ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৯ জুন ২০২৪, ৬ আষাঢ় ১৪৩১

ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর

বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ॥ জাতির বিক্ষত বিবেক

প্রকাশিত: ২১:১৭, ২৮ আগস্ট ২০২০

বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ॥ জাতির বিক্ষত বিবেক

(২৬ আগস্টের পর) আসামি ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদের মৃত্যুদণ্ডের ধারা বিষয়ে বিচারপতি রহুল আমীন ও বিচারপতি খায়রুল হকের মতানৈক্য সত্ত্বেও, দু’জনই দণ্ড বিধির দুই ভিন্ন ধারায় মৃত্যুদ- দৃঢ়ীকৃত করার ফলে কর্মকরণ সূত্র অনুযায়ী তা চূড়ান্ত দণ্ড বলেই গণ্য করা হয়। উপরোক্ত দু’জন বিচারপতির সিদ্ধান্ত ৫ জন আসামির ক্ষেত্রে অভিন্ন না হওয়ার ফলে ২০০০ এর ১৪ ডিসেম্বর ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৮ ধারা অনুযায়ী এই ৫ জন আসামির ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য ডেথ রেফারেন্সটি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়। প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান ২০০১ এর ১৫ জানুযারি এদের ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তি করার জন্য বিচারপতি ফজলুল করিমকে নিযুক্ত করেন। বিচারপতি করিম ২৫ কর্মদিবসে বিষয়টির ওপর শুনানি নিয়ে ২০০১ এর ৩০ এপ্রিল ঐ ৫ জন আসামির মধ্যে ৩ জন, নামত মেজর আহমদ শরফুল হোসেন, ক্যাপ্টেন কিসমত হাশেম ও ক্যাপ্টেন নাজমুল হোসেন আনসারকে অপরাধ সংঘটন প্রক্রিয়ায় তাদের সক্রিয়তা বা সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রমাণের অনুপস্থিতির কারণে মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই দেন। এই রেহাই দানের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তিনি এই বিষয়ে বিচারপতি মোঃ রুহুল আমীনের সঙ্গে অংশত ঐকমত্য পোষণ করেন। আর বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের মতের সঙ্গে অংশত একমত হয়ে তিনি লেঃ কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ (আর্টিলারি), ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ ও রিসালদার মোসলেম উদ্দিনের মৃত্যুদন্ড দৃঢ়ীকৃত করেন। ফলত জেলা ও দায়রা বিচারক কাজী গোলাম রসুল কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ১৫ জন আসামির মধ্যে হাইকোর্ট ডিভিশন কর্তৃক ৩ জন, নামত মেজর আহমদ শরফুল হোসেন, ক্যাপ্টেন কিসমত হাশেম ও ক্যাপ্টেন নাজমুল হোসেন আনসার ছাড়া বাকি ১২ জন দেশের প্রচলিত আইনে দৃঢ়কৃত ভাবে মৃত্যুদন্ডে দণ্ডিত থাকেন। এদের মধ্যে পলাতক আসামির ক্ষেত্রে প্রদত্ত দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আইনে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সুপ্রীমকোর্টের আপিলাত বিভাগে কোন আপীল করা হয়নি বিধায় তাদের ওপর আরোপিত মৃত্যুদ- ইতোমধ্যে দৃঢ়ীকৃত ও চূড়ান্ত হয়ে আছে। তাদেরকে গ্রেফতার করে দেশে প্রত্যার্পণ করিয়ে মৃত্যুদ- তাৎক্ষণিক কার্যকর করা যায়। ২০০১ সালের অক্টোবর থেকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত জোট সরকার এসব পলাতক আসামিকে গ্রেফতার করে দেশে এনে তাদের ওপর আরোপিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কোন উদ্যোগ নেয়নি। হাইকোর্ট ডিভিশন কর্তৃক চূড়ান্তভাবে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত কারারুদ্ধ আসামিদের মধ্যে ৮ জন সুপ্রীমকোর্টের আপিলাত বিভাগে তাদের ওপর আরোপিত ও দৃঢ়ীকৃত দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপীল করেছিল। বঙ্গবন্ধুর হত্যা মামলা নিষ্পত্তিকরণে আপিলাত বিভাগের ৩ জন বিচারক নামত বিচারপতি আমীরুল কবির চৌধুরী, বিচারপতি এম এম রুহুল আমীন ও প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছের হোসেন এই বিচারিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে বিব্রতবোধ করেছেন বলে জানিয়েছিলেন। আপিলাত ডিভিশনে তখন পদোন্নত বিচারপতি মোঃ রহুল আমীন ও বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিম ইতোমধ্যে এই হত্যাকা- উৎসারিত ডেথ রেফারেন্সের শুনানি হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতির ভূমিকায় সম্পাদন করেছিলেন। এই কারণে আপিলাত বিভাগের এই দু’জন বিচারপতি এদের আপীল নিষ্পত্তি করতে পারেননি। ফলত এই বিষয়ে বিব্রতবোধ না- করা একজন বিচারপতি, নামত প্রধান বিচারপতি তফাজ্জল ইসলাম আপিলাত বিভাগের সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী এই ডেথ রেফারেন্স বিষয়ক আপীল নিষ্পত্তির জন্য যোগ্য বিবেচিত হন। কিন্তু আপিলাত বিভাগে গঠিতব্য পূর্ণ বেঞ্চে এই সব আপীল নিষ্পত্তিকরণে ৩ জন বিচারপতির প্রয়োজন ছিল। হাইকোর্ট বিভাগ থেকে আপিলাত বিভাগে এড হক ভিত্তিতে ২ জন অতিরিক্ত বিচারপতি নিয়োগ করে এসব আপীলের নিষ্পত্তি হতে পারত। সংবিধান (অনুচ্ছেদ ৯৮) অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে এই নিয়োগ দিতে পারেন। তৎকালীন জোট সরকারের আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মওদুদ তখন বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মাত্র ১ জনকে এডহক ভিত্তিতে আপিলাত বিভাগে নিযুক্তি দিতে পারেন। তার মতে ১ জনকে এভাবে এডহক ভিত্তিতে আপিলাত বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ করলে এই মামলার নিষ্পত্তির জন্য পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ গঠন করা যায় না, দুজনের জনের প্রয়োজন হবে। মওদুদ আহমদের মতে এই কারণে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পদোন্নয়নের মাধ্যমে আপিলাত বিভাগে আরও দু’জন বিচারপতি নিযুক্ত না হলে এইসব আপীলের নিষ্পত্তি করা যেত না। মওদুদের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগ থেকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বিব্রত না-হওয়া দু’জন বিচারপতির পদোন্নয়ন ঘটার আগে সম্ভবত প্রধান বিচারপতি তফাজ্জল ইসলাম অবসরে চলে যেতেন। ফলত বঙ্গবন্ধু হত্যার মৃত্যুদ- প্রাপ্ত খুনীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য সুপ্রীমকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এড়িয়ে যেতে পারত। আইনের মোড়কে মওদুদের এরূপ কৌশলীয় অবস্থান তার সরকারের ২০০৮ সালে পরাজয়ের পর গ্রহণ করা যায়নি। তখন আইনবিদদের সযতœ বিবেচনায় সংবিধান অনুযায়ী একাধিক বিচারপতি এডহক ভিত্তিতে আপিলাত বিভাগে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রধান বিচারপতির সুপারিশ বিবেচনায় এনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে নিযুক্ত হতে পারেন বলে স্থিরীকৃত হয়। এভাবে দু’জন বিচারপতি নিযুক্ত হওয়ার পর এই বিচারিক প্রক্রিয়ায় ইতোমধ্যে বিব্রত না-হওয়া আর একজন বিচারপতিসহ এই মামলার জন্য পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ গঠন করা