ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

ঈদে গৃহিণীর ব্যস্ততা

নাজনীন বেগম

প্রকাশিত: ০০:৫৭, ১৪ জুন ২০২৪

ঈদে গৃহিণীর ব্যস্ততা

কোরবানির মাংস রান্না করা কম ঝক্কি ঝামেলা নয় কিন্তু

সামনে অপেক্ষমাণ পবিত্র ঈদুল আজহা। ধর্মপ্রাণ জাতি আমরা। আরও বেশি করে অসাম্প্রদায়িক আবহমান বাংলার এক অনন্য বোধে যাপিত জীবন এগিয়ে নিই। যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সম্প্রীতির বাঁধনে লড়াকু অভিযাত্রায়ও নিজেদের একতার কাতারে সম্মিলিতও করি।

এমন সব ধর্মীয় অনুভবে বঙ্গ ললনাদেরও যে কত আবেগ, আয়োজন প্রচ্ছন্ন হয়ে থাকে তাও এই অঞ্চলের বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপের চিরায়ত কর্মসাধনা। কোরবানির ঈদ মানেই ব্যাপক অনুষ্ঠান সর্বস্ব মহা আড়ম্বর তো বটেই। গরু-ছাগল কোরবানি দেওয়াই শুধু নয় তার চেয়েও বেশি প্রস্তুতির পর্বের অবারিত কর্মযোগ।

সমাজ, সংস্কার পরিবারের বৃহৎ কার্যক্রমের সমসংখ্যক নারীর প্রায়ই পুরোটাই জড়িয়ে থাকা চিরায়িত বাংলার সমতাভিত্তিক অবয়ব। উৎসবপ্রিয় জাতি আমরা। তাই ধর্ম হোক কিংবা পার্বণই ধরা যাক। মহা সাড়ম্বরে উদযাপন করতে বাঙালি নারীদের অবারিত কর্ম সাধনা সেই পুরাকাল থেকে আধুনিক প্রযুক্তির বাংলাদেশেও সম্প্রসারিত। নির্দ্বিধায়, নির্বিঘেœ সমর্পণও বলা যেতে পারে।

প্রথমেই কোরবানির আগেই সপ্তাহখানেক ধরে শুরু হয়ে যায় হাটে যাওয়া, গরু কেনা। তার ওপর আর্থিক সার্মথ্যও বিশেষ বিবেচনায় থাকে। শুধু কি হাটে গিয়ে গরু, ছাগল কেনা? বরং প্রস্তুতি পর্ব শুরু হয়ে যায় বসতবাড়ির কোথায় কোরবানির পশুকে রাখা যাবে। বৃহদাকার থেকে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশও কোরবানির পশুর জন্য নির্ধারিত থাকে।

এমন সব কাজ গৃহিণীকেই হয় নিজের হাতে করা লাগে। নয় তো বা সতর্ক নজরদারিতে অন্য কাউকে দিয়ে করিয়ে নিতে হয়। খুব সহজসাধ্য নয় কিন্তু। কঠোর তত্ত্বাবধান আর সচেতন দৃষ্টি রাখতে হয় বসতবাড়ির আঙিনার চতুর্দিক। শুধু কি পশু থাকার সুবন্দোবস্ত। বরং জবাই দেওয়ার পর গুছানোর ঝামেলা যে কতখানি সেটাও অভিজ্ঞ এক সুগৃহিণীর চিরন্তন পারদর্শিতা তো বটে।

একা কোরবানি দিলে ব্যবস্থা যা হয়-সেখানে ভাগের বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা। কয়েক জন মিলে যদি কোরবানি দেওয়া হয় তেমন ভাগবাটোয়ারার ঝক্কি ঝামেলা তো কতখানি সংশ্লিষ্টরাই উপলব্ধি করেন সবচেয়ে বেশি। সব কাজ গৃহিণী দশভূজার মতো এক হাতে সামলান তা কিন্তু নয়। বরং-পরিবারের কর্তাব্যক্তিটিও তার যথাযথ কর্মযোগের বাইরে থাকেনই না। সম্মিলিত এক মহোৎসব।

যা নারী-পুরুষ উভয়েরই এক অবায়িত মিলনযজ্ঞ। তবে এ তো গেল শুধু গরু-ছাগলের রাখা এবং জবাই করার ব্যাপক কাজের মহাযজ্ঞ। কোরবানির কয়েকদিন আগে থেকেই ময়মসল্লা গোছানোর কাজটিও সারতে হয় পরিবারের মা, স্ত্রী, কর্ত্রীকেই। সেটাও  কম আয়োজনের কিছু নয়। ব্যাপকভাবে মহা আয়োজনের যথাযথ প্রস্তুতি বলে কথা।

