ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯

আজ মহানবমী ॥ অষ্টমীতে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত

প্রকাশিত: ০৫:৪৬, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭

আজ মহানবমী ॥ অষ্টমীতে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত

স্টাফ রিপোর্টার ॥ নির্যাতন আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে দেবী দুর্গার ‘কুমারী’ রূপের আরাধনায় নারীশক্তি জাগরণের প্রার্থনা করেছেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। দেবী দুর্গা শক্তিরূপে স্থান নেবে ভক্তের হৃদয়ে আর ভক্ত রুখে দাঁড়াবে ধর্ম আর সংস্কারের দোহাই দিয়ে হওয়া নির্যাতনের বিরুদ্ধে। এবার কুমারীপূজায় এ প্রার্থনাই ছিল সবার মনে। প্রতিবারের মতো এ বছরও বৃহস্পতিবার শারদীয় দুর্গোৎসবের অষ্টমীতে দেশের সব রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনে অনুষ্ঠিত হয়েছে কুমারীপূজা। ভোর থেকেই সনাতন ধর্মাবলম্বীরা জড়ো হতে থাকেন রামকৃষ্ণ মিশনসহ বিভিন্ন মণ্ডপে। এ সময় মন্দিরের নিরাপত্তার দায়িত্বে পুলিশ ও র্যাব নিয়োজিত ছিল। আজ শারদীয় দুর্গোৎসবের চতুর্থ দিন। মহানবমী। মহানবমী পূজা শুরু হবে সকাল সাড়ে ৬টায়। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হবে আরতি প্রতিযোগিতা। আজ মণ্ডপে মণ্ডপে প্রধান আকর্ষণ থাকবে আরতি প্রতিযোগিতা। রাতকে উজ্জ্বল করে ভক্তরা মেতে উঠবেন নানা ঢঙে আরতি নিবেদনে। রামকৃষ্ণ মিশনে অষ্টমী পূজা শুরু হয় সকাল সাড়ে ৬টায়। বেলা ১১টায় কুমারী দেবীকে আসনে বসানো হয়। এবার কুমারী দেবীরূপে মণ্ডপে অধিষ্ঠিত হয় রামপুরা বনশ্রীর রূপকথা চক্রবর্তী। এ বছর কুমারীর শাস্ত্রীয় নাম ‘মালিনী’। হাজারো ভক্ত দেবী দুর্গা ও কুমারী মাকে জয়ধ্বনি, উলুধ্বনি দিয়ে বরণ করে নেন। কুমারীর বাবার নাম বিদ্যুৎ চক্রবর্তী। মায়ের নাম লিপি চক্রবর্তী। তার জন্ম ২০১০ সালের ২৩ জুন। সে চাইল্ড স্কুলের প্রথম শ্রেণীর ছাত্রী। সনাতন শাস্ত্রে উল্লেখ আছে, এক থেকে ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত অজাতপুষ্পবালাকে কুমারী বলা হয়। বয়স অনুযায়ী তার নাম এরূপ এক বছর বয়সে সন্ধ্যা, দুইয়ে সরস্বতী, তিনে ত্রিধামূর্তি, চারে কালিকা, পাঁচে সুভগা, ছয়ে উমা, সাতে মালিনী, আটে কুব্জিকা, নয়ে অপরাজিতা, দশে কালসন্ধর্ভা, এগারোয় রুদ্রাণী, বারোয় ভৈরবী, তেরোয় মহালক্ষ্মী, চৌদ্দয় পীঠনায়িকা, পনেরোয় ক্ষেত্রজ্ঞা এবং ষোলো বছরে অম্বিকা বলা হয়ে থাকে। কুমারীপূজা ছাড়া দুর্গাপূজায় পরিপূর্ণ ফল লাভ হয় না বলে সনাতন শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে। কেন কুমারীপূজা করা হয়- এ সম্পর্কে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেব বলেছেন, শুদ্ধাত্মা কুমারীতে ভগবতীর বেশি প্রকাশ। কুমারী পূজার মাধ্যমে নারী জাতি হয়ে উঠবে পূতপবিত্র ও মাতৃভাবাপন্ন। প্রত্যেকে শ্রদ্ধাশীল হবে নারী