ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ০৪ অক্টোবর ২০২২, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯

গডফাদারসহ দুই শ’ মাদক কারবারির আত্মসমর্পণ প্রস্তুতি

প্রকাশিত: ০৫:৪২, ২৫ জানুয়ারি ২০১৯

গডফাদারসহ দুই শ’ মাদক কারবারির আত্মসমর্পণ প্রস্তুতি

শংকর কুমার দে ॥ মাদক নির্মূলে মহাপরিকল্পনা নিচ্ছে সরকার। মিশনের অংশ হিসেবে ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রথম দফায় কক্সবাজারে প্রায় ২শ’ ইয়াবা ব্যবসায়ীসহ গডফাদাররা আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছে, তাদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে হবে আনুষ্ঠানিক তালিকা অনুযায়ী গডফাদারসহ ২শ’ ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পণ। আত্মসমর্পণকারীদের তালিকায় অন্তত ৩০ জন বিভিন্ন স্তরের জনপ্রতিনিধিসহ সাবেক সাংসদ আবদুর রহমান বদি পরিবারের ৭ সদস্য রয়েছে। কক্সবাজার জেলা পুলিশ লাইনে আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান হবে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় শুধু কক্সবাজারে ১ হাজার ১৫১ মাদক ইয়াবা ব্যবসায়ী। এর মধ্যে প্রথম দফায় প্রায় ২শ’ ইয়াবা মাদক ব্যবসায়ীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান করার আলোচনা হয়েছে। ইয়াবাসহ মাদকবিরোধী অভিযানের জন্য গঠন করা হচ্ছে মাদকবিরোধী টাক্সফোর্স। ইয়াবার মতো মাদক চোরাচালান বন্ধে উখিয়া-টেকনাফ ও খাগড়াছড়ির পার্বত্যাঞ্চলে সীমান্ত সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি)। গত বছরের মে মাসে সারাদেশে মাদকবিরোধী অভিযান শুরুর পর শুধু কক্সবাজারের টেকনাফে ৪০ ইয়াবা মাদক ব্যবসায়ী পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র এ খবর জানা গেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, একাদশ নির্বাচনের আগেই জিরো টলারেন্স নিয়ে দেশের মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করেছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার। একাদশ নির্বাচনে সরকার বিজয়ী হওয়ার পর মাদক নির্মূলে মাদকবিরোধী অভিযানের ধারাবাহিকতায় মহাপরিকল্পনা মিশন নিয়ে সরকার পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে কয়েকজন গডফাদারসহ প্রায় ২শ’ মাদক ব্যবসায়ী আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছে। আত্মসমর্পণ যারা করবে তাদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। কক্সবাজার পুলিশ লাইনে মাদক তথা ইয়াবা ব্যবসায়ী, গডফাদারদের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সাবেক সাংসদ আবদুর রহমান বদির স্ত্রী শাহিন চৌধুরী এমপি। এ ছাড়াও উপস্থিত থাকতে পারেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, র‌্যাবের ডিজি বেনজীর আহমেদ, কক্সবাজার পুলিশ সুপারসহ উর্ধতন কর্মকর্তাগণ। মিয়ানমার থেকে যাতে দেশে ইয়াবা ও মাদক আসতে না পারে সেজন্য মাদক নির্মূলের অংশ হিসেবেই উখিয়া-টেকনাফ ও খাগড়াছড়ির পার্বত্যাঞ্চলে সীমান্ত সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি। বিজিবির প্রস্তাবটি পাঠানো হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলমান মাদকবিরোধী অভিযানকে আরও জোরদার করার জন্য এবং মাদক নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত মাদকবিরোধী অভিযান যাতে অব্যাহত থাকে সেজন্য ইয়াবার আগ্রাসন রোধে শীঘ্রই উচ্চ ক্ষমতা টাস্কফোর্স গঠন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। খুব শীঘ্রই মাদকবিরোধী টাস্কফোর্স গঠন করা হবে বলে জানা গেছে। জঙ্গী ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের ফলে সারাদেশের চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি, অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী গ্রেফতার ও জঙ্গী দমনে অনেকটা সফলতার মুখ দেখেছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি। সেই অর্থে মাদকবিরোধী অভিযানে একাধিকবার জিরো