ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ০২ মার্চ ২০২৪, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩০

সাতক্ষীরার পথে সুন্দরবনে

আশরাফ উজ জামান

প্রকাশিত: ১৭:৪৬, ৮ জানুয়ারি ২০২৩; আপডেট: ১৭:৪৮, ৮ জানুয়ারি ২০২৩

সাতক্ষীরার পথে সুন্দরবনে

খালের দুই পাশে অপরুপ সুন্দরবন। ছবি: জনকণ্ঠ।

এইতো গেল ডিসেম্বরে ৩ দিনের লম্বা ছুটির ফাঁদে ঢাকা ছাড়বো এমনই পরিকল্পনা সবার। ৬ জনের একটি দল। তবে ক’দিন পেরোতেই এতে যোগ হলো আরো ২ জন। হাসান ভাই, সাঈদ ভাই, রোজি ভাবি, সজীব, লুবনা, মেহনুর ও সাফা। তাদের বেশিরভাগই চাকরিজীবী হওয়ায় এ ছুটি ছাড়া উপায়ও ছিল না। সবশেষে ৮ জনের এই ছোট দলের রওনা সাতাক্ষীরার পথে। আর তাতে বাধ সাধলো মাইক্রোবাস নিয়ে। আগের রাতে ড্রাইভার বিগড়ে গিয়ে পরে নানা অজুহাতে আর গেলই না। সেই রাতেই গ্রুপ মিটিং। সিদ্ধান্ত হলো বাসে যাওয়ার। সেই পরিকল্পনায় সকাল ৭টার আগেই গুলিস্তানে বাস কাউন্টারে সবাই হাজির।

যাত্রা হলো শুরু:

সময় মতোই গাড়ি সকাল ৭টায় ছাড়ল। দলে একজন বাদে কেউই পদ্মা সেতুর উপর দিয়ে যায়নি। তাই, সবাই ছিল খুবই উৎসুক। শীতের আগমন ভালোই লাগছিল সবার। কুয়াশার কারণে সেতুর দু’পাশের খুব বেশি দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল না। তারপরেও সবার মনে ছিল আনন্দ। এই সেই সেতু, কত কেচ্ছা, কত কাহিনীতে ভরপুর ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক। কেউ নামাজ পড়েছিল, কেউবা টিকটক, কেউবা সেলফি তুলেছে, কেউ আবার নাটবল্টু খুলাসহ আরো কত কি করে আলোচনা এসেছিল! সেতু পার হতেই সুন্দর একটি রাস্তা দিয়ে দ্রুত চলে যাচ্ছে বাস। ফরিদপুর ভাঙা পার হয়ে খুলনার পথে বাস। পথে অবশ্য ১০ মিনিটের চা বিরতি। সেই সঙ্গে যে যার মতো একটু হালকাও হয়ে নিল। 

খুলনার রূপসা সেতুর কাছে আসতেই সবার মন যেনো অস্থির, আর কত দূর সাতক্ষীরা। বেলা ১২টায় পৌঁছানো হলো সাতক্ষীরা বাস স্টান্ডে। আর আমাদের স্বাগত জানাতেও হাজির রঘুদা। তিনিই হলেন ২ দিনের গাইড। একটি রেস্টুরেন্টে নাস্তার পর্ব শেষ করে এবার শহরেই ঘোরাঘুরির পালা।

শ্রী শ্রী অন্নপূর্ণা মন্দির

রঘুদা পথমেই নিলেন শ্রী শ্রী অন্নপূর্ণা মন্দির। শহরের কাছে হওয়ায় সবাই মিলে দেখে নিলাম মন্দির। ইতিহাস ঘেটে যা পেলাম, তা এমনই। একই স্থানে পাঁচটি ভিন্ন মন্দির। সেগুলি হলো- কালী মাতা মন্দির, শিবমন্দির, কালভৈরব মন্দির, অন্নপূর্ণা মন্দির, রাধাগোবিন্দ মন্দির অবস্থিত বলে একত্রে সাতক্ষীরা পঞ্চমন্দির বলা হয়। জমিদার বিষ্ণুরাম চক্রবর্তী এই পঞ্চমন্দির নির্মাণ করেন। নান্দনিকতার সৌন্দর্য্যের দিক থেকে অন্নপূর্ণা মন্দির অন্য মন্দির গুলো থেকে আলাদা। মন্দিরটি ৪৫ ফুট উঁচু। ভূমি থেকে সরু হতে হতে মন্দিরের চূড়া গম্বুজাকৃতির রূপ নিয়েছে। মন্দিরের গায়ে বিভিন্ন টেরাকোটার নকশাওয়ালা ইট ব্যবহার করা হয়েছে। ১৭৯৭ সালে জমিদার বিষ্ণুরাম চক্রবর্তী স্থায়ীভাবে সাতক্ষীরায় বসবাস শুরু করেন। তিনি পূজা অর্চনার জন্যই এই পঞ্চ মন্দির নির্মাণ করেন।