জাতির প্রতি। ১৯০১ সালে ভারতীয় দার্শনিক ও ধর্মপ্রচারক স্বামী বিবেকানন্দ সর্বপ্রথম কলকাতার বেলুড় মঠে নয়জনের কুমারীপূজার মাধ্যমে এর পুনঃপ্রচলন করেন। তখন থেকে প্রতি বছর দুর্গাপূজার অষ্টমী তিথিতে এ পূজা চলে আসছে। অষ্টমীর দিনই কেন কুমারীপূজা করা হয়- এ প্রসঙ্গে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ স্বামী ধ্রুবেশানন্দ বলেন, অষ্টমীর দিনই কুমারীপূজা হতে হবে এর কোন বাধ্যবাধকতা নেই। কোন কোন মন্দিরে দুর্গাপূজার যে কোন দিন কুমারীপূজা করা হয়। বঙ্গদেশ ও ভারতবর্ষের নানা অঞ্চলে নবরাত্রির নয়টি শুভদিনে দুর্গাপূজা হয়। এই শুভ দিনের যে কোন দিন কুমারীপূজা হতে পারে। সকালে কুমারী রূপকথাকে স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয়। মাথা ও গলায় ফুলের মালা, অলঙ্কার ও প্রসাধনে নিপুণ সাজে সাজিয়ে তোলা হয় তাকে। এরপরই কুমারী মাকে মন্ত্র পাঠ করে গঙ্গাজল ছিটিয়ে শরীর-মন শুদ্ধ করে মাতৃজ্ঞান রূপে পূজা করা হয়। ১৬টি উপকরণ দিয়ে কুমারী পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। অগ্নি, জল, বস্ত্র, পুষ্প ও বাতাস- এ পাঁচটি উপকরণ দিয়ে কুমারীকে পূজা করা হয়। কুমারীকে সিংহাসনে বসানোর আগে তার আগমনবার্তা নিয়ে ভক্তিমূলক গান পরিবেশন করা হয়। তখন পুরো এলাকার পুণ্যার্থীরা অধীর আগ্রহে কুমারী দেবীর অপেক্ষায় প্রহর গুনতে থাকেন। তাকে সিংহাসনে বসানোর সময় অসংখ্য পুণ্যার্থী সমস্বরে ‘দুর্গা মায় কি জয়’, ‘কুমারী মায় কি জয়’ বলে ধ্বনি দিতে থাকেন। কুমারীপূজা সম্পন্ন হলে ভক্তরা মাকে প্রণাম করেন। কুমারীপূজা শেষে ভক্তরা দেবী দুর্গার পায়ে অঞ্জলি নিবেদন করেন। অঞ্জলি নিবেদনপর্ব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে এবং ভক্তদের সুবিধার্থে কয়েক দফায় অঞ্জলি দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। অঞ্জলি শেষে হাজার হাজার ভক্ত-দর্শনার্থীর মধ্যে বিতরণ করা হয় মহাপ্রসাদ। অষ্টমী পূজা ছাড়াও রাতে অনুষ্ঠিত হয় সন্ধিপূজা। অষ্টমীর শেষ নবমীর শুরুর সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হয় সন্ধিপূজা। যেসব ম-পে কুমারীপূজা হয় সেখানে একই দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছে তিনটি পূজা। দিনের বেলা অষ্টমী বিহিতপূজা আর কুমারীপূজা পরে সন্ধিপূজা। সকালে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির কেন্দ্রীয় পূজাম-পে দেবীর মহাষ্টমী বিহিতপূজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে অনুষ্ঠিত হয় সন্ধিপূজা। গতকাল দুপুরে বিভিন্ন ম-পে ও মন্দিরে বিতরণ করা হয় মহাপ্রসাদ। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় আরতি। গতকাল দুপুরের পর থেকে ম-পগুলোয় ঢল নামে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের। এদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, মন্ত্রী, সংসদ সদস্যরাও নগরীর বিভন্ন ম-প পরিদর্শন করেছেন।