মঙ্গলবার ১২ মাঘ ১৪২৮, ২৫ জানুয়ারী ২০২২ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা
সর্বশেষ

করোনার মতো আরেকটি কিলার ভাইরাস

করোনার মতো আরেকটি কিলার ভাইরাস
  • আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকা-ে সারা আমেরিকা জ্বলছে। বলতে গেলে জ্বলছে সারাবিশ্ব। ব্রিটেনেও হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে শামিল হয়েছে। আমেরিকা ব্রিটেনসহ সারা দুনিয়ায় এই বিক্ষোভে সাদা-কালো সব মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে নেমেছে। যে শ্বেতাঙ্গ পুলিশ জর্জ ফ্লয়েডকে হত্যা করেছে তার স্ত্রী পর্যন্ত এই হত্যাকা-ের প্রতিবাদে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়েছেন। এক কথায় বর্ণবাদের বিরুদ্ধে এটা বিশ্ব মানবতার এক বৈপ্লবিক জাগরণ। বর্ণ, গোত্র যাই হোক মানুষ মানুষের বন্ধু এই সত্যটা আজ শক্তভাবে আমেরিকার মাটিতেও প্রমাণিত হয়েছে। ট্রাম্পের বর্ণবিদ্বেষের রাজনীতি এখানেই একটা বড় ধাক্কা খেল। ট্রাম্প এখন যতই বলুন, তিনি কোন কিছুই কেয়ার করেন না। জর্জ ফ্লয়েডের রক্ত আমেরিকার মাটিতে বর্ণবাদ ও ফ্যাসিবাদের জঞ্জাল ধুয়ে মুছে সাফ করে দিতে চলেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নৈতিক পরাজয়টি এখানেই ঘটে গেছে।

বাংলাদেশের সচেতন মানুষও এই বর্বর হত্যাকা-ের বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদে শামিল হয়েছে। ঢাকা থেকে আমার অনুজ প্রতিম বন্ধু, বিখ্যাত নাট্যজন নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু আমাকে টেলিফোনে জানালেন, ঢাকার কিছু বিদগ্ধজন ফ্লয়েডের হত্যাকা-ের প্রতিবাদে একটি যুক্ত বিবৃতি দিচ্ছেন। আমি তাতে যোগ দিতে আগ্রহী কিনা? তাকে জানালাম, আমি শুধু আগ্রহীই নই, উদগ্রীবও।

এই যুক্ত বিবৃতিতে স্বাক্ষর দেয়া প্রসঙ্গে মনে পড়ল একটি শোকাবহ স্মৃতি। ঢাকায় সুপ্রীমকোর্ট ভবনের প্রাঙ্গণ থেকে যখন গ্রীক স্টাইলে নির্মিত ভাস্কর্যটি সরকারের আদেশে অপসারিত হয়, তখন রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে বিশ্বাসী বহু প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ মনে আঘাত পেয়েছিলেন। সেবারেও তারা সরকারী সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়ে একটি যুক্ত বিবৃতিদানের সিদ্ধান্ত নেন। এই সময় হঠাৎ একদিন সদ্য প্রয়াত ড. আনিসুজ্জামান আমাকে টেলিফোন করে জানতে চাইলেন, আমি ভাস্কর্য সংক্রান্ত যুক্ত বিবৃতিতে সই দিতে রাজি কিনা? এই বিবৃতিদানের উদ্যোক্তারা আমাকে সই দিতে এপ্রোচ করেছেন কিনা? বলেছি, এপ্রোচ করেছেন এবং আমি স্বেচ্ছায় সাগ্রহে সইটি দিয়েছি।

সেবারেও যুক্ত বিবৃতিতে সই দিতে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন নাসিরুদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুই। বাচ্চু আমাকে জানালেন, ড. আনিসুজ্জামানও বিবৃতিতে সই দিতে রাজি হয়েছেন, তবে যুক্ত বিবৃতিতে তার নাম যেন প্রথমে না যায়। আমি প্রতিবাদ করে বলেছি, ড. আনিসুজ্জামান এখন জাতির অভিভাবক। যুক্ত বিবৃতিতে তার নাম প্রথমে যাওয়া উচিত। বাচ্চু বললেন, কিন্তু আনিস স্যারের ইচ্ছা আপনার নাম প্রথমে যাবে। আমরা তাই দিয়েছি।

আমি প্রথমে ভেবেছি সরকারের ভয়ে সম্ভবতঃ ড. আনিসুজ্জামান যুক্ত বিবৃতিতে প্রথমেই তার নাম দিতে রাজি হননি। এ কথা ভেবে একটু বিস্মিত হয়েছি। তার সঙ্গে আমার কোন কোন বিষয়ে মতভেদ ছিল। কিন্তু এ কথা জানতাম, তিনি ভীরু নন। আইয়ুব এবং জিয়াউর রহমানের আমলেও তিনি সাহসের সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেছেন। তাহলে এখন তো তার ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

