ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯

বিনিয়োগের অন্যতম বাধা হিসেবে একে দেখছেন উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীরা

সিঙ্গেল ডিজিটে নেই ব্যাংক ঋণের সুদহার, ঠেকেছে ১৬ শতাংশে

প্রকাশিত: ০৫:৫৬, ২৪ জানুয়ারি ২০১৯

সিঙ্গেল ডিজিটে নেই ব্যাংক ঋণের সুদহার, ঠেকেছে ১৬ শতাংশে

রহিম শেখ ॥ কথা ছিল কমবে, কিন্তু আবারও বাড়ছে ব্যাংক ঋণের সুদ। শিল্পের মেয়াদী ও চলতি মূলধন ঋণের সুদহার এখন ১১ থেকে ১৬ শতাংশ। যা ৯ শতাংশের ঘরে থাকার কথা ছিল। এজন্য গত বছর একের পর এক সুবিধাও নিয়েছিলেন ব্যাংক মালিকরা। ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের দাবির মুখে সরকারী আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারী ব্যাংকে রাখার সুযোগ দেয় সরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নগদ জমা বা সিআরআর সংরক্ষণের হার কমানো হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে স্বল্প মেয়াদে ধারের ব্যবস্থা ‘রেপো’র সুদ হারও কমানো হয়। এসব সুবিধা পাওয়ার পর গত বছরের জুন থেকে সুদহার কমেও আসছিল। কিন্তু বছরের শেষদিকে হঠাৎ করে বেড়ে যায় ঋণের সুদহার। যদিও নতুন করে সুদহার বাড়ানোর এই প্রবণতাকে বিনিয়োগের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখছেন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা। মূলত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সরকারের চাপে সুদহার সাময়িক সামান্য কমিয়েছিল ব্যাংক। এখন আবার বাড়াতে শুরু করেছে। ব্যাংকারদের মতে, নির্বাচনের পর বেসরকারী খাতে বিনিয়োগ বাড়ার লক্ষণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার আলোকে আগামী মার্চের মধ্যে ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) নতুন সীমায় নামিয়ে আনার বাধ্যবাধকতারই সুদহার বাড়ছে। ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্সের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এ বিষয়ে জনকণ্ঠকে বলেন, ৯ থেকে ১০ শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ বিতরণ সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে ঋণের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে তারল্যের ওপর এখন চাপ আরও বাড়ছে। এছাড়া আগামী মার্চের মধ্যে এডিআর সমন্বয়ের নির্দেশনা রয়েছে। সব মিলিয়ে সুদহার বাড়ছে। বিভিন্ন ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শিল্পের মেয়াদী ঋণে অধিকাংশ ব্যাংক ১১ থেকে ১৬ শতাংশ সুদ নিচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ঋণে সুদ নেয়া হচ্ছে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত। বাড়ি-গাড়ি কেনার ঋণে এখন ১১ থেকে ১৬ শতাংশ সুদ নেয়া হচ্ছে। ব্যবসা তথা ট্রেডিংয়ে সুদ দিতে হচ্ছে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ। আর ক্রেডিট কার্ডে অধিকাংশ ব্যাংকের সুদহার ২৪ থেকে ২৭ শতাংশ। ঋণের সুদহারের উর্ধমুখী এই প্রবণতা ঠেকাতে গত বছরের এক নির্দেশনায় বছরে ১ শতাংশের বেশি সুদ না বাড়ানোর নির্দেশ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একবার বাড়ানোর জন্যও অন্তত তিন মাস আগে গ্রাহককে নোটিস দিতে বলা হয়। অপর এক নির্দেশনায় ক্রেডিট কার্ডে অন্য যে কোন ঋণের সর্বোচ্চ সুদের চেয়ে ৫ শতাংশের বেশি সুদ না নিতে নির্দেশ দেয়া হয়। তবে অধিকাংশ ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশ লঙ্ঘন করে গ্রাহকদের কাছ থেকে উচ্চহারে সুদ নিচ্ছে। আর ব্যাংকগুলোর নিজেদের ঠিক করা ‘সিঙ্গেল ডিজিট’ তো মানাই হচ্ছে না। সংশ্নিষ্টরা জানান, ব্যাংকগুলোর আমানতে সুদহার কমলেও সঞ্চয়পত্রের হার অপরিবর্তিত থাকায় গ্রাহকরা এখন ব্যাংকের তুলনায় সঞ্চয়পত্রে টাকা রাখছে বেশি। এতে বেশিরভাগ ব্যাংক আশানুরূপ আমানত পাচ্ছে না। নির্বাচনের আগে সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ বিতরণে বিভিন্ন পক্ষের চাপ থাকলেও পরে থাকবে না এমন ধারণা বাজারে রয়েছে। এছাড়া ব্যাংকে তারল্যের ওপরও চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, টানা কয়েক মাস ঋণের সুদহার সামান্য হ্রাসের পর আবার বাড়ছে। গত বছর জুনে ব্যাংকগুলোর গড় সুদহার ছিল ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ। জুলাইতে কমে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশে নামে। এভাবে প্রতিমাসে কমতে কমতে অক্টোবরে ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশে নামে। অবশ্য নবেম্বরে আবার বেড়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ হয়েছে। আর জুনে বেসরকারী ব্যাংকগুলোর গড় সুদহার ছিল ১০ দশমিক ৫৬ শতাংশ। জুলাইয়ে তা ১০ দশমিক ৩৯ শতাংশে নামে। অক্টোবরে আরও কমে ১০ দশমিক ২২ শতাংশ হয়। তবে নবেম্বরে বেড়ে ১০ দশমিক ২৫ শতাংশে ওঠে। এদিকে গত জুনে ব্যাংকগুলো গড়ে ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ সুদে আমানত নেয়। ঋণের সঙ্গে আমানতের ধারাবাহিক সুদহার কমে অক্টোবরে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ হয়। নবেম্বরে আবার বেড়ে তা ৫ দশমিক ৩০ শতাংশ হয়েছে। ডিসেম্বরের গড় সুদহারের পরিসংখ্যান এখনও পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সুদহার বাড়ানো হয়েছে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন এ প্রসঙ্গে জনকণ্ঠকে বলেন, কাক্সিক্ষত মাত্রায় বিনিয়োগ বাড়াতে চাইলে ঋণের সুদহার কমানোর কোন বিকল্প নেই। সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ বিতরণের কথা বললেও অধিকাংশ বেসরকারী ব্যাংক এখনও তা কার্যকর করেনি। উল্টো এখন সুদহার বাড়ছে। এ প্রবণতা বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করবে। তিনি বলেন, নতুন অর্থমন্ত্রী দায়িত্বে এসেছেন। আশা করি, সুদহার বৃদ্ধি থামাতে অর্থমন্ত্রী এবং সেই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক সব পক্ষ কাজ করবে। ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, ঘোষণার আলোকে সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার কার্যকর করার অন্যতম শর্ত ছিল সরকারী প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদে ব্যাংকে আমানত রাখবে। সরকারী ব্যাংকগুলোও উদ্বৃত্ত তহবিল বেসরকারী ব্যাংকে রাখার ক্ষেত্রে ৬ শতাংশের বেশি সুদ নেবে না। তবে কেউই তা মানছে না। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে এখন আমানত নিতে ৯ শতাংশের বেশি সুদ দিতে হচ্ছে। আবার ব্যাংকের মুনাফা বাড়ানোর জন্য ব্যাংকারদের ওপর চাপ রয়েছে। প্রবৃদ্ধি কমলে ব্যাংকারদের জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে। এ ধরনের বাস্তবতায় সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার কার্যকর সম্ভব নয়। জানা যায়, ’১৭ সালের মাঝামাঝি থেকে ঋণ চাহিদা ব্যাপক বেড়ে যাওয়ায় তা নিয়ন্ত্রণে গত বছরের ৩০ জানুয়ারি ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) কমিয়ে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তখন অনেক ব্যাংক ডাবল ডিজিট সুদে আমানত নিতে শুরু করে। এ পরিস্থিতিতে সুদহার কমানোর কথা বলে বিভিন্ন সুবিধা নেন ব্যাংক উদ্যোক্তারা। গত বছরের ১ এপ্রিল ব্যাংক মালিকদের সঙ্গে এক বৈঠক থেকে সিআরআর সাড়ে ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৫ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে বাংলাদেশ ব্যাংক। সিআরআর কমানোর ফলে বিনা সুদে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা রাখার বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড় পায় ব্যাংকগুলো। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার নেয়ার ‘রেপো’ সুদহার ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ শতাংশ করা হয়। এ ছাড়া সরকারী আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারী ব্যাংকে রাখার সুযোগ দেয়া হয়। এর পর প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনার আলোকে গত ২০ জুন ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবির বৈঠক থেকে জুলাই থেকে সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ বিতরণের ঘোষণা দেয়া হয়।