ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২০ আগস্ট ২০২২, ৫ ভাদ্র ১৪২৯

পরীক্ষামূলক

ঐতিহাসিক পানাম নগরী

চার শ’ বছরের প্রাচীন জনপদ- লোনা ইট, টেরাকোটায় ধূসর স্মৃতি

প্রকাশিত: ০৫:৫৩, ১৪ জুলাই ২০১৬

চার শ’ বছরের প্রাচীন জনপদ- লোনা ইট, টেরাকোটায় ধূসর স্মৃতি

মোঃ খলিলুর রহমান ॥ ঐতিহাসিক পানাম নগরের নাচঘর, শুনসান নীরবতা...। সেখানে এখন আর নাচে না নর্তকী। বাজে না পায়ের ঘুঙুর। দরবার ঘরে বসে না রসিক নাগরদের মিলনমেলা। দেশ-বিদেশের বণিক আর পর্যটকদের সারি সারি ডিঙি নৌকাও নোঙ্গর ফেলে না এই নগরীর ঘাটে। মেতে ওঠে না কেনাবেচার বর্ণিল উৎসব। ধন-দৌলতে ভরে ওঠে না খাজাঞ্চিখানা। কালের বিবর্তনে আজ হারিয়ে গেছে এ নগরীর জীবনযাত্রা আর বর্ণাঢ্য সব আয়োজন। একই সঙ্গে ভেঙ্গে গেছে আলোকময় জীবনের সাজানো সব খেলাঘর। এইসব অট্টালিকায় এখন আর নেই আগেকার মতো উচ্ছ্বল প্রাণের স্পন্দন। শত বছরের অনাদর অবহেলার চিহ্ন গায়ে মেখে আজও দাঁড়িয়ে আছে অট্টালিকাগুলোর ধ্বংসাবশেষ। পোড়ো বাড়ির ভেতরে ঢুকে কোন শূন্য কক্ষে নীরবে কান পাতলেই কোন্ সুদূর থেকে যেন অস্ফুটস্বরে ভেসে আসে নারীকণ্ঠের সুরেলা আওয়াজ। কালে কালে স্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী এই নগরীর অবশিষ্ট চিহ্ন এক নজর দেখতে বহু দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিন এখানে আসছে অসংখ্য দেশী-বিদেশী পর্যটক। ইদানীং পর্যটকদের তোলা এখানকার নান্দনিক প্রকৃতি ও কারুকার্যময় ভবনের দৃশ্য এবং তার ছবি ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। পানাম নগরের পা রেখেই পর্যটকরা হারিয়ে যাচ্ছে সেই প্রাচীন আমলের দিনক্ষণে। সম্প্রতি এ পানাম নগরীকে সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের আওতায় আনা হয়েছে। পর্যটক-দর্শনার্থীদের জন্য চালু করা হয়েছে টিকিটের ব্যবস্থা। সাধারণ পর্যটকদের জন্য ১৫ টাকা, ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ৫ টাকা, বিদেশী পর্যটকদের জন্য ১০০ টাকা ও সার্কভুক্ত দেশগুলোর পর্যটকদের জন্য ৫০ টাকা হারে টিকেট ধার্য করা হয়েছে। চার শ’ বছরের প্রাচীন এই জনপদ পানাম নগরী। প্রতিনিয়তই আকর্ষণ করছে পর্যটকদের। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের কাছেই পানাম নগর। এই নগরের সরু একটি রাস্তার দু’ধারে চোখ রাখলেই সেই অপূর্ব, নিপুণ কারুকাজে ভরপুর ও নানা ডিজাইনের প্রাচীন সব ইমারত দেখা যায়। কালের সাক্ষী হিসেবে এখনও দাঁড়িয়ে আছে এই নগরীর ৫২টি অট্টালিকাসহ নানা স্থাপনা। লোনা ইট, কালো পাথরের টেরাকোটা ধূসর স্মৃতি নিয়ে অট্টালিকাগুলো দাঁড়িয়ে আছে। পানাম নগরে সরেজিমন গেলে দেখা যায়, নিপুণ কারুকাজখচিত অসংখ্য প্রাচীন ইমারত। এখানে সরু রাস্তার দুই ধারে গড়ে উঠেছিল অট্টালিকা, সরাইখানা, মসজিদ, মন্দির, মঠ, ঠাকুরঘর, গোসলখানা, কূপ, নাচঘর, খাজাঞ্চিখানা, টাকশাল, দরবারকক্ষ, গুপ্তপথ, প্রশস্ত দেয়াল, প্রমোদালয় ইত্যাদি। এখানে আরও দেখা যায় ৪০০ বছরের পুরনো মঠবাড়ি। এর পশ্চিমে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যকুঠি (নীলকুঠি)। রয়েছে পোদ্দারবাড়ি, কাশিনাথের বাড়ি ও আর্টগ্যালারিসহ নানা প্রাচীন ভবন। তবে অধিকাংশ দাঁড়িয়ে আছে জীর্ণ ও ভগ্নাবস্থায়। পানামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পঙ্খীরাজ খাল। এ খাল পানামের গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলো ছুঁয়ে পুবদিকে মেনিখালি নদ হয়ে মেঘনা নদীতে মিশেছে। খালের ওপর আদমপুর বাজারের কাছে রয়েছে মোগল আমলের সেতু (পঙ্খীরাজ সেতু)। তিনটি খিলানের ওপর নির্মিত এ সেতু ১৪ ফুট প্রশস্ত। তলদেশ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ২৮ ফুট এবং দৈর্ঘ্য ১৭৩ ফুট। এ সেতুটি কে কখন নির্মাণ করেন তার কোন সঠিক তথ্য কেউ বলতে পারেনি। শেরশাহের আমলে নির্মিত সোনারগাঁ থেকে সিন্ধু পর্যন্ত প্রায় ৩০০ মাইলের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড ট্রাংক রোডের কিছু অস্তিত্ব পানামে আজও দৃশ্যমান। শুধু বর্ণাঢ্য অনুপম স্থাপত্য ইমারতরাজির জন্য পানাম বিখ্যাত নয়, পানামের সামগ্রিক গুরুত্ব কিন্তু অন্য কারণে। চতুর্দশ শতকে পানাম ও তার আশপাশের গ্রামগুলোতে বিকশিত হয়েছিল এক সমৃদ্ধ চারু কারুকলাজাত শিল্প। যে শিল্পের কারণে পানামের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল এ উপমহাদেশ ছাড়িয়েও পাশ্চাত্যে। বিশ্বখ্যাত মসলিনের আদিস্থান ছিল সোনারগাঁয়। পানাম নগরীতে একদা ছিল মসলিনের বিশাল আড়ং। পৃথিবীখ্যাত মসলিন শবনম, মলমুলখাস, আব-ই-রওয়া উৎপাদিত হতো পানাম নগরের আশপাশ ঘিরেই। জেমস টেলরের মতে, আড়ংয়ের তাঁতখানা সোনারগাঁয়ের পানাম নামক স্থানে ছিল এবং মসলিন শিল্প কেনাবেচার এক প্রসিদ্ধ বাজার ছিল এই পানাম নামক স্থানটি। ৫ মিটার প্রশস্ত ও ৬০০ মিটার দীর্ঘ একটি সড়কের দুই পাশে এক তলা, দোতলা ও তিনতলা দালান রয়েছে পানামে। কিন্তু পানাম নগর হারাতে বসেছে তার ঐতিহাসিক রূপ, সৌন্দর্য ও জৌলুস। এই নগরের অনেক প্রাচীন স্থাপনাই আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যেগুলো আছে সেগুলোর অবস্থাও আজ জরাজীর্ণ। নগরের পুরনো ভবনগুলোর ইট, সুরকি খসে পড়ছে। ভবনের গায়ে জন্ম নিয়েছে শেওলা ও আগাছা। দূর থেকে দেখলে মনে হয় ভুতুড়ে বাড়ি। শুধু কালের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে মাত্র।