ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ২৪ অগ্রাহায়ণ ১৪২৯

monarchmart
monarchmart

টেবিলে বসে দেখা মুনতাসীর মামুনের লেখা -স্বদেশ রায়

প্রকাশিত: ০৩:৫১, ২৪ মে ২০১৬

টেবিলে বসে দেখা মুনতাসীর মামুনের লেখা -স্বদেশ রায়

লেখক মুনতাসীর মামুনকে নিয়ে লিখতে গেলে কোথা থেকে যে শুরু করতে হবে তা ঠিক করাই বেশ কষ্টের। বিচিত্রার লেখালেখির মুনতাসীর মামুন দিয়ে শুরু করা যায়। তবে বিচিত্রার লেখালেখি দিয়ে শুরু করাটা আমার জন্যে একটু মুশকিলের। কারণ, বিচিত্রা কোনদিন আমার প্রিয় পত্রিকা ছিল না। তাই মুনতাসীর মামুন আমাদের প্রথম চমকে দেন, একতাতে তাঁর কলাম ‘সব সম্ভবের দেশ’ লেখা দিয়ে। সব সম্ভবের দেশÑ এটাকে অনেকে দেখি এখন বলেন, বাংলাদেশ সম্পর্কে এটি একটি প্রবাদ। একজন লেখকের জীবদ্দশায় যখন তাঁর কোন কলামের নাম প্রবাদে পরিণত হয়, তখন আর ওই লেখককে নিয়ে কী আর লেখার থাকে? কারণ, লেখক হিসেবে সাফল্যের কোন চূড়ায় গেলে তাঁর কলামের নাম প্রবাদে পরিণত হয় তা মনে বুঝতে কারও কষ্ট হবার কথা নয়। এরপরে আসে মুনতাসীর মামুনের যায়যায়দিন যুগ। তখন আমি সন্ধানীতে। যায়যায়দিন ওই অর্থে তখন সন্ধানীর বাইরে নয়। গাজী ভাইয়ের তখন অনেক উপদেশ থাকত যায়যায়দিনে। তবে তারপরেও তখন আমরা মুনতাসীর মামুনের পাঠক। তখন দেশে সামরিক স্বৈরাচার, পরে এলো বিএনপি স্বৈরাচার। এই দুই সময়ে সামরিক বাহিনীর অনেক অনিয়মের বিরুদ্ধে একাই মুনতাসীর মামুন সাহস করে লিখেছেন। তিনিই মনে হয় প্রথম বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মকে জানিয়ে দিলেন, তাজউদ্দীন নামে আমাদের একজন নেতা ছিলেন। যিনি আমাদের নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের নেতা। বঙ্গবন্ধুর নামে যিনি মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেন অসীম ধীশক্তি নিয়ে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন নিভৃতচারী নেতার উদাহরণ বিরল। মুনতাসীর মামুন জনকণ্ঠের লেখক অনেক দিন থেকে। তখনও আমি জনকণ্ঠে যোগ দেইনি, পাঠকমাত্র। তখন দেখেছি জনকণ্ঠে মুনতাসীর মামুনের কলাম লিড নিউজ হিসেবে ছাপা হয়েছে। এমনকি সে সময়ে ইত্তেফাকেও কয়েক দিন প্রথম পাতায় তার লেখা ছাপা হয়, পরে আবার ইত্তেফাক ইউটার্ন নেয়। টেবিলে বসে মুনতাসীর মামুনের লেখা ছাপার সুযোগ হয় আমার ২০০৯ থেকে। ২০০৯ থেকে ২০১৬ অবধি নিয়মিত মুনতাসীর মামুনের লেখা ছেপে যাবার সৌভাগ্য আমার সাথী হয়ে আছে। মুনতাসীর মামুনের লেখা ছাপতে গিয়ে সব থেকে মজার অভিজ্ঞতা হলো, বিস্তর পাঠকের ধন্যবাদ পাই প্রতি মুহূর্তে, তেমনি এক শ্রেণীর লেখকের বিরাগভাজন হয়েছি। তাঁরা মনে করেন, মুনতাসীর মামুনের লেখা আমি ইচ্ছে করেই বেশি বেশি ছাপি যার ফলে তাঁদের লেখা ছাপি না, তাদের প্রতি আমি সুবিচার করি না। যার টেবিলে বসে যিনি এ কাজ করেন তাঁর জন্যে অনেক বড় অপবাদ। এ অপবাদ আমাকে কত বেশি পোহাতে হয় তার একটি উদাহরণ দেই। একজন সাবেক আমলা কাম লেখক, গাফ্ফার চৌধুরী ভাইকে ফোন করে বলেন, স্বদেশ আগে খুব ভাল ছেলে ছিল কিন্তু এখন জনকণ্ঠে বসে সে অন্য রকম হয়ে গেছে। গাফ্ফার চৌধুরী ভাই বিষয়টি নিয়ে আমার কাছে কোন উত্তর চাননি। কারণ, এ ঘটনা তাকে নিয়েও ঘটে আসছে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে। কারণ শেষ মুহূর্তে গাফ্ফার চৌধুরীর লেখা পত্রিকায় এলে অন্যের লেখা বাদ পড়ে যায়। এটা পত্রিকা বা সম্পাদনার দায়িত্বে যারা থাকেন তাদের জন্যে অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। কারণ, পত্রিকা সেই লেখা আগে ছাপবে যা বেশি মানুষে পড়ে। মুনতাসীর মামুনের লেখা পড়ে সাতক্ষীরার দেবহাটা থানার কোন এক গ্রাম থেকে পাঠক ফোন করেন, বলেন তিনি তিন মাইল হেঁটে গিয়ে জনকণ্ঠ কেনেন মুনতাসীর মামুনের লেখার মতো লেখা পড়ার জন্যে। যেমন সিলেটে এক ব্যক্তি মারা গেছেন, মুক্তিযোদ্ধা, অতি দরিদ্র ছিলেন। তিনি তারপরেও অন্য কাজ ফেলে সাত মাইল হেঁটে জনকণ্ঠ নিয়ে আসতেন মাথায় করে। কোন পারিশ্রমিক ছাড়া বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিতেন জনকণ্ঠ। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল মুনতাসীর মামুন, গাফ্ফার চৌধুরীসহ কয়েক জনের লেখা যেন মানুষ পড়ে। মানুষ যাতে ভুলে না যায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সঠিক রাজনীতির ধারা। যদিও এখানে এ প্রসঙ্গ আনা ঠিক নয়, তবুও বলি ওই মু্িক্তযোদ্ধা মারা গেছেন। মারা যাবার পরে সেখানকার একজন শিক্ষক আমাকে ফোন করে জানান, এই মুক্তিযোদ্ধার ঘটনা ও তার পরিবারের কথা। বিবাহযোগ্য তিন কন্যা রেখে গেছেন তিনি। ঘরটিও পড়ে গেছে ঝড়ে তিনি মারা যাবার পর পরই। মেয়ে তিনটির বিয়ে ও তার ঘরটি তোলার জন্যে কিছু সহযোগিতা করা দরকার। কিছুই রেখে যেতে পারেননি পরিবারের জন্যে দেশের প্রতি ওই নিবেদিতপ্রাণ মুক্তিযোদ্ধা। কথা দিয়েছি তার পরিবারের জন্যে কিছু করার। কিন্তু এখনও জোগাড় করতে পারিনি। শুধু ওই শিক্ষককে বলে রেখেছি, কিছু জোগাড় হলে তাঁর কাছে পাঠিয়ে দেব। মুনতাসীর মামুনের এই সব নিবেদিত পাঠককে চিনতে পারলাম টেবিলে বসে তার লেখা ছাপার পরে। জানতে পারলাম পাঠক কতটা উদগ্রীব হয় তার প্রিয় লেখকের লেখার জন্যে। যখনই মুনতাসীর মামুনের কোন লেখা ধারাবাহিক ছাপা হয় তখনই পাঠক ফোন করে জানতে চান আগামী দিন কী থাকছে তাঁর লেখায়। অনেক বিনয়ের সঙ্গে বলতে হয়, যাতে তিনি বিষয়টি কাল পত্রিকায় দেখেন। কিন্তু বুঝতে পারি তাদের উত্তেজনা। একজন ক্ষুদ্র লেখক হিসেবে একজন ক্ষুদ্র সম্পাদক বা সাংবাদিক হিসেবে এইটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছি যে, সাংবাদিকতার একটি বড় বিষয় সাহস। এই সাহসের ক্ষেত্রে মুনতাসীর মামুনের তুলনা মুনতাসীর মামুনই। সামরিক শাসনের ভিতর বসে তিনি লিখেছেন, সামরিক বাহিনীর অপর্কীতির কথা। যখন মুক্তিযুদ্ধকে ভুলিয়ে দেবার জন্যে সবাই উঠেপড়ে লেগেছে, তখন তিনি শুধু বঙ্গবন্ধুর কথা লেখেননি, তিনি তাজউদ্দীন আহমদের কথাও লিখেছেন সেই দুর্দিনে। সর্বশেষ বাংলাদেশে যখন রাষ্ট্রের একটি বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যক্তির দ্বারা টিরানির ছায়া পড়ে। ডকুমেন্ট নির্ভর লেখা লিখেও আমি ও জনকণ্ঠ সম্পাদক যখন কনটেম্পট অব কোর্ট মামলায় অভিযুক্ত তখন মুনতাসীর মামুন ধারাবাহিক লিখেছেন সত্যের সপক্ষে। এমনকি সুপ্রীমকোর্টে শেষ হয়ে যাওয়া এক শ’ আটষট্টি মামলা যখন পুনঃ শুনানির এডমিনিস্ট্রেটিভ অর্ডার দেয় সিনহা সে সময়ে মুনতাসীর মামুন যে তাত্ত্বিক লেখা লেখেন এ ধরনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তা কেবলমাত্র মুনতাসীর মামুনের পক্ষে সম্ভব। আসলে টেবিলে বসে মুনতাসীর মামুনের লেখা ছাপতে গিয়ে এই অভিজ্ঞতা হলো, মুনতাসীর মামুন কলাম লেখক হিসেবে জনপ্রিয়তায় সবাইকে ছাড়িয়ে যান, কারণ তিনি ঝড়ের পরে আম কুড়ান না, তিনি ঝড় মাথায় নিয়েই আম কুড়ান। [email protected]
monarchmart
monarchmart