ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ০২ ডিসেম্বর ২০২৩, ১৮ অগ্রাহায়ণ ১৪৩০

বকর-ওমর আলাদা হয়ে বাড়ি ফিরছে আজ 

প্রকাশিত: ১৭:২০, ৪ অক্টোবর ২০২৩

বকর-ওমর আলাদা হয়ে বাড়ি ফিরছে আজ 

পেট জোড়া শিশু বকর-ওমর 

আবু বকর ও ওমর ফারুক দুই ভাই। বুকে-পেটে জোড়া লাগানো অবস্থায় গত জুলাইয়ে তাদের জন্ম হয়েছিল। গত মাসে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাদের আলাদা করা হয়। 

বুধবার তারা বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে বকর ও ওমরের অস্ত্রোপচার হয়। তাই আজ তাদের বেশ ঘটা করেই বিদায় জানায় বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ।দুই শিশুকে সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আলাদা করে মা–বাবার কাছে তুলে দিতে পেরে উচ্ছ্বসিত চিকিৎসকেরা। আর দুই সন্তানকে আলাদাভাবে কোলে নিতে পেরে আনন্দে আটখানা মা–বাবা। ফলে বিএসএমএমইউতে আয়োজিত আজকের অনুষ্ঠানে সবার মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল মা–বাবার কোলে থাকা বকর-ওমর।

গত ৪ জুলাই বুকে-পেটে জোড়া লাগানো অবস্থায় বকর ও ওমরের জন্ম হয়। তাদের বাবা গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া পৌরসভার তিন নম্বর ওয়ার্ডের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আল আমিন শেখ, মা চায়না বেগম। এই দম্পতির আরও চারটি সন্তান আছে।

আল আমিন-চায়না দম্পতি আগেই জেনেছিলেন, এবার যমজ সন্তান হবে। কিন্তু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরে তাঁরা বিস্মিত হয়ে যান। দেখতে পান, দুই ছেলের বুক-পেট জোড়া লেগে আছে।

স্থানীয় চিকিৎসকেরা অভয় দিয়ে এই দম্পতিকে বলেছিলেন, এখন দেশেই এমন শিশুদের অস্ত্রোপচার করে আলাদা করা যায়। তবে তা বেশ খরচের ব্যাপার।

এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় দুই সন্তানকে নিয়ে আল আমিন-চায়না দম্পতি ঢাকায় আসেন। গত ৫ জুলাই তাঁরা দুই সন্তানকে বিএসএমএমইউতে ভর্তি করান। দীর্ঘ ৭৮ দিন চিকিৎসার পর গত ২০ সেপ্টেম্বর সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দুই শিশুকে আলাদা করেন চিকিৎসকেরা।

চিকিৎসকদের এই সাফল্য ও বকর-ওমরকে বিদায় জানানো উপলক্ষে বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিএসএমএমইউর শহীদ ডা. মিল্টন মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বকর-ওমরের জটিল অস্ত্রোপচারের বিবরণ তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি বিদেশের তুলনায় যে স্বল্প খরচে বিএসএমএমইউতে উন্নত মানের চিকিৎসাসুবিধা আছে, তা বলা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএসএমএমইউর উপাচার্য মো. শারফুদ্দিন আহমেদ। দুই শিশুর শল্যচিকিৎসার বিবরণ তুলে ধরেন চিকিৎসক দলের প্রধান শিশু সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান এ কে এম জাহিদ হোসেন। উপস্থিত ছিলেন বিএসএমএমইউর তিন সহ-উপাচার্য মোশারফ হোসেন, সয়েফ উদ্দিন আহমেদ ও মনিরুজ্জামান, কোষাধ্যক্ষ আতিকুর রহমান, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগের চেয়ারম্যানসহ অন্য চিকিৎসকেরা।