আবার দা, বঁটি, ছুরি যার ওপর রেখে মাংস কাটা হয় তেমন আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র গোছানোর দিকেও ঘরের কর্ত্রীটিরই নজর থাকে বেশি। পুরো বিষয়টি আসলে যোগাড় যন্ত্রের মধ্য দিয়ে রান্নার পর্ব সারা। সেটা তো সেই যুগ-যুগান্তরের শাশ্বত বঙ্গ রমণীর নিঃশর্ত সমর্পণ, নিবেদন। আধুনিক প্রযুক্তির আঙিনায়ও নারীদের সেই চিরায়ত কর্মচাঞ্চল্যের কোনো বিরাম বিরতি তো নেইই।

বরং নতুন সময়ের কত বরমাল্য যে তার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে সেটাও আবহমান বাংলার নানামাত্রিক আয়োজনের আর এক নব অধ্যায়ের অনন্য মহিমা। যারা একটা গরু কোরবানি দেন তাদের যতœ করে সংরক্ষিত মাংস গোছানোর বিষয়টিও থাকা ভিন্নতর কর্মপ্রবাহ। কঠিনও বটে। ধর্ম আর আইন অনুযায়ী ভাগ বাটোয়ারার পর্ব সেরে বাকি মাংস অত্যন্ত সচেতনতায় স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে গুছিয়ে রাখতে হয় সামনের সময়গুলোর জন্য।

সেখানে সবার আগে সামনে আসে সুস্বাদু মাংসের কিছুমাত্র ব্যতিক্রম না ঘটিয়ে তাকে ঠিকঠাক আদলে রাখতে ফ্রিজের প্রয়োজন নিতান্তই শুধু নয় অত্যাবশ্যকও বটে। আর আধুনিক সময়ের ফ্রিজের বহুবিধ অবয়ব আর ঠান্ডা রাখার সমূহ সম্ভাবনায় গৃহিণীদের নজর থাকে ভালো কোম্পানির অত্যাধুনিক ফ্রিজ। শুধু কেনা নয় বাসায় থাকা ফ্রিজকেও ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে একেবারে ঝকঝকে তকতকে করতে রঙ্গ-রমণীদের জুড়ি মেলা ভার।

ধর্মের বিধি অনুযায়ী নিজ অংশের মাংস থেকে কিছু আত্মীয়-স্বজন ছাড়াও গরিব দুঃখীদের মধ্যে বিতরণ করতে হয়। কাজটা যত সহজে বললাম করাটা আরও কঠিন। সেখানে শুধু গৃহিণী নন পরিবারের পুরুষ কর্তাটিকেও হাত লাগাতে হয়। এতক্ষণ গৃহিণীর পরম কর্ম কাঁচা মাংস গুছানো ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে আলোকপাত করেছি মাত্র। আসল কাজ তো এখনো বাকি। যা দশভূজা আবহমান বঙ্গ রমণীদের রন্ধন শিল্পে অনন্য বিজয় গাঁথা তো বটেই।

কোরবানির মাংস রান্না করা কম ঝক্কি ঝামেলা নয় কিন্তু। বার্ষিক এই ধর্মীয় উৎসবটি সারা বছরের এক আরাধ্য বিষয়ও বটে। বাজার থেকে নিয়মিত মাংস কিনে খেতে হয় আমাদের। সেটা আজকের না ২/৩ দিন আগের তাও বুঝার উপায় থাকে না। কিন্তু কোরবানির তাজা গরুর মাংসের রান্নার যে অভাবনীয় উৎসাহ আর আগ্রহ সেটা শুধু একজন সুগৃহিণীকেই আলোড়িত, আলোকিত করে তার দাম আলাদা, অমূল্যই বটে।

তেমন আয়োজনও হয় অন্তরনিঃসৃহ পরম আগ্রহ আর উৎসাহব্যঞ্জক তো বটেই। একটু যেন অন্য রকম রন্ধনের অভাবনীয় এক সুসময় অবশ্যই। বিয়েবাড়ির মতো বড়  পাতিলে রান্না করার আনন্দ তো সারা বছর পাওয়াই যায় না। ধর্মীয় ও জাতিগত উৎসব কোরবানি যা বাংলার আপামর গৃহিণীদের জন্য এক অপার সম্ভাবনাময় দ্বার উন্মোচন করে দেয়। তবে উৎসবপ্রিয়তার কারণে ধর্মীয় কর্মযোগও আমরা আনন্দ আয়োজনে ভরিয়ে তুলি।

সেখানে আমাদের নারী সমাজের যে অনন্য, অসাধারণ তোলপাড় করা কর্মযজ্ঞ তা তুলনাহীন। আনন্দ, উৎসব আর আয়োজনের সঙ্গী হয়ে বড় মাপের কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন  সত্যিই এক অনন্য জীবনপ্রবাহ। তবে আমাদের নারী সমাজ তেমন উৎসবের অপেক্ষাই শুধু করে না বরং নিঃশর্ত নিবেদনে পুরো কর্মযোগ সামলানো যেন তাদের জাতিগত আর চিরায়ত ঐতিহ্যকেও ধারণ লালন করে।

×