ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৪ জুলাই ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১

বিরল বিদেশী জাত দেশীয় হয়ে উঠছে ক্রমশ

খাওয়ার চেয়েও বেশি কৌতূহল যেসব আম নিয়ে

মোরসালিন মিজান

প্রকাশিত: ২৩:০২, ২৪ জুন ২০২৪

খাওয়ার চেয়েও বেশি কৌতূহল যেসব আম নিয়ে

লাল রঙের আম আমেরিকান পালমার। আরও অনেক বিচিত্র নাম ও জাতের বিদেশী আম ক্রমে দেশীয় হয়ে উঠছে

এখন ফলের মৌসুম। বিশেষ করে আম খুব পাওয়া যাচ্ছে। কাজ শেষে বাসায় ফেরার সময় কিছু আম যেন না কিনলেই নয়। আস্রপালি হিমসাগর ল্যাংড়া গোপালভোগ লক্ষণভোগসহ অন্যান্য দেশীয় জাতগুলোর সঙ্গে কম বেশি সবাই পরিচিত। তবে এসবের বাইরেও কিছু আম এখন দেশে হচ্ছে। নামধাম রং বা আকার আকৃতির দিক থেকে এগুলো বেশ বিচিত্র। আর স্বাদ? না, স্বাদের কথা চট্ করে বলে দেওয়া যে কারও জন্য মুশকিল হবে। কারণ এই আমগুলো কম হয়। সরবরাহ অপ্রতুল। ফলে চেখে দেখার সুযোগ তেমন হয় না। তার পরও বাইরে থেকে আসা আম ঘিরে দারুণ কৌতূহল। ‘বাইরে’ থেকে বলতে, বাইরের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা জাত। 
জেনে রাখার জন্য বলি, বাংলাদেশ ছাড়াও পৃথিবীর বহু দেশে বিপুল পরিমাণে আম হয়। কাছের দেশ ভারত পাকিস্তানে এটি তো জাতীয় ফল। চীন জাপান আমেরিকা ইউরোপ আফ্রিকাÑ কোথায় যাবেন? আম পাবেন সবখানে। সারাবিশ্বে, যতদূর জানা যায়, প্রায় ৪ কোটি ৬০ মিলিয়ন টন আম উৎপাদিত হয়। এক দেশের আম অন্য দেশে রপ্তানি হয়। আবার বীজ বা চারার মাধ্যমেও বাইরের জাত দেশে আসে। অভিন্ন নিয়মে দেশে এসেছে বিদেশী অনেক আমের জাত। বিদেশী জাত থেকে গবেষণার মাধ্যমে নতুন জাতও উদ্ভাবন করছে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা।

বাংলাদেশের আবহাওয়ায় গাছগুলো যেন ভালোভাবে বাঁচে, সে ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। এভাবে ক্রমে দেশীয় হয়ে উঠছে অনেক বিদেশী জাত। কিছু নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। এই যেমন: ব্রুনাই কিং, মিয়াজাকি, আমেরিকান পালমার, ইন্দো পালমার, চিয়াং মাই, তাইওয়ান গ্রীন, তাইওয়ান রেড, কিউসেফ, টমি এটকিনসন্স, ভূতোবোম্বাই। আরও নানা নামের বিদেশী আম এখন দেশের বলে গণ্য হচ্ছে। 
কয়েকদিন আগে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত জাতীয় ফল মেলায় বেশ কিছু বিদেশী জাত প্রদর্শনীর জন্য আনা হয়েছিল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্যাভিলিয়নে ছিল আকর্ষণীয় সংগ্রহ। সেখানে রাখা আমগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল পালমার। আমেরিকার জাতটির নাম আমেরিকান পালমার। ইন্দোনেশিয়ারটিকে ইন্দো পালমার নাম দেওয়া হয়েছে। ব্রুনাই থেকে এসেছে ব্রুনাই কিং। এটি বেশ বড়সর আকারের আম। লম্বাটে আমের ওজনও সাধারণ আমের তুলনায় অনেক বেশি। এ কারণেই ‘কিং।’

একটি ব্রুনাই কিংয়ের ওজন ৫ কেজি বা তারও বেশি হতে পারে বলে স্টল থেকে জানানো হয়েছিল। তাইওয়ানের একটি লাল আমের নাম তাইওয়ান রেড। চীন থেকে এসেছে হুয়াং ডং। একই দেশ থেকে আসা সরু লম্বাটে আমের নাম চিয়াং মাই। স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে ভীষণ কৌতূহল নিয়ে বিদেশী জাতের এসব আম দেখছিলেন কৌতূহলীরা। 
বৃক্ষমেলায় পাওয়া যাচ্ছে ফিলিপাইন সুপার সুইটের চারা গাছ। আমও ধরে আছে গাছে। ফিলিপাইনের এই আম খুব মিষ্টি। তাই সুপার সুইট নাম। একটি আম আবার আপেলের মতো গোল দেখতে। নাম তাই আপেল ম্যাংগো। আকারে অবশ্য আপেলের চেয়ে বড়। ওজন দেড় কেজি পর্যন্ত হয়। ‘থ্রি টেস্ট’ নামের আমটি আরও বিচিত্র। এক আম থেকেই পাওয়া যায় তিন তিনটি স্বাদ ও ঘ্রাণ। ভারতবর্ষ থেকে আসা আরেকটি জাত ভূতোবোম্বাই।

আর আমেরিকার একটি জাতকে ‘আমেরিকান সুন্দরী’ নাম দেওয়া হয়েছে। একই দেশ থেকে আসা জাতের নাম আমেরিকান তুলি। বৃক্ষমেলায় ব্যাপক হারে চোখে পড়ছে ব্যানানা ম্যাংগো। জানা যায়, এটি থাইল্যাল্ডের জাত। ২০১০ সালে এ জাতের ডগা নিয়ে এসে প্রথমে গ্রাফটিং করা হয়। পরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারে দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য কাজ শুরু হয়। সাফল্য আসে ২০১২ সালে।

এরপর প্রতিবছর নিয়মিত আম আসায় ২০১৫ সালে বাণিজ্যিকভাবে কৃষকদের মধ্যে এ আমের সম্প্রসারণ কাজ শুরু হয়। আলাদা দেখতে হওয়ায় সহজেই দৃষ্টি কাড়ে ব্যানানা ম্যাংগো। এদিকে, জাপান থেকে আসা মিয়াজাকি আমকে মহামূল্যবান ভাবা হচ্ছে এখন। কারণ দাম চড়া। আমের আকৃতি ডিমের মতো কিছুটা। পাকলে লাল সূর্যের মতো দেখায়। তাই বাংলাদেশে উদ্ভাবিত জাতটির নামকরণ করা হয়েছে সূর্য ডিম। বৃক্ষমেলায় ঘুরে অনেকেই মিয়াজাকি খুঁজছেন। সহসা এটি পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বাকি জাতগুলো নিয়ে তাদের আগ্রহের সীমা নেই।   
বিদেশী জাতের দেশী ফল সম্পর্কে জানতে কথা হয় কৃষিবিদ মিমি তালুকদারের সঙ্গে। কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের এই কর্মকর্তা বলেন, এ জন্য কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের আলাদা গবেষণা সেল আছে। এ সেলের উদ্ভাবিত নতুন জাতের চারা প্রথমে গাজীপুরের উদ্যান উন্নয়ন কেন্দ্রে লাগানো হয়। সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হলে এসব ফলের গাছ সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

একই প্রক্রিয়ায় দেশের নানা প্রান্তে বিদেশী জাতের দেশী আম হচ্ছে। উদ্ভাবিত জাতগুলো স্বাদে গন্ধে একটির থেকে অন্যটি আলাদা। কোনোটি খুব মিষ্টি। আবার কোনোটি অতো মিষ্টি নয়। সুগার কম। দিন দিন এইসব জাত দেশে জনপ্রিয় হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

×