ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২০ আগস্ট ২০২২, ৫ ভাদ্র ১৪২৯

পরীক্ষামূলক

দেশী ও বিদেশী শিল্পপতিদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী

কর্মপরিবেশ ও শ্রম অধিকার নিশ্চিত করুন

প্রকাশিত: ০৬:১২, ১২ ডিসেম্বর ২০১৬

কর্মপরিবেশ ও শ্রম অধিকার নিশ্চিত করুন

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ এবং শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করতে দেশী-বিদেশী উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, শিল্পপতিদের (উদ্যোক্তাদের) নিজ নিজ কারখানায় কর্মপরিবেশ উন্নয়ন, শ্রম অধিকার নিশ্চিতকরণ, পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অধিকসংখ্যক নারী ও প্রতিবন্ধী শ্রমিক নিয়োগসহ শ্রমিকদের জন্য কল্যাণমূলক ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি শিল্প মালিকদের শুধু ব্যবসা করার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে দক্ষ কর্মী তৈরিতে তাদের প্রশিক্ষণের দিকেও বিশেষ মনোযোগী হতে হবে। একটা কারখানা করে শুধু পয়সা কামাই করবÑ এমন চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে একটু উদ্যোগী হতে হবে। উন্নয়ন সহযোগীগণ অতীতের মতো ভবিষ্যতেও দক্ষতা উন্নয়ন, নিয়োগযোগ্যতা বৃদ্ধি ও শোভন কর্মপরিবেশ সৃষ্টিতে তাদের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। রবিবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ‘ঢাকা সামিট অন স্কিলস, এমপ্লয়াবিলিটি এ্যান্ড ডিসেন্ট ওয়ার্ক-২০১৬’ (দক্ষতা, নিয়োগযোগ্যতা এবং শোভন কাজ) শীর্ষক সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় (এমওএলই), বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ), ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেশন কমিটি ফর ওয়ার্কার্স এডুকেশন (এনসিসিডব্লিউই) যৌথভাবে তিন দিনব্যাপী এ সম্মেলনের আয়োজন করেছে। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ বিজনেস ডিজএ্যাবিলিটি নেটওয়ার্কের (বিবিডিএন) আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। অন্যদের মধ্যে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মহাপরিচালিক গাই রাইডার, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু, ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন্স অব এমপ্লয়ার্স (আইওই) মহাসচিব লিন্ডা ক্রোমজং, বিজেএমইএ সভাপতি মোঃ সিদ্দিকুর রহমান, বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডার হাইকমিশনার বেনোই-পিয়েরে লারামি, বিশ্বব্যাংকের পরিচালক অমিত দার, ন্যাশনাল ওয়ার্কার্স কোঅর্ডিনেশন কমিটির চেয়ারম্যান শাহ মোঃ আবু জাফর প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি সালাউদ্দিন কাশেম খান। প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, শিল্পোদ্যোক্তাসহ অন্য স্টেকহোল্ডারদের সক্রিয় সহযোগিতা এবং অংশীদারিত্ব ব্যতীত শুধু সরকারী উদ্যোগ এক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত ফল নিয়ে আসতে পারবে না। সরকার পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি এবং বাজার সম্প্রসারণের জন্য বিভিন্ন প্রণোদনামূলক কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। তবে এক্ষেত্রে শুধু প্রণোদনাই যথেষ্ট নয়। আমাদের মূলধন ও প্রযুক্তিতে বেশি বিনিয়োগ এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তৈরি পোশাকসহ আমাদের বেশিরভাগ পণ্য স্বল্প-মজুরি, নিম্নমান, স্বল্পমূল্য ইত্যাদির ফাঁদে আটকে আছে। আমাদের এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধাগুলোকে উন্নততর উৎপাদনশীলতার ওপর ভিত্তি করে পুনর্বিন্যাস করতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের শিখতে হবে কী করে বর্তমান পণ্যসামগ্রীতে মূল্য সংযোজন করা যায়। তিনি বলেন, ভবিষ্যত অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থানের জন্য আমাদের পণ্যের বৈচিত্র এবং পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ প্রয়োজন। দ্রুত পরিবর্তনশীল কর্মবিশ্বে উদ্ভাবন শক্তি, সৃজনশীলতা এবং কাস্টমাইজড উৎপাদনের ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। তখনই কেবল বিশ্বব্যাপী পণ্য ও সেবার ‘সাপ্লাই চেইন’-এ আমরা নিজেদের টিকিয়ে রাখতে পারব। এই সত্যটি সামনে রেখে আমাদের শিক্ষার সঙ্গে দক্ষতাকে মিলিয়ে নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সংস্কারের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন ও নিয়োগযোগ্য বৃদ্ধিতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদী কর্মসূচী বাস্তবায়নে আইএলও এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে প্রশিক্ষণের কোন বিকল্প নেই। দক্ষতা উন্নয়নে সরকারী, বেসরকারী এবং এনজিও পরিচালিত সকল ধরনের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কর্মকা-কে সুসমন্বিত করে শ্রমবাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমরা জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি ২০১১ প্রণয়ন করেছি। বাংলাদেশে কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও শিল্পায়নের ওপর অনুষ্ঠানে একটি ভিজ্যুয়াল প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করা হয়। তিনি বলেন, বিগত কয়েক বছরে মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দক্ষ জনশক্তির চাহিদারও পরিবর্তন হয়। এই চাহিদা পূরণের সক্ষমতা অর্জন করার উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করেছি। শেখ হাসিনা বলেন, শ্রমবাজারে যে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিবছর প্রবেশ করছেন, তাদের কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজন শিল্প-কারখানা স্থাপন এবং সেবা খাতের প্রসার। বর্তমানে আমাদের জিডিপির প্রায় ৫৪ শতাংশ আসে সেবা খাত থেকে, ৩০ শতাংশ শিল্প খাত এবং ১৬ শতাংশ কৃষি খাত থেকে। তিনি বলেন, কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজন শ্রমঘন খাত। আবার পণ্য উৎপাদন এবং সেবার ব্যয় হ্রাস করে সেগুলোকে প্রতিযোগিতামূলক করতে হলে প্রয়োজন জনশক্তির দক্ষতার উন্নয়ন। পাশাপাশি অভিবাসন প্রত্যাশীদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের চাহিদা ও মজুরি উভয়ই বৃদ্ধি করা সম্ভব। শেখ হাসিনা বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম-আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা যে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাচ্ছি, তা বাস্তবায়নের জন্য সকল ক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন। এমডিজি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের সামনে এখন এসডিজি বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ। দক্ষ জনশক্তির যোগান বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে উপার্জন সক্ষমতা অর্জন ও আয়বৃদ্ধি দারিদ্র্য দূরীকরণে সহায়ক হবে, যা অন্যান্য সামাজিক সূচকগুলোকে কাক্সিক্ষত মাত্রায় উন্নীত করবে। সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় আমরা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনেও সফল হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে নতুন উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণ, মূলধন ব্যয় কমানো, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ সকল বিষয়ে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা সারাদেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছি। শিল্প-কলকারখানা স্থাপনের জন্য ভূমি ব্যাংক স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নতুন নতুন শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠা, আমদানি-রফতানি বাণিজ্য সহজীকরণ, বন্দর সুবিধা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য সরকার কাজ করে যাচ্ছে। সরকারী কর্মকা-ে গতিশীলতা আনয়নের লক্ষ্যে সকল স্তরে ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক উন্নয়নে সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শ্রমিক-মালিক সৌহার্দ্যপূর্ণ শিল্প-সম্পর্ক স্থাপন, শ্রমিকদের আইনগত অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং শ্রম কল্যাণের লক্ষ্যে বহুবিধ কর্মসূচী হাতে নেওয়া হয়েছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো শ্রম কল্যাণ ফাউন্ডেশন এবং রফতানিমুখী শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য কল্যাণ তহবিল গঠন। তিনি বলেন, তার সরকার অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত শ্রমিকদের জন্য বীমা কর্মসূচী প্রবর্তন, কল-কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরকে শক্তিশালী করেছে। শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারী উদ্যোগ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ন্যূনতম মজুুরি কমিশন শক্তিশালী করা, রফতানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার প্রদান, শ্রম আইন সংশোধন ও শ্রম বিধিমালা জারির মাধ্যমে শ্রমিকদের অধিকার সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার বহুবিধ কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন পরিষদ গঠনের মাধ্যমে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা সংস্কার এবং কর্ম-উপযোগী ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। সরকারের জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন তহবিল গঠনের পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান প্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রতিবন্ধী ও নারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। অর্থের যোগান সহজ করার লক্ষ্যে সরকার জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন তহবিল গঠনের পদক্ষেপ নিয়েছে। তিনি বলেন, তার সরকার এনএসসিসি সচিবালয়কে শক্তিশালী করে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কতৃর্পক্ষ গঠনের কার্যক্রমও হাতে নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ এবং শ্রম চাহিদার রূপান্তর জাতীয় অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জনশক্তির কর্মোপযোগী দক্ষতা বৃদ্ধি অনস্বীকার্য হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, আমাদের রফতানি আয় বৃদ্ধি পেলেও তা মূলত তৈরি পোশাক ও সীমিতসংখ্যক বৈদেশিক বাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। দক্ষ শ্রমশক্তির পাশাপাশি দক্ষ ব্যবস্থাপক ও দক্ষ পেশাজীবী তৈরির মাধ্যমে এক্ষেত্রে বিরাজমান পরনির্ভরশীলতা দূর করে জাতীয় সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে শিল্পের চাহিদার সমন্বয় ঘটাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিল্পের প্রয়োজনে দক্ষ ব্যবস্থাপক তৈরির লক্ষ্যে যথাযথ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু করার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, আমি আশা করি অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞগণ কারিগরি অধিবেশনগুলোতে দক্ষতা উন্নয়ন, শোভন কর্মসৃজন ও নিয়োগ যোগ্যতা বিষয়ে সুচিন্তিত মতামত প্রদান করে বর্তমান চ্যালেঞ্জসমূহ সমাধানে সহায়তা করবেন।