ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ১৩ জুলাই ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১

বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সদিচ্ছা নিয়ে আইপিসিসি প্রধানের সন্দেহ প্রকাশ

প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য অর্জনই এখন বড় প্রশ্ন

কাওসার রহমান 

প্রকাশিত: ১৪:০১, ২৭ আগস্ট ২০২৩; আপডেট: ১৪:২৪, ২৭ আগস্ট ২০২৩

প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য অর্জনই এখন বড় প্রশ্ন

বৈশ্বিক উষ্ণতা

বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে প্যারিস চুক্তির উচ্চাভিলাসী লক্ষ্যমাত্রা অর্জনই এখন জলবায়ু রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। ২০১৫ সালে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল জাতিসংঘের ২১তম জলবায়ু সম্মেলন। 

মাইলফলক ওই সম্মেলনেই বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণে স্বাক্ষরিত হয়েছিল ঐতিহাসিক জলবায়ু চুক্তি। আর ওই চুক্তিতেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বিশ্বকে রক্ষার জন্য বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি প্রাক-শিল্প যুগ থেকে ১.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার এক উচ্চাভিলাসী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এ লক্ষ্যে দীর্ঘ দরকষাকষি শেষে বিশ্ব পৌছেছিল এক আইনগত বাধ্যবাধকতায়। 

আরও পড়ুন:এনটিআরসিএ,শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে বড় সুখবর দিলেন শিক্ষামন্ত্রী

কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের ৭ বছর পর এই লক্ষ্য অর্জন এখন এক বিরাট প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। বিজ্ঞানীদের মধ্যে এই লক্ষ্য অর্জনে বিশ্বের সামর্থ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় সন্দেহ তৈরি হয়েছে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সদিচ্ছা নিয়ে। আসলেই কী বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এই লক্ষ্য অর্জন করতে চায়? অন্তত বিশ্ব নেতৃবৃন্দের আচরণ এবং পদক্ষেপে তা মনে হচ্ছে না।  

২০২২ সালের মতো ২০২৩ সালেও বৈশ্বিক উষ্ণতায় পুড়ছে পুরো পৃথিবী। তীব্র হচ্ছে মেরু অঞ্চলের বরফ গলা। দ্রæত বাড়ছে সাগরের উচ্চতা। কমে যাচ্ছে শীতের সময়কাল। দীর্ঘ হচ্ছে গ্রীস্ম। তীব্রতর হচ্ছে গরম। জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়ঙ্কর এক আগ্রাস রূপ দেখছে এখন পৃথিবী। বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চলে বইছে তীব্র তাপপ্রবাহ। ভাঙছে তাপমাত্রাবিষয়ক বিভিন্ন রেকর্ড। দেশে দেশে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে অস্বস্তিতে পড়েছে মানুষ। সারা পৃথিবীতে বয়ে যাওয়া তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। দেখা যাচ্ছে দাবানল। বিশ্ব জুড়ে একের পর এক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সামুদ্রিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, এবং মেরু অঞ্চলের সমুদ্রে বরফস্তর যে রেকর্ড গতিতে ভাঙছে তাতে রীতিমত শঙ্কিত বিজ্ঞানীরা। 

এ প্রসঙ্গে জলবায়ু সংক্রান্ত জাতিসংঘের আন্ত:সরকার বিশেষজ্ঞ প্যানেলের (আইপিসিসি) নব নির্বাচিত চেয়ারপার্সন জিম স্কিয়া কার্বন নির্গমন হ্রাসে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সদিচ্ছা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘নীতি নির্ধারকদের কাছে আমাদের চাওয়া হচ্ছে আরও পদক্ষেপ ধর্মী তথ্য। আমরা এখন আর নীতি বিষয়ক পদক্ষেপ চাইনা। আমরা চাই অ্যাকশন ধর্মী পদক্ষেপ। এই পদক্ষেপ গ্রহণে নেতৃবৃন্দকে জোড়ালভাবে হাটতে হবে।’ 

আইপিসিসির নতুন চেয়ার জিম স্কিয়া হচ্ছেন লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজের একজন জলবায়ু বিজ্ঞানী। তিনি-ই এখন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী সংগঠন আইপিসিসির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই সংগঠনটিতে এখন স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কয়েকশ’ বিজ্ঞানী কাজ করছেন। 

বিশ্বজুড়েই এখন চরম বিরুপ আওহাওয়া বিরাজ করছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় বিশ্বকে হিমসিম খেতে হচ্ছে। এই অবস্থায় নীতিনির্ধারকদের কাছে আইপিসিসি এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, ‘তোমরা কী করছো?’  কারণ, আগামী ডিসেম্বরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতিসংঘের ২৮তম জলবায়ু সম্মেলন।