হয়। প্রধান বিচারপতি তফাজ্জল ইসলামের নেতৃত্বে পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের রায় অনুযায়ী ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি ৫ আত্মস্বীকৃত খুনী নামত কর্নেল ফারুক রহমান, কর্নেল শাহরিয়ার রশীদ খান, লেঃ কর্নেল মহিউদ্দিন আহমদ, মেজর একে বজলুল হুদা ও মেজর একেএম মহিউদ্দিন আহমদের মৃত্যু দণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয়। উল্লেখ্য, এদের মধ্যে মেজর এ কে এম মহিউদ্দিনকে যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক আশ্রয় না দিয়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়েছিল। এরপর মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আরেক পলাতক আসামি ক্যাপ্টেন মাজেদ এই বছরের এপ্রিল মাসে দেশের অভ্যন্তরে ধরা পড়লে ১২ এপ্রিল তার মৃত্যু দণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয়। মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত বাকি ৬জনের মধ্যে একজন, নামত আজিজ পাশা ২০০০১ সালে জিম্বাবুইতে অবজ্ঞা ও অবহেলার আবহে মারা যায়। আর বাকি ৫ জন, নামত লেঃ কর্নেল খন্দকার আব্দুর রশিদ, মেজর শরীফুল হক ডালিম, কর্নেল এ এম রাশেদ চৌধুরী, মেজর এএইচএমবি নূর চৌধুরী ও রিসালদার মোসলেম উদ্দীন খান এখনও পর্যন্ত ধরা পড়েনি। এদের মধ্যে রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে এবং নূর চৌধুরী কানাডায় অবস্থান করছে বলে জানা গেছে। পলাতক দ-প্রাপ্তদের আইন অনুযায়ী সহায় সম্পত্তি বাজেয়াফত করার পদক্ষেপ এখনও নেয়া হয়নি। রাশেদ চৌধুরীর যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবরণে অবস্থান সে দেশের সরকার পর্যায়ে এখনও সিদ্ধান্তবিহীন অবস্থায় আছে। এই বিষয়ে যথা আইনী সিদ্ধান্ত দেয়ার জন্য সে দেশের এ্যাটর্নি জেনারেল উইলিয়াম বার সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে খুনীকে সে দেশে আশ্রয় না দেয়ার সিদ্ধান্ত দিয়ে একেএম মহিউদ্দিনের মতো বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবেন বলে আশা করা যায়। কানাডায় অবস্থানরত মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রাপ্ত আসামি নূর চৌধুরীকে মৃত্যুদ-াদেশ দেয়া দেশে, এক্ষেত্রে বাংলাদেশে পাঠানোর ওপর আইনী পর্যালোচনা চলছে। আশা করা যায় যে, এই ক্ষেত্রে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর নূর চৌধুরীকে বাংলাদেশে ফেরত এনে তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা যাবে। বাকি ২ নরাধম ঘাতকের মধ্যে শরিফুল হক ডালিম ও রিসালদার মোসলেম উদ্দীন পাকিস্তানে এবং আবদুর রশীদ লিবিয়াতে অবস্থান করছে বলে শোনা যায়। এদেরকে গ্রেফতার করার জন্য ইন্টারপোলকে দিয়ে লাল নোটিস জারি করা আছে। এই বিষয়ে নিশ্চিন্ত হওয়ার জন্য এই ২ দেশে আমাদের দূতাবাসকে সুস্পষ্ট ও দৃঢ় নির্দেশ দেয়া সকলের কাম্য। এই দুই দেশে তাদের অবস্থান দৃঢ়ীকৃত হলে, ঐ দুই দেশকে এ তিন নরাধম অপরাধীকে ফেরত দেয়ার জন্য কূটনৈতিক চরমপত্র দেয়া সঙ্গত হবে। জাতি বিশ্বাস করে যে, যে দেশ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের গোপনে আশ্রয় দিয়ে লালন করছে, তারা বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না এবং তাদের সঙ্গে এই কারণে সম্পর্ক ছেদ করতে দ্বিধাগ্রস্ত না হওয়া অমূলক হবে না। (সমাপ্ত) লেখক : সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য
×