চিকিৎসক দলের প্রধান জাহিদ হোসেন বলেন, জিনগত সমস্যা, ট্রমাসহ নানা কারণে এমন জোড়া শিশুর জন্ম হয়ে থাকে। সাধারণত জন্মের ৩ থেকে ৪ মাসের মধ্যে এমন শিশুদের অস্ত্রোপচার করা যায়। এই দুই শিশুর ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা ছিল। তাদের ওজন ছিল কম, মাত্র সাড়ে তিন কেজি। ওজন বাড়ানোর জন্য সময় দিতে হয়েছে। এ ছাড়া তাদের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গসহ রক্তের উপাদান নিয়ে অনেক পরীক্ষা করতে হয়েছে।

বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসকেরা তাদের চিকিৎসা করেছেন। ওজন আট কেজি হওয়ার পর অন্যান্য সমস্যার চিকিৎসা শেষে তাঁরা দুই শিশুকে পৃথক করার জন্য অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন। বিএসএমএমইউতে জোড়া শিশু পৃথক করার এটাই প্রথম সফল ঘটনা।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিএসএমএমইউতে নুহা ও নাবা নামের আরও এক জোড়া শিশুর চিকিৎসা চলছে। তারা আরও জটিলভাবে যুক্ত। তাই ধাপে ধাপে তাদের অস্ত্রোপচার করা হচ্ছে। প্রথম দুই ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তৃতীয় ও শেষ ধাপের অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি চলছে।

বিএসএমএমইউর চিকিৎসকেরা জানান, বাংলাদেশে আগেও বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল, সিএমএইচ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ছয় জোড়া শিশুকে আলাদা কারা হয়েছে। বকর-ওমর সপ্তম জোড়া শিশু। দেশ এ ধরনের অস্ত্রোপচারের জন্য ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার খরচ হয়। তবে বিদেশে এ ধরনের চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল। লম্বা সময় প্রয়োজন হয় বলে খরচের অঙ্কও বড় হয়ে যায়।

উপাচার্য মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, বকর-ওমরের চিকিৎসায় প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছে। চিকিৎসার পুরো খরচের ব্যবস্থা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর প্রত্যক্ষ নির্দেশে চিকিৎসা পরিচালিত হয়েছে।

শারফুদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, দেশে বিশেষ করে বিএসএমএমইউর বিশেষায়িত হাসপাতালে এখন নিয়মিত কিডনি ও লিভার প্রতিস্থাপন হচ্ছে। কিডনির ক্ষেত্রে প্রায় ৭ লাখ ও লিভারে ২০ লাখ টাকা খরচ হয়। বিদেশে কিডনি প্রতিস্থাপনে প্রায় ৪০ লাখ ও লিভারের ক্ষেত্রে ১ কোটি টাকা খরচ হয়ে থাকে। এ ছাড়া বিএসএমএমইউতে প্রতিদিন ৮ থেকে ৯ হাজার রোগীর জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাই উন্নত চিকিৎসার জন্য এখন আর দেশের মানুষের বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।

বিএসএমএমইউর পক্ষ থেকে বকর-ওমরের জন্য কিছু উপহারসামগ্রী দেওয়া হয়। উপাচার্য শারফুদ্দিন আহমেদ দুই শিশুর মা–বাবার হাতে উপহার তুলে দেন।

বাবা আল আমিন হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলেন, ‘আমরা আজ যে রকম খুশি, তা বলার মতো না। ডাক্তার সাহেবেরা যা করছেন, সারা জিন্দেগি তাঁদের জন্য দোয়া করলেও ঋণ শেষ হবে না।’

মা চায়না বেগমেরও মুখভরা হাসি। তিনি ছেলেদের জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চান। তিনি জানান, আজই তাঁরা গ্রামে ফিরে যাবেন। তবে পরবর্তী পর্যবেক্ষণের জন্য শিশুদের নিয়ে দুই সপ্তাহ পরে তাঁদের ঢাকায় আসতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসা নিয়ে একটি ভিডিও দেখানো হয়। চিকিৎসার দিকগুলো তুলে ধরেন চিকিৎসক উম্মে হাবিবা দিলশাদ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সহযোগী অধ্যাপক সুশংকর মণ্ডল।

এস