ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯

বিএনপি নেতা এম কে আনোয়ারের ইন্তেকাল ॥ আজ দাফন

প্রকাশিত: ০৫:৪৬, ২৫ অক্টোবর ২০১৭

বিএনপি নেতা এম কে আনোয়ারের ইন্তেকাল ॥ আজ দাফন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক মন্ত্রী ও কুমিল্লার হোমনা থেকে ৫ বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য এমকে আনোয়ার ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি... রাজিউন)। সোমবার রাত দেড়টার দিকে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে নিজ বাসভবনে বার্ধক্যজনিত রোগে এমকে আনোয়ার ইন্তেকাল করেন। মঙ্গলবার ঢাকায় ৩ দফা জানাজা শেষে তার কফিন বারডেমের হিমঘরে রাখা হয়েছে। আজ বুধবার তার নির্বাচনী এলাকা তিতাস উপজেলা সদরে ৪র্থ ও হোমনায় ৫ম জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। এমকে আনোয়ারের মৃত্যুতে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা শোক প্রকাশ করেছেন। আর বিএনপির পক্ষ থেকে মঙ্গলবার দিনব্যাপী শোক দিবস পালন করা হয়। এ সময় দলের নেতাকর্মীরা কালোব্যাজ ধারণ করেন। এমকে আনোয়ার ১৯৩৩ সালের ১ জানুয়ারি কুমিল্লার হোমনায় জন্মগ্রহণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। মৃত্যু সংবাদ শুনে মঙ্গলবার ভোর থেকেই বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী ও এমকে আনোয়ারের আত্মীয়স্বজনরা তার বাসায় ছুটে যান। এ সময় বাসায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। সকাল সাড়ে ১০টায় কাঁটাবন মসজিদে এমকে আনোয়ারের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে এমকে আনোয়ারের আত্মীয়স্বজনসহ বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ অংশ নেন। ১২টায় নয়াপল্টন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নেয়া হয় এমকে আনোয়ারের মরদেহ। এ সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের সিনিয়র নেতারা তার কফিন দলীয় পতাকায় ঢেকে দেন। পরে কফিনে ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা। এরপর বিএনপি অফিসের সামনের রাস্তায় এমকে আনোয়ারের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি অফিসের সামনে নামাজে জানাজায় অংশ নেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ, ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর, মোহাম্মদ শাহজাহান, খন্দকার মাহবুব হোসেন, শামসুজ্জামান দুদু, জয়নাল আবেদীন, আহমেদ আজম খান, আবদুল হালিম, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান, আবদুস সালাম, আবদুল কাইয়ুম, বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবির খোকন, হাবিব-উন নবী খান সোহেল, সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, দলের নেতা আবুল হাই, রেজাউল করীম, হাবিবুল ইসলাম হাবিব, ওবায়দুল ইসলাম, আবদুস সালাম আজাদ, তাইফুল ইসলাম টিপু, মুনির হোসেন, বেলাল আহমেদ, রফিক শিকদার, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম, যুবদল সভাপতি সাইফুল আলম নীরব, সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবু, সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল, ওলামা দলের সভাপতি এম এ মালেক, সাধারণ সম্পাদক শাহ নেসারুল হক। এম কে আনোয়ারের বড় ছেলে মাহমুদ আনোয়ারও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। জানাজার আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এই সরকারের নির্যাতনেও এম কে আনোয়ার পিছু হটেননি। তিনি গণতন্ত্রের যে আদর্শে বিশ্বাস করতেন, সেই আদর্শকে সমুন্নত রাখার জন্য সব সময় ত্যাগ স্বীকার করেছেন এবং জনগণকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আজকে তার এই চলে যাওয়া শুধু তার পরিবারের জন্য নয়, আমাদের বিএনপির জন্য শুধু নয়, দেশের জন্যও একটা অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। এরকম নির্ভিক ও সৎ মানুষ আমাদের মাঝে আজকাল বিরল। দেশবাসীকে অনুরোধ করব, তারা যেন এমকে আনোয়ারের জন্য দোয়া করেন। বিএনপি অফিসের সামনে জানাজা শেষে এমকে আনোয়ারের মরদেহ দুপুর দেড়টার দিকে নিয়ে যাওয়া হয় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। সেখানে জানাজায় অংশ নেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ আসম ফিরোজ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, দলের ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, আবদুল মান্নান, প্রচার সম্পাদক শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী প্রমুখ। এমকে আনোয়ারের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে তার ছোট ছেলে মাসুদ আনোয়ার ও মেয়ে খাদিজা আনোয়ার আজ বুধবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফেরার পর সড়ক পথে কফিন নিয়ে যাওয়া হবে এমকে আনোয়ারের নির্বাচনী এলাকা কুমিল্লার হোমনায়। হোমনা যাওয়ার পথে প্রথমে তিতাস উপজেলা সদরে বাদ জোহর নামাজে জানাজার পর হোমনা সদরে বাদ আসর শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এর পর পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। এদিকে এমকে আনোয়ারের মৃত্যুতে মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যে সংবাদ সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল তা স্থগিত করা হয়। সেইসঙ্গে মঙ্গলবার দিনব্যাপী শোক দিবস পালন করা হয়। এছাড়া এমকে আনোয়ারের মৃত্যুতে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে শোক বই খোলা হয়। এমকে আনোয়ার দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানান রোগে ভুগছিলেন। অসুস্থতার কারণে ২৩ অক্টোবর বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অংশ নিতে পারেননি তিনি। ১৯৫৩ সালে সিএসপি অফিসার হিসেবে সরকারী চাকরিতে যোগ দেন মোহাম্মদ খোরশেদ আনোয়ার (এমকে আনোয়ার)। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। সরকারের অর্থ সচিব ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্বও পালন করেন তিনি। ১৯৯০ সালে সরকারী চাকরি থেকে অবসরের পর এমকে আনোয়ার রাজনীতিতে নামেন। যোগ দেন বিএনপিতে। এরপর কুমিল্লার হোমনা আসন থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। সর্বশেষ ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এমকে আনোয়ার খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারে দুই দফা মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে তিনি কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে বিএনপির আন্দোলনের মধ্যে নাশকতার বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বেশ ক’টি মামলা হয়। এ জন্য তিনি কারবরণও করেন। এমকে আনোয়ারের সততা ঈর্ষণীয় উচ্চতায়- খালেদা জিয়া ॥ এমকে আনোয়ারের মৃত্যুতে মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক শোক বার্তায় বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া বলেছেন, রাজনীতিবিদ এমকে আনোয়ারের সততা ঈর্ষণীয় উচ্চতায়। সজ্জন, মিতবাক, নিয়মনিষ্ঠ, কথা ও কাজে অসাধারণ সামঞ্জস্য ছিল মরহুম এমকে আনোয়ারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সে কারণেই পেশাগত জীবনে সরকারী সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত থেকেও অমলিন ব্যক্তিমর্যাদা অক্ষুণœ রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। রাজনৈতিক জীবনেও নিজ আদর্শে অটল থেকে সংগ্রাম ও জনগণের সেবা করে গেছেন। শোকবার্তায় খালেদা জিয়া আরও বলেন, দেশের বরেণ্য রাজনীতিবিদ এমকে আনোয়ারের মৃত্যুতে তার পরিবারবর্গের মতো আমিও গভীরভাবে শোকাহত ও ব্যথিত হয়েছি। আমি তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। তিনি বলেন, রাজরোষে পড়া সত্ত্বেও এমকে আনোয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করেননি, তাই বারবার কারাবরণসহ নিপীড়ন-নির্যাতন সহ্য করেও নিষ্ঠা ও সাহসের সঙ্গে অগণতান্ত্রিক সরকারের অসদাচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে গেছেন। খালেদা জিয়া বলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে সব সময় এমকে আনোয়ার সামনের কাতারে থেকেছেন। নিজ এলাকায় শিক্ষার প্রসার ও জনকল্যাণমূলক কাজেও তার অবদান স্মরণীয়। তাই জনগণের নিকট প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার কারণেই আদর্শনিষ্ঠ এমকে আনোয়ার বারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী দর্শনকে বুকে ধারণ করে তিনি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার অঙ্গীকারে বিএনপিকে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। এমকে আনোয়ারের মৃত্যুতে দেশবাসী ও দলের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।