ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ০৩ অক্টোবর ২০২২, ১৮ আশ্বিন ১৪২৯

লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক

প্রকাশিত: ০৪:৫২, ২৮ আগস্ট ২০১৭

লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক

অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম রফিক ॥ আজ পবিত্র জিলহজ মাসের পঞ্চম দিবস। কোরআনুল করীমে আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা ইরশাদ করেছেন, প্রকৃতপক্ষে সে-ই সফলকাম হয়েছে যে নিজের নফসকে পবিত্র করতে পেরেছে। সুরাতুল ফজরে বলা হয়েছে, হে প্রশান্ত মন, তুমি তোমার পালনকর্তার নিকট ফিরে যাও সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। অতঃপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ কর। কোরআনে বর্ণিত এ পবিত্র নফস-প্রশান্ত মন বা আত্মা পরিগঠন আর পরিশুদ্ধির বিশ্ব মৌসুম হলোÑ মাহে রমজান। রোজা অন্যতম দৈহিক ইবাদত। দেহের কসরত আর প্রবৃত্তিকে দমনের মাধ্যমেই আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংশোধন সম্ভব। দেহ সবসময় মানুষকে মাটির দিকে টানে, ভোগবিলাস এবং আরাম-আয়েশের দিকে টানে আর আত্মা মানুষকে হাতছানি দেয় রহস্যময় উর্ধজগত আলিমে গায়বের দিকে—যেখান থেকে এ আত্মা একদিন মানুষের ভেতর আশ্রয় নিয়ে ধরাধামে এসেছিল। মানব সৃষ্টির প্রথম থেকেই দেহ ও আত্মার দ্বন্দ্ব চলে আসছে বিরামহীনভাবে। আর এতে যখনই আত্মা বিজয়ী হয়েছে মানুষ সফল হয়েছে দুনিয়া-আখিরাতে-উভয় জাহানে। সৃষ্টির আদিতে মানুষের অস্তিত্ব এক সময় এমন ছিল যে, আত্মাই মূল উপাদান। তখন ছিল এটি অতি পূতপবিত্র, এর নাম ছিল পানাহার, ভোগবিলাস, না ছিল পার্থিব চাহিদা। সে ছিল ফেরেস্তাদের গুণে গুণান্বিত। যখনই এতে দেহ সংযোজিত হয় শুরু হয় চাহিদা ও ভোগের স্পৃহা। রমজানের মাসব্যাপী সিয়াম-সাধনা মানুষকে সেই আদি অস্তিত্বের কথা স্মরণে এনে দেয়। ইসলামের পঞ্চমস্তম্ভ হচ্ছেÑ কালেমা, নামাজ, রোজা, যাকাত ও হজ। কালেমা ত্বায়্যেবা পাঠ ও অনুধাবনের মধ্য থেকে একজন মানুষ নিজেকে ঈমানের আগুনে তপ্ত করে তোলে, এরপর নামাজের মাধ্যমে এ আগুন তার পাশবিক প্রবৃত্তিকে প্রায় দগ্ধ করার পর্যায়ে পৌঁছায়। (উল্লেখ্য, নামাজের আরবী প্রতিশব্দ সালাতের শাব্দিক অর্থই হচ্ছে সেঁকা)। তারপর রমজানের রোজা বা দহনের পালা। ত্রিশদিনের কঠোর সাধনা একজন ঈমানদারের নফস বা পাশবিকতাকে দগ্ধ করে তাকে পরিশুদ্ধ করে তোলে। এভাবে নিজ দেহ ও মনের পবিত্রতা অর্জনের পর আসে ধন-সম্পদ পবিত্রকরণের প্রশ্ন। যাকাত প্রদান হচ্ছে, সেই পবিত্রতা অর্জনের সোপান। যাকাতের আবিধানিক অর্থও তাই। সবশেষে আসে হজের ভূমিকা। এটা হচ্ছে মু’মিনের চূড়ান্তরূপ। হাদিসে আছে হজের মাধ্যমে একজন মুসলমান সমুদয় গুনাহ হতে পূতপবিত্র হয়ে সদ্যপ্রসূত শিশুর মতো নিষ্পাপ জীবন লাভ করে। এমনিভাবে ইসলামের পাঁচস্তম্ভ ক্রমান্বয়ে পরিশোধিত করে ধূলোর মানুষকে উন্নীত করে মু’মিন মুত্তাকিন ও মুহসিনের পর্যায়ে। তাই ইসলামের প্রতিটি আমল এবং বার্ষিক সাজানো অনুষ্ঠানাদি মনুষ্যত্বের মর্যাদা বৃদ্ধি, ঈমান আকিদার মজবুতি আর আত্মা ও দেহের অভ্যন্তরীণ শক্তির বিরাট নিয়ামক। জিলহজের এ মওসুম এ জন্যই গুরুত্বপূর্ণ এ মাস হিজরী সনের সমাপনী মাস আর সামনের মহরম থেকে শুরু হবে মুমিন মুসলমানদের নয়া জিন্দেগীর পুনঃআবাদ। তাই, ঈমান ও ইসলামের বরকত হাসিলের জন্য জিলহজ মাসের অনুষ্ঠানাদির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের কোন বিকল্প নেই। এর ধারাবাহিকতায় নিজের অতীত প্রায়শ্চিত্ত স্মরণে এনে ইবরাহিমী মজনুর মতো সাদা শুভ্র কাফনের ইহরাম পড়ে মুমিন মুসলমানরা মরু আরবের তপ্ত বালুরাশিতে লাব্বায়েক ধ্বনিতে মুখরিত করছে মরু আকাশ।