ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯

পরীক্ষামূলক

হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে টাকা পাচারের উদ্দেশ্যেই এ চটকদার বিজ্ঞাপন!

মালয়েশীয় কোম্পানির অনুমোদনহীন আবাসন মেলা

প্রকাশিত: ০৫:৪৫, ৭ নভেম্বর ২০১৬

মালয়েশীয় কোম্পানির অনুমোদনহীন আবাসন মেলা

রহিম শেখ ॥ বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কোন সম্মতি নেই, নেই প্রশাসনের অনুমতি, তবু খোদ রাজধানীতেই চলছে মালয়েশিয়ান একটি কোম্পানির আবাসন মেলা। পত্রিকায় চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে ফ্ল্যাটের বুকিং মানি (অগ্রিম অর্থ) সংগ্রহ করছে মালয়েশীয়ভিত্তিক কোম্পানি প্লেনিটিউড। ‘দ্য মেরিন’ এক্সিবিউশন নামে রাজধানীর লেকশোর হোটেলে চলছে কোম্পানিটির দুই দিনব্যাপী মেলা। আজ সোমবার রাজধানীতে মেলার শেষ দিন হলেও কাল থেকে শুরু হচ্ছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। সরকারের কোন অনুমোদন না নিয়ে পত্রিকায় চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে এ্যাপার্টমেন্ট কেনার অবৈধ প্রচারে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। তারা বলছেন, হুন্ডির মাধ্যমে বিপুল অর্থ দেশ থেকে পাচারের উদ্দেশ্যে এমন প্রচার চালাচ্ছে কোম্পানিটি। ‘দ্য মেরিন এক্সিভিউশন’ শিরোনামে গত ২ নবেম্বর পত্রিকায় নজরকাড়া বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে মালয়েশিয়ান ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান প্লেনেটিউড। ওই বিজ্ঞাপনে অবশ্য কোম্পানিটির নাম প্রকাশ করা হয়নি। এতে বলা হয়, রাজধানীর লেকশোর হোটেলে ৬-৭ নবেম্বর এবং বন্দরনগরীর চট্টগ্রাম ক্লাবে ৮-৯ নবেম্বর আবাসন মেলা অনুষ্ঠিত হবে। মেলা চলবে সকাল এগারোটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত। ক্রেতা সেজে রবিবার রাজধানীর লেকশোর হোটেলে গিয়ে দেখা যায়, দুই-এক জন ক্রেতার কাছে পাওয়ার প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার পেনাং শহরে অবস্থিত কোম্পানিটির প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরছেন কর্মকর্তারা। ক্রেতাদের জানানো হয়, মেলা চলাকালীন বুকিং দিলেই ১০ শতাংশ ছাড়ে ফ্ল্যাট পাবেন ক্রেতারা। ফ্ল্যাটের দাম জানতে চাইলে কর্মকর্তারা জানান, ১৮৫০ স্কয়ার ফিটের একটি ফ্ল্যাটের মূল্য পড়বে ৪ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে ১৭৫০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটের মূল্য পড়বে ৩ লাখ ৯৫ হাজার ৫০০ ডলার। এ দেশীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ দাঁড়াবে সোয়া তিন কোটি টাকা। মালয়েশিয়ান প্রতিষ্ঠান প্লেনেটিউড কোম্পানির বিপণন বিভাগের কর্মকর্তা ডেনিস লিয়ে জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা মূলত কোম্পানির প্রচার চালাতে বাংলাদেশে এসেছি। সেই হিসেবে এ দেশের ক্রেতাদের কাছ থেকে বুকিং মানি (অগ্রিম মূল) সংগ্রহ করব। বাকি অর্থ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধ করতে পারলে ক্রেতারা ফ্ল্যাট বুঝে পাবেন। অগ্রিম মূল্য বাবদ অর্থ কিভাবে নেয়া হবে জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা জানান, ক্যাশে (নগদে) নেয়া হবে। কেননা, অগ্রিম মূল্য পরিমাণে কম! এ দেশে মেলার করার আগে অনুমতি নেয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে কোম্পানির বিপণন ও বাণিজ্যিক বিভাগের গ্রুপ জেনারেল ম্যানেজার কাও হুক সিয়াং জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা ব্যবসায়িক ভিসায় বাংলাদেশে এসেছি। বর্তমানে মুক্ত বাণিজ্য অর্থনীতিতে আবাসন মেলা করতে অনুমোদন নিতে হবে কিনা তা তার জানা নেই। তিনি আরও বলেন, যাদের সামর্থ আছে তারাই এই ফ্ল্যাট কিনতে পারবে। মেলার আয়োজন সম্পর্কে বাংলাদেশী এজেন্ট মোর্তুজা করিম জনকণ্ঠকে বলেন, গুলশান থানার অনুমোদন তাদের রয়েছে। তবে থানা কর্তৃপক্ষের অনুমোনের কোন ডকুমেন্ট তারা দেখাতে পারেনি। সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগ করেও এই কোম্পানির এমন প্রচারের বিষয় জানা যায়নি। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ অন্য কোন সংস্থার অনুমোদন রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা অনুমোদনের জন্য চেষ্টা করছেন। অনুমোদন ছাড়া কেন মেলার আয়োজন করেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে কোন সঠিক উত্তর দিতে পারেনিন তিনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লেকশোর হোটেলের এক উর্ধতন কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, আমাদের বলা হয়েছে তারা অনুমোদন নিয়েই মেলার আয়োজন করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জমি ও এ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির মাধ্যমে এদেশ থেকে সহজ উপায়ে অর্থ হস্তান্তরের ঘোষণা দিলেও কোম্পানিটির উদ্দেশ্য ছিল অবৈধ উপায়ে অর্থ হাতিয়ে নেয়া। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মালয়েশিয়ান ভিত্তিক কোম্পানি প্লেনিটিউড বাংলাদেশের ক্রেতার কাছে এ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির ঘোষণার বিষয়ে সরকারের কোন অনুমোদন না নিয়ে শুধু পত্রিকায় চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে এ ধরনের প্রচার চালাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রতিষ্ঠানটির কোন তথ্য নেই বলে জানা গেছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা জনকণ্ঠকে বলেন, রাষ্ট্রীয় নীতিমালা অনুযায়ী মূলধনী হিসাব খোলার কোন বিধান নেই। তাই এ্যাপার্টমেন্ট কেনার জন্য বিদেশে অর্থ স্থানান্তরেরও কোন সুযোগ নেই। কোম্পানিটির বিজ্ঞাপন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের প্রলোভন দেখানো অবৈধ। এসব অবৈধ কর্মকা-ের সঙ্গে যদি কোন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান জড়িত থাকে তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যাংকিং আইনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এদিকে রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে একটি সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশীদের বিদেশে স্থাবর সম্পত্তি কেনার জন্য বিদেশে অর্থ পাঠানোয় বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭ অনুযায়ী বিধিনিষেধ রয়েছে। আইন অমান্য করে অবৈধভাবে অর্থ প্রেরণে যোগসাজশকারীদের ভূমিকা আইন অনুযায়ী দ-নীয় অপরাধ। গণমাধ্যমে এ ধরনের বিজ্ঞাপন প্রকাশে সতর্ক ও সংযত হওয়ার পরামর্শও দেয়া হয়। আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট এ্যান্ড হাউজিং এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) পরিচালক (প্রেস এ্যান্ড মিডিয়া) কামাল মাহমুদ জনকণ্ঠকে বলেন, কোন ধরনের অনুমোদন ছাড়া প্রকাশ্যে বিদেশী কোম্পানির এ্যাপার্টমেন্ট প্রলোভন অবৈধ। তিনি বলেন, আমরা খবর নিয়ে জানতে পেরেছি কোম্পানিটি হুন্ডির মাধ্যমে অবৈধ উপায়ে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে এদেশে এসেছে। তাই অনতিবিলম্বে এই প্রচার বন্ধের পরামর্শ দেন তিনি। অনুমোদনহীন এই মেলার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচার হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন রিহ্যাবের মেলা আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যান শাকিল কামালা চৌধুরী। তিনি বলেন, এভাবে অনুমোদনহীন মেলা চলতে থাকলে দেশের অর্থনীতি আরও হুমকির মুখে পড়বে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক উর্র্ধতন কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, এই কোম্পানি এবং তাদের মেলা সম্পর্কে আমাদের কাছে কোন তথ্য নেই। যদি এমন মেলার আয়োজন করা হয় তবে অবশ্য সেটি বন্ধ হবে এবং যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০০৩ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত দেশে এফডিআই এসেছে ৮২৪ কোটি ডলার। আর ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) হিসেবে ওই সময়ে দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ১ হাজার ৩১৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ দেশে আসা এফডিআইয়ের তুলনায় পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় ১৬০ শতাংশ।