ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১ আশ্বিন ১৪২৯

মনিকার জার্সি বদল! জাতীয় ফুটবলার থেকে পুলিশ

প্রকাশিত: ০৫:৫২, ১৯ মার্চ ২০১৮

মনিকার জার্সি বদল! জাতীয় ফুটবলার থেকে পুলিশ

রুমেল খান ॥ ‘মাস দুয়েক হলো পুলিশের চাকরিতে জয়েন করেছি কনস্টেবল পদে। আপাতত কর্মস্থল চট্টগ্রামের হালিশহরের পুলিশ লাইনে। পরিবারের সবাই খুব খুশি। বন্ধুরা তো ইউনিফর্মে দেখলেই ঠাট্টা করে ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ বলে ক্ষেপায়। এলাকার মুরুব্বীরাও সমীহ করে কথা বলে।’ ভয় পায় না? ‘ভয়ের কী আছে? পুলিশ জনতার বন্ধু, ভীতিকর কিছু না।’ কথাগুলো মনিকা চাকমার। রাঙামাটির মেয়ে। আজ থেকে ছয় বছর আগে জাতীয় বয়সভিত্তিক দলের অন্যতম সেরা ফুটবলার। দাপটের সঙ্গে খেলেছিল বছর তিনেক। তারপরই হঠাৎ করেই যেন বেমালুম গায়েব হয়ে গেল মেয়েটি। এক সময় সবাই যেন ভুলেই গেল তার কথা। জনকণ্ঠের অনুসন্ধানে মাস দুয়েক আগে তার সন্ধান পাওয়া যায়। তারপর তাকে নিয়ে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘ফুটবলে ফিরতে মরিয়া মনিকা’ শিরোনামে একটি সুদীর্ঘ ফিচার প্রকাশিত হলে দেশবাসী জানতে পারে তার হাল-হকিকত। মূলত ওই সময় তার অপরিণত বয়সের অপরিণামদর্শী- আবেগী-ভুল সিদ্ধান্ত এবং খেলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলাই তাকে ছিটকে ফেলে ফুটবল থেকে। ১৯ বছরের সুদর্শনা মনিকা ইন্টারভিউ দিয়ে পুলিশে চাকরি পায় কনস্টেবল পদে। মাস দুয়েক ধরে চাকরি করছে সে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে কম্পিউটার বিষয় নিয়ে পড়ছে প্রথমবর্ষে। মনিকা জানতো পুলিশে যোগ দেয়ার পর এখানে মহিলাদের আলাদা ফুটবল দল গঠন করা হবে। সেক্ষেত্রে ফুটবলে আবারও ফেরার আশা ছিল। কিন্তু এখন পর্যাপ্ত ও দক্ষ মহিলা পুলিশ ফুটবলার না থাকায় ফুটবল দল গঠিত হয়নি। এজন্য বেশ হতাশ সে। ‘ফুটবল দল গঠিত না হলেও মহিলা হ্যান্ডবল দল গঠিত হবে। আমাকেও খেলতে বলা হয়েছে। তবে এ নিয়ে দ্বিধায় আছি। কারণ কোনদিনও খেলাটি খেলিনি, তবে দেখেছি। কিন্তু দেখা আর খেলা তো এক জিনিস নয়।’ গত ফেব্রুয়ারিতে জনকণ্ঠের মাধ্যমেই মনিকা জেনেছিল বাফুফে সভাপতির সেই ঘোষণা- এ বছরই মহিলা ফুটবল লীগ আবারও চালু হবে। এ প্রসঙ্গে তার ভাষ্য, ‘এ আশাতেই বুক বেঁধেছি। ঢাকার কোন ক্লাব যদি আমাকে খেলতে ডাকে তাহলে অবশ্যই সাড়া দেব। তবে এক্ষেত্রে আমাকে আমার কর্মস্থল থেকে অনুমতি ও ছুটি নিতে হবে। আশাকরি সেটা পাব। আমি কখনও কোন ক্লাবের হয়ে খেলিনি এর আগে। শুধু জাতীয় দলে খেলেছি। তবে আনসারের হয়ে খেলেছিলাম একবার। তবে আনসার তো আর কোন ক্লাব নয়, সার্ভিসেস সংস্থা।’ পুলিশ ঘুষ খায়Ñ এ নিয়ে প্রায়ই অভিযোগ ওঠে। মনিকার জবাব, ‘ঘুষ সবাই খায়, দোষ কেবল পুলিশের হবে কেন? সব পুলিশ ঘুষ খায় না। ভাল পুলিশও আছে। আমি ভাল পুলিশই হতে চাই। পুলিশের সুনাম-ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে চাই।’ প্রতিদিন প্রায় আট ঘণ্টা ডিউটি করতে হয় মনিকাকে। তবে বাসা থেকে যাতায়াতে আরও ঘণ্টা দুয়েক লেগে যায়। কাজের ধরন সিকিউরিটিভিত্তিক। তল্লাশি বা অস্ত্র-বিস্ফোরকের সন্ধান। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার কি হলো? ‘পুলিশের চাকরির চাপে ঠিকমতো ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পারছি না। মনে হয় শীঘ্রই বন্ধ করে দিতে হবে। তাই বলে পড়াশুনা ছাড়ব না। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব।’ পুলিশের চাকরি কেমন লাগছে? ‘ভালই। শরীর ফিট রাখতে আমাদের প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা পিটি-প্যারেড করতে হয়। ভারি অস্ত্র নিয়ে দৌড়াতে হয়। সালামি অনুশীলন করতে হয়। এভাবে সপ্তাহে ছয় দিন দুই বেলা করে। জরুরী প্রয়োজনে শুক্রবারে ছুটির দিনেও এসব করতে হয়।’ ডিউটি প্রসঙ্গে আরও যোগ করে মনিকা, ‘আমাদের পুলিশ ইউনিফর্মের মতো সিভিল ড্রেসেও ডিউটি করতে হয়। কুমিল্লা ও কক্সবাজারে গিয়েও ডিউটি করতে হয়েছে। ক’দিন আগেই রামুতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ক্যাম্পে গিয়ে দায়িত্ব পালন করে এসেছি। আমার কাজ ছিল শৃঙ্খলা বজায় রাখা। ওখানে রোহিঙ্গা শিশুদের দুঃখ-দুর্দশা দেখে ভীষণ কষ্ট পেয়েছি।’ এখনও পিস্তলে ফায়ারিং করতে পারেনি মনিকা। তবে ফায়ারিং করেছে শটগান, রাইফেল, এসএমজি এবং গ্যাসগান নিয়ে। ‘অস্ত্র নিয়ে প্রথম ফায়ারিংয়ের দিন খুব ভয়ে আর সংশয়ে ছিলাম কিভাবে ফায়ার করব। এখন অনুশীলন করতে করতে সব স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আত্মবিশ্বাসও অনেক বেড়েছে।’ মনিকার পুলিশ-সতীর্থ এবং বসরাও জানেন সে যে একসময় জাতীয় মহিলা ফুটবলার ছিল। কিভাবে জানে? ‘গত ফেব্রুয়ারিতে জনকণ্ঠে আমাকে নিয়ে প্রকাশিত বিশাল ফিচার পড়েই সবাই জেনেছে।’ যখন ক্লাস ফাইভে পড়ে মনিকা (রাঙামাটির মঘাছড়ি প্রাইমারী সরকারী বিদ্যালয়), তখন ২০১০ সালে ‘বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট’ দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু তার। সেবার তার স্কুল বিভাগীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। দলের ক্যাপ্টেন ছিল সে। তারপর খেলে চট্টগ্রাম বিভাগের হয়ে। সেবার ওই আসরে হয়েছিল টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়। তারপর ধাপে ধাপে উঠে এসে সুযোগ পায় জাতীয় বয়সভিত্তিক দলে। প্রথমে ডাক পায় অ-১৪ দলে। ওই দলের সবচেয়ে জুনিয়র প্লেয়ার ছিল মনিকাই। তাদের দলটি ২০১২ সালে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত এএফসির টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে তৃতীয় স্থান (কোচ ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক) এবং ফেয়ার প্লে ট্রফি জিতেছিল। ওই আসরে মনিকা গোল করেছিল তিনটি। এর দু’বছর পরই ২০১৪ সালে স্বীয় নৈপুণ্যে প্রজ্বলিত হয়ে অ-১৬ দলের অধিনায়ক হয়ে যায় মনিকা (এর মধ্যেই বাংলাদেশ আনসারের হয়ে ২০১৩-১৫ সাল পর্যন্ত খেলে)। ঘরের মাটিতে এএফসি অ-১৬ মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাইপর্বের খেলায় অংশ নেয়। এখন দেখার বিষয়, ফুটবলার থেকে পুলিশে পরিণত হওয়া মনিকাকে আবারও ফুটবলার হিসেবে মাঠে দেখা যায় কবে থেকে?