সোমবার ৪ মাঘ ১৪২৮, ১৭ জানুয়ারী ২০২২ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা

নাম না জানা অসংখ্য শহীদের কবর আজও কাঁদায়

নাম না জানা অসংখ্য শহীদের কবর আজও কাঁদায়
  • মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধির গ্রাম

তাহমিন হক ববী ॥ মহান মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখযুদ্ধ, স্মৃতিবিজরিত স্থান, বীর মুক্তিযোদ্ধার সমাধিগুলো আজও জ্বল জ্বল করছে। পঞ্চাশ বছর আগের সেই মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে এলাকাভেদে কিছু কিছু ঘটনা আজও মানুষজনকে কাঁদায়। কোন কোন শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম অনেকের জানা নেই। আবার কিছু শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম জানা রয়েছে। এমন একজন শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আরশাদ আলী। তিনি শায়িত আছেন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নে। তার নামেই গ্রামের নামকরণ করা হয় আরশাদগঞ্জ। নিভৃত গ্রামের বাঁশঝাড়ের নিচে শ্বেতপাথরে (টাইলস) বাঁধাই করা একটি কবর। কবর ঘেঁষে দক্ষিণ পাশে ঈদগাহ মাঠ। তার অদূরেই হাট। ঈদগাহ মাঠটিও তার নামেই আরশাদগঞ্জ ঈদগাহ মাঠ বলে পরিচিতি পেয়েছে। হাটের নামটিও আরশাদগঞ্জ হাট। গ্রামের দুটি মসজিদ, একটি মাদ্রাসারও নামকরণ করা হয়েছে এই শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার নামে।

সম্প্রীতি এ ব্যাপারে কথা হলে গ্রামের মুদি ব্যবসায়ী তারিক হোসেন (৩২) বলেন, আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, কিন্তু একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার নামে আমাদের গ্রামের নামকরণ হওয়ায় গর্ব বোধ করি। বীর মুক্তিযোদ্ধা আরশাদের স্বজনেরা প্রতি বছরের ২৮ অক্টোবরের দিনটি ঘিরে এখানে আসেন ও কবর জিয়ারত ও স্থানীয় মসজিদে মিলাদ মহফিল করেন। তখন এলাকাবাসী তাদের সঙ্গে মিলিত হয়।

৬ নম্বর সেক্টরের বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়ালিউর রহমান চৌধুরী (৬৯) বলেন, ঠাকুরগঞ্জ গ্রামটি ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় এই সীমান্ত দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা এই গ্রামে প্রবেশ করে পার্শ্ববর্তী এলাকায় সম্মুখযুদ্ধ করেন। এই গ্রাম ছিল শক্রমুক্ত। তাই শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের এই গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় কবর দেয়া হয়েছিল। অনেকের নাম পরিচয় এখনও অজানা রয়েছে।

তিনি জানান, ভারত থেকে ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা ডিমলাকে ৬টি কো¤পানি বা অঞ্চলে ভাগ করে নিয়েছি। সেগুলো স্থান হলো দক্ষিণ বালাপাড়া অঞ্চলে মাহাবুব কোম্পানি, ঠাকুরগঞ্জ অঞ্চলে মনির কোম্পানি, টুনির হাট ভাড়ালদাহ অঞ্চলে সিদ্দিক কোম্পানি, কলোনী দোহলপাড়া অঞ্চলে রওশন কোম্পানি, রহমানগঞ্জ ও টেপাখড়িবাড়ি অঞ্চলে হারেছ কোম্পানি ও তিস্তা নদীর তীর অঞ্চল মতিন কোম্পানি। এই ৬টি কোম্পানির মুক্তিযোদ্ধারা যে সকল অস্ত্র ব্যবহার করেছিল তা হলো এসএলআর থ্রি নট থ্রি রাইফেল, এলএমজি টুইন্স মটার, সর্টমেশিন গান, এন্টি পারসোনাল ১৬ মাইন, এন্টিপারসোনাল ১৪ মাইনসহ আরও বেশ কিছু অস্ত্র।

১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর ভোররাতে ডিমলা উপজেলার টুনিরহাটের সম্মুখযুদ্ধে টাউরীদহ নামক স্থানে শহীদ হন আরশাদ আলী। এরপর সহযোদ্ধারা তাঁর লাশ ওই গ্রামে নিয়ে আসলে ঘটনাটির দিন সন্ধ্যার পর সেখানে দাফন করা হয় তাঁকে। তাঁর নাম অনুসারেই গ্রামের নামকরণ করা হয়েছে আরশাদগঞ্জ। তবে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ের আগে ওই গ্রামের নাম ছিল বাদিয়াপাড়া। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ আরশাদ আলীকে কবর দেয়ার পর গ্রামটির নামকরণ করা হয় আরশাদগঞ্জ। যদিও এই মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী বলে স্থানীয়রা জানায়। আরশার আলীর মতো আরও অনেক শহীদ শায়িত আছেন আশপাশের গ্রামের মাটিতে। এদের অনেকের নাম পরিচয় এখনও জানা যায়নি।

সেই ঘটনার সাক্ষী গ্রামের মোঃ আব্দুল মতিন (৬৬) বলেন, তখন আমি অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র ছিলাম। সন্ধ্যার সময় তাঁর (আরশাদ) লাশ এই গ্রামে আনা হয়। গ্রামবাসীর মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছিল। সন্ধ্যার পর যখন জানাজার প্রস্তুতি চলছিল, তখন খবর এলো, খান সেনারা এদিকে আসছে। তখন অনেকে পালিয়ে যান। এরপর অল্পসংখ্যক মানুষ তাঁর জানাজায় অংশগ্রহণ করেন।