পরে আমার এই ভুলটা ভেঙ্গেছে। ভাস্কর্য সম্পর্কে যুক্ত বিবৃতিতে সই দিতে তিনি সাহস হারাননি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছিলেন তার প্রিয় ছাত্রী। এই ছাত্রী এখন বিব্রত হতে পারেন এটা ভেবে তিনি যুক্ত বিবৃতিতে সই দিতে দ্বিধাবোধ করছিলেন। এমনকি সই যখন দিয়েছেন, তখন বিবৃতিদাতাদের দ্বিতীয় কাতারে নিজের নাম যুক্ত করেছেন।

আজ যখন আমেরিকায় বর্বর বর্ণ নির্যাতনের প্রতিবাদে সারাবিশ্বের মানুষ গর্জে উঠেছে, তখন বাংলাদেশের মানুষও তার প্রতিবাদ জানাচ্ছে। সুধী সমাজ এই প্রতিবাদে শামিল হয়ে যুক্ত বিবৃতি দিচ্ছেন। আনিসুজ্জামান বেঁচে থাকলে এই বিবৃতিতে স্বাক্ষরদাতাদের মধ্যে তার নামটি যে প্রথম হতো তাতে আমার সন্দেহ নেই। ভাবতে বড় কষ্ট হচ্ছে, বন্ধু আনিসুজ্জামানের মরদেহ এই সময়ে কবরে শায়িত।

মার্কিন মুল্লুকের বর্ণবাদী ঘটনার কথায় ফিরে আসি। বারাক ওবামার মতো একজন কালো লোক আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হতে পারায় মনে হয়েছিল বর্ণ বৈষম্যের জন্য কুখ্যাত দেশটিতে সম্ভবত শ্বেতাঙ্গ মেজরিটির চৈতন্যোদয় হয়েছে। বিশ্বের মানুষের এই আশাবাদ বেশিদিন টেকেনি। বুশ প্রেসিডেন্সির আমলেই শুরু হয় বিশ্বে আমেরিকান সুপ্রিমেসি প্রতিষ্ঠার প্রকাশ্য ধুয়ো। সেই ধুয়োকে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকা ফার্স্ট এবং হোয়াইট সুপ্রিমেসির ফ্যাসিবাদী মন্ত্র আউড়ে প্রেসিডেন্ট হন। ট্রাম্প এ্যাডমিনিস্ট্রেশনের আনুকুল্যেই আমেরিকায় শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদ পুনরুজ্জীবিত হয়। মুসলিম বিদ্বেষ, অশ্বেতাঙ্গ ও বহিরাগত বিদ্বেষ সারা মার্কিন মুল্লুকে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বময় করোনা মহামারীর মধ্যে ট্রাম্প তার বর্ণবাদী ও ফ্যাসিবাদী ভূমিকা থেকে সরে আসতে রাজি হননি। করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধের চাইতে তিনি তার দেশে চীন বিরোধী জনমত গঠন এবং চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধায়োজনেই বেশি ব্যস্ত।

বর্ণবাদ তথা বর্ণবিদ্বেষের বারুদ আমেরিকায় জমা হয়েই ছিল। একজন অশ্বেতাঙ্গকে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের বর্বরোচিত হত্যা তাতে দেশলাইয়ের জ্বলন্ত কাঠির কাজ করেছে মাত্র। তবে এবার সবচাইতে বড় ভরসার খবর বর্ণবাদের বারুদে আগুন লেগেছে বটে, কিন্তু তা নেভাতে সাদা-কালো নির্বিশেষে সব বর্ণ, গোত্রের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে নেমেছে। ওয়াশিংটনে তাদের বিক্ষোভে ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের বাঙ্কারে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। বিশ্বের সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষের প্রতিবাদ মিছিলে আওয়াজ তোলা হয়েছে ‘রেসিজম ইজ এ কিলার ভাইরাস লাইক করোনা।’ একে রুখতে সকলকে লড়াইয়ে নামতে হবে।

এই লড়াইয়ে এখন সারা বিশ্ব শামিল। মানুষের এই জাগ্রত চেতনাই এখনকার সবচাইতে বড় ভরসা। কোন আত্মদানই বৃথা যায় না। জর্জ ফ্লয়েডেরও যাবে না। একদল শ্রমিকের রক্তদানে যেমন ‘মে দিবসের’ আবির্ভাব এবং সারা দুনিয়ার শ্রমিক শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, তেমনি বর্তমান আমেরিকায় এক কালো মানুষের আত্মদান দেশটির সামাজিক ও রাজনৈতিক মানচিত্রে স্থায়ী পরিবর্তন ঘটাবে। এই পরিবর্তনের জোয়ার ট্রাম্প এবং তার নিওকন এ্যাডমিনিস্ট্রেশন রুখতে পারবে না।

