১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

এবার যুবলীগে আসছে একঝাঁক নতুন মুখ !

প্রকাশিত : ১৮ নভেম্বর ২০১৯

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ এবার দেশের বৃহৎ যুব সংগঠন যুবলীগের পালা। সংগঠনটিতে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ ‘বুড়ো’দের বিদায় নিশ্চিত হয়েছে অনেক আগেই। বয়সের ফাঁদে পড়ে বাদ যাচ্ছেন সংগঠনের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতাই। বুড়োদের বিদায় নিশ্চিতের পর নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে আওয়ামী যুবলীগে।

অপেক্ষাকৃত একঝাঁক তরুণ প্রস্তুতি নিচ্ছেন নেতৃত্বে আসার। তরুণ, যুববান্ধব ও সৎ নেতৃত্ব গঠনে উদ্যোগী হয়েছেন আওয়ামী লীগ হাইকমান্ড। যুবলীগের হৃতগৌরব ও ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি সংগঠনকে আরও গতিশীল করতে এবারের যুবলীগের সপ্তম জাতীয় কংগ্রেসে থাকছে বড় চমক। সংগঠনকে ঢেলে সাজাতে নতুন কমিটিতে তরুণ ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব নিয়ে আসার পাশাপাশি কোন দুষ্কর্মকারীরই ঠাঁই মিলবে না। এক্ষেত্রে ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের মধ্য থেকেই বেছে নেয়া হতে পারে সংগঠনের নতুন কমিটি।

সূত্রে জানা গেছে, এরইমধ্যে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুবলীগের নতুন নেতৃত্ব খুঁজছেন। যারা সংগঠনের দুঃসময়ে পাশে ছিলেন, দলে পরীক্ষিত, ত্যাগী, ক্লিন ইমেজ ও সাংগঠনিকভাবে দক্ষ এমন অনেক নেতার প্রোফাইল এখন সাংগঠনিক নেত্রী শেখ হাসিনার হাতে। দলীয় ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে যুবলীগের ইমেজ ফিরিয়ে আনতে এসব নেতার বিষয়ে অনুসন্ধান এবং সাংগঠনিক দক্ষতার বিষয়ে অনুসন্ধান করছেন তিনি। এর মধ্যে থেকে বাছাই করে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির ও সাংগঠনিক দক্ষতাসম্পন্ন দু’জনকে যুবলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হবে। একইসঙ্গে যুবলীগ ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণেরও নতুন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে নতুন ক্লিন ইমেজের নেতৃত্ব বাছাইয়ের প্রক্রিয়া চলছে।

নতুন সম্মেলন মানেই নতুন মুখ। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনের ধারাবাহিক সম্মেলনে এটি পরিষ্কার হয়ে গেছে। কৃষকলীগ, শ্রমিকলীগ, সবশেষ স্বেচ্ছাসেবক লীগে নতুন নেতৃত্ব এনেছে আওয়ামী লীগ। কৃষকলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের শীর্ষ নেতৃত্বে ছাত্রলীগের সাবেক নেতারাই স্থান পেয়েছেন। আর এই তিনটি সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনের নতুন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে বিগত কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা নেতারাই পদোন্নতি পেয়েছেন। তবে যুবলীগের ক্ষেত্রে সভাপতি পদে ওই সংগঠন থেকে নাকি বাইরে থেকে কাউকে আনা হচ্ছে- এ নিয়ে সর্বত্রই চলছে জোর আলোচনা।

যুবলীগের সম্মেলনে কেমন নেতৃত্ব আসছে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, নতুন সম্মেলন মানেই নতুন মুখ। সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী অঙ্গ সংগঠনকে ঢেলে সাজানো হবে। অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটিয়ে আমরা দলকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব। এখানে পরিবর্তন হবে, নতুন মুখ আসবে।

যুবলীগে ‘বুড়ো’দের নেতৃত্বে থাকার দিন শেষ হয়েছে। ৫৫ বছরের উর্ধে কেউ যুবলীগের নেতৃত্বে থাকতে পারবেন বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বয়সের ফাঁদে পড়ে স্থায়ী ঠিকানা হারানোর দুশ্চিন্তায় দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন বুড়িয়ে যাওয়া নেতারা। তবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আসার ক্ষেত্রে বয়সসীমা বেঁধে দেয়ায় সাবেক ছাত্র নেতাদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে। সংগঠনের চেয়ারম্যান ও সাধারণ সম্পাদক পদে প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে যারা কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না, বয়সসীমা নির্ধারণের পর তারা আলোচনার পুরোভাগে চলে এসেছেন। যাদের বেশিরভাগ সৎ, সাংগঠনিকভাবে দক্ষ, ত্যাগী ও পরীক্ষিত।

