ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৮ মার্চ ২০২৬, ৪ চৈত্র ১৪৩২

লিভার টিউমারে মৃত্যুর সাথে লড়ছেন বিএনপি কর্মী আত্তাব গাজী

স্বামীর জীবন বাঁচাতে কন্যা সন্তান বিক্রির আকুতি! 

শাহরিয়ার কবির,পাইকগাছা (খুলনা)

প্রকাশিত: ১৯:৩১, ১৮ মার্চ ২০২৬

স্বামীর জীবন বাঁচাতে কন্যা সন্তান বিক্রির আকুতি! 

খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনি ইউনিয়নের রেজাকপুর গ্রামের এক কুঁড়েঘরে চলছে এক হৃদয়বিদারক মানবিক ট্র্যাজেডি। দুরারোগ্য লিভার টিউমারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সাথে লড়ছেন কপিলমুনি ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব আত্তাব গাজী (৪৫)। চিকিৎসার সামর্থ্য নেই, পাশে দাঁড়ানোর মতোও কেউ নেই। অসহায় স্ত্রী শাহিদা খাতুন তাই স্বামীর জীবন বাঁচাতে বুক চিরে বলছেন—প্রয়োজনে একটি কন্যা সন্তান বিক্রি করতেও রাজি তিনি।

বুধবার সকালে সরেজমিনে রেজাকপুর গ্রামে গেলে দেখা যায়, ছোট্ট একটি জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরে চার কন্যা সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন আত্তাব গাজী। দুই কাঠা জমির উপর দাঁড়িয়ে থাকা সেই ঘরটিই তাদের একমাত্র আশ্রয়। অসুস্থ শরীরে বিছানায় শুয়ে থাকা আত্তাব গাজী সাংবাদিকদের দেখে কষ্ট করে উঠে বসেন। মুখে কষ্টের ছাপ, চোখে অনিশ্চয়তার ছায়া।

একসময় এলাকার রাজনীতিতে সক্রিয় এই মানুষটি দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে সামনের সারিতে ছিলেন বলে দাবি করেন। পরিবারের ভাষ্য, এ সময় একাধিক হামলা-মামলার শিকার হন তিনি, বহুবার জেলও খাটতে হয়েছে। সেই রাজনৈতিক জীবনই যেন আজ তার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কথা বলতে বলতে আত্তাব গাজীর চোখ ভিজে ওঠে। তিনি বলেন,“এখন আপনারা সত্যটা লিখবেন। আমার নেতা এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী। দেশে শান্তি আসবে—এই বিশ্বাসই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আমার আর কোনো চাওয়া নেই।”

কিছুক্ষণ থেমে আবার বলেন,“একটা আফসোস আছে—আমার ম্যাডাম বেঁচে থাকতে এটা দেখে যেতে পারলেন না। জীবনের শেষ ইচ্ছা, একবার ম্যাডামের কবর জিয়ারত করবো আর প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করবো।”

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নাম উচ্চারণ করতে গিয়েই আবেগে ভেঙে পড়েন তিনি। কাঁদতে কাঁদতে বলেন,“জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি বিএনপির জন্য নিবেদিত থাকবো। কিন্তু এখন আর শরীরে শক্তি নেই, কোথায় যাবো, কিভাবে যাবো?”

পিতার অঝোর কান্না দেখে বড় মেয়ে সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী মালা (১৪), পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী শারমিন (১১), ছোট খাদিজা (৩) ও আয়শা (২) এবং স্ত্রী শাহিদা খাতুন কান্নায় ভেঙে পড়েন। মুহূর্তেই ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। ভারী হয়ে উঠে আকাশ বাতাস। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এলাকাবাসীরাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
স্ত্রী শাহিদা খাতুন জানান,“রাজনীতি করতে গিয়ে আমাদের সংসারের সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, মাছের ঘের—সব হারিয়েছি। স্বামীকে বহুবার পুলিশ ধরেছে, জেলেও যেতে হয়েছে। তখন চার মেয়েকে নিয়ে কোথাও শান্তিতে থাকতে পারিনি।”

তিনি আরও বলেন,“এখন প্রতিদিন অন্তত ৫০০ টাকার ওষুধ লাগে। সেই টাকা জোগাড় করতে পারি না। কখনো মানুষের কাছে চেয়ে, কখনো না খেয়ে দিন কাটে। যে দলের জন্য আমার স্বামীর আজ এই অবস্থা, সেই দলের কোনো নেতা আমাদের খোঁজও নেয়নি।”

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন,“স্বামীর চিকিৎসা করাতে না পারলে হয়তো তাকে হারাবো। তাই বাধ্য হয়ে ভাবছি—আমার একটি কন্যা সন্তান বিক্রি করে হলেও স্বামীর চিকিৎসা করাবো। আর কোনো পথ খোলা নেই আমাদের সামনে।”

এই কথা বলতে বলতেই তিনি ভেঙে পড়েন কান্নায়। চার কন্যা মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে।

স্থানীয় এলাকাবাসীরাও জানান, আত্তাব গাজী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। অর্থের অভাবে তার চিকিৎসা বন্ধ হয়ে গেছে। তারা দ্রুত মানবিক সহায়তা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

রেজাকপুর গ্রামের সেই ছোট্ট কুঁড়েঘরে এখন শুধু একটাই আর্তনাদ—একজন স্বামী বাঁচতে চায়, এক মা স্বামীকে বাঁচাতে মরিয়া, আর চারটি নিষ্পাপ কন্যা তাকিয়ে আছে অজানা ভবিষ্যতের দিকে।

মানবিক সহায়তার হাত বাড়ালে হয়তো এখনো বাঁচানো সম্ভব একটি জীবন, আর অন্ধকার থেকে আলোয় ফিরিয়ে আনা যেতে পারে একটি অসহায় পরিবারের স্বপ্ন।
ছোট ছোট বালুকণা জমে যেমন একদিন একটি দ্বীপ গড়ে ওঠে, তেমনি আপনাদের সামান্য সামান্য সহায়তার হাতই হয়তো বাঁচিয়ে দিতে পারে একটি নিঃস্ব পরিবারকে। আপনাদের মানবিক স্পর্শে হয়তো আবারও ফিরে পাবে চারটি নিষ্পাপ কন্যা তাদের জন্মদাতা পিতার স্নেহময় ছায়া।

 

রাজু

×