ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

বিবাহ বিচ্ছেদ সংক্রান্ত আইন

শেগুফতা তাবাসসুম আহমেদ

প্রকাশিত: ০১:৫১, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩

বিবাহ বিচ্ছেদ সংক্রান্ত আইন

কিভাবে স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দেবেন

কিভাবে স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দেবেন
১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তালাক দিতে চাইলে যেকোনো পদ্ধতির তালাক ঘোষণার পর যথাশীঘ্র সম্ভব তালাকের নোটিস স্থানীয় ইউনিয়ন পরিশোধ/পৌরসভা/সিটি কর্পোরেশনের চেয়ারম্যানকে পাঠাতে হবে এবং উক্ত নোটিসের একটি অনুলিপি (নকল) স্ত্রীকে পাঠাতে হবে।’ ৭(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি নোটিস প্রদানের এ বিধান লঙ্ঘন করেন তবে তিনি এক বছর বিনাশ্রম কারাদ- বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় প্রকার দ-ে দ-নীয় হবেন। তবে স্বামী যদি নোটিস প্রদান না করে তাহলে শাস্তি পাবে ঠিকই কিন্তু তালাক বাতিল হবে না।’ ৭(৪) ধারা অনুযায়ী, ‘নোটিস পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান সংশ্লিষ্ট পক্ষদ্বয়ের মধ্যে পুনর্মিলন ঘটানোর উদ্দেশ্যে একটি সালিশী পরিষদ গঠন করবেন।

সালিশী পরিষদ যদি সমঝোতা করতে ব্যর্থ হয় এবং স্বামী যদি ৯০ দিনের মধ্যে তালাক প্রত্যাহার না করে তবে ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হবে। এই ৯০ দিন স্বামী তার স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকবে।’ ৭(৩) ধারা মতে, ‘চেয়ারম্যানের কাছে নোটিস প্রদানের তারিখ হতে ৯০ দিন অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত তালাক কার্যকর হবে না। কিন্তু তালাক ঘোষণার সময় স্ত্রী যদি গর্ভবতী থাকে তাহলে ৭(৫) অনুযায়ী গর্ভাবস্থা অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত তালাক কার্যকর হবে না। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার ৯০ দিন পর তা কার্যকর হবে।’ মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯৭৪ এর ৬ ধারা মতে বিয়ের তালাক ও রেজিস্ট্রি করতে হয়।

কাজী নির্ধারিত ফি নিয়ে তালাক রেজিস্ট্রি করবেন এবং ফি ব্যতীত প্রত্যয়ন কপি প্রদান করবেন। মুসলিম পারিবারিক আইন অনুসারে স্বামী তাঁর স্ত্রীকে ডিভোর্স দিতে চাইলে আদালতে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। তবে নিকাহনামার ১৮ নম্বর দফা বা কলামে স্ত্রীকে ডিভোর্স দেওয়ার অধিকার না দিলে বিবাহবিচ্ছেদের জন্য স্ত্রীকে আদালতে আবেদন করতে হয়। ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহবিচ্ছেদ আইন অনুসারে স্ত্রী আদালতে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করতে পারবেন। আদালত বিবাহবিচ্ছেদের ডিক্রি প্রদান করলে ওই ডিক্রি প্রদানের সাত দিনের মধ্যে একটি সত্যায়িত কপি আদালতের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান বা মেয়রের কাছে পাঠানো হবে।

চেয়ারম্যান বা মেয়র যেদিন নোটিস পাবেন, সেদিন থেকে ঠিক ৯০ দিন পর তালাক চূড়ান্তভাবে কার্যকর হবে। তবে স্ত্রী ডিভোর্স দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি শর্ত রয়েছে। বিয়ে নিবন্ধনের সময় নিকাহনামার ১৮ নম্বর কলামে যদি স্ত্রীকে ডিভোর্সের অধিকার দেওয়া থাকে, তবে স্ত্রী ডিভোর্স দিতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে স্বামীর জন্য যে প্রক্রিয়া বলা হয়েছে, একই বিধান স্ত্রীর জন্যও প্রযোজ্য। তবে ডিভোর্সের অধিকার না দেওয়া থাকলে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে আবেদন করে ডিভোর্স দিতে পারবেন।
বিবাহবিচ্ছেদ প্রক্রিয়া সম্পন্নের জন্য সরকারি খরচ :
বিবাহ এবং বিবাহবিচ্ছেদ (রেজি) বিধি, ১৯৭৫ অনুযায়ী-একজন নিকাহ বা বিবাহ নিবন্ধক বিবাহবিচ্ছেদের নিবন্ধনের জন্য ২০০ টাকা (দুইশত) ফি চার্জ করবেন। বিবাহ নিবন্ধক ২৫ টাকা কমিশন ফি হিসেবে এবং ০১ (এক) টাকা প্রতি কিলোমিটার হিসেবে ভ্রমণ খরচ হিসেবে দাবি করতে পারেন। কিন্তু বর্তমানে একজন বিবাহ নিবন্ধক প্রকৃত খরচের চেয়ে বহুগুণ বেশি খরচ দাবি করে থাকেন।
বিবাহবিচ্ছেদ প্রত্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য নি¤œলিখিত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:
১. কাবিননামার ফটোকপি ।
২. স্বামী এবং স্ত্রীর জাতীয় পরিচয় নম্বরপত্রের অনুলিপি।
৩. দুজন পুরুষ সাক্ষীর জাতীয় পরিচয় নম্বরপত্রের ফটোকপি ।
৪. ১ (এক) কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি যদি কোনো আইনজীবী দ্বারা কোনো হলফনামা প্রস্তুত করা হয়।
গর্ভাবস্থায় বিবাহ বিচ্ছেদের পদ্ধতি :
তালাক ঘোষণার সময় স্ত্রী গর্ভবতী হলে, নোটিসের তারিখ থেকে ৯০ দিন বা গর্ভাবস্থা, যেটি পরে হবে, তার নির্ধারিত সময় শেষ না হওয়া পর্যন্ত তালাক কার্যকর হবে না।
ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ডিভোর্স :
বিশেষ বিবাহ আইনে বিয়ে হলে স্বামী বা স্ত্রী চাইলেই বিবাহবিচ্ছেদ ঘটাতে পারবেন না। এ আইন অনুযায়ী কোনো পক্ষ বিবাহবিচ্ছেদ ঘটাতে চাইলে তাঁকে ১৮৬৯ সালের ডিভোর্স অ্যাক্ট অনুযায়ী এ বিচ্ছেদ ঘটাতে হবে। এর জন্য আদালতের শরণাপন্ন হতে হবে এবং আদালতের অনুমতিক্রমে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটাতে হবে। বিবাহবিচ্ছেদের নামে একটি হলফনামা পাঠিয়ে দিলেই বিচ্ছেদ হয়ে যাবে, সেটি বলা যাবে না। আদালতের অনুমতি ছাড়া বিবাহবিচ্ছেদ সম্পন্ন করতে চাইলে অপর পক্ষ তা চ্যালেঞ্জ করতে পারবে।
হিন্দু আইনে বিবাহবিচ্ছেদ :
হিন্দু আইনে বিবাহবিচ্ছেদের কোনো বিধান নেই। দাম্পত্য সম্পর্ক পরিসমাপ্তি ঘটাতে গেলে একজন হিন্দু স্ত্রী তাঁর স্বামী থেকে আলাদা ভরণপোষণ এবং পৃথক বাসস্থানের  জন্য  মামলা করতে পারেন। আমাদের দেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা দেওয়ানি আদালতে বিবাহবিচ্ছেদ চেয়ে ঘোষণামূলক মামলা মামলা করতে পারেন।