আগামী ২৩ নবেম্বর শনিবার সকাল এগারোটায় ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুবলীগের সপ্তম জাতীয় কংগ্রেসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কংগ্রেসে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে দ্বিতীয় অধিবেশনেই যুবলীগ থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নেবেন ৫৫ বছরের বেশি বয়সী সব নেতা। ইতোমধ্যে যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীকে অব্যাহতি দিয়ে চয়ন ইসলামকে আহ্বায়ক করে কংগ্রেস প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদকে সদস্য সচিব হিসেবে রাখা হলেও বয়সসীমার কারণে নতুন কমিটিতে তিনিও বাদ পড়ছেন।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, যুবলীগের ৩৫১ সদস্যের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটিতে হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া সবার বয়স ৫৫ বছর পেরিয়েছে। কারও কারও বয়স সত্তরের কোঠা ছাড়িয়েছে। সর্বোচ্চ পাঁচ নেতাও খুঁজে পাওয়া যাবে না, জাতীয় যুবনীতি অনুযায়ী যাদের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকসহ প্রেসিডিয়ামের ২৭ নেতার বেশিরভাগেরই বয়স ৬০ বছর পেরিয়ে গেছে। ’৭২ সালের ১১ নবেম্বর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তারুণ্যনির্ভর যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যুব নেতা শেখ ফজলুল হক মনি। সে সময়ে তার বয়স ছিল মাত্র ৩২ বছর। যুবলীগের প্রথম জাতীয় কংগ্রেসে অনুমোদিত গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ৩৫ বছরের বেশি কারও যুবলীগের সদস্য হওয়ার কোন সুযোগ ছিল না। এরপর আর বয়সসীমা অনুসরণ করা হয়নি। এবার নতুন করে বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এদিকে, যুবলীগের আসন্ন কংগ্রেস সামনে রেখে নতুন উদ্দীপনা নিয়ে নানামুখী তৎপরতা শুরু করেছেন পদ-পদবি প্রত্যাশী নেতারা। তারা চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের প্রেক্ষাপটে নিজেদের পরিচ্ছন্ন ইমেজ তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। কংগ্রেসের মাধ্যমে ইতোমধ্যে যুবলীগের নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। দুর্নীতি ও নানা অপকর্মে জড়িত বিতর্কিতরা নেতৃত্ব থেকে বাদ পড়বেন। সৎ, দক্ষ, পরীক্ষিত ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতারা প্রাধান্য পাচ্ছেন নতুন নেতৃত্ব গঠনে।

বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়দের মধ্যে শেখ ফজলুল হক মনি, আমির হোসেন আমু, শেখ ফজলুল করিম সেলিম যুবলীগের চেয়ারম্যান ছিলেন। অব্যাহতিপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীও বঙ্গবন্ধু পরিবারের আত্মীয়। এসব কারণে কংগ্রেস সামনে রেখে যুবলীগ চেয়ারম্যান পদে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের কোন সদস্য আসছে কি না, সেই আলোচনা সর্বত্র। এর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য ও ঢাকা-১০ আসনের এমপি ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসকে যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যন করার খবর প্রকাশ হয়ে পড়ে। পরে অবশ্য তা আর হয়নি। চেয়ারম্যান পদে আলোচনায় রয়েছেন শহীদ শেখ ফজলুল হক মনির বড় ছেলে অধ্যাপক শেখ ফজলে শামস পরশের নামও। তবে চেয়ারম্যান পদে বাইরে থেকে নাকি যুবলীগের মধ্যে থেকেই কাউকে বেছে নেয়া হবে, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আওয়ামী লীগ হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের ওপর।

নতুন প্রেক্ষাপটে যুবলীগের চেয়ারম্যান পদে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তাদের মধ্যে যুবলীগের বর্তমান কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য আতাউর রহমান, এ্যাডভোকেট বেলাল হোসাইন, ডাঃ মোখলেসুর রহমান হিরুসহ আরও দু’তিনজন। তবে সাধারণ সম্পাদক পদে প্রায় এক ডজন নেতা জোর লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন। সাধারণ সম্পাদক পদে সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছেন তিন যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন আহমেদ মহি, মনজুর আলম শাহীন ও সুব্রত পাল। মহিউদ্দিন আহমেদ মহি বর্তমান কমিটির এক নম্বর যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ছাড়াও আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকতে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি হিসেবে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে সাহসী ভূমিকা পালন করেন।

স্কুলজীবন থেকে ছাত্রলীগের সক্রিয় রাজনীতি করে আসা যুবলীগের অপর যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মনজুর আলম শাহীন যুবলীগের (নানক-আজম) কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি, চট্টগ্রাম বিভাগের ছাত্রলীগের সমন্বয়ক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকতে যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে ঢাকা বিভাগের সমন্বয়কের দায়িত্বও সফলভাবে পালন করেন। ’১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশীও ছিলেন যুবলীগের এই নেতা। তবে আসনটি জোটের শরিক দলকে বরাদ্দ দেয়া হয়।

অপর যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সুব্রত পালেরও রাজনৈতিক জীবন শুরু ছাত্রলীগের মধ্য দিয়ে। তিনিও আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে যুবলীগ নেতা হিসেবে রাজপথে সাহসী ভূমিকা রাখেন। এ তিনজন ছাড়াও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী তালিকায় রয়েছেন তিন সাংগঠনিক সম্পাদক বদিউল আলম, ফজলুল হক আতিক, ফারুক হাসান তুহিন, প্রচার সম্পাদক ইকবাল মাহমুদ বাবলুসহ বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির আরও কয়েকজন। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত শিকদার, বাহাদুর বেপারীসহ বেশ ক’জন সাবেক ছাত্রলীগ নেতার নামও আলোচনায় রয়েছে।

প্রকাশিত : ১৮ নভেম্বর ২০১৯

১৮/১১/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: