ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯

প্রতিভাময়ী তোরসা

শেখ আব্দুল্লাহ্ ইয়াছিন

প্রকাশিত: ০১:৫৬, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২

প্রতিভাময়ী তোরসা

প্রতিভাময়ী তোরসা

সাধারণের ধারণা একজন মডেল হবেন সব কিছুতেই পারদর্শী, তার মাঝে সকল গুণ থাকা চাই। কথাটি একেবারে ষোলোকলা মিলে যায় তোরসার সঙ্গে। বলছি মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ মুকুট বিজয়ী রাফাহ নানজীবা তোরসার কথা। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী তোরসা তারকা তোরসা হয়ে উঠার পথটা এতটা মসৃণ ছিল না। সৃজনশীল প্রতিভা অন্বেষণ প্রতিযোগিতা এনটিভি মার্কস অলরাউন্ডারের মধ্যে দিয়ে তোরসা মিডিয়ায় পা রাখে। তবে মার্কস অলরাউন্ডারের যাত্রাটি খুব সহজতর ছিল না, ছিল ছন্দ পতনও।

২০০৯ সালে তোরসা অংশগ্রহণ করে মার্কস অলরাউন্ডার প্রতিযোগিতায়। কিন্তু সে বছর ডিভিশন রাউন্ডে বাদ পড়ে যায়। পরের বছর আবারও  মার্কস অলরাউন্ডার প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় এবং সাফল্যের সঙ্গে সবকটি ধাপ পেরিয়ে প্রথম রানার্সআপ বিজয়ী হয়। সেই আসরে তোরসা কবিতা  আবৃত্তি করে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। তোরসা আবৃত্তিতে বেশ পটু। তোরসা আবৃত্তি নিয়ে কাজ করছে চট্টগ্রাম নরেন আবৃত্তি একাডেমিতে। বর্তমানে সহসাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

মার্কস অলরাউন্ডারের স্মৃতির গল্প বলতে গিয়ে তোরসা বলেন সে সময়ের স্মৃতিগুলো বেশ মজার ছিল। তখন পুরো দেশে আমাদের বিলবোর্ড লাগানো হয়েছিল। যেখানে যায় সেখানে নিজেদের পোস্টার, বিলবোর্ড দেখতে পাই সেটা দারুণ একটা এক্সপেরিয়েন্স ছিল। সে সময় প্রতিযোগিতায় আমরা যারা ছিলাম সবার সঙ্গে এখনও একটা ভাল বন্ডিং আছে।
তোরসার গ্রামের বাড়ি কক্সবাজার কুতুবদিয়ায় হলেও তার বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামের শিল্পকলা এলাকায়। ফলে ছোট বেলা থেকেই সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিচরণ ছিল তার। শৈশবে  কিডস কালচার নামে  একটি ইনিস্টিটিউশনে চাইল্ড আর্টিস্ট হিসেবে যুক্ত হোন। সেখানেই মুখাভিনয় শিখেন তিনি।
তোরসার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে  প্রথম  প্রতিযোগিতা ছিল দিল্লীর মান্ডি হাউসে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল ড্রামা ফেস্টিভ্যাল। সেখানে সে মুখাভিনয় করে বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। পরে মুকাভিনয় শিল্পী হিসেবে নাটুয়া নির্বাক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হোন।
নৃত্য, আবৃত্তি, বিতর্ক, থিয়েটার ও মডেলিং-এ একাধারে সাফল্যের সাক্ষর রেখেছেন তিনি। ২০০৮ সালে লিটল মিস চিটাগাং বিজয়ী হোন, ২০০৯ সালে বঙ্গবন্ধু শিশু কিশোর প্রতিযোগিতায় জাতীয় পর্যায়ে ফোক ড্রান্সে প্রথম হয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত হতে পুরস্কার গ্রহণ করেন।

২০১০ সালে জাতীয় শিশু প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্তির ফলে দেশকে রিপ্রেজেন্টের জন্য জাপানে ফেলোশিপ করার সুযোগ পান তোরসা কিন্তু চট্টগ্রাম শিল্পকলায় সময়মতো কনফার্মমেশন লেটার না পৌঁছানোয় তিনি তাতে আর অংশ নিতে পারেননি। ২০১০ সালে একই বছর ভারতনাট্যমে গোল্ড মেডেল অর্জন করেন তোরসা। ২০১৯ সালে ৩৭ হাজার প্রতিযোগীকে পিছনে ফেলে মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের মুকুট জিতেন তোরসা। একই বছর লন্ডনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশ নেন তিনি।

শুধু সাংস্কৃতিক অঙ্গন নয় সমানতালে পড়ালেখায় ও মেধাবী তোরসা। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন। এছাড়া চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এ্যান্ড কলেজ থেকে জিপিএ ফাইভ পেয়ে কৃত্বিতের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। ২০১৬ সালে বিজ্ঞান প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন।
ক্রিয়েটিভ ও প্রডাক্টিভ কিছু করা তোরসার শখ। ২০১৮ সালে হতে বেশকিছু দিন বিজয় টিভিতে সঞ্চালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তোরসা ১১বছর বয়স থেকে জড়িত আছেন চ্যারিটি কার্যক্রমের সঙ্গে।

বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন লিও ক্লাব চট্টগ্রাম ডাইনামিক সিটির জোন ডিরেক্টর হিসেবে। এছাড়াও স্মাইল বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন নামে নিজের একটি সংগঠনও রয়েছে। যেটি গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে মানুষের জন্য কাজ করছে।
তৌকির আহমেদ পরিচালিত হালদা চলচ্চিত্রের মধ্যে দিয়ে অভিনয় জগতে অভিষেক হয় তোরসার। পরবর্তীতে ছোট পর্দায় স্বপ্ন তোমার জন্য নামে একটি কমেডি ঘরনার টেলিফিল্মে অভিনয় করেন। বেশ কিছু মুভি, ওবিসি, মিউজিক ভিডিও করার অফার পেলেও পড়াশোনার জন্য কাজ হতে কিছুদিন দূরে ছিলেন। বিরতি কাটিয়ে এখন কাজ করছেন নিজের গতিতে। বর্তমানে ফ্রেন্ডবুক নামে একটি ওয়েব সিরিজ করছেন।

যাতে তোরসার বিপরীতে রয়েছে নেটওয়ার্কের বাইরে খ্যাত অভিনেতা খাইরুল বাসার। ফ্রেন্ডবুক প্রসঙ্গে তোরসা বলেন ফ্রেন্ডবুক মূলত তিন তরুণীর জীবনের গল্প। আমার চরিত্রের নাম পূর্ণা। পূর্ণা ক্যারেক্টারটা সম্পূর্ণ আমার মতো (হেসে বললেন)। সে  চঞ্চল, খুব  কালচারাল, ভাল  নাচ পারে, গান পারে।
তবে কাজটি আমার জন্য একটু চ্যালেঞ্জিং ছিল। এটি আমার প্রথম ওয়েব সিরিজ ছিল। সিরিজটির সিজন ১ এর শূটিংয়ের সময় আমার মা ও ভাইয়ার কোভিড হয়। ঢাকা থেকে আমি তা জানতে পারি। তখন খুব মন খারাপ হয়। মন খারাপ নিয়ে সেটে গিয়ে অন ক্যামেরায় চঞ্চল মেয়ে পূর্ণার ক্যারেক্টরটা প্লে করি। ভয়ে ছিলাম আদৌ পারব কিনা। সে সময় খাইরুল বাসার ভাইও এক্সিডেন্ট করেন। তাই স্ক্রিপ্টে কিছুটা চ্যাঞ্জও করতে হয়। ডিরেক্টার গৌতম দা এবং আমার অন্যান্য কো আর্টিস্টরা অত্যন্ত হেল্পফুল ছিলেন।
জীবনের শ্রেষ্ঠ এচিভমেন্ট সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জীবনে মানসিকভাবে সুন্দরভাবে পজেটিভভাবে বাঁচতে পারাটা হচ্ছে আমার জন্য বর্তমানে বড় এচিভমেন্ট। দ্বিতীয়ত এত এত মানুষের ভালবাসা পাচ্ছি এবং অনুপ্রেরণা পাচ্ছি তা সত্যিই আমার জন্য বড় পাওয়া ও ভাল লাগার। এতদূর আসার পিছনে অনুপ্রেরণা দাতাকে এমন প্রশ্নের উত্তরে জানান- এতদূর আসার পিছনে পরিশ্রমটা আমার মায়ের। তিনি ছোটবেলায় পুশ না করলে আমি হয়তো আজকের রাফাহ নানজীবা তোরসা হয়ে উঠতে পারতাম না এতটুকু আসার  সর্বোচ্চ অবদান আমার মায়ের। তবে এতদূর আসার পিছনে অনুপ্রেরণাটা আমি নিজেই।

তখন ছোট ছিলাম বুঝতাম না। এখন বুঝি অন্যজন আমায় যত পুশ করুক, হাতে কলমে ধরিয়ে দিক তবুও আমি পারব না যদি না আমি মানুষটা নিজেকে নিজে পুশ না করি। বহুগুণে গুণান্বিত আপনি নিজেকে সঞ্চালক, মডেল, অভিনেত্রী, নাকি মুখাভিনয় শিল্পী কোনটি হিসেবে দেখতে চান জানতে চাইলে বলেন, আমি আসলে নিজেকে কখনও একটা গ-িতে আবদ্ধ রাখতে চাই না। আমার ফোকাস এক জায়গায় হলেও পাশাপাশি আমার ক্যাপাসিটর মধ্যে যতটুকু পারি নিজের প্যাশনের জায়গার সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে চাই। একজন ব্র্যান্ড হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে কাজ করতে চাই, দেশকে রিপ্রেজেন্ট করতে চাই।