মন্দির দেখা শেষে এবার দুপুরের খাবারের পালা। শহরের মাঝেই সবাই খেয়ে নিলাম বিখ্যাত সেই চুইঝালের খাসির মাংস দিয়ে। সঙ্গে দই।

শ্যামনগরের পথে:

বাহন এবার মাইক্রোবাস। শহর পার হয়ে শ্যামনগরের পথে। মাঝে অবশ্য একটি জমিদার বাড়ি ও যশোরেশ্বরী কালি মন্দিরে ঢু মেরে আসা। জানা যায়, যশোরেশ্বরী কালী মন্দির সনাতন ধর্মালম্বীদের কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান। সারা পৃথিবীতে সনাতন ধর্মের ৫১ পীঠের একটি যশোরেশ্বরী মন্দির। দেশ-বিদেশের বহু সনাতন ধর্মের অনুসারীরা প্রতি বছর এখানে শ্যামনগরের ঈশ্বরীপুর যশোরেশ্বরী কালী মন্দির পরিদর্শনে আসেন। সেখানে দেবীর সন্তুষ্টির জন্য পূজা অর্চনা দিয়ে থাকেন। সনাতন ধর্মালম্বীদের বাইরেও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় অসংখ্য মানুষ বিভিন্ন সময়ে এ কালী মন্দির দর্শন করেন। সানতন ধর্মালম্বীদের বিশ্বাস, দেহত্যাগের পর দেবী সতীর শরীর যে ৫৩ খন্ড হয়ে যায় তার পাঁচটি খন্ড বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। অন্য অংশগুলো ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, আফগানিস্তান ও চীনে পড়ে। এর মধ্যে ঈশ্বরীপুর গ্রামে সতীর করকমল বা পাণিপদ্ম পড়ে।

যশোরেশ্বরী কালি মন্দির।

মন্দির দেখা শেষে আবারও শুরু পথ চলা। পথ খুব একটা মৃসূণ না থাকায় ঝাঁকুনিতে মোটামুটি সবারই নাকাল অবস্থা। সন্ধ্যার দিকে হাজির শ্যামনগর। আগেই বুক করা ছিল বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার রেস্ট হাউজ সুশীলন। যে যার রুমে গিয়ে ফ্রেশ হওয়া এবং একটু বাদে বের হওয়া চা কফি খাওয়া। ঠান্ডায় মোটামুটি সবারই জানান দিচ্ছে ভালো করেই। অন্ধকারে আপাতত কিছুই করার নেই। কিছুদূরে মালঞ্চ নদী। গ্রুপের কেউ কেউ বললো, ভাই জানালা-দরজা বন্ধ রাইখেন, বাঘ নাকি নদী পার হয়ে সাঁতরে উপকূলে এসে পড়ে। ভয়ে অস্থির কেউ কেউ। তাই রাতের খাবার খেয়েই সবাই কম্বলের তলে। মাঝে অবশ্য ঘরোয়া গান ও কার্ড চলছেই।

খেজুর রস:

সকাল ৭টায় সবাই উপস্থিত রেস্ট হাউজের বারান্দায়। উপলক্ষ খেজুর রস ও খিচুড়ি। যদিও ৮টা বেজে গেল সব গোছগাছ করতে। তারপরেও খেজুর রসে সকালের বেড টি সেড়ে ফেলা হলো। এতো মিষ্টি! সবাই ২-৩ গ্লাস খেয়ে নিল। তবে রঘুদাকে ধন্যবাদ দিতে ভুললো না। এবার মুরগি-খিচুড়ি পেয়ে সবাই যেনো পেট পুরে খেয়ে নিল। শহরে যারা আমরা বাসায় খিচুড়ি খাই, তাদের জন্য গ্রামাঞ্জলের পাকা বাবুর্চির হাতে খিচুড়ি, এক কথায় অপূর্ব।

সুন্দরীতমা:

রেস্ট হাউজ থেকে আবার মাইক্রোবাসে করে খোলপেটুয়া নদীর ট্রলার ঘাটে। আবারও সেই খানাখন্দ রাস্তা। যদিও ৩০ মিনিটের রাস্তা, কিন্তু সবার মাঝে সেই কষ্টটা বুঝা যায়নি। অবশেষে ট্রলার ঘাটে। দূরে সুন্দরবন। নদীর মাঝ দিয়ে একে একে ছেড়ে যাচ্ছে ট্রলার। আমরা উঠে পড়ি ট্রলারে। কেওড়া ও সুন্দরীগাছের পাশ ঘেষে কূলের ধার বেয়ে ট্রলার চলছে। নির্মল ঠান্ডা বাতাশে মন-প্রাণ ভরে যাচ্ছে। কেউবা শতভাগ অক্সিজেন নেয়ার চেষ্টায় জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। কোথাও বাঘ ও হরিণের দেখা না পেলেও কলাগাছিয়া ইকোট্যুরিজম পার্কে নাকি বানর, হরিণ, কুমিরের দেখা মেলে। সঙ্গে লাল কাকঁড়া। মূলত খুলনার সাতক্ষীরা রেঞ্জের আওতায় সুন্দরবনের পশ্চিম অংশে অবস্থিত কলাগাছিয়া ইকো ট্যুরিজম পার্ক ও টহল ফাঁড়ি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত একটি পর্যটন কেন্দ্র। 

