ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ০১ জুন ২০২৩, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩০

ব্যতিক্রমী ইফতার বায়তুল মোকাররমে

চাকুরে ব্যবসায়ী ভিক্ষুক ভবঘুরে- সবাই সমান একই খাবার

মোরসালিন মিজান 

প্রকাশিত: ২৩:৫৪, ২৭ মার্চ ২০২৩

চাকুরে ব্যবসায়ী ভিক্ষুক ভবঘুরে- সবাই সমান একই খাবার

বায়তুল মোকাররমের ইফতারে প্রতিদিন হাজার হাজার মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন

মসজিদকে বলা হয় আল্লাহর ঘর। আর আল্লাহর ঘরে মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ করা হয় না। একই নীতি অনুসরণ করে প্রতিবছর বায়তুল মোকাররম মসজিদে আয়োজন করা হয় বিশাল ইফতারের। প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার রোজাদার এখানে ইফতার করছেন। রমজানের প্রথম দিন থেকেই চলমান আছে ইফতার আয়োজন। 
এ ইফতারের মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানে ধনী দরিদ্রের কোনো পার্থক্য নেই। বসার বা খাবারের আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই কারও জন্য। চাকরিজীবী, বড় ব্যবসায়ী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে আশপাশের দোকানি, পথচারী, ভিক্ষুক, ভবঘুরে সবাই পাশাপাশি বসে ইফতার করেন। একই খাবার খান তারা। এমনকি একপাত্রে অনেককে খেতে দেখা যায়। সবাইকে সমান মর্যাদার অতিথি জ্ঞান করা হয়। শুধু ইফতার নয়, এখান থেকে নেয়া যায় সমাজে সাম্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার শিক্ষাও।

সোমবার আছরের নামাজের পর মসজিদের পূর্ব সাহানে গিয়ে দেখা যায়, অনেকেই আর বাইরে যাননি। বয়ান হচ্ছিল। মুসল্লিরা বয়ান শুনছিলেন। হামদ্ নাতও চলছিল। সময় যত গড়াচ্ছিল, অতিথি সংখ্যা তত বাড়ছিল। কেউ নামাজের সারির মতো লম্বা লাইন করে বসছিলেন। কেউ বসছিলেন বৃত্তাকারে। আশপাশের দোকানের কর্মচারী, গুলিস্তান এলাকায় কেনাকাটা করতে আসা সাধারণ মানুষ, ভিক্ষুক, ভবঘুরে, এতিম-মিসকিন সবাই অপেক্ষা করতে থাকেন ইফতারের জন্য। ইফতার পরিবেশনসহ অন্যান্য কাজেও অংশ নিচ্ছিলেন তারা। দেখতে দেখতে মাগরিবের আজান ভেসে আসে। শুরু হয়ে যায় ইফতার। 
আগে এই ইফতারের উদ্যোক্তা ছিল ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদ ও মার্কেট বিভাগ। এই বিভাগের একজন উপ-পরিচালক সমস্ত কিছু তদারকি করতেন। গত বছর থেকে দায়িত্বে আছে বায়তুল মোকাররম মসজিদ মুসল্লি কমিটি। কমিটি আয়োজিত ইফতারে থাকে শরবত, খেজুর, ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজু, জিলাপি  কলাসহ মুখরোচক নানা খাবার। 
এই ইফতারে প্রতিদিন আনুমানিক ৭০ কেজি ছোলা, ৪৫ কেজি মুড়ি, ৬০ কেজি পেঁয়াজু, ৬০ কেজি জিলাপি এবং ৪০ কেজি খেজুর রাখা হয়। সাড়ে ৬শ’ থেকে ৭০০ পিস কলা কেটে অর্ধেক করে পরিবেশন করা হয়। ১০টি বড় বালতিতে তৈরি করা হয় শরবত। ৭০টি জগে করে গ্লাসে গ্লাসে বিতরণ করা হয়। খাবার পরিবেশনের জন্য রয়েছে ২০০টি বড় ডিশ। প্রতিটিতে ৬ থেকে ৮ জন একসঙ্গে ইফতার করতে পারেন।  রোজাদাররা ডিশের চারপাশে চমৎকার গোল হয়ে বসে ইফতার করেন। সিঙ্গেল ডিশও আছে। ৪শ’ মানুষ সিঙ্গেল ডিশে ইফতার করতে পারেন। দশটি সারিতে ৭০ জন করে বসে ইফতার করেন। 
বিশাল এই আয়োজন সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে কাজ করছেন ২১ খাদেম। থালা বাটি ধোয়ার জন্য রয়েছেন আরও কয়েকজন। আর   স্বেচ্ছাসেবীর কথা তো আগেই বলা হয়েছে। পুরুষের পাশাপাশি পৃথক ব্যবস্থা রয়েছে মহিলাদের জন্য। মসজিদের পূর্ব-দক্ষিণ প্রান্তে নামাজকক্ষে প্রতিদিন শতাধিক মহিলা ইফতার করেন। সব মিলিয়ে অন্যরকম একটি আয়োজন। 
মুসল্লি কমিটির সেক্রেটারি মিজানুর রহমান মানিকের তথ্য মতে, প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার মানুষের ইফতারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে এখানে। রমজানের ৩০ দিনে ৬০ হাজার মানুষের ইফতার আয়োজন করা হবে। সেভাবেই প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। 
মিজানুর রহমান মানিক বলেন, জাতীয় মসজিদে ইফতার করতে আসা মানুষজনের মধ্যে একেবারে দরিদ্র মানুষ যেমন থাকেন, তেমনি থাকেন অর্থবিত্তের মালিকরাও। সবাই এখানে অতিথি। ভ্রাতৃত্বপূর্ণ পরিবেশে পাশাপাশি বসে ইফতার করেন। এখান থেকে ইসলামের সমতার শিক্ষা গ্রহণ করার আছে বলে মনে করেন তিনি।  
রমজানের চতুর্থ দিন বাইতুল মোকাররমে ইফতার করতে এসেছিলেন আলী আফতাব মজুমদার। একসময় সরকারি চাকরি করেছেন। বর্তমানে একটা বিমা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। মতিঝিলে অফিস। কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, বাইতুল মোকাররমে জামাতে নামাজ পড়তে আসি। ইফতার করে ফিরতে ফিরতে মাগরিবের নামাজ শেষ হয়ে যায়। তাই ইফতারটাও এখানে করি। আমার আশপাশে অনেক সাধারণ দরিদ্র মানুষও বসেন। তাদের সঙ্গে আমি কথা বলি। একে অপরের দিকে শরবতের গ্লাসটা ঠেলে দিই। খুব ভালো লাগে। 
শরীফুল ইসলাম নামের আরেক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তিনি গুলিস্তানে কোনো একটা কাজে এসেছিলেন। ঘটনাক্রমে মসজিদে ইফতার। প্রথমে কিছুটা অপ্রস্তুত লাগছিল নিজের কাছে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে মনে হলো এখানে সবাই সবার পরিচিত। 
মসজিদে প্রায় নিয়মিত ইফতার করেন ভিক্ষুক আলী হুসেন। তিনিও অধিকার নিয়ে দিব্যি বললেন, ‘আল্লার ঘরে তো সবাই সমান। ওজু কইরাই ঢুকি। আমারে কেউ কি বাইর কইরা দিতে পারব? 
আসলেই কেউ তাকে বের করে দিতে পারবে না। বের করে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। পরিবেশটা এমনই সৌহার্দ্যরে যে!