতাসহ পুরো পরিবারের চরম দুর্দিনে। প্রাথমিকভাবে পরিবার থেকেই আপত্তি আসছিল এমন মহৎ কাজের ব্যাপারে।

অল্প বয়সী কন্যার লিভারে পিতার জীবন বাঁচানো। কিন্তু কোনো ওজর আপত্তি ধোপে টেকেনি। কাহিনী শেষ করে ঊর্মি যেন নির্বিঘœ, নিরুদ্বেগ আর স্বস্তিদায়ক নিশ্বাস ফেলেন। শেষ পর্যায়ে আনন্দ উল্লাসে উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন বাবাকে বাঁচানো ছাড়াও আমি আর বাবা আসলে খুব সুস্থ আছি পরম করুণাময়ের অশেষ আশীর্বাদে। সবার দোয়া প্রার্থী এই পিতৃভক্ত কন্যাটি। পিতা আর নিজের জন্যও দোয়া চাইলেন। পিতা যেন দীর্ঘজীবী হোন আর নিজে যেন সুস্থ থাকতে পারেন। এমন সহৃদয় মঙ্গল কামনা প্রতিবেদক পাঠকের কাছেও আশা করছে।
অপরাজিতা প্রতিবেদক

×