ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ০৪ অক্টোবর ২০২২, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯

ওপেনিংয়ের ব্যর্থতা কাটানোর সংগ্রাম

টানা ব্যর্থ তামিমের ফর্মে ফেরার অপেক্ষায় দল

প্রকাশিত: ০৯:৩৫, ২৮ জুলাই ২০১৯

 টানা ব্যর্থ তামিমের ফর্মে ফেরার অপেক্ষায় দল

মোঃ মামুন রশীদ ॥ বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানদের মধ্যে কার উইকেটটি সবচেয়ে সুরক্ষিত? টানা ৫ ম্যাচে অপরিহার্য ওপেনার বাঁহাতি তামিম ইকবাল বোল্ড আউট হয়ে সাজঘরে ফেরার পর এমন প্রশ্ন জাগতেই পারে। তিন ফরমেটেই বাংলাদেশের পক্ষে সর্বাধিক রান করার কারণে নিঃসঙ্কোচে বলা যায় তামিমই দেশসেরা ব্যাটসম্যান। কিন্তু তিনি নিজের উইকেট সুরক্ষিত রাখতে ব্যর্থ হচ্ছেন বারবার। দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পঞ্চ পা-ব- তামিম, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহীম, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ও মাশরাফি বিন মর্তুজার ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ দল। এর মধ্যে মাশরাফি ছাড়া ব্যাটিংয়ের অন্যতম ভরসা বাকি চারজনই। পর্যালোচনা করলে দেখা যায় নিজের উইকেটটাকে সবচেয়ে সুরক্ষিত রাখতে পেরেছেন মুশফিকই। তিনি এ কয়জনের মধ্যে সবচেয়ে কম ২৩ বার এবং তামিম, সাকিব ৩০ বার করে ও রিয়াদ ২৯ বার বোল্ড হয়েছেন। টানা ৫ ম্যাচে বোল্ড হওয়াতে দেশসেরা ব্যাটসম্যান তামিম কি নিজেকে ফিরে পাবেন না? তার এমন ব্যর্থতায় ওপেনিং জুটিতে বড় কোন রানের দেখা পাচ্ছে না দল। ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠার চ্যালেঞ্জটা এখন আরও চেপে বসেছে অধিনায়ক তামিমের ওপর। তিনি ফর্মে ফিরলে হয়তো উদ্বোধনী জুটির দীর্ঘ রানখরাটাও কাটবে। আজ দ্বিতীয় ওয়ানডেতে সেটাই হয়তো বড় লক্ষ্য হবে বাংলাদেশ দলের জন্য। মিডলঅর্ডারের ব্যাটিং স্তম্ভ এবং যাকে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ব্যাটিংয়ে ‘দেয়াল’ হিসেবে ধরা হয় তিনি মুশফিক। আর স্টাম্পকে সুরক্ষিত রাখতে গিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ চার ব্যাটসম্যানের মধ্যে সর্বাধিক ১৬ বার এলবিডব্লিউ হয়েছেন মুশফিক। সাকিব. তামিম ১৪ বার করে ও রিয়াদ ১৩ বার এলবিডব্লিউ হয়েছেন। তবে বোল্ড হওয়ার দিক থেকে তামিম যেন সবাইকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। নয়তো টানা ৫ ওয়ানডেতে বোল্ড হওয়ার ঘটনাটি ঘটতো না। নিজের স্টাম্পকে আগলে রাখতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন ২০১৮ সালে ফর্মের তুঙ্গে থাকা তামিম। গত বছর ১২ ওয়ানডে খেলে ২ সেঞ্চুরি আর ৬ হাফ সেঞ্চুরিতে ৬৮৪ রান করেন ৮৫.৫ গড়ে। ৪টি ম্যাচেই ছিলেন অপরাজিত, ওপেনার হিসেবে যা খুব সহজ ব্যাপার নয়। যে ৮ ম্যাচে আউট হয়েছিলেন কোনবারই বোল্ড হননি। চলতি বছর তামিম ১৬ ওয়ানডেতে ৪২১ রান করেছেন মাত্র ২৬.৩১ গড়ে। হাফ সেঞ্চুরি মাত্র ৩টি। অপরাজিত থাকা দূরের কথা এর মধ্যে ৭ বারই বোল্ড হয়েছেন এবং নিজের স্টাম্প আগলে রাখার ক্ষেত্রে তার কৌশলগত দিক যে ব্যর্থ তা এতেই প্রমাণ হয়েছে। এর আগে ক্যারিয়ারে এক বছরে সর্বাধিক ৪ বার বোল্ড হয়েছিলেন ২০১১ সালে। তবে একই ধরনের ডিসমিসালে সবচেয়ে বেশিবার আউট হয়েছিলেন ২০১৬ সালে। সে বছর ১০ ম্যাচ খেলে সবগুলোতেই ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফিরেছিলেন। চলতি বছর তাই নিজের সুনামের প্রতি একেবারেই অবিচার করে চলেছেন তামিম। বাংলাদেশের পক্ষে ওয়ানডেতে সর্বাধিক ৩০ বার করে এখন বোল্ড হওয়ার তালিকায় আছেন তামিম, সাকিব ও মাশরাফি। রিয়াদ ২৯, মুশফিক ২৩ বার বোল্ড হয়েছেন। এর মধ্যে তামিম ২০২ ম্যাচে ২০০ ইনিংস, সাকিব ২০৬ ম্যাচে ১৯৪ ইনিংস, মুশফিক ২১৪ ম্যাচে ২০০ ইনিংস, রিয়াদ ১৮৩ ম্যাচে ১৫৮ ইনিংস ও মাশরাফি ২১৭ ম্যাচে ১৫৬ ইনিংস ব্যাট করেছেন। তামিমের এমন বিভীষিকাময় ব্যাটিংয়ে এ বছর ১৬ ইনিংসে মাত্র ৩টি অর্ধশতক এসেছে। দেশের পক্ষে সর্বাধিক ১২৭ বার তিনি ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফিরেছেন। আবার বোল্ড হওয়ার দিক থেকেও সর্বাধিক রেকর্ডের দিকে ছুটে চলেছেন। সর্বাধিক ৪২ ম্যাচে অপরাজিত ছিলেন রিয়াদ। মুশফিক ৩২, মাশরাফি ২৭ ও সাকিব ২৬ বার নটআউট ছিলেন। সেখানে তামিম মাত্র ৪ বার অপরাজিত থাকতে পেরেছেন। অবশ্য এর মধ্যে সবসময়ই তামিম ওপেনিংয়েই নেমেছেন বলে নটআউট থাকা কঠিন তারজন্য। বাকিরা ৪, ৫, ৬ ও ৭ নম্বর পজিশনে ব্যাট করে থাকেন। তামিম হয়তো নিজের স্টাম্পকে আগলে রাখতে পারলেই আবার সফল হবেন। এ বিশ্বকাপে তার টানা ব্যর্থতার পর ব্যাটিং টেকনিকে সমস্যা হচ্ছে এমন কথা উঠেছিল। সেই সমস্যাটা হয়তো এখনও কেটে উঠতে পারেননি তিনি। লঙ্কানদের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে তার প্রথম ওভারেই ৫ বল খেলে বোল্ড হয়ে যাওয়াটা সেদিকেই ইঙ্গিত করছে। চলতি বছরে তামিমের ব্যর্থতার জন্যই বড় কোন ওপেনিং জুটি গড়ে ওঠেনি। বিশ্বকাপে সে কারণেই সমস্যায় ভুগেছে দল। এর মধ্যে ১১ ম্যাচে তিনি সৌম্য সরকারের সঙ্গে ইনিংসের গোড়া পত্তন করেছিলেন। গত ৭ মে ডাবলিনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১টি মাত্র সেঞ্চুরি পার্টনারশিপ হয়। সেদিন ১৪৪ রানের উদ্বোধনী জুটি গড়েছিলেন তামিম-সৌম্য। ৮০ রানের ইনিংস উপহার দেন তামিম। ত্রিদেশীয় ওই সিরিজে ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে পরের ম্যাচে এ জুটি ৫৪ ও ফাইনালে ৫৯ রানের জুটি গড়েছিল। সবগুলো ম্যাচেই জয় পায় বাংলাদেশ দল। বিশ্বকাপে দুটি অর্ধশতক পার্টনারশিপ হয়েছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচে। তামিম-সৌম্য সেদিন ওভালে গড়েছিলেন ৬০ রানের উদ্বোধনী জুটি। সে ম্যাচেও জয় পায় বাংলাদেশ দল। আবার টন্টনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দু’জন ৫২ রানের জুটি গড়েছিলেন যাতে ভর দিয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বাধিক রান তাড়া করে জিতে যায় বাংলাদেশ। এছাড়া আর কোন বড় জুটি হয়নি। তবে ১১ ম্যাচে ৪৬.৪৫ গড়ে দু’জন ৫১১ রান তুলেছেন। এ সময়ে ৫ ওয়ানডেতে লিটন দাসের সঙ্গে ওপেনিং করেছিলেন তামিম। ৩০.০০ গড়ে মাত্র ১৫০ রান হয়েছে। এর মধ্যে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ডাবলিনে ১১৭ রানের জুটিই দু’জনের মধ্যে সেরা ছিল এবং সেই ম্যাচে বাংলাদেশ দল জয় পায়। বাকি চার ম্যাচ থেকে এ জুটি দলকে মাত্র ৩৩ রান উপহার দিতে পেরেছে। এখানেই ব্যর্থতা পরিষ্কার হয়ে যায়। ওপেনিং জুটির ব্যর্থতায় যে বাংলাদেশ দলকে বিফল করছে তা এই পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে ১ রানেই থেমে গেছে উদ্বোধনী জুটি। আজ দ্বিতীয় ওয়ানডেতে তামিমের যেমন রানে ফেরাটা দলের জন্য জরুরী, তেমনি ওপেনিং জুটিতে বড় একটি সংগ্রহ পাওয়া অত্যাবশ্যক জয়ের ধারায় ফেরার জন্য। টানা ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো এবার অধিনায়ক হিসেবে লঙ্কানদের মুখোমুখি হওয়া তামিমের জন্য বেশ কঠিনই হবে। তবে বাংলাদেশ দল তার দিকে এখনও আস্থা ও নির্ভরতা নিয়ে তাকিয়ে আছে।