ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৯ জুন ২০২৪, ৬ আষাঢ় ১৪৩১

বাঙালির ঐতিহ্য বাঁশের তৈরি সামগ্রী

ছিল অমূল্য রতন, আজ ব্যবহারে পড়েছে ভাটা কদরও কমে গেছে

সমুদ্র হক

প্রকাশিত: ২৩:২৫, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩

ছিল অমূল্য রতন, আজ  ব্যবহারে পড়েছে ভাটা  কদরও কমে গেছে

অতীত হয়ে যাচ্ছে বাঙালির ঐতিহ্যের বাঁশের তৈরি সামগ্রী

মাছ ধরা, ঘর সাজানো গেরস্থালির নানা কাজে বাঁশের তৈরি সামগ্রী ব্যবহারে ভাটা পড়েছে। কদরও অনেক কমেছে। দ্রুত অতীত হয়ে যাচ্ছে। প্রবীণরা বলেন, হাজার বছরের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় বাঙালির জীবনে বাঁশের তৈরি সামগ্রী ছিল অমূল্য রতন। দূর অতীতে প্রতিটি বাড়ির গৃহস্থালি কাজে বাঁশের তৈরি সামগ্রী না হলেই নয়। ঘর সাজানো হতো বাঁশের তৈরি জিনিস দিয়ে। জন্য গ্রামে ছিল বাঁশ বাগান (স্থানীয় কথায় বাঁশের ঝাড়) এই বাগান থেকে বাঁশ কেটে গ্রামের কৃষক তৈরি করত নানা ধরনের জিনিস। তাদের কেউ নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে পণ্য বিপণন করত। বাঁশের তৈরি সামগ্রী ছিল গ্রামীণ জীবনের প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ। যা গ্রামের প্রতিটি বাড়ির গৃহবধূ নারীর কাছে ছিল গৃহস্থালি অলঙ্কার। পুরুষদের কাছে বাঁশের তৈরি মাছ ধরার সামগ্রী ছিল পৌরুষ উপকরণ।

আজ বাঁশের তৈরি জিনিসগুলোর বিকল্প তৈরি হয়েছে। যার কিছু অংশ প্লাস্টিকের তৈরি। প্লাস্টিক গিলে ফেলছে বাঙালির বাঁশকেন্দ্রিক ঐতিহ্য। গ্রামীণ গৃহস্থালি সামগ্রীর মধ্যে আছে কুলা, ডালা, ধামা, চালুনি, টোনা, ঠুসি, ঝাঁটা, পাল্লা, হোঁচা, চাঙ্গারি আঙিনায় হাঁস-মুরগি ঢেকে দেওয়ার বিশেষ ধরনের ঝাপি ইত্যাদি। মাছ ধরার সামগ্রীর মধ্যে আছে পলো, দাড়কি, খলুই, টানা জাল, বিভিন্ন ধরনের ঠুসি। আম পাড়ার এক ধরনের ঠুসি তৈরি হয়। শিশুদের খেলনাপাতি, দোলনা। ্যাক, বুকশেলফ ইত্যাদি বানানো হয়। অতীতে বাঁশের তৈরি নানা ধরনের সামগ্রী বাঙালির ঐতিহ্যের তালিকায় বড় আসন করে নিয়েছিল। এইসব সামগ্রীর সঙ্গে যুক্ত হয় নানা ধরনের হস্তশিল্প। নকশি ওয়ালম্যাট, টেবিল ম্যাট বাঁশের কাঠিতে তৈরি দরজা জানালার পর্দা ইত্যাদি। ঘর সাজানোর এই পর্দা বনেদি বাড়ির আভিজাত্য বহন করত।

ওয়ালম্যাট টেবিলম্যাট বিদেশেও রপ্তানি হয়ে সুনাম বয়ে এনেছিল। গ্রামের মানুষের নিজ উদ্যোগে কুটির শিল্পের আদলে গড়া এই শিল্প আজ হারিয়ে যাচ্ছে। বংশ পরম্পরায় কোনো রকমে যারা এই শিল্প টিকিয়ে রেখেছেন তাদের দুর্দিন। বাঁশের দাম বেড়েছে অনেক। সেই তুলনায় বাড়েনি বাঁশের তৈরি সামগ্রীর দাম। ফলে বাঁশ কেটে ছিলে কারিগরের মজুরি দেওয়ার পর যে দামে বিক্রি হয় তাতে লাভ থাকে একেবারে কম। কোনো রকমে দিনগুজরান করেন কারিগররা। বগুড়ার সদরের  গোদারপাড়া চারমাথা এলাকায় বাঁশের তৈরি সামগ্রী বিক্রি করেন ইব্রাহিম প্রামাণিক (৭৪) তার পূর্বসূরি একই কাজ করতেন। ইব্রাহিম প্রামাণিক জানালেন পসরা সাজিয়ে আব্দুর রাজ্জাক নামের এক লোক বসিয়ে ভিন্ন কাজে যান তিনি। তিনিও বাঁশের তৈরি কিছু সামগ্রী বানাতে পারেন। তবে বয়সের কারণে আজ সেই শক্তি পান না। কিছু কাজ করেন আব্দুর রাজ্জাক। এতে কারিগর খরচ কিছুটা বেচে যায়। বললেন বছর কয়েক আগে একটি বড় বাঁশ বিক্রি হতো ৮০ থেকে ১৫০ টাকায়। বর্তমানে একটি বড় বাঁশের দাম ৩৫০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা। বড় বাঁশ ছাড়া সামগ্রী মজবুত হয় না। এর সঙ্গে মজুরি যুক্ত করতে হয়।

বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার বাঙালি নদীর তীরের রানীরপাড়া গ্রামের প্রবীণ গৃহস্থ সোলায়মান আলী জানালেন অতীতে গ্রামের অনেক বাড়িতে বাঁশের সামগ্রী তৈরি করত ক্ষুদ্র মধ্যম কৃষক। অনেক গৃহস্থ বাড়িতে ছিল বাঁশ বাগান। কৃষক পণ্য বানিয়ে লাভ করত। অনেক সময় গৃহস্থ বাঁশের পণ্য বানিয়ে নিতে বাঁশের দাম নিতেন না। কৃষকদের সহযোগিতা করতেন। অতীতে বাঁশের সামগ্রী বানাবার কারিগর ছিল। তারা বাঁশের তৈরি সামগ্রীকে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করেছিলেন। ষাটের দশকে দেশের অনেক গ্রামে নীরবে গড়ে উঠেছিল কুটির শিল্প। তাদের কোন যন্ত্র ছিল না।

হাতেই তৈরি করত। ষাটের দশকের মধ্যভাগে ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠান মানিকগঞ্জে বাঁশের তৈরি পণ্য সামগ্রীর মধ্যে ঘর সাজাবার কিছু নকশা পণ্য তৈরি শুরু করে। এগুলো অনেক বাড়ির ড্রইং রুমে ওয়ালম্যাট হয়ে সৌন্দর্য্য বাড়িয়ে দেয়। এক পর্যায়ে ডাইনিং টেবিল ম্যাট তৈরি শুরু হয়। ব্যাপক সাড়া মেলে। প্রতিষ্ঠানটি এই সামগ্রী বিদেশে রপ্তানি শুরু করে। সুনাম বয়ে আনে। পরে ওয়ালম্যাট টেবিলম্যাটের শিল্পকে এগিয়ে নিতে পারেনি ওই প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে কোনো প্রতিষ্ঠান বাঁশের ওয়ালম্যাট টেবিলম্যাট তৈরিতে এগিয়ে আসছেন না। দিনে দিনে গৃহস্থালি মাছ ধরার সামগ্রী তৈরি কমে গেছে। বাঁশের তৈরি নতুন কোনো শিল্পকর্ম তৈরি রপ্তানিমুখী করা যায় কিনা এই বিষয়েও কোনো উদ্যোগ নেই।

×