 ওই সম্মেলনের সবচেয়ে মাইলফলন মহুর্ত হবে ‘গেøাবার স্টকটেকিং’ প্রতিবেদন প্রকাশ। অর্থাৎ কোন দেশ জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে বৈশ্বিক কার্বন নির্গমন কমাতে কি পদক্ষেপ নিয়েছে তা জানানোর। আর এই আসরেই উঠে আসবে আসলে বিশ্ব প্যারিস জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্য অর্জনে কতটা দূরে আছে। আর যদি দূরত্বটা অনেক বেশী হয় তবেই বিশ্ব নেতৃবৃন্দের ওপর কার্বন নির্গমন কমানোর প্রতিশ্রুতি বাড়ানোর নতুন চাপ সৃষ্টি হবে। 

জাতিসংঘের আইপিসিসি প্যানেল এখন এই স্টকটেক রিপোর্ট নিয়ে গবেষণা করছে। যা পর্যালোচনার জন্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছে দেয়া হয়েছে। তবে জিম স্কিয়া এখন আর বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি প্রাক-শিল্প যুগের চেয়ে ১.৫ (২.৭ ডিগ্রী ফারেনহাইট) ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত থাকার ব্যাপারে আশাবাদী নন। 

মার্কিন গণমাধ্যম এক্সিওস নিউজলেটারকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেছেন, প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য অর্জনের কী করতে হবে তা জানিয়ে বিজ্ঞানীরা কিন্তু সরকারগুলোকে একটি প্রতিবেদন দিয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে তৎকালীন পৃথিবীর বাস্তব অবস্থা তুলে ধরে দ্রæত গ্রিন হাউজ গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর জন্য  জোড়াল পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দেয়া হয়েছিল। সেই জলবায়ু বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদন দেয়ার পরও কিন্তু পাঁচ বছর সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। বৈশ্বিক গ্রিন হাউজ গ্যাস পরিস্থিতির এখন আরও অবনতি হয়েছে এবং এই গ্যাস নিঃসরণের ধারা এখনও উর্ধ্বমুখী রয়েছে। 

তিনি চোখে আঙ্গুলি দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে বলেছেন, প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতা কিন্তু প্রশান্ত মহাসাগরের নিম্নাঞ্চলের ক্ষুদ্র দ্বীপ দেশগুলোকে ‘মৃত্যুদন্ড’ দেয়ার শামিল হবে। কারণ সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমেই বাড়ছে। আর এই বৃদ্ধি তরান্বিত করছে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি। 

তিনি বিশ্ববাসীকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘প্যারিস চুক্তির ১.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস লক্ষ্য কিন্তু এখনও জীবিত আছে। তবে এজন্য গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমন কমানোর জোর প্রচেষ্ঠা চালিয়ে যেতে হবে। তবে আদৌ এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হকে কিনা তা এখন একটি বড় প্রশ্ন।’ 

তিন গণমাধ্যমের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, বিশ্বব্যাপী চলমান জলবায়ু দুর্যোগ ও রেকর্ড তাপমাত্রা বৃদ্ধি এখন এই গ্রীষ্মে গণমাধ্যমের শিরোনাম হচ্ছে। এর অর্থ হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন দ্রুত ঘটছে এবং এটি এখন মানুষের প্রতিদিনের বাস্তবতা। ১০ কিংবা ২০ বছর আগের গণমাধ্যমের শিরোনাম স্মরণ করুন। 

ওই সময়ে বলা হলো, জলবায়ু পরিবর্তন একটি ভবিষ্যতের ঘটনা। অনেকে তখন তাদের সন্তানদের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আর এখন আপনি আপনার টেলিভিশন সেট খুললে কিংবা জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেই দেখতে পাবেন জলবায়ু পরিবর্তনের নানা ঘটনা। আপনি নিজেও এখন এই পরিবর্তনের উত্তাপ অনুভব করছেন। তাই এখন আর বিজ্ঞানীরা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ভবিষ্যতবাণী করেন না। কারণ এখন জলবায়ু পরিবর্তনের ঘটনা খুব দ্রুততার সঙ্গে দৃশ্যমান হচ্ছে। তাই এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও তা মোকাবেলায় সংযোগ স্থাপনে জনগনকে সম্পৃক্ত করতে হবে। অর্থাৎ জনগনকে সঙ্গে নিয়েই নেতৃবৃন্দকে জলবাযু পরিবর্তন মোকাবেলার যৌথ উদ্যোগ নিতে হবে। এবং তা করতে হবে আরও চরম আকার ধারণ করার আগেই।     
  

এমএম

×