ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৪ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

বৈশ্বিক উষ্ণতায় পুড়ছে পৃথিবী, চরম সংকটে মানব সভ্যতা 

কাওসার রহমান 

প্রকাশিত: ১৪:১৫, ১৭ আগস্ট ২০২৩; আপডেট: ১৪:৫১, ১৭ আগস্ট ২০২৩

বৈশ্বিক উষ্ণতায় পুড়ছে পৃথিবী, চরম সংকটে মানব সভ্যতা 

জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়ঙ্কর আগ্রাস রূপ দেখছে পৃথিবী।

শুধু শীতপ্রধান ইউরোপ কিংবা বৈচিত্রপূর্ণ এশিয়াই নয়, বৈশ্বিক উষ্ণতায় পুড়ছে পুরো পৃথিবী। তীব্র হচ্ছে মেরু অঞ্চলের বরফ গলা। দ্রুত বাড়ছে সাগরের উচ্চতা। কমে যাচ্ছে শীতের সময়কাল। দীর্ঘ হচ্ছে গ্রীস্ম। তীব্রতর হচ্ছে গরম। সারা পৃথিবীতে বয়ে যাওয়া তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। বাংলাদেশও অনুভব করছে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির এই বিভীষিকা। উলট-পালট আচরণ করছে দীর্ঘ দিনের পরিচিত আবহাওয়া। ফলে রেকর্ড উষ্ণ দিন পার করেছে বঙ্গোপসাগরের এই ব-দ্বীপ দেশটি। এপ্রিল থেকে জুলাই টানা চার মাস তীব্র তাপদাহে বিপর্যস্ত ছিল জনজীবন। প্রায় পুরো বর্ষা বৃষ্টিহীন থেকে শ্রাবনের শেষে এসে বৃষ্টি ঝড়ছে। ফলে বর্ষার প্রধান ফসল আমন আবাদ পিছিয়ে যাচ্ছে। 

আরও পড়ুন:দেশের প্রতিটি মানুষের জীবনমান উন্নত করতে চাই: প্রধানমন্ত্রী

জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়ঙ্কর এক আগ্রাস রূপ দেখছে এখন পৃথিবী। বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চলে বইছে তীব্র তাপপ্রবাহ। ভাঙছে তাপমাত্রাবিষয়ক বিভিন্ন রেকর্ড। দেশে দেশে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে অস্বস্তিতে পড়েছে মানুষ। দেখা যাচ্ছে দাবানল। বিশ্ব জুড়ে একের পর এক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সামুদ্রিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, এবং মেরু অঞ্চলের সমুদ্রে বরফস্তর যে রেকর্ড গতিতে ভাঙছে তাতে রীতিমত শঙ্কিত বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, যেরকম দ্রুত গতিতে এবং যে সময়ের মধ্যে এসব রেকর্ড ভাঙছে তা ‘নজিরবিহীন’। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবী জুড়ে আবহাওয়ায় যে নানা অস্বাভাবিক প্রবণতা দেখা দিচ্ছে এবং অস্বাভাবিক গরম বা ঠাণ্ডা, বৃষ্টিপাত, বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছাস, সাইক্লোন, দাবানল -ইত্যাদি এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে যেতে পারে।

জাতিসংঘ বলছে ইউরোপ জুড়ে যে তাপপ্রবাহ চলছে তা আরও রেকর্ড ভাঙার দিকে এগোচ্ছে। বলা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রাকৃতিক ইভেন্ট এল নিনোর কারণেই এমনটা হচ্ছে। লন্ডনের ইম্পিরিয়াল কলেজের জলবায়ু বিজ্ঞানের লেকচারার ড. পল সেপ্পি বলছেন, ‘পৃথিবী এখন লাগামহীন পরিবর্তনের মধ্যে ঢুকে পড়েছে, যার পেছনে রয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে ঘটা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। এর সঙ্গে তাল মেলাচ্ছে ‘এল নিনো’র প্রভাবে পৃথিবী গরম হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া।’  

সংযুক্ত আরব আমিরাতে আসন্ন ২৮তম জলবায়ু সম্মেলনকে সামনে রেখে বিবিসি, রয়টার্স, সিএনএন, আল-জাজিরা, দা গার্ডিয়ান প্রভৃতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এখন ফলাও করে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাব, তার কারণ প্রতিকার নিয়ে নানা প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। এসব গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এপ্রিল থেকে এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ দফায় দফায় রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত দেশগুলোর অবস্থা বেশি খারাপ। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি মোকাবিলার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রচণ্ড গরমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে চীন ও জাপান পর্যন্ত উত্তর গোলার্ধের অনেকগুলো দেশে জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এই তাপপ্রবাহকে ‘নজিরবিহীন’ বলে আখ্যায়িত করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্বব্যাপি তাপমাত্রার রেকর্ড রাখা শুরু হবার পর থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি গরম পড়েছে এ বছরেরই জুন-জুলাই মাসে। প্রচণ্ড গরমের কারণে অন্যতম গুরুতর পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে ইউরোপের দক্ষিণ দিকের ভূমধ্যসাগর-সংলগ্ন এলাকায়। ইউরোপ মহাদেশে এখন তাপমাত্রা সর্বোচ্চ রেকর্ডের কাছাকাছি উঠে গেছে।

ইতালি জুড়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। স্পেনে লা পালমা দ্বীপে এক দাবানল সৃষ্টি হওয়ায় কমপক্ষে ৫০০ লোককে নিরাপদ জায়গাং সরিয়ে নিতে হয়েছে। ক্রোয়েশিয়ায় অগ্নিকান্ডে বাড়িঘর ও গাড়ি পুড়ে গেছে। গ্রীসে এবার জুনে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উঠেছে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি। প্রচণ্ড গরমের কারণে পর্যটনের ভরা মৌসুমে এথেন্সের অন্যতম দর্শনীয় স্থান অ্যাক্রোপলিসের দরজা বন্ধ করে দিতে হয়েছে। ইতালি ও গ্রিসে একাধিক পর্যটক গরমের কারণে হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে সংজ্ঞা হারিয়েছেন। উত্তর ইতালিতে একজনের মৃত্যুও হয়েছে হিটস্টোকে।

হারিয়ে যাচ্ছে পরিচিত ভূমধ্য সাগর:
 
সবুজ বেলাভূমি ও আনন্দদায়ক বাতাসের জন্য খ্যাত ভূমধ্যসাগরের উপকূল চরম আবহাওয়ার কারণে শিরোনাম হচ্ছে। দুর্বিষহ গরম, দাবানল ও শুকিয়ে যাওয়া নদীর জন্য পরিচিত হয়ে উঠছে ইউরোপ ও আফ্রিকার এই অঞ্চলটি। তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে গত এপ্রিলে ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী দেশ স্পেন, মরক্কো ও আলজেরিয়া এবং পার্শ্ববর্তী দেশ পর্তুগালে খরায় ফসল পুড়ে যায় এবং অনেক জলাধার শুকিয়ে যায়। মরক্কোর কোনো কোনো অঞ্চলে ৪০ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ছিল, যা ‘জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া প্রায় অসম্ভব’। উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কোতেও প্রচণ্ড গরমের জন্য সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ছাড়া এমন চরম পরিস্থিতি প্রাকৃতিকভাবে ঘটতে পারে ৪০ হাজার বছরে মাত্র একবার। 

প্রভাবশালী সাময়িকী ফরেন পলিসির এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়, যে ভূমধ্যসাগরকে আমরা চিনি তা হারিয়ে যাচ্ছে। সবুজ বেলাভূমি ও আনন্দদায়ক বাতাসের জন্য খ্যাত ভূমধ্যসাগরের উপকূল চরম আবহাওয়ার কারণে শিরোনাম হচ্ছে। দুর্বিষহ গরম, দাবানল ও শুকিয়ে যাওয়া নদীর জন্য পরিচিত হয়ে উঠছে এই অঞ্চলটি। গত বছর (২০২২) স্পেন ও পর্তুগাল এক হাজার বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে শুষ্ক আবহাওয়ায় পড়েছিল। গরম থেকে বাঁচতে গ্রিস ও ফ্রান্স থেকে হাজার হাজার মানুষ ঘর ছেড়েছিলেন। 

আমেরিকায় দাবানলের বিভীষিকা:
 
আমেরিকা মহাদেশের মধ্যে পুরো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দিয়ে তীব্র তাপ-প্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। উত্তরপশ্চিমের ওয়াশিংটন রাজ্য থেকে শুরু করে ফ্লোরিডা, টেক্সাস, ক্যালিফোর্নিয়া -সবখানেই প্রচণ্ড গরম। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অঙ্গরাজ্যগুলোতে গরম পড়েছে সবচেয়ে বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই অঙ্গরাজ্যের মাউই কাউন্টি বিগত একশ বছরের ইতিহাসে দাবানলে পুরে ছ্ইা হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষের মৃত্যুর রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে। এক এক করে দুই হাজারেরও বেশি বাড়ি-ঘর পুড়ে ছাই। এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত পুড়ে মারা গেছেন অন্তত ৮৯ জন। খোঁজ মিলছে না অন্তত এক হাজার মানুষের। এবারের দানানলের এক শ বছরেরও বেশি সময় আগে সংঘটিত এক ভয়াবহ দাবানলে ৮৫ জন নিহত হয়েছিল। ১৯১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে ওই দাবানল সংঘটিত হয়েছিল। সেখানে আগুনে ক্ষতি ও তা পুনঃনির্মাণের আনুমানিক খরচ হবে প্রাথমিকভাবে ৫.৫২ বিলিয়ন ডলার। আমেরিকার অঙ্গরাজ্যটির ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলা হচ্ছে এই দাবানলকে।

১৪ জুলাই ফিনিক্সের তাপমাত্রা ছিল ৪৬ ডিগ্রি, লাস ভেগাসে ৪৫ ডিগ্রি, এবং ডেথ ভ্যালিতে ৫১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছে। তীব্র গরমের কারণে টেক্সাস রাজ্যে এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারের পরিমাণ আগেকার রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এ রাজ্যে একদিনে ৮১ হাজার ৪০৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহারের এক নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। 

কানাডায় প্রতি বছরের মতো এবারও অন্তত ৯০০টি এলাকায় দাবানল দেখা দিয়েছে- যার মধ্যে প্রায় ৫৬০টির আগুন ছিল নিয়ন্ত্রণহীন। এরইমধ্যে আবার কানাডার প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্রদেশ নোভা স্কটিয়ায় গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় প্রদেশটির কিছু জায়গায় ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়। এ পরিমাণ বৃষ্টি সাধারণত তিন মাসে হয়ে থাকে। গত ২২ জুলাই এ বৃষ্টিতে প্রদেশটির বেশিরভাগ অঞ্চলে দেখা দেয় বন্যা। এতে অনেক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রদেশের সবচেয়ে বড় শহর হ্যালিফ্যাক্স এবং আরও চারটি অঞ্চলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।

রক্ষা পাচ্ছে না শীতল সাইবেরিয়া:
 
পৃথিবীর অন্যতম শীতল অঞ্চল রাশিয়ার সাইবেরিয়াও তাপপ্রবাহ থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। পরিবেশবিষয়ক সাময়িকী ‘নেচারের’ সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাইবেরিয়ায় বর্তমানের গরম গত সাত হাজার বছরেও দেখা যায়নি। ২০২০ সালের তথ্য দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, সে সময় সাইবেরিয়ার তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছিল।

একই সময়ের তথ্য দিয়ে সিএনএন জানায়, বিজ্ঞানীদের ভাষ্য- সাইবেরিয়ায় এমন তাপপ্রবাহের পেছনে জলবায়ু সংকট দায়ী থাকার সম্ভাবনা আছে। কেননা, মানুষের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন না হলে আর্কটিক অঞ্চলে এমন পরিবর্তন দেখা যেতে পারে প্রতি ৮০ হাজার বছর পর পর। পরিবেশবিষয়ক সাময়িকী নেচারের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, সাইবেরিয়ায় বর্তমানের গরম গত সাত হাজার বছরেও দেখা যায়নি।

চীন সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড: 

মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে নিজেদের ইতিহাসের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড গড়েছে চীন। বছরের শুরুর দিকে তীব্র ঠান্ডায় কাঁপছিল দেশটির কিছু এলাকা। একপর্যায়ে হিমাঙ্কের নিচে (মাইনাস) ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে সর্বনিম্ন তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড তৈরি হয়। ১৯৬৯ সালে রেকর্ড করা হয়েছিল সেই তাপমাত্রা।

সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড দেখিয়েছে চীন। এবার তাপমাত্রা উঠেছে রেকর্ড ৫২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ১৬ জুলাই বিশ্বে সবচেয়ে বেশি কার্বন নি:সরণকারী দেশটির জিনজিয়াংয়ের সানবাও শহরের তুরপান ডিপ্রেশন এলাকায় তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৫২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। এটি ২০১৫ সালে রেকর্ড করা চীনের আগের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। আট বছর আগে আয়দিং এলাকার কাছে সর্বোচ্চ ৫০ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করেছিল চীনের আবহাওয়া কর্তৃপক্ষ।

অপরদিকে, চীনের বেইজিংও ষাট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ উষ্ণ দিন দেখেছে এবার। যা আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। গত ২২ জুন চীনের আবহাওয়াা দপ্তর জানায়, বেইজিংয়ে দিনের তাপমাত্রা ৪১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। এটি গত ৬০ বছরে বেইজিংয়ে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। আবহাওয়া কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১৯৬১ সালে রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর থেকে এটি জুনের সবচেয়ে উষ্ণতম দিন ছিল।

একইভাবে দেশটির বৃহত্তম শহর সাংহাই পূর্ব উপকূলে মে মাসে ১০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে উষ্ণতম দিনের রেকর্ড করা হয়। চীনের বৃহত্তম শহর জুজিয়াহুই স্টেশনে দিনের তাপমাত্রা ৩৬.১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল, যা গত ১০০ বছরের মধ্যে মে মাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড করেছিল।

সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ডের পাশাাশি চীনে টানা বর্ষণেও পূর্বের রেকর্ড ভেঙেছে। গত ২৮ জুলাই থেকে ২ আগষ্ট পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের অতিবৃষ্টিতে তলিয়ে যায় রাজধানী বেইজিংয়ের উপকণ্ঠ। এ সময় ৭৪৪ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়। যা ১৮৯১ সালের পর সর্বোচ্চ।

জানুয়ারিতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড গড়ার পর থেকেই কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভারী বৃষ্টিপাতের মুখে পড়ে চীন। ফলে তলিয়ে যায় দেশটির ‘শস্যভাণ্ডার’ নামে পরিচিত বিশাল এলাকা। এরপর শুরু হয় তাপপ্রবাহ। আর এবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড দেখলো তারা।

মধ্যপ্রাচ্য যেন অগ্নিগর্ভ: 

উষ্ণ আবহাওয়ার জন্য সুখ্যাতি পাওয়া মধ্যপ্রাচ্যও এবছর অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে গত ১৫ জুলাই প্রথমবারের মতো তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১২২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) অতিক্রম করেছে। সেদিন দুপুর আড়াইটার দিকে আবুধাবির বাদা দাফাসে (আল ধাফরা অঞ্চল) সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৫০ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গরমের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ‘মিড ডে ব্রেক’ নামে একটি নিয়ম চালু করেছে আমিরাত সরকার। এ নিয়ম অনুযায়ী, দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত খোলা জায়গায় বা সরাসরি সূর্যের আলোতে কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

এ ছাড়া, ১৭ জুলাই দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ইরানে দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ বুশেহেরের আসালুয়েহ জেলার পার্সিয়ান গালফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় ৬৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১৫২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। যা মানুষ, উদ্ভিদ ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য অসহনীয়।

গরমের অতিষ্ঠ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জনজীবন:
 
দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ওপর দিয়েও বয়ে গেছে তাপপ্রাবহ। এ বছর ভিয়েতনামে গরম ৪৪ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার এই দেশটির ইতিহাসে এটি সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড। তাপমাত্রার প্রভাবে বিদ্যুতের চাহিদায় আকস্মিক উল্লম্ফন এবং তার জেরে ভিয়েতনামে প্রায় ভেঙে পড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা। প্রতিবেশী দেশ লাওসেও এ দিন রেকর্ডভাঙা তাপমাত্রা ছিল। দক্ষিণপূর্ব এয়িশার অপর দেশ ফিলিপাইনে প্রায় প্রতিদিন তাপমাত্রার সূচক ‘বিপজ্জনক’ পর্যায়ে থাকায় স্কুলের সময়ঘণ্টা কমাতে বাধ্য হয়েছে সরকার।

তাপপ্রবাহ থেকে থেকে মুক্তি পায়নি ফিলিপাইনের দুই প্রতিবেশী থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়াও। জুন মাসে থাইল্যান্ডের উত্তর ও মধ্যাঞ্চালে তাপমাত্রা ছিল ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপর। থাই জলবায়ুবিদরা সরকারের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছেন, সামনের তিন বছর দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে খরা দেখা দিতে পারে; সরকারের উচিত আসন্ন এই দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে রাখা।

খরার আশঙ্কায় আছে মালয়েশিয়াও। দেশটির আবহাওয়া দপ্তর এক পূর্বাভাসে জানিয়েছে, চলতি বছর মালয়েশিয়ায় বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত। যদি সত্যিই এমন হয়, সেক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পাম ওয়েল উৎপাদনকারী এই দেশটির ভোজ্যতেলের মূল কাঁচামাল পামের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলীয় মাগওয়ে অঞ্চলে তাপমাত্রা ছিল ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শুধু তাই নয়, এ বছর পর্যটনসমৃদ্ধ থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। লাউসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। 

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এবছর যে তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে তা ‘২০০ বছরে একবার দেখা যায়’ বলে শিরোনাম করেছে সংবাদমাধ্যম সিএনএন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ধারণের তাপপ্রবাহ প্রায়ই দেখা যাবে বলেও এতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।

দক্ষিণ এশিয়ায় তাপপ্রবাহ ৩০ গুণ বেড়েছে: 

ভয়ঙ্কর তাপপ্রবাহে দগ্ধ দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারতের উত্তর প্রদেশে ২০২৩ সালের জুন মাসের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত তাপপ্রবাহ অব্যাহত ছিল। চতুর্থ সপ্তাহে এসে বৃষ্টি নামার আগে ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যটির কিছু কিছু এলাকায় তাপমাত্রার পারদ উঠেছিল ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এতে তাপজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন শত শত মানুষ। প্রতিবেশী রাজ্য বিহারে জুনের চুতর্থ সপ্তাহ পর্যন্ত চলে তীব্র তাপপ্রবাহ, যার কারণে স্কুল-কলেজ বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হন সেখানকার কর্তৃপক্ষ।

ভারত সাধারণত মে ও জুন মাসের গ্রীষ্মে তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি বেশ আগেভাগে এসেছে এবং আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। গত এপ্রিলে ভারত যে তাপপ্রবাহের সম্মুখীন হয়েছিল, তাতে রাজধানী নয়াদিল্লিতে তাপমাত্রা টানা সাত দিন ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে ছিল। এই তাপপ্রবাহ কিছু রাজ্যে স্কুল-কলেজ বন্ধ, ফসলের ব্যাপক ক্ষতি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর মারাত্মক চাপ তৈরি করে।

দক্ষিণ এশিয়ার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তাপপ্রবাহ, বিশেষ করে বাংলাদেশে গরমের কথা পাঠকদের কাছে বিশেষভাবে তুলে ধরা বাহুল্যই বটে। বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে সিএনএনর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত ও বাংলাদেশে যে তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে ‘হয়ত মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তা অন্তত ৩০ গুণ বেড়ে এমনটি হয়েছে’। অর্থাৎ, কল-কারখানার ধোঁয়া, বনাঞ্চল উজাড়সহ মানবসৃষ্ট দূষণ না হলে এমনটি হতো না।

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে জুনের তৃতীয় সপ্তাহে তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়েছিল। পাকিস্তানে তীব্র গরমের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৪ জুন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দেশটির জনগণকে রক্ষার আবেদন করে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার সংকটপীড়িত দেশটির জনগণের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করা হয়। গত এপ্রিলে দ্বীপদেশ শ্রীলঙ্কার অধিকাংশ অঞ্চল তীব্র তাপপ্রবাহে ‘পুড়েছিল’ বলে জানা যায় দেশটির সংবাদমাধ্যম সূত্রে।

বাংলাদেশে রেকর্ড উষ্ণ দিন:
 
বাংলাদেশেও এ বছর রেকর্ড উষ্ণ দিন পার করেছে। গত এপ্রিলে ২৪ দিন ও মে মাসে ২২ দিন তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। দেশের ২ এপ্রিল থেকে টানা ১৯ দিনের তাপপ্রবাহে পুরো দেশ বৃষ্টিহীন থাকে। এতে নয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৩ তাপমাত্রা উঠে পাবনার ঈশ্বরদিতে। এরপর সিলেটে বৃষ্টিতে দূর হতে শুরু করে তাপপ্রবাহ। ২৫ এপ্রিল থেকে আবার তাপপ্রবাহ শুরু হয়। তেঁতেঁ ওঠে গরম। তাপপ্রবাহ বইছিল দেশটির রাজধানী ঢাকায়ও। তবে এর মধ্যেই কালবৈশাখী ও বৃষ্টি বেড়ে যায়। তিন দিনের মাথায় গত ২৮ এপ্রিল তা দূর হয়। তৃতীয় দফায় ২৯ মে থেকে শুরু হয় টানা তাপপ্রবাহ শুরু হয়ে তা চলে টানা ১০ জুন পর্যন্ত। দুই সপ্তাহ ধরে চলা তাপপ্রবাহের পরিধি দেশের দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৯ জেলায় বিস্তৃতি লাভ করে। তীব্র গরমের কারণে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্লাস ৫ থেকে ৮ জুন পর্যন্ত বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে অতীতে এত উষ্ণ দিন কখনও দেখা যায়নি। 

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হলো মাচ মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৭ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাতের পর টানা চার মাস প্রায় বৃষ্টিহীন হয়ে পড়ে বাংলাদেশ। আবহাওয়া বিভাগের তথ্যে বলা হয়েছে, এপ্রিল মাসে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ৬৬.৪ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়। সেই ধারাবাহিকতায় মে মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে ৪৪.১ শতাংশ ও জুন মাসে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ১৬ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়। আর জুলাই মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হয় ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ। 
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের কারণে আগষ্টের শুরু থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হয়। এখানে লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো, এপ্রিল এবং মে এই ২ মাসে দেশটিতে গড় বৃষ্টি ছিল ৩০ বছরের মধ্যে কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশে ঋতু চক্রে এই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এতে বলা যায়, এপ্রিল ও মে মাসে দেশটিতে তাপমাত্রার যে রেকর্ড হয়েছে সামনের দিনগুলোতে তা অব্যাহত থাকবে। ফলে এই উচ্চ তাপমাত্রা মানিয়ে নেওয়া ছাড়া গতি নেই।

চরম সংকটে পড়বে গোটা মানবসভ্যতা: 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে প্রতিকূল আবহাওয়া আরও মারাত্মক হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তাপপ্রবাহ পরিস্থিতি বেড়ে গেছে এবং এটা এখন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। জলবায়ু সংকটের কারণে ভবিষ্যতে তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন দেখা দেবে এবং তা দীর্ঘতর হতে হবে। গবেষকরা সতর্ক করেছেন, এ ধরনের চরম তাপমাত্রার প্রভাব বিধ্বংসী হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত প্যানেল সম্প্রতি একটি প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়েছে, বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রতিটি ডিগ্রি তাপমাত্রা বিপদ আরও বাড়িয়ে তুলবে।

বিশেজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃতিতে কার্বন ডাই অক্সাইডসহ অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের ব্যাপক নিঃসরণ, অতিমাত্রায় জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, বনজঙ্গল ধ্বংস করা এবং শিল্প কারখানার পরিমাণ দিন দিন বাড়তে থাকায় ক্রমশ অস্বাভাবিক উষ্ণ হয়ে উঠছে পৃথিবী। তাই যে কোনো উপায়ে হোক জীবাষ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে লাগাম টানতে হবে। অন্যথায় এমন হতে থাকলে খুব শিগগির চরম সংকটে পড়বে গোটা মানবসভ্যতা।

এম হাসান

×