ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

মিলছে না কাক্সিক্ষত সেবা

খুমেক হাসপাতালে তিনগুণ রোগী

প্রবীর বিশ্বাস, খুলনা অফিস

প্রকাশিত: ২১:২২, ৬ মার্চ ২০২৪

খুমেক হাসপাতালে তিনগুণ রোগী

খুমেক হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে রোগীরা ওয়ার্ডের বাইরে ফাঁকা জাযগায় মাদুর পেতে থাকছেন

৫০০ শয্যার হাসপাতাল কিন্তু প্রতিদিন রোগী থাকছে প্রায় তিনগুণ। এরইমধ্যে আবার রয়েছে চিকিৎসক, সেবিকাসহ জনবলের সংকট। হাসপাতাল থেকে নামমাত্র ওষুধ দেওয়ার ফলে নগদ অর্থ দিয়ে দামি ওষুধ কিনতে হচ্ছে বাইরের ফার্মেসি থেকে। একইভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করাতে হচ্ছে অন্য ক্লিনিক কিংবা ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে। এছাড়া অপরিষ্কার অপরিচ্ছন্ন পরিবেশতো রয়েছেই।

এমন চিত্র দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সরকারি স্বাস্থ্যসেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের। নতুন ভবন, চিকিৎসক, সেবিকা ও প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম বৃদ্ধি করা না হলে পর্যাপ্ত সেবা দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। একটু ভালো সেবা পাওয়ার আশায় বিভাগের ১০ জেলা ও গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, ফরিদপুর, পিরোজপুর, ঝালকাঠিসহ আশাপাশের জেলা থেকেও রোগীরা আসেন খুমেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে।

সরেজমিনে দেখা গেল, গত ছয়দিন আগে দোতলার ৪-৫ নম্বর মেডিসিন ওয়ার্ডের আওতায় হার্টসহ বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যা নিয়ে ভর্তি হয়েছেন যশোর জেলার নওয়াপাড়ার শতবর্ষী মোসলেম ফকির। প্রায় অচেতন তিনি। শয্যা পাশে স্ত্রী, মেয়ে, পুত্রবধূসহ নিকটজন। পুত্রবধূ রেশমা বেগম বলেন, আসবার পরই শুনছি সিট দেবে, কিন্তু কবে দেবে জানি না। এইভাবে থাকলে রোগী আরও বেশি অসুস্থ হয়ে যাবে।

শুধু মোসলেম ফকিরই নন, জরুরি বিভাগের সামনের সিড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে রোগী ও স্বজনদের হাঁটাচলার জন্য নির্ধারিত স্থানটিতে ঠাঁই হয়েছে কেশবপুরের আমিন উদ্দিন (৬১) সরদারের, বরগুনার খাদিজা বেগমসহ (৫০) অন্তত অর্ধশত রোগীর। কেননা হাসপাতাল অভ্যন্তরের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে রোগী নেই। কেউ বিছানা করে থাকছেন চলাচলের রাস্তায়, কেউ ওয়ার্ডের বারান্দায় আবার কেউ রোগীর খাটের নিচেই আর একটা বিছানা পেতেছেন।

কেউ আবার সিঁড়ি ঘরের পাশের ফাঁকা জায়গা অথবা যে কোনো একটু ফাঁকে মাদুর পেতে নিচ্ছেন চিকিৎসা। এভাবে হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডের বারান্দাজুড়ে রোগীদের সারি সারি দীর্ঘ লাইন। শুধু শয্যার বিড়ম্বনাই নয়। যত্রতত্র ময়লা রাখায় দূষিত হয়ে উঠছে হাসপাতালের পরিবেশ। রোগীর স্বজন আরিয়া খাতুন বলেন, বাথরুমে যেতে হলে নাক বন্ধ করে যেতে হয়, নিরুপায় হয়েই আমরা যাচ্ছি।

রোগীর সঙ্গে যারা আমরা আছি এই পরিবেশে তারাও অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। সাতক্ষীরা থেকে জটিল রোগ নিয়ে ভর্তি হওয়া খালেক ব্যাপারী বলেন, পরীক্ষা দিয়ে বলেছেন সন্ধানী ক্লিনিক থেকে করাতে। সেখান থেকে প্রায় ছয় হাজার টাকা দিয়ে সব পরীক্ষা করে এসেছি। আর ওষুধ দিচ্ছে নাম মাত্র। সবই কিনতে হয় ফার্মেসি থেকে। রোগীর স্বজন হিরামন ম-ল বলেন, নিচতলা থেকে দোতলায় উঠতে ট্রলি টানতে দুইশ টাকা দিতে হয়েছে। এক ধরনের জোর করেই আয়ারা টাকা নিয়ে নিলো।

এরপর গজ, ব্যান্ডে সবকিছুই নিতে হয়। শুধু তাই নয়, যারা সেবা দেয় তাদেরও দফায় দফায় বকশিস না দিলে হয় না। আর এক রোগীর স্বজন নাসিমা আক্তার বলেন, আমার মায়ের পেটে অপারেশন করতে হবে। সপ্তাহে সপ্তাহে তারিখ দেয়, এক মাস হয়ে গেল কিন্তু হচ্ছে না। এরা বলেছে অপারেশন থিয়েটার কম তাই এমন হচ্ছে। এছাড়া বিকেলে পর আর বড় ডাক্তার পাওয়া যায় না। নার্সদের বার বার ডাকলে রাগারাগি করে।

খুমেক হাসপাতালের আরএমও ডা. সুমন রায় বলেন, ৫০০ শয্যার সবকিছু দিয়ে চলছে তিনগুণের অধিক রোগী ব্যবস্থাপনার কাজ। সে কারণে হয়ত সব রোগীর মন জয় করতে আমরা পারছি না। তবে আমরা সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। মানুষ ভালো সেব পায় বলেই খুলনা বিভাগ ছাড়াও ঢাকা ও বরিশাল বিভাগ থেকে এখানে রোগী আসে। আর হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মো. হুসাইন শাফায়াত বলেন, কখনো এক হাজার সাতশ’ ওপরে রোগী ভর্তি থাকে।

আবার আউটডোরেও রোগীদের সেবা দিতে হয়। মন্ত্রণালয় ও বিভাগ অবকাঠামো, লোকবল, যন্ত্রপাতি, অপারেশন থিয়েটারসহ সব সংকটের কথাই জানেন। তারা ভিজিট করে বার বার দেখেছেন। আমরা প্রতিবেদনেও উল্লেখ করি। তবে পর্যায়ক্রমে সংকট নিরসনের আশ্বাস দিয়েছেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।

×