ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ২৮ মে ২০২৪, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

বর্ষবরণ বাঙালি নারীর শাশ্বত বোধ

নাজনীন বেগম

প্রকাশিত: ০২:০১, ১৯ এপ্রিল ২০২৪

বর্ষবরণ বাঙালি নারীর শাশ্বত বোধ

বর্ষবরণ বাঙালি নারীর শাশ্বত বোধ

১৪৩১ সাল সাড়ম্বরে উৎসব আনন্দে তার নব অবগাহনে সবাইকে মাতিয়ে দেয়। তার আগে বিষাদঘন অনুভবে পুরনো বছরকে বিদায় দেওয়া প্রচলিত নিয়মের অধীন। উৎসব প্রিয় জাতি আমরা মহামিলনের যজ্ঞ শালায় সর্বমানুষের একাত্মবোধ সেই চিরায়ত অবিমিশ্র স্রোতের নব আঙ্গিক। তবে পুরনোর শেষ প্রহরে আর প্রভাতের নতুন সূর্যোদয় যেন শাশ্বত বাংলার অপরিমেয় শৌর্য।

এমন শক্তিময়তা আর মাধুর্যের মিলনগ্রন্থিতে যুগ-যুগান্তরের বঙ্গ রমণীর যে অপরিমেয় কর্মসাধনা আর নিত্যদিনের অঙ্গসজ্জার বহুবিধ উপকরণ তাও এই চৈত্র সংক্রান্তি আর নববর্ষের যৌথ স্রোতের অনবদ্য অবগাহন। সারা বাংলাদেশ নব সাজের যে অভিন্ন রূপে নিজেকে রাঙিয়ে নেয় তেমন সম্ভারও বাঙালিয়ানার অনন্য রূপময়তা। সত্যিই রূপশৌর্যই বটে। যেমন বঙ্গ রমণীর সালঙ্করা সাজ সজ্জা পাশাপাশি আপন ঐতিহ্যে পরিবেশের সঙ্গে হরেক মাত্রার যোগসাজশও। এবার ঈদ আনন্দ আর বৈশাখী আমেজ এক মিলিথ স্বপ্ন সৌধ যেন। দুই মাত্রার সাংস্কৃতিক বোধ মিলেমিশে একাকার।

আবহমান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চেতনার যেন যুগলবন্দি। চিরস্থায়ী মনন
 সৌধে আর এক ঐতিহ্যিক দ্যোতনার নবদ্যুতি তো অবশ্যই। আবহমান বঙ্গ  রমণীরা শুধু উৎসব প্রিয়তাই নয় বরং বাহারি রান্নার আয়োজন ছাড়াও সাজ সজ্জায় নিয়ে আসে বৈচিত্র্যিক আবহ। তেমন দৃশ্য অবলোকন করা হয় রমনা বটমূলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা চত্বরে। তবে শুধু বঙ্গ ললনারাই নয় তার সঙ্গে বৃহত্তর মিলনমেলায় যুক্ত হয়েছেন অনেক বিদেশী নারীও। নিজেদের দেশীয় পোশাকের বদলে অঙ্গে শোভা পাচ্ছে বাঙালি বোধেরও অনন্য সম্ভার শাড়ি।

শাড়ি দুলিয়ে অঙ্গভঙ্গিতে নাচতে থাকা ভিন দেশী রমণীরা উপস্থিত দর্শকদের নজর কাড়ে। আনন্দে উদ্বেলিত হওয়ার মতো পরিবেশ পরিস্থিতিও খুশির আবেগে সাড়া জাগায় চারুকলা চত্বরের পুরো উৎসব মুখরিত প্রাঙ্গণ। আর চৈত্র সংক্রান্তির মেলায় বসেছে নারীর অঙ্গ সজ্জার নানামাত্রিক উপকরণ। মাটির গহনা থেকে শুরু করে কারুকার্য খচিত বিভিন্ন ডিজাইনের নকশায় পোশাকের যে ভিন্নমাত্রার আবেদন তাও বাংলার আবহমান রমণীর আপন কর্মযোগের চিরায়ত বোধ। শুধু কি মাটির গহনা?

তার সঙ্গে মিলেছে মাটির হাঁড়িপাতিলও। সেটা ছোট্ট কন্যা সোনামণিদের জন্য সারা বছরের রান্নায় খেলনার অনন্য উপকরণ। নারীদের জীবনযাপনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসও চৈত্র সংক্রান্তি আর বৈশাখী মেলাকে চিরস্থায়ী আবেদনে বর্ণাঢ্য করে তোলে। অন্যদিকে বাংলার নৈসর্গিক সৌন্দর্য তাকে আরও রূপময় করে দৃষ্টিনন্দনে ভরিয়ে রাখে। চারুকলার চত্বরজুড়ে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে বৈশাখী সাজ সজ্জায় নারীদের যে রূপময়তা সেটা যেন নৈসর্গিক শাশ্বত বাংলার অনবদ্য রূপ সম্ভার।

বৈশাখী সাজে নয়নাভিরাম শোভায় নারীদের যে মিলনসৌধ সেটা তো এই অঞ্চলের সম্প্রীতির শক্ত বাধনও। যে মিলনযজ্ঞে প্রত্যেকের পরম নির্মাল্য সেটাও শাশ্বত শুভকর্মের সাহসী যাত্রাপথ। যেমন ছোট্ট পারিবারিক অঙ্গনে শক্ত বাধন তৈরি করে নারীদের যে অদম্য ছুটে চলা সেটা উৎসব আয়োজনে বৃহত্তর সামাজিক পরিধিকে শক্ত থেকে আরও শক্তিময়তায় রূপ নেয়। যা চিরস্থায়ী সম্প্রীতির ব্যাপক আড়ম্বরের অনন্য মিলনসৌধ। বৈশাখ মানেই নতুন বছরের নব উন্মাদনা।

আধুনিকতার পরম নির্মাল্যে অনেক কিছু যোগ হলেও ঐতিহ্যিক চেতনায় তেমন কোনো ব্যত্যয় তৈরি হয়নি। আমরা নিজেরা স্বভাবগত পরিম-লে মূলত একা থাকতে অপছন্দ করি। ভরা সংসারের বৃহত্তর পরিবেশ আমাদের এক সুতায় গেঁথে বংশ পরম্পরায় যে মিলনগ্রন্থি তৈরি করে দেয় তেমন বন্ধন জাল ছিন্ন করা এক অসম্ভব পর্যায়। গ্রামনির্ভর আবহমান বাংলার এমন সহনীয় পরিস্থিতি যেন ঘরে ঘরেই সম্প্রীতির জোয়ারের নির্ণায়ক। যার মূল আবেদনে থাকে চিরায়ত বাঙালি নারীর আবহমান মমত্ববোধ আর চিরস্থায়ী বন্ধনগ্রন্থির অভাবনীয় কর্মদ্যোতনা।

মিলেমিশে একসঙ্গে যে বন্ধন জাল বিস্তার আধুনিকতার নতুন সময়েও তাকে ছিন্ন করা যেন অসম্ভবের পর্যায়। শুধু কি বঙ্গ ললনা? তার সঙ্গে ক্ষুদ্র সোনামণি কন্যা শিশুদের যে আনন্দ আবেদন সেটাও চিত্তাকর্ষক এবং নয়নাভিরাম। কন্যা শিশুদের হাতে-পায়ে-মুখে যে আলপনার সুচারু চিত্রাঙ্কন দেখেও যেন সাধ অপূর্ণ থেকে যায়। শিশু শব্দটিই সুন্দর, মাঙ্গলিক আর রূপময়। আর কন্যা শিশু তার বৈচিত্র্যিক সৌরভে যে মাত্রায় পরিবেশ-পরিস্থিতি রাঙিয়ে দেয় তার তুলনা সত্যিই এক অপূর্ব মায়াময় স্বপ্ন দ্যোতনা।

আর বৈশাখ মানেই তেমন ঐতিহ্যিক সহমর্মিতার নিরবচ্ছিন্ন মিলনমেলা। পুরনো বছরের বিদায়েও নারীদের বিভিন্ন দেশীয় পার্বণ উদ্যাপন সাংস্কৃতিক মিলনগ্রন্থিতে জীবনভর নিবেদন, সমর্পণে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এক সুতায় মালা গাঁথে। যা শাশ্বত বাংলাকে চিরমহিমান্বিত-গৌরবান্বিত করে দেয়। আর বৈশাখ মাস নবরূপে আবির্ভূত হলেও পুরনো ঐশ্বর্যকে বাদ দিয়ে কোনোভাবেই নয়।

তা ছাড়া বৈশাখ মাসের সময়জুড়ে থাকে নারীদের (হিন্দু) আর এক অন্যমাত্রার যোগসাজশ, বেলভাতা বলে যে বিষয় হিন্দু রমণীরা পূজা পার্বণের মতো উদ্যাপন করেন তাও স্বামী-সন্তানের মঙ্গল কামনায় পূর্ণ থেকে পূর্ণতর হয়। বেলভাতা মানেই সূর্যের কিরণ থাকা অবধি রাতের আহার শেষ করতে হয়। 

×