খ্রিস্টান ধর্মে বিবাহ বিচ্ছেদ : ১৮৬৯ সালের ক্রিশ্চিয়ান ডিভোর্স অ্যাক্টের বিবাহবিচ্ছেদের ব্যাপারে নারীকে অধিকার প্রদান করা হয়েছে। বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, স্ত্রীর ক্ষমতা ও অধিকারকে স্বামীর পাশাপাশি সমুন্নত রাখা হয়েছে এবং স্ত্রীকেও স্বামীর পাশাপাশি সমতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
বৌদ্ধ ধর্ম পারিবারিক আইন ২০১৮ এর ৯ নং ধারা অনুযায়ী- বিবাহ বিচ্ছেদ :
‘(১) স্বামী বা স্ত্রী বিবাহের পর যে কোনো সময় বিবাহবন্ধন বিচ্ছেদ অথবা স্বতন্ত্রভাবে বসবাসের জন্য পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করিতে পারিবে, যদি (ক) স্বামীর সন্তান জন্মদানে অক্ষম হইলে বা পুরষত্বহীনতার কারণে বা স্ত্রীর শারীরিক অক্ষমতার কারণে পরস্পরের মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সম্ভব না হইলে; অথবা (খ) বিবাহবন্ধনের পরে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হইয়া স্বামী স্ত্রী ভিন্ন অন্য কোনো নারীর সঙ্গে এবং স্ত্রী স্বামী অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন; বা ভিন্ন (গ) মামলা দায়েরের তারিখ হইতে বিবাদী নিরবচ্ছিন্নভাবে ন্যূনতম দুই বছর পূর্ব হইতে ইচ্ছাপূর্বকভাবে বাদীকে পরিত্যক্ত অবস্থায় রাখেন; বা (ঘ) বিবাদী বৌদ্ধ ধর্ম পরিত্যাগ করিয়া অন্য কোনো ধর্ম গ্রহণ করেন বা অন্য ধর্মাবলম্বীর সহিত বিবাহবন্ধনজনিত কারণে বৌদ্ধ ধর্ম পরিত্যাগ করেন; অথবা (ঙ) বিবাদী নিরবচ্ছিন্নভাবে অনারোগ্য মানসিক বিকারগ্রস্ত হন; অথবা (চ) অবিরামভাবে কিংবা সবিরামভাবে এমন মানসিক বিশৃঙ্খলায় ভুগতে থাকেন যে, বাদী যুক্তিসংগত কারণে বিবাদীর সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন যাপন করিতে অপারগ হন বা বিবাদী যদি নিষ্ঠুর দৈহিক ও মানসিক আচরণ করেন; অথবা (ছ) বিবাদী স্থায়ীভাবে সংসারজীবন পরিত্যাগ করিয়া বৌদ্ধ ভিক্ষু/ভিক্ষুণী সংঘের অন্তর্ভুক্ত হন; অথবা (জ) বিবাদী নিরবচ্ছিন্নভাবে সাত বছর কিংবা উহার অধিককাল যাবৎ নিখোঁজ থাকেন। (ঝ) বিবাদী আদালত কর্তৃক চূড়ান্ত রায়ে সাত বছর বা বেশি সময়ের জন্য সাজাপ্রাপ্ত হন। 
(২) উপ-ধারা (১) অনুসারে আদালতে কোনো মামলা দায়ের করা হইলে আদালত যদি এই মর্মে সন্তুষ্ট হন যে, বিবাহবিচ্ছেদের যথেষ্ট কারণ বিদ্যমান রহিয়াছে, তাহা হইলে আদালত যাহা যুক্তিযুক্ত বিবেচনা করিবেন সেই মোতাবেক ডিক্রি প্রদান করিবেন।’
একটি সংসারের ইতি টানার ক্ষেত্রে একটি নারী তখনই এই সিদ্ধান্ত নেয় যখন কোনোভাবেই মানিয়ে নিতে পারে না এবং একাধিক সমস্যা উৎপত্তি হয় এবং তখন তারা ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নেন। মন থেকে কেউই চান না যে বিচ্ছেদ হোক। তবে স্বামী যদি অকারণে মারধর, গালিগালাজ করেন, শ্বশুরবাড়িতেও প্রতিনিয়ত অত্যাচারের সম্মুখীন হতে হয়। এছাড়াও নানাবিধ কারণে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হয় নারীদের।

×