ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ০৬ জুলাই ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯

পরীক্ষামূলক

জাতীয়

বিঘায় ফলন ৩৬ মণ

‘ফাতেমা’ ধানে নতুন আশা

প্রকাশিত: ২২:৪৪, ১৬ মে ২০২২

‘ফাতেমা’ ধানে নতুন আশা

মামুন-অর-রশিদ, রাজশাহী ॥ রাজশাহীতে এবার প্রথমবারের মতো ‘ফাতেমা’ জাতের ধান চাষ করে আশাতীত ফলন পেয়েছেন কৃষক। ধান কাটার পর ফলনে আশার সঞ্চার সৃষ্টি করেছে কৃষকদের। রাজশাহীতে প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলকভাব এ ধান চাষ করে বিঘায় ৩৬ মণ ধান উৎপাদন করেছেন জেলার পবা উপজেলার এক কৃষক। কৃষি বিভাগ এ ধান চাষে আগ্রহ সৃষ্টি করলে কৃষক পর্যায়ে সাড়া ফেলতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে। রাজশাহীতে প্রথম চাষ করা এ জাতের ধানের ফলন প্রতি বিঘায় ৩৬ মণ। রাজশাহীর ধান চাষী দুলাল মাহবুব বলেন, তার জমিতে প্রথমবারের মতো ফাতেমা ধান চাষ করেছিলেন এবার। গত শনিবার এ ধান কর্তন করে প্রতি বিঘায় ৩৬ মণ ফলন পেয়েছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতি বিঘাতে উচ্চ ফলনশীল ব্রি-২৮ ধানের উৎপাদন হচ্ছে ১৬ থেকে ২০ মণ। সেখানে একই খরচে প্রতি বিঘা জমিতে ফাতেমা ধান ৩৬ মণ উৎপাদন হচ্ছে। ব্রি-২৮ ধানের চেয়ে প্রতি বিঘা জমিতে ১৬ মণ ধান বেশি পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, ধান বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে নিবিড় যতœ সহকারে ফাতেমা জাতের ধান চাষ করলে প্রতি বিঘাতে ৪০ থেকে ৫০ মণ উৎপাদন করা সম্ভব। তবে তিনি বলেন, কৃষি বিভাগ এখনও এ জাতের ধান চাষ নিয়ে কৃষকপর্যায়ে কোন প্রভাব পেলতে পারে নি। অনেকটাই অনীহা রয়েছে কৃষি বিভাগের। কৃষক দুলাল মাহবুব জানান, চলতি বছর শখের বসে তিনি নওগাঁ জেলার মান্দা থেকে এ ধানের বীজ সংগ্রহ করে উপজেলার নওহাটার তেঘর-বসন্তপুর গ্রামের নিজস্ব জমিতে চাষ করেছিলেন। শনিবার তার জমিতে ধান কাটা হয়েছে। এ উপলক্ষে সেখানে কৃষক সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় ধান চাষী আফাজ উদ্দিন সরকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের কোষাধ্যক্ষ ও পবা উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সরকার দুলাল মাহবুব ও উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা (সাবেক) মজিবর রহমান। প্রধান অতিথি পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শফিকুল ইসলাম বলেন, এ জাতের ধানে প্রতি শীষে যে পরিমাণ ধান আছে তাতে প্রতি বিঘা জমিতে ৪০ মণের উপরে ফলন হবে। তিনি বলেন, রাজশাহীতে এ জাতের ধান কর্তনের পর ফলন দাঁড়িয়েছে ৩৬ মণ। তিনি কৃষকের এই ধানের বিষয়ে কৃষি বিভাগের উর্ধতন কর্মকর্তাদের জানাবেন। তিনি বলেন, অন্য ধানের মতোই এ ধানের চাষ পদ্ধতি। আউশ, আমন ও বোরো তিন মৌসুমেই এ ধানের চাষ করা যায়। তবে বোরো মৌসুমে এর উৎপাদন সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে। গাছের উচ্চতা প্রায় ৫ ফুট যা অন্য ধানের তুলনায় বেশি। গাছগুলো শক্ত হওয়ায় হেলে পড়ে না। আর এক একটি ধানের শীষে ৫০০ থেকে ১০০০টি করে ধান পাওয়া গেছে। এ ধানে রোগ ও পোকামাকড়ের হার তুলনামূলক কম। এছাড়া চাল খুব চিকন ও ভাতও খেতে খুব সুস্বাদু। পবা উপজেলার সাবেক উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মজিবর রহমান বলেন, ফাতেমা ধানের ফলন কৃষিকে বদলে দিতে পারে। কৃষক পর্যায়ে যদি এ ধান চাষে আগ্রহ সৃষ্টি করা যায় তাহলে এ ধানের চাষাবাদ বাড়তে পারে। তিনি এই ধানের ফলনে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ঝড় বৃষ্টিতে মাঠের প্রায় সব ধান গাছ নুয়ে পড়ে অথচ এইধান গাছ গুলো এখনও শক্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। ধান কাটা অবধি গাছ খাড়া থাকে। এ কারণে ফলনও বেশি হয়। কৃষক দুলাল বলেন, এবার প্রাথমিকভাবে তিনি দেড় বিঘা জমিতে ধান চাষ করে ফলন পেয়েছেন ৫৪ মণ। আগামীতে তিনি আরও বেশি জমিতে ফাতেমা জাতের ধান চাষ করবেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে বর্তমানে যেসব জাতের ধান চাষ হয় সেসবের চেয়ে এই ধানের ফলন দ্বিগুণ। তারা বলছেন, ফাতেমা ধানের গাছ, ফলন, পাতা, শীষ সবকিছু অন্য যে কোন জাতের ধানের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। প্রতি গোছে একটি চারা রোপণ করলেই তা বেড়ে ৮-১২ টি হয়। প্রতিটি ধান গাছ ১১৫ থেকে ১৩০ সেন্টিমিটার লম্বা। একেকটি ছড়ার দৈর্ঘ্য ৩৬-৪০ সেন্টিমিটার। সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করে চাষ করল এ ধানের প্রতি ছড়ায় দানার সংখ্যা এক হাজার থেকে ১২০০টি হয়। এই ধান ঝড়-বৃষ্টিতে হেলে পড়ার কোন আশঙ্কা নেই। অন্য যে কোন জাতের তুলনায় এই জাতের ধান অনেক ব্যতিক্রম। অনুসন্ধানে জানা যায়, বাগেরহাটের কৃষক ফাতেমা বেগম প্রথম ২০১৬ সালে বোরো মৌসুমে তার বাড়ির পাশে জমিতে হাইব্রিড আফতাব-৫ জাতের ধান কাটার সময় তিনটি ভিন্ন জাতের ধানের শীষ দেখতে পান। ওই তিনটি শীষ অন্যগুলোর চেয়ে অনেক বড় এবং শীষে ধানের দানার পরিমাণও অনেক বেশি ছিল। এরপর ওই ধানের শীষ তিনটি বাড়িতে এনে শুকিয়ে প্রক্রিয়া করে বীজ হিসেবে রেখে দেন। পরের বছর সেই থেকে ধান চাষ চাষ করে আড়াই কেজি ধান পাওয়া যায়। সময়ের ব্যবধানে এখন এ ধান সাড়া ফেলেছে। পরিচিতি পেয়েছে ফাতেমা ধান হিসেবে। কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন ফাতেমা জাতের ধানের রয়েছে নানা বৈশিষ্ট্য। এ ধানের ফলন শুধু দেশ নয়, গোটা বিশ্বকে তাক লাগাতে পারে। যা দেশের খাদ্য ঘাটতি পূরণ করে বিদেশেও রফতানি করা যেতে পারে।