ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯

এনামুল হক

মস্তিষ্ক স্মৃতিকে রিপ্লে করে দেখায়

প্রকাশিত: ০৯:৪৯, ২০ মার্চ ২০২০

মস্তিষ্ক স্মৃতিকে রিপ্লে করে দেখায়

মৃগী রোগীদের ওপর এক সমীক্ষা চালাতে গিয়ে গবেষকরা রোগীদের স্মৃতির পরীক্ষা নেয়ার সময় নিউরন নামে কথিত মস্তিষ্কের হাজার হাজার কোষের বৈদ্যুতিক ক্রিয়াকলাপ পর্যবেক্ষণ করেছেন। তারা লক্ষ্য করেছেন যে রোগীরা যখন একজোড়া শব্দ শেলে তখন কোষগুলোর ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠার ধারাটা এমন হয় যে রোগীরা শব্দজোড়া সাফল্যের সঙ্গে স্মরণ করার আগেই নিমেষের মধ্যে সেগুলো রিপ্লে হয়ে থাকে। স্মৃতি আমাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সঙ্গীতের স্বরলিপি যেমন রেকর্ডের গায়ে খাঁজে খাঁজে বাণীবদ্ধ হয়ে থাকে তেমনি বাহ্যত আমাদের মস্তিষ্কও স্মৃতিগুলোকে নিউরনগুলোর ক্রিয়াশীল হওয়ার প্যাটার্ন বা ধারার মধ্যে এমনভাবে সংরক্ষণ করে রাখে যে সেগুলো বার বার রিলে হতে পারে। কথাটা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ্ নিউরোসার্জন ও গবেষক করিম জগলুল। উপরে যে সমীক্ষার কথা বলা হয়েছে সেটির গবেষকদের একজন এবং গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক তিনি। গবেষণাটি ছিল ওষুধ প্রতিরোধী মৃগী রোগীদের নিয়ে। এ ধরনের মৃগী রোগে আক্রান্তদের খিঁচুনি উঠলে তা ওষুধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। গবেষণাপত্র ‘সায়েন্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। ওষুধ প্রতিরোধী মৃগী রোগে আক্রান্তদের মধ্যে যারা আপাতত কাটাছেঁড়া করে শরীরে বসানো ইলেকট্রোড নিয়ে চলছে ডাঃ জগলুল ও তাঁর দল তাদের বৈদ্যুতিক প্রবাহের রেকর্ডিং করে চলেছেন। ইলেকট্রোড বসানোর উদ্দেশ্য ছিল রোগীদের মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপ মনিটর বা পর্যবেক্ষণ করা এবং সেটা এই আশায় যাতে করে রোগীদের সীজার বা খিঁচুনির উৎস চিহ্নিত করতে পারা যায়। এই পর্বে স্মৃতির সময়কার মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর ক্রিয়াকলাপ নিয়ে গবেষণা করারও সুযোগ পাওয়া গেছে। ১৯৫৭ সালে এইচএম নামে এক মৃগী রোগীর কেসটি স্মৃতি সংক্রান্ত গবেষণার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক অগ্রগতি যুগিয়েছিল। এইচএম এর সিজার বা খিঁচুনি বন্ধ করার জন্য তাঁর মস্তিষ্কের একটা অংশ অস্ত্রোপচার করে বাদ দেয়ার পর সে তর নতুন অভিজ্ঞতার কথা মনে রাখতে পারত না। তারপর থেকে মৃগী রোগের গবেষণা এই ধারণাটির দিকে অঙ্গুলি নিদেৃশ করে যে অনিয়মিত স্মৃতিগুলো নিউরনের ক্রিয়াকলাপের ধারা হিসেবে এমনভাবে সংরক্ষিত বা সঙ্কেতাবদ্ধ থাকে যে এক ঝলক পরিচিত গন্ধ নাকে লাগার কিংবা চিত্তাকর্ষক কোন সুর কানে দোলা দেয়ার মতো ঘটনার দ্বারা সেই নিউরনগুলো