ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০ ফাল্গুন ১৪৩০

হার না মানা মা সালমা খাতুন

নাজনীন বেগম

প্রকাশিত: ০১:৩২, ৮ ডিসেম্বর ২০২৩

হার না মানা মা সালমা খাতুন

সালমা খাতুন

বাংলাদেশের হরেক উন্নয়ন কর্মযোগে সামনে এগিয়ে চলার দৃশ্য চমৎকৃত হওয়ার মতোই। সঙ্গতকারণে সমসংখ্যক নারীও সেভাবে পিছিয়ে থাকছে না। সেটা হলে সার্বিক প্রবৃদ্ধি ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যেত। কিন্তু অনন্য এগিয়ে যাওয়াই শুধু পথযাত্রা নয়। নানামাত্রিক বিপন্নতা ও জীবনকে অসহনীয় দাবানলে দগ্ধ করে দেয়। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে তেমন সমস্যা সমাজের রন্ধ্রে, রন্ধ্রে। এমনকি গ্রামেগঞ্জে প্রত্যন্ত অঞ্চলে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া নারীদের জীবন যে কত দুর্বিসহ যা আধুনিকতার বলয়কেও প্রশ্নবিদ্ধ করে যাচ্ছে। তাছাড়া স্বামীহারা, বিচ্ছিন্নতার শিকার হওয়া পারিবারিক বলয় থেকে পরিত্যক্ত নারীদের অবস্থা মোটেই স্বস্তিদায়ক নয়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হরেক নারীর বিপন্নতা গণমাধ্যমে উঠে আসতে সময়ও নেয় না।
মমিনপুর ইউনিয়নের সালমা খাতুন। লড়াকু হার না মানা নারীই শুধু নন বরং পিতৃহীন সন্তানদের মানুষ গড়ার জীবনটাও সাবলীলতায় এগিয়ে দিয়েছেন। স্বামীর মৃত্যু, অর্থকষ্ট কোনোটাই এই অদম্য নারীকে থামাতে না পারাও নারী শৌর্যের অহঙ্কার। অথচ সালমা নিজেও হয়তো বা জানেন না তিনি কতখানি নারী শক্তি অনন্য নজির। শত বাধা বিপত্তিকে দুমড়ে মুচড়ে অশিক্ষিত এক বিধবা নারী স্বামীকে হারিয়েও সহায় সম্বলহীন অবস্থায় এগিয়ে যাচ্ছেন দুরন্তগতিতে। তেমন অনন্য কর্মযোগ তাকে তাড়িত করেই না। বরং মনে করেন পিতাহারা সন্তানদের মানুষ করার দায়-দায়িত্ব তারই। তাই তাকে সেটা অতি আবশ্যিকভাবে করে যাওয়াও জন্মদাত্রীর অদম্য সচেতন দায়বদ্ধতা। 
মমিনপুর ইউনিয়ন। গ্রামবাংলার এক অনন্য সুন্দর অঞ্চল। ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় তো বটেই। কিন্তু অনেকের কাছে তা অনধিগম্য দুর্গম পথ ছাড়া অন্য কিছু নয়। 
আজ থেকে আট বছর আগে স্ট্রোক করে স্বামী মারা যান। দুই পুত্র সন্তানের জননী স্বামী শোকে হতবাক হয়েও কঠোর হাতে সংসারের হাল ধরতে নিজেকে শক্ত অবস্থানে দাঁড় করান। প্রয়োজনে যা যা করতে হয় কোনোটাতেই পেছন ফিরে তাকাননি একবারও। স্বামী ভূমিহীন অবস্থায় পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। তবে তিন বিঘা জমি থাকলেও বেঁচে থাকতে স্বামী তা বন্ধক রেখে যায়। অকুল সমুদ্রে ভেসে যাওয়ার দূরবস্থা আর কি। স্ত্রী সালমা টাকার অভাবে সে বন্ধক রাখা জমি মুক্ত করতেও ব্যর্থ হন। 
মনিপুর ইউনিয়নের বোয়ালমারি গ্রামের বাসিন্দা এই সালমা। বড় ছেলে স্নাতকোত্তর পরীক্ষার্থী চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজ থেকে। ধারণা করা যায় ৮ বছর আগে প্রথম সন্তানের বয়স কত ছিল? সেখান থেকে আজ অবধি টেনে এনেছেন সফল কৃতী এই অনন্য মাতৃত্ব বোধে। কনিষ্ঠ সন্তান উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে বর্তমান ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে মা সালমা খাতুন যে টাকা দিয়ে বন্ধক জমি ছাড়াতে পারতেন সেই অর্থ বিনিয়োগ করেন দুই সন্তানের লেখাপড়া শেখার জন্য। কারণ একজন মাই পারেন তার সন্তানদের জন্য যথার্থ নিশানা ঠিক করে দিতে। সেখানে সালমা ব্যতিক্রমই শুধু নন নজিরও বটে।

একজন অসহায় অক্ষরজ্ঞানহীন নারীর কাছে লেখাপড়ার দাম শুধু বেশিই নয় সেটা সার্বিক জীবনের নির্ণায়ক তেমন অনুভবও ভেতর থেকে তাড়িত করে। তবে সালমার পাশে দাঁড়ায় সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সমাজসেবা অধিদফতর। জামানত আর সুদমুক্ত ক্ষুদ্র ঋণের সহায়তায় সালমার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পকথা। মৌলিতা পারভিন চুয়াডাঙ্গার সমাজ সেবা অধিদপ্তরের উপজেলা কর্মকর্তা। তিনি তৃণমূল মানুষের মাঝে ঋণ সহায়তা দিয়ে তাদের স্বাবলম্বী করার প্রয়াসে তার প্রাতিষ্ঠানিক সচেতন দায়বদ্ধতাকে স্পষ্ট করে যাচ্ছেন। ঋণের টাকা দিয়ে সালমা খাতুন সেলাই মেশিন কিনেছেন।

সেখানে প্রতিদিন ২০০ টাকার মতো রোজগার হয়। তা দিয়ে ছেলেদের শিক্ষিত করা এবং সংসার চালানো সবই সম্ভব করে যাচ্ছেন। বড় ছেলে সরকারি কলেজে সুযোগ পাওয়ায় লেখাপড়ার খরচ অপেক্ষাকৃত কম হওয়াও পরিস্থিতির ন্যায্যতা। আর কনিষ্ঠ সন্তান? বিজ্ঞানের ছাত্র। স্বামী অসময়ে, অকালে চিরবিদায় নেন। তেমন অন্তর্জ¡ালা বুকের মধ্যে আজও জিইয়ে আছে। মায়ের অদম্য ইচ্ছায় ছেলে শুধু বিজ্ঞানের ছাত্র নয় বরং চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়েও জীবনের লক্ষ্যে এগিয়ে চলে যাবে।

সালমা খাতুন যে অদম্য লড়াই আর অভাবনীয় দৃষ্টান্ত রেখে ছেলেদের তৈরি করছেন সেখানেই শুধু মাতৃশৌর্যই নয় বরং সফল মাতৃত্বের মহিমায়ও অনন্য এক হার না মানা অপরাজিতা নারী। সকলের  আশীর্বাদ ও মায়ের বহুল আকাক্সক্ষায় ছোট ছেলে যেন সরকারিতে চিকিৎসা বিদ্যা অর্জনে সুযোগ পায়। তেমন শুভ কামনা পরিচিতজন আর অগণিত পাঠকের থাকবে। শুভ আর মঙ্গলময় হয়ে উঠুক সালমা খাতুনের পারিবারিক অনন্য আঙিনাটি।

×