আমেরিকার উত্তাল গণবিক্ষোভকে অনেকে ‘দ্বিতীয় আমেরিকান বিপ্লব’ আখ্যা দিয়েছেন। প্রথম আমেরিকান বিপ্লবে কালো দাস সম্প্রদায়ের মুক্তি এবং তাদের নাগরিক ভোটাধিকার অর্জনের পথ খুলে গিয়েছিল। বর্তমান দ্বিতীয় আমেরিকান বিপ্লবে বর্ণবাদ এবং ফ্যাসিবাদ দুই-ই পরাভূত হবে বলে আশা করা যায়।

গত শতকের ফ্যাসিবাদের চাইতে বর্তমান শতকের ফ্যাসিবাদের চেহারা একটু ভিন্ন। এই ফ্যাসিবাদ দেশে দেশে ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণবিদ্বেষ, জাতি বিদ্বেষ, উগ্র জাতীয়তা ইতিহাসের চাইতে মীথে বিশ্বাস-ইত্যাদি নানা ছদ্মাবরণে আত্মপ্রকাশ করে। তাই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ একেক দেশে একেক রকম। আমেরিকায় যা বর্ণবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, বাংলাদেশে তা ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এই সকল যুদ্ধেরই লক্ষ্য একÑ বর্বর ফ্যাসিবাদের উচ্ছেদ।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে হিটলার, মুসোলিনী, তোজা পরাজিত হয়েছেন। ফ্যাসিবাদ পরাজিত হয়নি, সে নতুন চেহারায় আমেরিকায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। এই ফ্যাসিবাদ আরও ভয়ঙ্কর। হিটলার প্যারিস দখল করার সময় জার্মান সৈন্যদের কঠোর নির্দেশ দিয়েছিলেন তারা যেন প্যারিসের ঐতিহ্যম-িত জাদুঘর, চিত্রশালা, প্যানথিওÑ যাতে ভিক্টর হুগো ও রুশোর সমাধি আছে, তা ধ্বংস না করে। আমেরিকার জর্জ বুশ বাগদাদ দখল করার সময় তার যৌথ সেনাবাহিনীকে অবাধে বাদদাদ লুণ্ঠনের অধিকার দিয়েছেন। বাগদাদের দু’হাজার বছরের প্রাচীন সম্পদ ও ঐতিহ্য মার্কিন সৈন্যরা লুট করেছে, চুরি করেছে, ধ্বংস করেছে।

হিটলার ৬ লাখ ইহুদীকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বন্দী করে রেখে হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়। আমেরিকা এবং তার পশ্চিমা মিত্ররা সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে দেশটির বিরুদ্ধে ১২ বছর যাবত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ রেখে অনাহারে ও অপুষ্টিতে ১৭ লাখ ইরাকি নারী ও শিশু হত্যা করেছে। করোনাও এখন পর্যন্ত সারা বিশ্বে এত মানুষ মারেনি।

তাই বিশ্বের মানুষ আজ ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে করোনা ও বর্ণবাদের সমান বিপজ্জনক ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য। এই যুদ্ধে মানবতার জয়ে আস্থা রাখি।

[লন্ডন, ৯ জুন, মঙ্গলবার, ২০২০]

শীর্ষ সংবাদ:
আগুন যেন অপ্রতিরোধ্য ॥ একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে         শাবি ভিসির পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত         উলন বিদ্যুত উপকেন্দ্র পুড়ে ছাই         ইসি গঠনের বিলে দুই পরিবর্তনের সুপারিশ         খাদ্য মজুদ ২০ লাখ টন ছাড়িয়েছে         কিউকমের ২০ গ্রাহক ফেরত পেলেন আটকে থাকা টাকা         মধ্য ফেব্রুয়ারির আগে করোনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে         অর্ধেক জনবলে অফিস চলা শুরু         করোনায় আরও ১৫ জনের মৃত্যু         শিক্ষা আইন চূড়ান্ত শীঘ্রই সংসদে উঠবে ॥ শিক্ষামন্ত্রী         স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না গণপরিবহনে         কুমার নদে বিলীন মন্দিরসহ ১১ স্থাপনা         মধ্যপ্রাচ্যগামী এয়ার টিকেটের মূল্য তিনগুণ বেড়েছে         এবারের পুলিশ সপ্তাহে পুরনো দাবিগুলোই উত্থাপনের উদ্যোগ         দক্ষতা মূল্যায়নের মূল ভিত্তি হবে পারফরমেন্স         শিক্ষকদের বরখাস্তের ১৮০ দিনের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তির নির্দেশ         ঢাকায় ওমিক্রনের নতুন ৩ সাব-ভ্যারিয়েন্ট         করোনায় মৃত্যু ১৫, শনাক্ত ১৪৮২৮         আন্দোলনকারীদের অর্থ সংগ্রহের ৬ ‘অ্যাকাউন্ট বন্ধ’         ভূমি নিয়ে আসছে নতুন আইন