সক্রিয় হয়ে উঠলেই আমাদের মস্তিষ্ক সেই স্মৃতিগুলো রিফ্লে করে। তবে সেটা ঠিক কিভাবে ঘটে তা অজানা ছিল। গত দুই দশকে ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গেছে যে মস্তিষ্ক স্মৃতিগুলোকে নিউরনগুলোর সক্রিয় হয়ে ওঠার এক অদ্ভুত পরম্পরা বা ক্রম হিসেবে মজুদ করে রাখে। জগলুলের ল্যাবে যোগদান করার পর নর্থ ক্যারোলিনার ডারহামের ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডির ছাত্র এলেক্স পি, ভাজ এ ধারণাটি মানবদেহে পরীক্ষা করে দেখার সিদ্ধান্ত নেন। তিনিই এই গবেষণার প্রধান ব্যক্তি। বায়োইঞ্জিনিয়ার ভাজ শরীরের দ্বারা সৃষ্ট বৈদ্যুতিক সঙ্কেতগুলোর অর্থ বা মর্মোদ্ধারে বিশেষ পারদর্শিতার অধিকারী। ভাজ বলেন, ‘আমরা সে সব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছি সেগুলো সতর্কতার সঙ্গে এবং মনোযোগ দিয়ে দেখলে আমরা মানুষের ক্ষেত্রে স্মৃতি ও নিউরনগুলোর জ্বলে ওঠার ধারার মধ্যে একটা যোগসূত্র খুঁজে বের করতে সক্ষম হতে পারি যা কিনা ইঁদুরের ক্ষেত্রেও একই রকম দেখা গেছে। সেই যোগসূত্র খুঁজতে গিয়ে ভাজ ও তাঁর দল মস্তিষ্কের ভাষার কেন্দ্র এন্টেরিয়র টেম্পোরাল লোবে অবস্থিত প্রতিটি নিউরনের জ্বলে ওঠার ধারা বিশ্লেষণ করে দেখেন। রোগীদের একটা স্ক্রিনের সামনে বসানো হয় এবং ‘কেক’ ও ‘ফক্স’-এর মতো শব্দজোড়া শিখতে বলা হয়। একই সময় তাদের মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক প্রবাহও রেকর্ড করা হয়। গবেষকরা প্রতিটি নতুন শব্দের প্যাটার্ন শিখার সঙ্গে সম্পর্কিত এক একটি নিউরনের অদ্ভুত ফায়ারিং প্যাটার্ন আবিষ্কার করেন। পরে একজন রোগীকে যখন তার শেখা শব্দগুলোর কোন একটা দেখানো হলোÑ যেমন ধরুন ‘কেক’ তখন সেই রোগী কেকের জোড়াশব্দ ‘ফক্স’ সঠিকভাবে স্মরণ করা মাত্র মিলিসেকেন্ড আগে নিউরনগুলোর একেবারে একই রকমভাবে জ্বলে ওঠার ধারাটির রিপ্লে হয়েছে। ডাঃ জগলুল বলেন, এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে বোঝা যায় যে আমাদের মস্তিষ্ক স্মৃতি মজুদ করার জন্য নিউরনগুলোর জ্বলে ওঠার স্বতন্ত্র সিকোয়েন্স হয়ত কাজে লাগিয়ে থাকে এবং তারপর আমরা অতীতের কোন অভিজ্ঞতা স্মরণ করলে সেই স্মৃতিগুলো রিপ্লে করে। গত বছর তাঁর দল দেখিয়েছে যে আমরা কোন কিছু সঠিকভাবে স্মরণ করার ঠিক আগ মুহূর্তে মস্তিষ্কে লহরীর মতো বেদ্যুতিক তরঙ্গ সৃষ্টি হতে পারে। ডাঃ জগলুল বলেন, আমাদের গবেষণার ফলাফল থেকে এই ধারণাই সমর্থিত হয়েছে যে স্মৃতি মানেই হলো মস্তিষ্কজুড়ে নিউরনগুলোর জ্বলে ওঠার প্যাটার্নের একটা সুসমন্বিত রিপ্লে। আমাদের স্মতি কিভাবে তৈরি হয় এবং কিভাবে তা পুনরুদ্ধার করা হয় তা নিয়ে গবেষণা করলে আমাদের নিজেদেরই শুধু বোঝা যাবে তাই নয়, স্মৃতির বিকলন ঘটলে কিভাবে নিউরনগুলোর সার্কিট ভেঙ্গে পড়ে সে সম্পর্কেও ধারণা লাভ করা যাবে। সূত্র : সায়েন্স নিউজ