টলারেন্স ঘোষণা করার পর এখনও মাঝে মধ্যেই দেশের কোথাও না কোথাও ইয়াবার বড় বড় চালান ধরা পড়ার ঘটনা ঘটছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরাপত্তার বিষয়টি অগ্রাধিকার দেয়ার কারণে মাদকবিরোধী অভিযানে কিছুটা হলেও ভাটা পড়ে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যস্ততার মধ্যে আবারও মাদক ব্যবসার প্রবণতা লক্ষ্য করছে পুলিশ। যে কোন মূল্যে নিয়ন্ত্রণে আনার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। তার সরকারের যে কয়েকটি লক্ষ্যের কথা ঘোষণা করেছেন তাতে একেবারে ওপরেই রয়েছে জঙ্গী দমন ও মাদক নির্মূলের প্রতিশ্রুতি। তাই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তিনি সরকার গঠনের পরদিন থেকেই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের তাগিদ দিয়েছেন। ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চাপে তালিকাভুক্তদের মধ্যে এ পর্যন্ত প্রায় দেড় শতাধিক ইয়াবা ও মাদক ব্যবসায়ী কক্সবাজার জেলা পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন, যা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, মাছ ধরার ট্রলারে বা নৌকায় করে মিয়ানমার থেকে অনায়াসেই ইয়াবা পাচার হয়ে কক্সবাজারের বিভিন্ন পয়েন্টে এসে থাকে। সম্প্রতি বিজিবি ওই সব এলাকায় সীমান্ত সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। মাদকের অনুপ্রবেশ রোধে সরকার প্রস্তাবটি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। ওই প্রস্তাবে বলা হয়েছে সীমান্ত অরক্ষিত থাকার কারণে মিয়ানমার থেকে বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে সহজেই মাদক বহন করে নিয়ে আসছে কারবারিরা। সীমান্ত সড়ক নির্মাণ করা গেলে মাদক পাচারের রুট অনেকাংশে বন্ধ হয়ে যাবে। তারপরও স্বল্প পরিসরে মাদক ঢুকলে সেগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সামাল দিতে সক্ষম হবে। মাদক নির্মূলে এবার ‘মাল্টি ডাইমেনশনাল প্রজেক্ট’ হাতে নিতে যাচ্ছে সরকার। উদ্যোগের অংশ হিসেবে শীঘ্রই মাদক নির্মূলে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ বাহিনীর প্রতিনিধি সমন্বয়ে গঠন করা ওই টাস্কফোর্স মিয়ানমান গিয়ে তাদের সরকারের সঙ্গে কথা বলবে। টাস্কফোর্স সীমান্ত ঘেষে গড়ে ওঠা মিয়ানমারের ইয়াবা কারখানাগুলো সরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব করবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, গত মে মাস থেকে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে কক্সবাজার জেলায় মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সর্বাধিক বন্ধুকযুদ্ধ হয়েছে যাতে প্রায় ৪০ জন মারা গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযানের মুখে মাদক ব্যবসায়ীরা বাড়িতে থাকতে পারছে না। এ কারণে মাদক ও ইয়াবা ব্যবসায়ীরা আত্মসমর্পণের জন্য আগ্রহ দেখিয়ে প্রস্তাব পাঠাচ্ছে। মাদক বা ইয়াবা ব্যবসা ছেড়ে যদি কোন ব্যক্তি ভাল হয়ে সুন্দরভাবে সমাজে বাঁচতে চায় তাদের সুযোগ দেয়া উচিত। ইতিপূর্বে সুন্দরবনে জলদস্যুদের আত্মসর্মপণের মাধ্যমে সুন্দরভাবে সমাজে বাঁচার সুযোগ করে দিয়েছে সরকার। কক্সবাজারসহ সারাদেশেই মাদক ও ইয়াবা ব্যবসায়ীরা যদি ইয়াবা ও মাদক ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে ভাল হয়ে সমাজে সুন্দরভাবে বাঁচতে আগ্রহ প্রকাশ করে তাদেরও সরকারের পক্ষ থেকে সুযোগ দেয়াটা যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করে সরকার। এ জন্যই কক্সবাজারের ইয়াবা ও মাদক ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পণ করার সুযোগসহ মাদক নির্মূলে মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করাসহ মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে সরকার, যা মাদক ও ইয়াবা নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত জিরো টলারেন্স অব্যাহত থাকবে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্মকর্তার দাবি।