কলাগাছিয়া ইকোট্যুরিজম পার্কে হরিণ।

কেন্দ্রটির একদিকে লোকালয় ও অন্যপাশে সুন্দরবন, আর মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে খোলপেটুয়া নদী। বন পেরিয়ে নদী পথে খাল পার হয়ে কলাগাছিয়া যেতে হয়। লোকালয় পার হয়ে সুন্দরবনের পশ্চিম বনের ভেতর দিয়ে কলাগাছিয়া যাওয়ার সময় দুই ধারের সারি সারি বন পর্যটকদের মুগ্ধ করবেই।

ঘাটে ট্রলার ভিড়লেই দেখা মেলে অসংখ্য বানরের। মূল অংশে ঢোকার পথে আছে লোহার তৈরি একটি ব্রিজ। এই ব্রিজ পার হলেই একটি রেস্ট হাউজ ও কাঠের  তৈরি আরেকটি ব্রিজ। কাঠের সেতুর দুই পাশে আছে খলিশা, হরকোচা ও বাইন গাছের সারি। আর বনের ভেতরে আছে বানর ও হরিণের দল। তাদের পর্যটকরা হাতে করে নিয়ে আসছে কলা ও মুড়ি। তা নিয়েই বানরদের টানাহেঁচড়া। কেউবা হরিণের মুখে তুলে দিচ্ছে মুড়ি আর পেয়ারা। হাতের কাছেই হরিন-বানরদের পেয়ে পর্য়টকরাও মেতে উঠেছে কিছু সময় কাটাতে। 

ওয়াচ টাওয়ার

পাঁচতলা সমান ওয়াচ টাওয়ার থেকে পাখির চোখে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। এখানে বনের ভেতরের শিব মন্দিরে বনবিবির পূজা করা হয়। অনেকের বিশ্বাস মন্দিরে দর্শন দিয়ে বনের ভেতরে গেলে সকল বিপদ আপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

কলাগাছিয়া ইকোট্যুরিজম পার্ক ঘুরে আবার শ্যামনগরে আকাশলীনা ইকোট্যুরিজম পার্ক। টিকিট কেটে ঢুকে পড়া। চুনা ও মালঞ্চ নদীর কোল ঘেঁষা শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের কলবাড়িতে অবস্থিত আকাশলীনা ইকো ট্যুরিজম সেন্টার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ আধার।

আকাশনীলা ইকো সেন্টার থেকে দূরে সুন্দরবন।
প্রকৃতি যেন তার আপন মহিমায় সাজিয়েছে সবুজে ঘেরা এ পর্যটন কেন্দ্রটি। পর্যটন কেন্দ্রটিতে ঢুকে কিছুদূর এগুতেই দেখা যায় শাখা-প্রশাখার মতো ছড়িয়ে গেছে সুদৃশ্য ট্রেইল। ট্রেইল ধরে হাঁটতে হাঁটতে চলে যাওয়া যায় চুনা নদীর তীরে। যার ওপারেই সুন্দরবন। এখানে আসলে দেখা যাবে, আবদুস সামাদ ফিস মিউজিয়ামে সংরক্ষিত সুন্দরবনের নদ-নদীর মৎস্য সম্পদ। রয়েছে, উন্নতমানের আবাসিক ইকো কটেজ বনবিলাস। সারি সারি কেওড়া, গেওয়াসহ সুন্দরবনের বৃক্ষরাজির সমাহারে ঘেরা আকাশলীনা ইকো ট্যুরিজম সেন্টার সব সময় শালিক, বকসহ নানা প্রজাতির পাখির কিচির মিচির শব্দে মনকে আন্দোলিত করে।

নদী ঘেষে সুন্দরবনের কেওড়া গাছ

সুন্দরবন আসলে দুই দিন ঘুরে দেখা সম্ভব নয়। তারপরেও সুন্দরী গাছের ভিড়ে সুন্দরীতমার খোঁজে কে না যেতে চায়? সবশেষে রঘুদা, তুহিন ভাইয়ের আতিথেয়তা মনে থাকবে সারাজীবন। হয়তো আবারও সুযোগ পেলে, তখন বনের আরো গহীনে দেখা পাবো বাঘ মামার, ভ্রমণ শেষে এটাই মনে হচ্ছে।

এমএইচ

×