আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পুরোদমে চলছে লবণ উৎপাদন
কক্সবাজারে লবণের ভরা মৌসুমে পুরোদমে উৎপাদন কার্যক্রম চললেও ন্যায্যমূল্য না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন প্রান্তিক লবণ চাষিরা। এবারে অর্ধলক্ষ লবণ চাষি ঈদ করতে পারছেন না বলে জানা গেছে। গত বছরের তুলনায় লবণের দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় চরম হতাশা ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন হাজার হাজার লবণ চাষি।
উপকূলজুড়ে দেশের লবণ শিল্পে নিয়োজিত লক্ষাধিক মানুষের ঘামেই পূরণ হচ্ছে দেশের চাহিদা। প্রায় ৪০ হাজার লবণ চাষি ও অর্ধলাখ শ্রমিকের নিরলস পরিশ্রমে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ লবণ উৎপাদন হলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চাষিরা পড়ছেন চরম আর্থিক সংকটে। উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। তবুও শ্রমিকদের বেতন পরিশোধে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
এদিকে একদিন পর ঈদুল ফিতর। চারদিকে উৎসবের আমেজ, বাজারে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়। কিন্তু ক্ষতির মুখে থাকা লবণ চাষিদের ঘরে নেই সেই আনন্দ। বরং দুশ্চিন্তা আর টানাপোড়েন যেন নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। দরজায় কড়া নাড়ছে ঈদুল ফিতর। ঈদে নতুন জামা পরতে কক্সবাজারের বিপণি বিতানগুলোতে ভিড় জমাচ্ছে সব পেশার মানুষ। দুপুর গড়াতেই ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে, যা গভীর রাত পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
জেলা ও উপজেলা সদরের মার্কেটগুলো সেহেরির সময় পর্যন্ত খোলা থাকছে। তবে এই উৎসবময় পরিবেশেও স্বল্প আয় বা লবণে ক্ষতির মুখে থাকা মানুষের মুখে হতাশা স্পষ্ট। পছন্দের পোশাক দেখলেও দাম বেশি হওয়ায় শেষমেষ না কিনেই ফিরে যাচ্ছেন। ঈদগাঁওয়ের গোমাতলীর লবণ চাষি রিদুয়ানুল হক বলেন, গত মৌসুমে ৪০ হেক্টর জমিতে লবণ চাষ করেছিলাম। উৎপাদন খরচ ও বিক্রিতে সামঞ্জস্য না থাকায় মৌসুম শেষে ৩৩ লাখ টাকার মতো লস ছিল।
লবণের মূল্য যাই হোক শ্রমিকদের বেতন ও খাবার খরচ ঠিকভাবে পরিশোধ করতে হয়েছে। আমার মতো একই অবস্থা ছিল সকল লবণ চাষির। তিনি আরও বলেন, এটা বাপ-দাদার পেশা। তাই ছেড়ে দিয়ে চলে যাওয়া যায় না। চলতি মৌসুমেও মাঠে নেমেছি। গত বছরের মতো চলতি মৌসুমেও লবণের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না চাষিরা। মণপ্রতি প্রায় সাড়ে ৩শ’ টাকা খরচের লবণের বাজারমূল্য মিলছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। এতে লস থাকছে প্রায় ১৭০ থেকে ১৫০ টাকা। এবার নির্বাচিত সরকার এলেও এখনো ন্যায্যমূল্য না মেলায় লবণের সঙ্গে সম্পৃক্ত অর্ধলক্ষাধিক পরিবারে গতবারের মতো এবারও ঈদ আনন্দ থাকবে না। যেসব পরিবার সন্তানদের ঈদে অন্তত দুই সেট কাপড় কিনে দিত তারা এবার এক সেট কিনতেই হিমশিম খাচ্ছে।
এদিকে চলতি মৌসুমের চার মাস পেরিয়ে গেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পুরোদমে চলছে লবণ উৎপাদন। কিন্তু চাষিদের চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। নতুন সরকার ক্ষমতা নিয়েছে এক মাস হতে চলল। এখনো লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে কোনো সুখবর আসেনি। মাত্র দুই-আড়াই মাস পর মৌসুম শেষ হবে। এর মাঝে মণপ্রতি ৪০০-৫০০ টাকা না পেলে লোকসানে পড়বেন উপকূলের হাজার হাজার লবণ চাষি। সদরের চৌফলদণ্ডীর লবণ চাষি হারুনুর রশীদ বলেন, গত মৌসুমে দুই একর জমিতে লবণ চাষ করে লোকসান গুনেছি প্রায় তিন লাখ টাকা। এবার পরিমাণ কমিয়ে দেড় একরে চাষ করেছি।
শ্রমিকের বেতন এক লাখ ২০ হাজার টাকা। তার খাবার, জমির লাগিয়াও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা খরচ হবে। এখন যে দামে লবণ বিক্রি হচ্ছে ন্যায্যমূল্য না পেয়ে চরম হতাশায় দিন কাটছে। দেনায় শ্রমিকের বেতন পরিশোধ করেছি, নিজের পরিবারের সদস্যদের জন্য ঈদের কেনাকাটা করা সম্ভব হয়নি এখনো। এভাবে প্রতি মৌসুমে লোকসান গুনতে হলে লবণ চাষ টিকিয়ে রাখা খুবই কঠিন হয়ে পড়বে।
কক্সবাজার চেম্বারের সভাপতি ও লবণ চাষি কল্যাণ সমিতির উপদেষ্টা আবদুল শুক্কুর বলেন, কক্সবাজারে মানসম্মত লবণ উৎপাদন হয়ে আসছে দশকের পর দশক। তবুও ইন্ডাস্ট্রিয়াল লবণের কথা বলে আমদানির কারণে স্থানীয় চাষিরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। এছাড়া ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির অপব্যবহারও বাজারকে প্রভাবিত করছে। তাই আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই, অতি দ্রুত লবণ আমদানি বন্ধ করে চাষিদের রক্ষায় উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
বিসিকের কক্সবাজারের লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভুঁইয়া বলেন, চলতি মৌসুমে লবণ চাষিদের মাঠে নামতে কিছুটা দেরি হয়েছে। তারপরও এখন আবহাওয়া অনুকূলে। পুরোদমে লবণ চাষও হচ্ছে। আশা করি মাঠে লবণ উৎপাদনের পরিমাণ বাড়বে। পাশাপাশি লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে সরকার কাজ করছে। লবণের দাম বাড়লে আগামী মৌসুমে চাষি ও মাঠের পরিমাণ বাড়বে। বিসিক জানায়, গত মৌসুমে ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে উৎপাদত হয়েছিল ২৫ লাখ ২৮ হাজার মেট্রিক টন লবণ। আর চলতি মৌসুমে ২৬ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মাঠে নামা চাষিরা মৌসুমের চার মাসে উৎপাদন করেছে প্রায় ৫ লাখ মেট্রিক টন।
প্যানেল হু