২৮ অক্টোবর কি ঘটেছিল ॥ আরশাদ আলীর সহযোদ্ধা ছিলেন নীলফামারী জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডিপুটি কমান্ডার আশরাফ আলী (৭০)। তিনি জানান, ভোর ৪টা ৪০ মিনিট থেকে আমরা ডিমলার টুনিরহাটে পাক সেনাদের পিছু হঠাতে প্রস্তুতি নেই। সেখানে মাহাবুব কোম্পানি, মনির কোম্পানি, সিদ্দিক কোম্পানি ও রওশন কোম্পানির মুক্তিযোদ্ধারা পজিশন নিয়ে থাকি।

পাকি সেনারা ভারি অস্ত্রে সজ্জিত। আমরা ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ শুরু। চারটি কোম্পানির প্রায় ৪ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা। চোখে মুখে বিজয়ের নেশা সঙ্গে সাধারণ মানুষের অনুপ্রেরণা। চলছে প্রচ- গোলাগুলি। দুই দিক হতে শুধু গুলি আর গুলির আওয়াজ। মাহাবুব কোম্পানির সাহসী দুই মুক্তিযোদ্ধা ছিল আরশাদ আলী ও সামছুল হক। তারা পাকি সেনাদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে চালাতে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। তাদের গুলিতে দশজন পাকি সেনা মারা যায়। ওই সময় পাকি সেনাদের বৃষ্টির মতো গুলিতে আরশাদ আলীর পেটে গুলিবিদ্ধ হয়। পাকি সেনারা তাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টার সময় আমরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে তারা গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে পরে যায়। ওই সময় অন্য মুক্তিযোদ্ধারা আরশাদ আলীতে আহত অবস্থায় কাঁধে করে তুলে নিয়ে যায় মুক্ত অঞ্চল বাদিয়াপাড়া গ্রামে (বর্তমান আরশাদগঞ্জ)। কিন্তু পেটে গুলি লাগায় তাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। ওই সময় পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে পাক সেনাদের হাতে ধরা পড়ে মুক্তিযোদ্ধা শামছুল হক। তাকে আমরা উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হলে পাকসেনারা শামছুল হককে ধরে নিয়ে যায় ডিমলা বাবুরহাটের রামডাঙ্গা পুরান থানা ক্যাম্পে। তাঁকে তিন দিন অমানুষিক নির্যাতন করে হত্যা করে পাকি সেনারা। পরে তাঁর লাশ পুরাতন থানা চত্বরে পুঁতে রাখে খান সেনারা। আশরাফ আলী বলেন, এর আগে ১৮ অক্টোবর একই উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের ব্রিজের ডাঙ্গায় শহীদ হন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী। তাঁর বাড়ি ছিল খুলনা জেলায়। তাঁকে আরশাদগঞ্জের পাশের ঠাকুরগঞ্জ বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পাশে দাফন করা হয়। তাঁর স্বজনদের পরিচয় এখনও অজানা।

বালাপাড়া ইউনিয়নের সোবহানগঞ্জ গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই (৭০)। তিনি বলেন, আরশাদ আলীসহ আমি একই ক্যাম্পে ছিলাম। সেদিন টুনির হাটে হিট করতে গিয়ে খান সেনাদের হাতে শহীদ হন আরশাদ আলী।

ঠাকুরগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা মোঃ খোরশেদ আলী (৭০) জানান, মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগীদের কোন তালিকায় নাম নেই। তিনি বলেন, এ গ্রামে আরশাদ আলীর মতো অনেক শহীদের কবর আছে। সম্প্রতি এসব কবর সংরক্ষণের কাজও শুরু হয়েছে। তিনি তাঁদের নাম পরিচয় সংরক্ষণে সরকারের প্রতি দাবি জানান। খোরশেদ আলী ওই এলাকা ঘুরে দেখিয়েছেন অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধার সমাধি। ঠাকুরগঞ্জ বাজারের মধ্যস্থলে পশ্চিম ছাতনাই কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পাশে শ্বেতপাথরে বাঁধাই করা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীর কবর। সেখান থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার উত্তরে মধ্য ছাতনাই গ্রামে দেখালেন একটি গণকবরের স্থান। এর পাশেই আরেকটি সমাধি দেখিয়ে বললেন, এই ছয় বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম জানা না গেলেও ওই বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম ছিল স্বপন। স্বপনের বাড়ি দিনাজপুরে ছিল বলে জানান তিনি। স্থানীয়রা বলেন, গ্রেনেডের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের লাশ আলাদাভাবে কবর দেয়া সম্ভব না হওয়ার কারণে তাঁদের সেদিন গণকবর দেয়া হয়েছিল।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ডিমলা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান তবিবুল ইসলাম বলেন, ১১ ডিসেম্বর আমরা ডিমলা উপজেলাকে হানাদারমুক্ত করতে সক্ষম হই। কিন্তু যুদ্ধকালীন আমাদের হারাতে হয় ডিমলা অঞ্চলে প্রায় শতাধিক মুক্তিযোদ্ধাকে। তিনি বলেন, আরশাদগঞ্জের কাছেই আমার গ্রামের বাড়ি। আমি সেই বাড়িতে এখনও থাকি। দুই দফায় উপজেলা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছি। এর আগে উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছি টানা ২০ বছর। এখানে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কবর বাঁধাই করা হয়েছে এবং কিছু বীর মুক্তিযোদ্ধার কবর ও গণকবর সংরক্ষণ করা হয়। তবে অনেকের পরিচয় এখনও অজানা। তাঁদের নাম পরিচয় জানা প্রয়োজন।

শীর্ষ সংবাদ: