২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

আট বছরে ডুবে মরেছে কয়েক হাজার রোহিঙ্গাসহ বাংলাদেশী

প্রকাশিত : ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২০
  • সাগরপথে মানবপাচার
  • তবুও থামছে না মানবপাচার

শংকর কুমার দে ॥ বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে পাচারকালে গত আট বছরে সাগরে ডুবে মারা গেছে কয়েক হাজার রোহিঙ্গাসহ বাংলাদেশের নাগরিক। আলোচ্য সময়ে মানবপাচার হয়েছে লক্ষাধিক। এ সময়ে মানবপাচারের অভিযোগে মামলা হয়েছে প্রায় ছয় হাজার। সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী উদ্যোগ নেয়ার পরও মানবপাচার বন্ধ হচ্ছে না। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় মানবপাচার বন্ধ হচ্ছে না। প্রতি বছরই সাগরে ডুবে মারা যাচ্ছে রোহিঙ্গাসহ বাংলাদেশের নাগরিকরা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশ থেকে সাগরপথে মালয়েশিয়া ও ইউরোপে মানবপাচার করা হচ্ছে। আর সাগরপথে পাড়ি দিতে গিয়ে অনেকেই প্রাণ হারাচ্ছে। পাচারকারী চক্রের প্রলোভনে অভিবাসন প্রত্যাশীরা প্রতি বছরই ভূমধ্যসাগর ও বঙ্গোপসাগরে প্রাণ হারাচ্ছে। কিন্তু মানবপাচারের সঙ্গে জড়িতরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরেই। ’১২ সালে মানবপাচার আইন হয়। এই আইন প্রণয়নের পর থেকে ৮ বছরে প্রায় ৬ হাজার মানবপাচারের মামলা হয়েছে। এ সময় সাগরে ডুবে মারা গেছে কয়েক হাজার রোহিঙ্গাসহ বাংলাদেশের নাগরিক। মানবপাচারের অভিযোগে যেসব মামলা হয়েছে তার অধিকাংশেরই এখন পর্যন্ত বিচার হয়নি, যা দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। মানবপাচার রোধে যথেষ্ট পদক্ষেপ না নেয়ায় কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মানবপাচার প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে ‘টায়ার-২ ওয়াচ লিস্টে’ রাখা হয়েছে। মানবপাচারের দিক থেকে বাংলাদেশের স্থান অনেক উপরে উঠে আসছে।

পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, মঙ্গলবার সমুদ্রপথে পাচারকালে ইঞ্জিনবোট ডুবিতে ১৫ রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে, উদ্ধার হয়েছে ৭৫ নিখোঁজ রয়েছে ৪৫ জন রোহিঙ্গা নিখোঁজ থাকার ঘটনায় আবারও মানবপাচারের বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। মানবপাচারের অভিযোগে ইঞ্জিনবোট ডুবির ঘটনায় ১৯ দালালের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় মামলা করেছে কোস্টগার্ড। এর মধ্যে ৮ জন দালালকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অবৈধভাবে সাগর হয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রাকারী রোহিঙ্গাদের বহনকারী একটি ইঞ্জিনবোট মঙ্গলবার কক্সবাজারের সেন্টমার্টিনের অদূরে ডুবে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। সেন্টমার্টিনের কাছে সাগরে রোহিঙ্গাদের বহনকারী ইঞ্জিনবোট ডুবির ঘটনায় জীবিত উদ্ধার চারজনসহ মোট ৮ দালালকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার রাতে ও বুধবার সকালে পুলিশ অভিযান চালিয়ে টেকনাফের বিভিন্ন এলাকা থেকে এজাহারভুক্ত ৪ আসামিকে গ্রেফতার করে। এর আগে ইঞ্জিনবোট ডুবির ঘটনায় উদ্ধার হওয়া চারজনকেও এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এদের মধ্যে দুজন রোহিঙ্গা, বাকি ৬ বাংলাদেশী।

পুলিশ সদর দফতর সূত্র মতে, মানবপাচারের টার্গেট এখন মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় রোহিঙ্গারা। এ লক্ষ্যে পাচারকারীরা রোহিঙ্গা যুবক ও তরুণীদের নানা প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে ক্যাম্পের বাইরে এনে সুবিধামতো জায়গায় জড়ো করা হয় এ তথ্যের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে অন্তত ৫ শতাধিক মালয়েশিয়াগামী রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। অবৈধ পন্থায় সাগরপথে মালয়েশিয়া পাড়ি দিতে গিয়ে ২০১৩-১৪ সালে কয়েক হাজার বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা সাগরে ডুবে মারা গেছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছে কয়েক হাজার। প্রশাসনের কঠোর নজরদারিতে একপর্যায়ে মানবপাচার প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। তবে সম্প্রতি ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে পাচারকারী চক্র। উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে কৌশলে পালিয়ে দালালের হাত ধরে রোহিঙ্গারা মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করছে। গত বছরও মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় ধরা পড়েছে শতাধিক রোহিঙ্গা। আর সাগরপথে মালয়েশিয়া যাত্রাকালে গত ৬ মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হাতে উদ্ধার হয়েছে পাঁচ শতাধিক রোহিঙ্গা। গত বছরের ৬ নবেম্বর ফের মানবপাচারকারী চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠার প্রমাণ পাওয়া যায়। সেদিন টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের উপকূল থেকে মালয়েশিয়াগামী ১৪ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করে বিজিবি। দালালচক্র মালয়েশিয়া নেয়ার কথা বলে দুদিন সাগরে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে থাইল্যান্ডের তীরে পৌঁছেছি বলে টেকনাফ সৈকতে নামিয়ে দেয় তাদের। বিজিবি পরে তাদের উদ্ধার করে। পরদিন ৭ একইভাবে আরও ৩৩ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুকে উদ্ধার করে কোস্টগার্ড। ছয় স্থানীয় দালালকেও আটক করা হয়। গত বছর অন্তত ২০ দফা কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা থেকে ৪৮১ রোহিঙ্গা ও ২ বাংলাদেশীকে উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এদের বেশিরভাগই নারী।

প্রথমদিকে টেকনাফ-মিয়ানমার আন্তঃসীমান্তে মানবপাচারকারী চক্র সক্রিয় থাকলেও পরে কক্সবাজার জেলা পেরিয়ে চট্টগ্রাম ও ঢাকার শহরতলী হয়ে দেশের পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করেছে। এই নেটওয়ার্কের নেতৃত্ব দেয় মিয়ানমার থেকে অবৈধ পন্থায় এসে বসতিগড়া রোহিঙ্গারা। পরে স্থানীয় প্রভাবশালীসহ বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ মানবপাচারে জড়িয়ে পড়ে। এমনকি নেটওয়ার্কটি বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে মিয়ানমার থাইল্যান্ড মালয়েশিয়া ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এই নেটওয়ার্কের সদস্যরা অপহরণের পর বিদেশে পাচার করে মুক্তিপণ আদায়, থাইল্যান্ডে দাস শ্রমিক হিসেবে বিক্রি, এমনকি খুনও করে থাকে। এই চক্রের খপ্পরে পড়ে শত শত যুবক নিখোঁজ হয়েছে। যাদের আত্মীয়স্বজন মালয়েশিয়ায় বসবাস করছে, তারাই মালয়েশিয়া যাওয়ার বিষয়ে বেশি আগ্রহী। তারা হুন্ডির মাধ্যমে দালালদের কাছে টাকা পাঠায়। আবার যাদের আত্মীয়স্বজন সেখানে নেই তারাও উন্নত জীবনের আশায়, অবিবাহিত নারীরা বিয়ের প্রলোভনে মালয়েশিয়া চলে যেতে চায়। এক্ষেত্রে তারা ত্রাণসামগ্রী বিক্রি করে টাকা জমিয়ে দালালদের হাতে তুলে দেয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র মতে, ২০১৯ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে তিউনিসিয়া উপকূলে নৌকাডুবিতে ৩৭ বাংলাদেশী নিহত হন। প্রাণে বেঁচে যায় ১৪। জীবিত ১৪ জনকে দেশে ফেরত আনা হয়েছে। এছাড়া ওই বছরই তিউনিসিয়ার উপকূলে ৬৪ বাংলাদেশী দুসপ্তাহের বেশি সময় ধরে নৌকায় ভাসছিল। তাদের তিউনিসিয়া গ্রহণ করতে রাজি হচ্ছিল না। বরং তিউনিসিয়া কর্তৃপক্ষ দেশে ফেরত পাঠানোর কথা ঘোষণা করে। ইতালি যাওয়ার পথে তারা তিউনিসিয়া উপকূলে কর্তৃপক্ষের হাতে ধরা পড়ে। তাদের উদ্ধারে রেডক্রিসেন্ট ও ইউএনএইচসিআরকেও (জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক কমিশন) তিউনিসিয়ার কর্তৃপক্ষ আটকে পড়াদের কাছে যেতে দেয়া হচ্ছিল না। তবে সাগর ভাসাদের ইতালিতে যেতে না দিলেও তিউনিসিয়ায় কাজ করার সুযোগ দেয়ার দাবি করেছিল। তিউনিসিয়ার উপকূলে সাগরে ভাসা বাংলাদেশীরা লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। ওই স্বপ্ন এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। তাই তাদের ইতালি যেতে না দেয়া হলেও তিউনিসিয়ায় কাজ পাওয়ার সুযোগ চাচ্ছে। কারণ কপর্দকশূন্য হয়ে দেশে ফেরার কোন সুযোগ নেই। কিছু দিন তিউনিসিয়ায় কাজ করে কিছুটা খরচ তুলে দেশে ফিরতে চান তারা।

পুলিশ সদর দফতরের এক উর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, গত কয়েক বছরে সাগরপথ দিয়ে হাজারও মানুষের মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে যাওয়ায় বাংলাদেশ বিশ্বজুড়ে খবর হয়েছিল। মিয়ানমার থেকে ’১৭ সালে ফের বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার বাংলাদেশে প্রবেশ পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা গত কয়েক মাসে পাচারকালে অনেক নারী ও শিশুকে উদ্ধারও করেছে। দেশের অভ্যন্তরেও মানবপাচার থেমে নেই। সরকার মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমনে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (এনপিএ ২০১৮-২২) গ্রহণ করেছে। মানবপাচার বিষয়ক মামলাগুলোর নিষ্পত্তি করতে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। মানবপাচার নিয়ে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ গ্রহণ করা উচিত। পাচারকারীদের দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলে মানবপাচারকারী চক্রের হাত থেকে মানবপাচার কমে আসতে পারে।

প্রকাশিত : ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২০

১৪/০২/২০২০ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: