২৪ জানুয়ারী ২০২০, ১১ মাঘ ১৪২৬, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

জঙ্গী দমনের অজুহাতে বিদেশী হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র তৈরির চেষ্টা

প্রকাশিত : ৮ ডিসেম্বর ২০১৯
  • দুই জঙ্গীর মাথায় আইএস টুপি- গভীর চক্রান্ত
  • জামায়াত-শিবির কানেকশন

গাফফার খান চৌধুরী ॥ গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গী হামলা-মামলার রায়ের পর দুই জঙ্গীর মাথায় আইএসের মনোগ্রাম সংবলিত টুপি পরার ঘটনা গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। এমন ষড়যন্ত্রের সঙ্গে দেশী-বিদেশী চক্র জড়িত। মূলত দুই জঙ্গীর মাথায় আইএসের মনোগ্রাম সংবলিত টুপি পরিয়ে, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠন আইএসের তৎপরতা আছে বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। জঙ্গীবাদ দমনের অজুহাতে বিদেশী হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র তৈরি করতেই পরিকল্পিত যড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এমন ঘটনা ঘটানো হয়েছে; যার নেপথ্যে কাজ করেছে জামায়াত-শিবির। হলি আর্টিজানে হামলার পর আইএসের ব্যান্ড পরিহিত জঙ্গীদের ছবি প্রকাশ এবং পরবর্তীতে বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনায় আইএসের নামে দায় স্বীকারের অংশ হিসেবেই সর্বশেষ এমন ঘটনা ঘটানো হয়েছে। জঙ্গীবাদ বিশেষজ্ঞ এবং আইএসের টুপির উৎস জানতে গঠিত তদন্ত কমিটি সূত্রে এমনটাই জানা গেছে। প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশান-২ এর ৭৯ নম্বর হলি আর্টিজান রেস্তরাঁ ও বেকারিতে জঙ্গী হামলায় বনানী থানার ওসি সালাহ উদ্দিন খান ও গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল করিম ছাড়াও ১৭ বিদেশী ও তিন বাংলাদেশী নিহত হন। সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানে পাঁচ জঙ্গীর মৃত্যু হয়। কমান্ডোরা জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করেন তিন বিদেশীসহ ১৩ জিম্মিকে। সব মিলিয়ে আগে ও পরে হলি আর্টিজানে জিম্মি দশা থেকে ৩৩ জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি সারা দুনিয়াকে কাঁপিয়ে দেয়।

এর পর চলতি বছরের ২৭ নবেম্বর হলি আর্টিজান হামলা-মামলার রায় ঘোষণার পর আদালতের ভেতরেই মৃত্যুদ-প্রাপ্ত সাত জঙ্গীর মধ্যে রাজীব গান্ধী ও রকিবুল হাসান রিগ্যান আইএসের মনোগ্রাম সংবলিত টুপি পরিধান করে বাংলাদেশে খেলাফত (ইসলামী শাসন) প্রতিষ্ঠা হবে বলে সেøাগান দেয়। এমন ঘটনার পর দ্বিতীয় দফায় সারা দুনিয়ায় হৈচৈ পড়ে যায়।

জঙ্গীদের কাছে আইএস লেখা সংবলিত টুপি যাওয়ার পুরো কাহিনী উদঘাটন করতে গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। কারা কর্তৃপক্ষের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান কর্নেল আবরার হোসেন জানান, কারাগার থেকে ওই টুপি যায়নি।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান ডিবির যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম জানান, মামলার রায়ের দিন কারাগার থেকেই জঙ্গীরা আইএসের মনোগ্রাম সংবলিত তিনটি টুপি নিয়ে আসে। যার মধ্যে দুটি ছিল কালো। অন্যটি সাদা। তিনটি টুপির মধ্যে মামলার রায় ঘোষণা শেষে আদালত থেকে বের হওয়ার সময় দুই জঙ্গী দুটি মাথায় দেয়। কারাগার থেকে বের হওয়ার সময় তল্লাশি করা হয়েছে। তবে তাদের কাছে যে টুপি ছিল তা রেখে দেয়া হয়নি। বরং নির্বিঘেœ তাদের টুপি নিয়ে আসতে দেয়া হয়েছে। কারারক্ষীরা হয়ত বুঝতেই পারেনি এটা বিশেষ কোন টুপি। নামাজের টুপি ভেবে তারা ছেড়ে দিয়েছে হয়ত। রায় শোনার পর দুই জঙ্গী টুপি উল্টো করে পরিধান করে। আর তাতেই আইএস লেখা বেরিয়ে আসে। আইএস টুপি বিতর্কের পর তদন্তের স্বার্থে রিগ্যানকে অনেক সংস্থা জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তবে রিগ্যান একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্য দিয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে জঙ্গীদের আইএস লেখা টুপি সরবরাহ করা হয়েছে। আর সেই টুপি যাতে তারা রায়ের পরে মাথায় পরিধাণ করে স্লোগান দেয়, এজন্য রীতিমত তাদের ব্রেন ওয়াশ করা হয়েছে। এজন্য রায়ের আগে রিগ্যান ও রাজীব গান্ধী কোন্ কোন্ কারাগারে কাদের সঙ্গে ছিল, তাদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এছাড়া পুরো প্রক্রিয়াটির সঙ্গে কারাগারের কোন ব্যক্তি জড়িত কিনা সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এটি গভীর ষড়যন্ত্র।

কারণ কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে জঙ্গীদের আদালতে হাজির করা হয়। কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা পর্যন্ত নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের সঙ্গে কোন সাধারণ মানুষ তো দূরে থাক, আইনজীবী, পুলিশ এমনকি সাংবাদিকদেরও দেখা করতে দেয়া হয়নি। এজন্য কারও পক্ষেই এমন টুপি সরবরাহ করা সম্ভব নয়।

ধারণা করা হচ্ছে, কারাগারে আসার আগে বহুদিন ধরে রিগ্যান ও রাজীব গান্ধীকে ব্রেন ওয়াশ করা হয়েছে। তারই অংশ হিসেবে তারা আইএস লেখা টুপি সরবরাহ করে। তারা ভেবেই নিয়েছিল, রায় কেমন হতে পারে। তবে সাজার ওপর টুপি পরিধান করা বা না করার কোন সম্পর্ক নেই। তাদের সাজা কম হলেও তারা টুপি পরিধান করে স্লোগান দিত। বাংলাদেশে থাকা আইএসের অনুসারীদের চাঙ্গা রাখতে এবং বহির্বিশ্বে জঙ্গী সংগঠনটির তৎপরতা থাকার তথ্য প্রচার করতেই এমনটা করা হয়েছে। তবে সরকারের তরফ থেকে বারবারই বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আইএসের কোন তৎপরতা নেই। তবে জঙ্গী সংগঠনটির অনুসারী আছে। রিগ্যানের দেয়া জবানবন্দীর বরাত দিয়ে এবং অন্যান্য বিষয় বিশ্লেষণ করে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, আইএস লেখা সংবলিত টুপি সরবরাহের সঙ্গে দেশী-বিদেশী চক্র জড়িত। আন্তর্জাতিক চক্রান্তের অংশ হিসেবে জামায়াত-শিবির টুপিগুলো সরবরাহ করেছে। এক্ষেত্রে জামায়াত-শিবির তাদের নিজস্ব লোক শিবির কর্মী রিগ্যানকেই বেছে নিয়েছে। ২০১৩ সালে বগুড়ার করতোয়া মাল্টিমিডিয়া স্কুল এ্যান্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এ প্লাস পেয়ে এসএসসি পাস করে রিগ্যান। তখনই শিবির তাকে টার্গেট করে। পূর্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০১৪ সালের শেষদিকে ক্লাস ফ্রেন্ড মেহেদী হাসান শুভ রিগ্যানের নাম পরিবর্তন করে মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ নামে ফেসবুক আইডি খুলে দেয়। ফেসবুক খুলে দেয়ার পর থেকেই তার ওপর নজরদারি করতে থাকে শিবিরের স্থানীয় শাখা।

পরিকল্পনা মোতাবেক ফেসবুকে সাব্বির (২৫) নামে এক জনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। সাব্বির নিয়মিত তাকে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সাব্বিরের মাধ্যমেই প্রথমে শিবির পরে জঙ্গীবাদে জড়িয়ে পড়ে। ২০১৫ সালে বগুড়া শাহ সুলতান সরকারী কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হিসেবে এইচএসসি পরীক্ষা দেয় রিগ্যান। পরীক্ষার ফল বের হওয়ার আগেই বগুড়া সরকারী আযীযুল হক কলেজের ছাত্র শিবিরের নেতা মোহাম্মদ রেজ্জাকুল রিগ্যানকে শিবির পরিচালিত রেটিনা কোচিং সেন্টারে ভর্তি করে দেয়। কোচিং সেন্টারে এক মাস মেডিক্যাল ভর্তির কোচিং করে। এক মাসের মধ্যেই রিগ্যানের পুরোপুরি ব্রেন ওয়াশ করে কোচিং সেন্টারের শিক্ষক হিসেবে থাকে জঙ্গী প্রশিক্ষকরা। তারা রিগ্যানকে পুরোপুরি মোটিভেট করতে সক্ষম হয়।

রিগ্যান জঙ্গীবাদে উদ্বুদ্ধ হওয়ার পর তিনি নিজেও বগুড়ার আদমদীঘির ছাত্র শিবিরের নেতা মাসুদ ও শিহাবকে দলে ভেড়ায়। জঙ্গী নেতাদের কথামত রিগ্যান মাসুদ ও শিহাবকে সঙ্গে নিয়ে ২০১৫ সালের ২৩ জুলাই কোচিং সেন্টারে যাওয়ার কথা বলে বগুড়ার শেরপুর বাসস্ট্যান্ডে যায়। সেখানে সাব্বির নামের সেই জঙ্গী তিন জনকে অন্য একজনের মাধ্যমে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়।

শিহাব ২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল রাজধানীর কলাবাগান থানাধীন ৩৫ নম্বর আছিয়া নিবাসের দ্বিতীয় তলার বাসায় ঢুকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির খালাত ভাই, ইউএসএআইডি কর্মকর্তা জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু নাট্যকর্মী মাহবুব রাব্বী তনয় হত্যা এবং ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর ঢাকার মোহাম্মদপুরে শুদ্ধস্বর প্রকাশনীতে হামলা করে তিনজনকে হত্যার চেষ্টা করে এবং একইদিন রাজধানীর আজিজ সুপার মার্কেটে জাগৃতি প্রকাশনার প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে গলাকেটে হত্যার সঙ্গে জড়িত।

রিগ্যানের মাধ্যমে শিবির থেকে জঙ্গী হওয়া মাসুদ ২০১৬ সালে ২৩ অক্টোবর হোসেনী দালানে বোমা হামলার আগের রাতে ২২ অক্টোবর রাজধানীর গাবতলীর আমিনবাজারে চেকপোস্টে তল্লাশিকালে ছুরিকাঘাতে দারুস সালাম থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক (এসএসআই) ইব্রাহিম মোল্লা হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার ছাত্র শিবিরের সভাপতি হিরণ পুলিশ কর্মকর্তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। আর মাসুদ বগুড়া আদমদীঘি উপজেলা ছাত্র শিবিরের সাথী। তাদের দেয়া বোমা দিয়ে হোসেনী দালানে তাজিয়া মিছিলে হামলা হয়। তদন্তকারী সংস্থার দায়িত্বশীলরা বলছেন, টুপি সরবরাহের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের জড়িত থাকার বিষয়টি প্রায় শতভাগ নিশ্চিত।

জঙ্গীবাদ নিয়ে কাজ করা বিশিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব) আব্দুর রশিদ বলছেন, রায়ের পর দুই জঙ্গীর আইএস লেখা টুপি পরিধান করার ঘটনাটি গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ হলি আর্টিজান থেকে শুরু করে পরবর্তীতে বড় বড় যত হামলার ঘটনা ঘটেছে, প্রত্যেকটির দায় স্বীকার করে আইএসের নামে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে। যদিও সেসব দায় স্বীকার করার সঙ্গে সত্যিকার অর্থে আইএসের কোন যোগসূত্রের সত্যতা মেলেনি। স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াত-শিবির থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক কোন্ কোন্ গোষ্ঠী হলি আর্টিজানে হামলার পর থেকেই বাংলাদেশে আইএসের তৎপরতা আছে বলে বার বার অভিযোগ এমনকি প্রমাণ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু তা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এজন্য তারা মরিয়া হয়ে পড়েছে। তারা বাংলাদেশে জঙ্গীবাদ দমনের অজুহাতে নানাভাবে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। আর তাতে সহযোগিতা করছে জামায়াত-শিবির।

সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশে আইএসের তৎপরতা থাকার মিথ্যা তথ্যকে নানাভাবে সত্য বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে পরিকল্পিতভাবে দুই জঙ্গীর ব্রেন ওয়াশ করে তাদের কাছে আইএসের মনোগ্রাম সংবলিত টুপি সরবরাহ করেছে। রায় ঘোষণার পর তারা যাতে সেই টুপি পরিধান করে, সেজন্যও তাদের ব্রেন ওয়াশ করা হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায়ই ঘটনাটি ঘটেছে।

প্রকাশিত : ৮ ডিসেম্বর ২০১৯

০৮/১২/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: