ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১

প্রমথ চৌধুরীর পৈত্রিক ভিটা

হরিপুর জমিদারবাড়ি, ভেঙেপড়া জৌলুস

রফিকুল ইসলাম রনি

প্রকাশিত: ০০:০১, ৫ জুন ২০২৩

হরিপুর জমিদারবাড়ি, ভেঙেপড়া জৌলুস

প্রমথ চৌধুরীর ভিটায় জমিদারবাড়ির পারিবারিক পুকুরঘাট, পারিবারিক মন্দির ও পাঠাগার

পাবনার চাটমোহর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের চৌধুরীপাড়া গ্রামে ইতিহাসে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাংলা গদ্যরীতির প্রবর্তক বিখ্যাত সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরীর পৈত্রিক ভিটা। বাংলা ভাষারীতিতে বিশেষ পরিবর্তন আনা এই মানুষটির নামমাত্র স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে সেখানে। যেটুকু আছে সেটা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিলুপ্তির পথে। প্রমথ চৌধুরীর পৈত্রিক ভিটা, চৌধুরী বাড়ির পুকুর মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ এখনো বিদ্যমান।

এককালের প্রতাপশালী, জ্ঞানগৌরবে উজ্জ্বল জমিদারবাড়ির পারিবারিক মন্দিরটির গায়ে বটপাকুড় মাথা গুঁজেছে, হুতুমপেঁচা আর চামচিকে বাসা বেঁধেছে। খসে পড়ছে ইট সুড়কি। একটু দূরে জাফরী ইটে শানবাঁধানো পুকুরঘাট। যার স্ফটিক জলের তল থেকে ভেঙেপড়া জৌলুস আজও জানান দিচ্ছে আভিজাত্য।

এই পিতৃভূমি নিয়ে প্রমথ চৌধুরীর দুর্বলতাটাও সবার জানা। আত্মকথায়ও তিনি বিষয়ে লিখে গেছেন- আমি ছেলেবেলায় কৃষ্ণনগরেই বাস করতুম বছরের সাড়ে এগারো মাস আর হরিপুরে পনেরো দিন। কিন্তু বাবার বাড়ি হরিপুরটা আমি সঙ্গে এনেছিলুম। যদিও তিনি মামাবাড়ি যশোহরে জন্মেছিলেন।

অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদের চলনবিলের ইতিকথা রাধারমন সাহার পাবনা জেলার ইতিহাস গ্রন্থমতে, প্রমথ চৌধুরীর বাবা ছিলেন দুর্গাদাস চৌধুরী। তিনি ছিলেন কৃষ্ণনগরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। আর তার বাবা ছিলেন কালীকান্ত চৌধুরী। নাটোর রাজার দেওয়ান। তিনি সোনাবাজু পরগনার সিকি অংশ কিনে জমিদার হয়েছিলেন। তার বংশধর হরি মৈত্রের নামানুসারে গ্রামের নাম হরিপুর রাখা হয়। আবার কেউ বলেছেন, চৌধুরীরা হরিসংকীর্তন করতেন বলে গ্রামের নাম হরিপুর হয়েছে।

প্রমথ চৌধুরীর মা ছিলেন মগ্নাময়ী দেবী। তার ছেলে, মেয়ে। প্রমথ চৌধুরীর ভাইবোন সবাই উচ্চ শিক্ষিত ছিলেন। মহারানী ভিক্টোরিয়া প্রমথ চৌধুরীর মাকেরতœগর্ভাউপাধি দিয়ে স্বর্ণপদক দিয়েছিলেন।

বড়দা আশুতোষ চৌধুরী ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি। অন্যরা হলেন- কুমুদনাথ চৌধুরী, যোগেশচন্দ্র চৌধুরী, মন্মথনাথ চৌধুরী, সুহৃদনাথ চৌধুরী অমিয়নাথ চৌধুরী।

নং ভাই বিলাত ফেরত ডাক্তার ছিলেন। অন্য ভাইয়েরা ছিলেন ব্যারিস্টার। কুমুদনাথ চৌধুরী বিখ্যাত শিকারি ছিলেন। তিনি সুন্দরবনে শিকারে গিয়ে মারা যান। বোন প্রসন্নময়ী দেবী মৃণালিনী দেবী ছিলেন বিলাত ফেরত উচ্চ শিক্ষিত। চৌধুরী পরিবারের প্রায় সকলেই উচ্চ শিক্ষার জন্য বিলেত যাওয়ায় স্থানীয় হিন্দু নেতারা সমাজচ্যুত করেছিলেন তাদের। আর অমিয়নাথ চৌধুরীর ছেলে প্রমথ চৌধুরীর ভাতিজা জয়ন্ত চৌধুরী (জেএন চৌধুরী) ভারতের সেনাধ্যক্ষ হয়েছিলেন।

প্রমথনাথ চৌধুরী জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারের জামাই ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভ্রাতুষ্পুত্রী অর্থাৎ সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেয়ে ইন্দিরা দেবীকে বিয়ে করেছিলেন ১৮৯৯ সালে। তিনি বিলেত থেকে বার-এট করে কলকাতা হাইকোর্টে কিছুদিন আইনব্যবসা করেছিলেন। তিনি বিশ্বভারতী সবুজপত্র সম্পাদনা করেছেন।

বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ প্রমথ চৌধুরী সম্পর্কে বলেছিলেন, তার চিত্রবৃত্তির বাহুল্যবর্জিত আভিজাত্য-আমাকে আকৃষ্ট করেছে। প্রমথ চৌধুরী ১৯৪৬ সালের সেপ্টেম্বর শান্তিনিকেতনে মৃত্যুবরণ করেন।

বাংলা সাহিত্যে প্রমথ চৌধুরীর অবদান অনেক। নতুন গদ্যরীতির প্রবর্তন করেন তিনিই। তার সৃষ্টির উল্লেখযোগ্য হলো- রায়াতের কথা, বীরবলের হালখাতা, চার-ইয়ারী কথা, আহুতি, নীললোহিত, পদচারণ, নানাচর্চা, প্রাচীন বঙ্গ সাহিত্যে হিন্দু মুসলমান, তেল নুন লাড়কি প্রবন্ধ সমগ্র।

জানা গেছে, প্রমথ চৌধুরীর পিতা দুর্গাদাস চৌধুরী ছিলেন হরিপুর গ্রামের জমিদার বংশের সন্তান। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কৃষ্ণনগরে প্রমথ চৌধুরীর শৈশব   কৈশোর কাটলেও মাঝেমধ্যেই হরিপুরর গ্রামে পৈত্রিক ভিটায় আসতেন তিনি। সেখানে বহু প্রাচীন একমাত্র মন্দিরে পূজার্চনা করতেন। সময়ের পরিক্রমায় কেটে যায় বহুবছর। এর মধ্যে দখলদাররা বিখ্যাত এই সাহিত্যিকের জায়গা জমি দখল করে বসবাস শুরু করেন। স্মৃতিচিহ্ন যখন মুছে যাচ্ছিল ঠিক সময় চাটমোহরের সচেতন সমাজপ্রমথ চৌধুরী স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদগড়ে তোলেন।

কয়েক বছর আন্দোলনের পর তৎকালীন পাবনার জেলা প্রশাসক রেখা রানী বালোর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় প্রশাসন প্রমথ চৌধুরীর তিন একর পৈত্রিক ভিটা দখলমুক্ত করেন এবং সেখানে একটি পাঠাগার গড়ে তোলেন। কিন্তু সেই পাঠাগারটিতেও এখন কেউ বসেন না। পাঠাগারের ভেতরে আসবাব বইপত্র ধুলোর আস্তরণে ঢাকা পড়েছে।

প্রমথ চৌধুরীর বাবার প্রতিষ্ঠিত চাটমোহর হরিপুরে দুর্গাদাস চৌধুরী হাইস্কুল কলেজের অধ্যক্ষ আলী হায়দার সরদার জানান, প্রমথ চৌধুরীর পৈত্রিক ভিটায় একমাত্র মন্দিরটি একেবারেই জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। জায়গাটি রক্ষণাবেক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। বিদেশী সাহিত্য সংস্কৃতির সঙ্গে বাঙালির পরিচয় ঘটানো স্বনামধন্য লেখক প্রমথ চৌধুরীর পৈত্রিক ভিটাটি আবারও দখলদারদের কবলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ১৯২৫ সালে প্রমথ চৌধুরীর বাবার প্রতিষ্ঠিত চাটমোহর হরিপুরে দুর্গাদাস চৌধুরী হাইস্কুলটি অনেক চড়াই উৎরাইয়ে ১৯৯৯ সালে দুর্গাদাস হাইস্কুল কলেজে উন্নীত হয়েছে। দুর্গাদাসের একটি পাথরের আবক্ষ মূর্তি স্কুলকক্ষে এখনো রয়েছে। তিনি প্রমথ চৌধুরী নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয়সহ সংস্কৃতি ভাষা চর্চা কেন্দ্রের দাবি জানান।

প্রমথ চৌধুরী স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি প্রভাষক ইকবাল কবির রঞ্জু বলেন, হরিপুরের চৌধুরীপাড়া প্রমথ চৌধুরীর পৈত্রিক ভিটায় একর জমির ওপর এলাকার ১৮টি পরিবার দখল করে ঘরবাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছিলেন। প্রমথ চৌধুরী স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের আন্দোলন দাবির মুখে প্রশাসন অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু করেন। উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে প্রমথ চৌধুরী স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের কমিটির নেতৃবৃন্দ এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে উচ্ছেদ অভিযান সফল হয়। দখলদারদের হাত থেকে বিখ্যাত এই সাহিত্যিকের জায়গা উদ্ধার করে পাঠাগার নির্মাণ করা হয়। একজন লাইব্রেরিয়ান রাখা হয়েছিল। কিন্তু তার বেতন দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় সেটিও এখন খোলা হয় না। ধুলোর আস্তরণে ঢাকা পড়েছে পাঠাগারের চেয়ার টেবিল বইপত্র।

তিনি আরও বলেন, সবার আগে বহু প্রাচীন মন্দির এবং জায়গাটির রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি। তাছাড়া কোনো স্মৃতিচিহ্নই থাকবে না। আমরা চাই এখন সরকার প্রমথ চৌধুরীর স্মৃতি রক্ষার্থে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

প্রমথ চৌধুরীর স্মৃতি রক্ষার্থে উপজেলা প্রশাসন থেকে কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা এবং লাইব্রেরিয়ান নিয়োগসহ সীমানা প্রাচীর নির্মাণ বিষয়ে চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. মমতাজ মহলের নিকট জানতে চাইলে তিনি কোনো বিষয়ে বক্তব্য দিবেননা মর্মে অভিমত ব্যক্ত করেন।

×