সোমবার ৪ মাঘ ১৪২৮, ১৭ জানুয়ারী ২০২২ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা

ঘুরে দাঁড়াল টাইগাররা

ঘুরে দাঁড়াল টাইগাররা
  • পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সাগরিকায় প্রথম টেস্ট

মোঃ মামুন রশীদ, চট্টগ্রাম থেকে ॥ সমালোচনার ঝড়ে টালমাটাল বাংলাদেশ দল, তা স্তিমিত হয়েছে শুক্রবার সাগর পাড়ের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে। মাত্র ৪ দিন আগে দেশের ক্রিকেটে যে দুজন সবচেয়ে সমালোচিত ছিলেন তারাই রেকর্ডের জন্ম দিয়েছেন সাগরিকার উইকেটে রানের ফোয়ারা তুলে। অথচ ঘোর অমানিশায় পথ হারিয়েছিল বাংলাদেশী ব্যাটাররা। ক্রিকেটপ্রেমী সকলের শঙ্কিত হৃদয়ে বারবার জাগছিল প্রশ্ন- রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি/এখনও তোমার আসমান ভরা মেঘে/সেতারা, হেলার এখনও ওঠেনি জেগে/তুমি মাস্তলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে। মাস্তুলে এদিন লিটন কুমার দাস আর বিপর্যয়ে দাঁড় টেনে গেলেন মুশফিকুর রহিম। দুজনের ব্যাটে জোয়ার উঠল বেশকিছু রেকর্ডের আর চট্টগ্রাম টেস্টের প্রথম দিন ৪ উইকেটে ২৫৩ রান তুলে তাই দীর্ঘ সময় পর স্বস্তির বাতাস বাংলাদেশের তাঁবুতে। সাগর থেকে ভেসে আসা প্রশান্তির হাওয়ায় ২৬ মাস পর সাগরিকায় ফেরা দর্শকদের ও দীর্ঘ ব্যর্থতার পর বাংলাদেশ টিম ম্যানেজমেন্টের মুখে ফুটল হাসি। ব্যাটিং কোচ এ্যাশওয়েল প্রিন্সও যেন তাই চাপা দীর্ঘশ্বস ছেড়ে জানালেন ভাল উইকেটে নিয়মিত ব্যাটিংয়ের গুরুত্ব কতটা। প্রথম শতক হাঁকিয়ে লিটনের ১১৩ ও মুশফিকের ৮২ রানের অপরাজিত দুই ইনিংসে রেকর্ডময় দিন পার করেছে বাংলাদেশ।

শক্তিশালী পাকিস্তানের বিপক্ষে ব্যর্থতায় নিমজ্জিত বাংলাদেশ দল যে নতুন চেহারা পেয়েছিল, টি২০ সিরিজে পরাভূত হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। তবে দুই ম্যাচে দারুণ লড়াই করে বাংলাদেশ। তবে ভিন্ন ফরমেটে সেই পাকদের আবার চট্টগ্রামে নতুন চ্যালেঞ্জে নামে মুমিনুল হকের দল। এবারও কঠিন চ্যালেঞ্জ সিনিয়র কয়েকজন না থাকায়, তাছাড়া দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে আরও নাজুক বাংলাদেশ। শুরুতেই তাই আক্রমণাত্মক মেজাজে টস হেরে বোলিং শুরু করে পাকিস্তান। উইকেট দেখে দারুণ খুশিতে ডগমগ মুমিনুল আগের দিনের মতোই এদিন জানিয়েছেন ব্যাটিংয়ের জন্য মঞ্চটা সুন্দর। তিনটি স্লিপ ও একটি গালি নিয়ে দিনের শুরুর আর্দ্রতা ও হালকা ঘাসে সবুজাভ সাগরিকার উইকেটে ঝড় তোলেন শাহীন শাহ আফ্রিদি, হাসান আলী ও ফাহিম আশরাফ। ৩ টপঅর্ডার সাইফ হাসান, সাদমান ইসলাম ও নাজমুল হোসেন শান্ত ফিরে যান প্রত্যেকে ১৪ রান করে! মাঝে অধিনায়ক মুমিনুলও ৬ রানে সাজঘরে ফিরলে ব্যাটিং উইকেটেও ৪৯ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে যায় বাংলাদেশের তাঁবু। দর্শকরাও হতাশায় অন্ধকার মুখে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করেন। এরপর যেন দেবদূতের মতো হাল ধরলেন মুশফিক ও লিটন। পথ দেখালেন দিশেহারা দলকে। লাঞ্চ বিরতি পর্যন্ত আর কোন উইকেট না হারিয়ে ৬৯ রানে ৪ উইকেট বাংলাদেশের। তারপর রোদে তপ্ত সাগরিকার উইকেট আরও ফ্ল্যাট হয়েছে। লাঞ্চ বিরতির পর তাই হাত খুলেছেন লিটনের পাশাপাশি মুশফিকও। এই সেশনে দুজনই অর্ধশতক পেয়ে যান।

ধীরস্থির মুশফিক ৫১ বলে ৬ রান করার পর অবশেষে ফাহিমকে চার হাঁকিয়ে গুটিয়ে যাওয়া খোলস থেকে নিজেকে বের করেন। এরপর দুজন সমানতালে ব্যাট চালিয়েছেন। ৯৫ বলে ফিফটিতে পৌঁছেন লিটন। অফস্পিনার সাজিদ খানকে লং অন দিয়ে একটি ছক্কাও হাঁকান তিনি। চা বিরতির কিছু আগে ক্যারিয়ারের ২৪তম ফিফটি পান মুশফিকও। তিনি ১০৮ বল খেলেছেন। অর্থাৎ খোলস ছেড়ে বের হয়ে পরের ৫৭ বলে ৪৪ রান করেন তিনি ৮ চারে! ফলে পুরো এক সেশনে প্রতিপক্ষ বোলারদের ঘাম ঝরিয়ে নির্বিঘ্নে চা বিরতিতে যান মুশফিক-লিটন। এই সেশনে ৩১ ওভারে ১০২ রান যোগ করে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৪ উইকেটে ১৭১। পরের সেশনে ব্যক্তিগত ৬৭ রানে শাহীনকে পুল করতে গিয়ে লিটন ক্যাচ দিয়েছিলেন লিটন, কিন্তু সাজিদ খান তা হাতছাড়া করেন। সুযোগটা কাজে লাগিয়ে ক্যারিয়ারে প্রথম সেঞ্চুরিটা পেয়ে যান তিনি ১৯৯ বল থেকে। তৃতীয় চেষ্টায় টেস্ট শতক পেলেন তিনি। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এই চট্টগ্রামেই ৯৪ ও গত জুলাইয়ে হারারেতে জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে ৯৫ রানে আউট হয়েছিলেন। আক্ষেপ ঘুঁচিয়েছেন এমন সময় যখন ওয়ানডে ও টি২০ ফরমেটে দারুণ খরা তার ব্যাটে। এমন সময়ে জ্বলে উঠেছেন যখন চরম বিপদে বাংলাদেশ। টেস্টে আগের ইনিংসে ৯৫ করা লিটন অপরাজিত থেকে যান দিনশেষে ২২৫ বলে ১১ চার, ১ ছক্কায় ১১৩ রানে। আর কঠিন দুটি সুযোগ দেয়া মুশফিক প্রায় নিচ্ছিদ্র ইনিংস খেলে ১৯০ বলে ১০ চারে অপরাজিত ৮২ রানে। শেষ সেশনের আধা ঘণ্টাখানেক ফ্লাডলাইটের নিচে খেলতে হয়েছে, তবু ৫ ওভার আগেই শেষ হয়ে যায় বাংলাদেশের ইনিংস ৪ উইকেটে ২৫৩ রানে। এই সেশনে ২৬ ওভারে বিনা উইকেটে ৮২ রান এসেছে। টানা দুই সেশন পাক বোলারদের হতাশায় পুড়িয়েছেন মুশফিক-লিটন তাই দেশের ৯৮তম টেস্ট ক্যাপ পাওয়া ২৫ বছরের ইয়াসির আলী রাব্বির ব্যাটিংয়ে নামার অপেক্ষা বেড়েছে। পাকরাও ২৪৬তম টেস্ট ক্যাপ দিয়েছে ২২ বছর বয়সী টপঅর্ডার আব্দুল্লাহ শফিককে।

৩ পেসার ২ স্পিনার নিয়ে একাদশ সাজানো পাকিস্তান তাই দিনশেষে স্বস্তি নিয়ে মাঠ ছাড়তে পারেনি। এ নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং কোচ প্রিন্স বলেন, ‘পিচটা ব্যাটিংয়ের জন্য ভাল। ৪০০ নাকি ৫০০ যথেষ্ট কেউ জানেনা। পিচ অনেক বড় পার্থক্য গড়ে দেয়। আমি যা বলতে চাই তা হয়তো বলতে পারব না। কিন্তু হ্যাঁ, অবশ্যই পিচ অনেক বড় পার্থক্য গড়ে। এটা ভাল পিচ, ছেলেরা ভাল খেলেছে। খুব ভাল হয় যদি আমাদের ব্যাটাররা নিয়মিত ভাল পিচে ব্যাট করতে পারে।’ ২০৪ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে দিন শেষ করেন লিটন-মুশফিক। এ বছর যত টেস্ট হয়েছে এটিই পঞ্চম উইকেটের সেরা জুটি। দেশের মাটিতে টেস্টে সেরা পঞ্চম উইকেট জুটি এটি বাংলাদেশের। এর আগে পাকদের বিপক্ষেই ২০১১ সালে মিরপুরে ১৮০ রানের পঞ্চম উইকেট জুটি গড়েছিলেন শাহরিয়ার নাফীস ও সাকিব আল হাসান। পাকদের বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের সেরা পঞ্চম জুটি। মুশফিক অপরাজিত ৮২ রানের সুবাদে দেশের মাটিতে সর্বাধিক ২৬৬৪ (৪৪ টেস্ট) রানের মালিক হয়েছেন। দ্বিতীয় স্থানে নেমে গেছেন তামিম ইকবাল ৩৭ ম্যাচে ২৬২০ রান নিয়ে। চট্টগ্রামে এখন মুশফিক সর্বাধিক রানের মালিক (১৮ টেস্টে ১২৭৬) এবং যেকোন এক ভেন্যুতে সর্বাধিক রানের দিক থেকে সাকিব আল হাসানের পরই তার অবস্থান। সাকিব মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ১৭ ম্যাচে ১৩১৩ রান করেছেন।

আর ২০১৫ সালে টেস্ট অভিষেকের পর গত বছর পর্যন্ত ২০ টেস্টের ৩৪ ইনিংস ব্যাট চালিয়ে ৫ অর্ধশতকে ২৬.০৩ গড়ে মাত্র ৮৫৯ রান করেছিলেন। কিন্তু এ বছর ফর্মের তুঙ্গে আছেন লিটন। ৬ টেস্টের ৯ ইনিংস ব্যাট করে ইতোমধ্যেই তার রান ১ সেঞ্চুরি ও ৫ ফিফটিতে ৪৮৩। এমন দুর্দান্ত নৈপুণ্যে ইতোমধ্যেই তার টেস্ট ক্যারিয়ারের ব্যাটিং গড় এখন ৩২.৭৩! এ বছর উইকেটরক্ষক ব্যাটার হিসেবে তার চেয়ে বেশি রান করেছেন শুধু ভারতের ঋষভ পান্ত (১৯ ইনিংসে ৭০৬)। তবে ৬০.৩৭ ব্যাটিং গড়ে সব উইকেটরক্ষক ব্যাটারকে ছাড়িয়ে এক নম্বরে লিটন। এই শতক অনেক সমালোচনার জবাব, সংক্ষিপ্ত ফরমেটের ক্রিকেটে টানা ব্যর্থতার কারণে বেশ চাপের মুখে ছিলেন। অনেক সমালোচনাও হয়েছে তাকে নিয়ে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে টেস্ট ক্রিকেটে তার ব্যাটে বেশ ধারাবাহিকতাই ছিল। এই ম্যাচে নামার আগে সর্বশেষ ১০ ইনিংসে ৫ অর্ধশতক ছিল এবং ১১তম ইনিংসে এসে পেলেন সেঞ্চুরি। তাকে নিয়ে প্রিন্স বলেন, ‘বিশ্বকাপ নিয়ে বেশিকিছু বলতে চাই না। এটা ভিন্ন প্রতিযোগিতা। আমার মনে হয় যে কেউ লিটন দাসের ব্যাটিং দেখে বলবে সে উচ্চ শ্রেণীর ব্যাটসম্যান। ড্রেসিং রুমটা অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছে যখন সে সেঞ্চুরি পেয়েছে। আমি আজ খুবই শান্ত ও ধীরস্থির লিটনকে দেখে মুগ্ধ।’ সেই মুগ্ধতা আরও বাড়াতে আজ নতুন করে নামবেন লিটন ও মুশফিক। যদিও ব্যাটিংয়ের সময় পায়ে টান অনুভব করছিলেন, প্রিন্সের আশা রাত পেরিয়ে আজ ঝরঝরে শরীরেই আবার শুরু করতে পারবেন লিটন। তা বাংলাদেশের জন্য অনেক সুফলই বয়ে আনবে। কারণ ম্যাচের আরও ৪ দিন বাকি, ভাল কিছু করতে হলে লিটন-মুশফিককে নতুন করে শুরু করতে হবে আজ।

শীর্ষ সংবাদ: