১৪ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

জন কিটস ॥ সৌন্দর্য ও জীবন বোধের কবি


জন কিটস ॥ সৌন্দর্য ও জীবন বোধের কবি

জন কিটসকে (১৭৯৫—১৮২১ ) আমরা সুন্দরের পূজারি কবি হিসেবে আখ্যায়িত করে তার প্রতি আমাদের জানাশোনার ইতি টানার এক ধরনের প্রবণতায় ভুগি কিন্তু সৌন্দর্য পিয়াসী ছাড়াও কিটস ছিলেন পরিশুদ্ধ এক দার্শনিক কবি। তিনি কবিদের মধ্যে বিশুদ্ধতম ভাববাদী বা আইডিয়ালিস্ট ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ আর ওয়ার্ডসওয়ার্থ ছাড়া কেউ তার সমকক্ষ ভাববাদী কবি নন। তিনি বিশ্ব সাহিত্যের অন্যতম প্রধান রোমান্টিক কবি যদিও মাত্র চার বছরকাল তিনি সাহিত্য চর্চার সুযোগ পেয়েছিলেন এবং তরুণ বয়সে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং ঐুঢ়বৎরড়হ, ঊহফুসরড়হ, ঞযব ঊাব ড়ভ ঝঃ অমহবং, খধ ইবষষব উধসব ঝধহং গবৎপ ছাড়া তার কবিতা ছিল গুটিকয় গীতি কবিতার (ড়ফব) মাঝে সীমাবদ্ধ কিন্তু তার এই কিঞ্চিৎ সাহিত্য সাধনায় তিনি জীবনের জন্য , মানুষের জন্য এমনকি কালজয়ী সাহিত্যিকদের জন্যে অনন্য কাব্যরস রেখে গেছেন। তার ছোট কবিতাগুলো শুধু কবিতাই নয় বরং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যে সমৃদ্ধ। যদি বলা হয় কিটস রোমান্টিকতার আর নান্দনিকতার একজন বিশুদ্ধতম মানদ- ছিলেন তা ভুল হবে না কারণ শত শত বছর ধরে তার কবিতা প্রভাবিত করে যাচ্ছে বিশ্বজুড়ে অগণন কবি আর পাঠককে। তার কবিতা আমাদের পাঁচ ইন্দ্রিয়ের সকল স্বাদ পরিতৃপ্ত করে ; শব্দের দ্বারা সংবেদনশীল চিত্র ফুটিয়ে তুলতে তার মতো পারদর্শী কবি খুব কম আছে বিশ্ব সাহিত্যে। কিটস পুরো পৃথিবী, সৃষ্টির প্রতিটি বস্তুর মাঝে সৌন্দর্য খুঁজে পেয়েছিলেন বস্তুত সৌন্দর্যই ছিল তার কাছে শেষ সত্য ; আর কিটসের অভিমত ছিল কল্পনার মাধ্যমেই সৌন্দর্যে উপনীত হওয়া যায় । রবীন্দ্রনাথ যেমন তার এক বিখ্যাত গানে বলেছেন- ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা, তুমি আমার সাধের সাধনা, মমশূন্য গগনবিহারী/ আমি আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তোমারে করেছি রচনা।’ শূন্য থেকেই নানান রঙ এনে কিটসও কল্পনাকে রঞ্জিত করে বাস্তবিক জগত ছেড়ে মানসিক জগতে বিভোর ছিলেন। তার বিখ্যাত ইন্ডিমিয়ন শুরু হয় সুন্দরের জয়গান দিয়ে ‘অ ঃযরহম ড়ভ নবধঁঃু রং লড়ু ভড়ৎ বাবৎ’ আবার এ কবিতাতেই কবি গভীর ভাবনায় ডুবে নিঃশব্দ থেকে মধুর গানের ধ্বনি শুনতে পান। অন্যদিকে কিটসকে গ্রিক বলা হতো কারণ তার কবিতার অন্তরাত্মা, প্রেম কাতর চরিত্র থেকে তার কবিতার অনেক উপকরণ গ্রিক সভ্যতা আর সাহিত্য (ইন্ডিমিয়ন ও হাইপেরিয়ন কাব্য ও ওড গুলোতে), চরিত্র আর মিথ সঞ্চারে সৃজিত। কিন্তু গ্রিক প্রেরণার চেয়ে তার নিখাদ কল্পনা, মায়াবী ইংল্যান্ডের প্রকৃতি, কোমল হৃদয়ের ব্যঞ্জনা, স্মৃতি কাতর মন (হড়ংঃধষমরধ), বাস্তব থেকে পলায়নপর মনোভাব, একের পর এক মানসিক আঘাত, না পাওয়া প্রেমিকা ফেনি ব্রনের প্রতি গভীর আসক্তি, সামাজিক অসঙ্গতি, দুর্নিবার আবেগ আকাক্সক্ষা, বাবা, প্রিয় ভাই টমের অকাল মৃত্যু তার হৃদয়কে এত বেশি বিদীর্ণ করেছিল যে তিনি ভেতর থেকে খুব বেশি দুর্বল হয়ে পড়েন অসহায়-প্রাণ কিটস সত্য জগৎ ত্যাগ করে আর সব রোমান্টিক কবিদের মতো কল্পনায় আকাশচারী হয়ে ভাবের জগতে নিমজ্জিত হয়েছিলেন। কল্পনার স্বপ্নিল রাজ্যে বিহার করে কিটস সামান্য থেকে অসামান্য এক জীবনের মায়াভরা রূপ আর সান্নিধ্যে ডুবে ছিলেন। স্বপ্ন বিহারী কবির কল্পনা, মায়া আর নিরালোক এক অসম্ভব মোহিনী জগতের সৃষ্টি করেছিল । ওড টু সাইকি কবিতা দিয়ে যার স্বপ্নে বিচরণ বাস্তবকে বিদায় দিয়ে ; ওড অন আ গ্রেসান আর্ন (ঙফব ড়হ ধ এৎবপরধহ টৎহ), নাইটিংগেল (ঙফব ঃড় ধ ঘরমযঃরহমধষব), মেলাংকলি (ঙফব ঃড় গবষধহপযড়ষ) তে তার বিষাদের সম্যক পূর্ণতা। আর ঙফব ঃড় অঁঃঁসহ এ স্বপ্ন বিভোর কবির ঘুম ভাঙ্গে ; তিনি নির্বস্তু থেকে বস্তুগত জগতে অবতরণ করেন। তার শেষ চারটি বিখ্যাত গীতি কবিতাই ক্রমান্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন দর্শন দাঁড় করায়। তার কবিতাগুলো আপাতদৃষ্টিতে বেদনা বিলাস মনে হতে পারে কিন্তু তা নয় এ শুধুই আকাশে স্বপ্নের বপন নয়। জীবনের হতাশায় কবি আকণ্ঠ নিমজ্জিত বেদনায় তাই কল্পনার মিথ্যা আশ্বাসে তার অদৃশ্য কবিতার জাদুতে ধ্যানের রাজ্যে বিহার কিন্তু যে কবি বেদনাকে ভুলতে মিথ্যাকে , কল্পনাকে সাথী করে নিজের মনকে ধোঁকা দিয়ে নাইটিংগেল পাখির কুহকি নিবাসে উড়ে গেলেন এবং এই মৃত্যু প্রবণ, জরা আসন্ন, সৌন্দর্য বিনাশী বাস্তব বা সত্য জীবনকে অস্বীকার করলেন তিনি আবার কল্পনার উল্টো রথে ফিরে আসেন এই মর্তে। অটাম গীতি কবিতায় (ঙফব ঃড় অঁঃঁসহ) কবি মোহের আবাস ছেড়ে এই মর্তকে স্বীকার করে নেন ; পৃথিবীতে দুঃখ , বেদনা, ক্ষয় আর সৌন্দর্যের মৃত্যু আছে কিন্তু এই প্রবহমান জীবনও নিছক অমূল্য নয়। এ যেন সেই অবিনাশী সত্যকে মেনে নেয়া বেদনা ছাড়া সুখের অনুভূতি কখনো উপভোগ্য হতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছিলেন - ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহবদন লাগে/ তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।’ কিংবা যেমন আরেক স্থানে জীবনের পূর্ণতার স্বার্থে মৃত্যুকে স্বীকার করেন এইভাবে- ‘কাঁপে ছন্দ ভালোমন্দ তালে তালে/ নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু, পাছে পাছে।’

কিটসের কল্পনার উদ্দেশ্যে মানসিক অভিযাত্রা শুরু হয় ওড টু সাইকি দিয়ে (ঙফব ঃড় চংুপযব) প্রেমের দেব, দেবী- কিউপিড-সাইকি, আলো আঁধারির সুরভীত নিকুঞ্জ, ভালবাসার উষ্ণ আলিঙ্গনে আবদ্ধ দুই প্রেমাত্মা যেন রাধা-কৃষ্ণের কথা মনে করিয়ে দেয়। আধা- বাস্তব আর আধ্যাত্মের মিলন প্রেমকাতরতা কিটসের বাস্তব থেকে অপ্রকৃত জগতে মানসিক ভ্রমণের ইঙ্গিতবাহী।

ঙফব ড়হ ধ এৎবপরধহ টৎহ কবিতাটি কিটসের ভাবনার প্রাচুর্যে ভরপুর। কবি মন নিজের অজান্তেই বাস্তব ত্যাগ করে কল্পনার দেশে আবাস গড়ে তুলে - কবি যেন এক্ষেত্রে বাস্তব বিস্মৃত হয়ে কল্পনাতেই বেশি আচ্ছন্ন। অতৃপ্ত কবি মানস কল্পনার আতিশয্যে একটি আর্ন (টৎহ) বা শবাধারে অঙ্কিত চিত্র দেখে মুগ্ধ হয়ে চিত্রের প্রেমমুগ্ধ দুই যুবক যুবতীর প্রেমকে , আর চিত্রপটের বসন্ত ঋতুকে বাস্তবের চেয়ে বেশি প্রাণরূপী মনে করেন। শুধু তাই নয় কবি শিল্পকে বলেন মানব জীবনের চেয়ে বেশি দীর্ঘস্থায়ী। কিটস তার অল্পকালীন জীবনে সীমাহীন বেদনা পেয়েছিলেন। কম বয়সে তার বাবার মৃত্যু , তার মায়ের অন্যখানে বিয়ে করা, তার ভাইয়ের অকাল মৃত্যু আর যাকে ভালবেসেছিলেন সেই চপলা ফ্যানি ব্রনের মায়ের কিটসের প্রতি অনীহা; এই সব মানবিক সঙ্কট কবি জীবনকে অতলস্পর্শী বেদনায় ঠেলে দেয়। তাছাড়াও তার কবিতা নিয়ে সেই কালের সমালোচকদের ছিল চরম বিদ্বেষপূর্ণ ধারণা; তার হাইপেরিয়ন ও এন্ডিমিয়ন ভীষণভাবে সমালোচিত হয়; কোমল হৃদয় কিটস সমালোচনার বাণে ভীষণভাবে বিদ্ধ হন। কিন্তু এতসব সত্ত্বেও কবি আরও বেশি নিবিড়ভাবে কবিতায় নিমগ্ন হয়ে পড়লেন ; জাগতিক বেদনা ভুলতে কবির আশ্রয় তাই শুধু কাব্যসাধনায়। রবীন্দ্রনাথ যেমন তার বেদনা ভুলতে গানকে তার অন্তরঙ্গ সঙ্গী করে নিয়েছিলেন তেমনি। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেন- ‘কণ্ঠে নিলাম গান /আমার শেষ পারানির কড়ি / একলা ঘাটে রইবো না গো পড়ি।’ কিটসও তেমনি কবিতাতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন তাই কিটস ঙফব ড়হ ধ এৎবপরধহ টৎহ কবিতায় দ্বিধাহীন চিত্তে বলেন শিল্প, জীবনের চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য; আর শিল্পের জীবন মরণশীল জীবনের চেয়ে উৎকৃষ্ট। তিনি গ্রেসান আর্নকে (টৎহ) বলেন নিঃশব্দের চিরকুমারী। কবি গ্রিসের সেই শবাধারে অঙ্কিত প্রেমরত দুই তরুণ তরুণীর প্রেমকে চিরজীবী বলেন কারণ মরণশীল মানুষের প্রেমের একদিন চির সমাপ্তি ঘটে কিন্তু শিল্পের প্রেম অমর হয়ে থাকে- যে প্রেমিক তার প্রেমিকাকে চুম্বনরত তাদের চুম্বনের উষ্ণতা কোনদিন ম্লান হবে না। যে প্রেমিক তার প্রেমিকাকে বাহুতে বাঁধতে চাইছে চিরদিন তাদের ভালবাসা অমর হয়ে থাকবে। যে বালক গাছের নিচে বসে বাঁশি বাজাচ্ছে তার সুর কোনদিন শেষ হবে না -না শোনা বাঁশির ধ্বনি কল্পনার তৃপ্তিতে তা আরো সুমধুর হয়ে যায় কবির কাছে ; তাই কবি বলেন- ‘শ্রুত ধ্বনি মধুর কিন্তু অশ্রুত ধ্বনি মধুরতর।’ এন্ডিমিয়নে কিটস একই কথা বলেন- ঃড় যরং পধঢ়ধনষব বধৎং. ঝরষবহপব ধিং সঁংরপ ভৎড়স ঃযব যড়ষু ংঢ়যবৎব ওয়ার্ডওয়াথর্ও একই কথা ভিন্নভাবে বলেন- ঝবিবঃবংঃ সবষড়ফরবং ধৎব ঃযড়ংব ঃযধঃ ধৎব নু ফরংঃধহপব সধফব সড়ৎব ংবিবঃ বাস্তবের সঙ্গে কবি এই চিত্রের জীবন তুলনা করেন- তার শব্দযুগল নঁৎহরহম ভড়ৎবযবধফ, ধহফ ধ ঢ়ধৎপযরহম ঃড়হমঁব পৃথিবীতে বেদনাক্লিষ্ট মানব জীবনের ব্যথাতুর উপস্থাপনা কিন্তু চিত্রের জীবন শুধু সুখময়; কবির উপলদ্ধি - ‘সাহসী প্রেমিক যদিও আঁকতে পারে না চুম্বন/ তবু হতাশ হয়ো না / সে কখনো বিবর্ণ হবে না/ থামবে না সুখময় কম্পন/ এ প্রেম চিরজীবনের তুমি চিরপ্রেমিক আর সে চির চির সুন্দর।’ এভাবেই কল্পনা, চেতনা দিয়ে ভাববাদীরা না পাওয়াকে রঙ, সুর দিয়ে মধুর করে তুলেন; রূপ সাগরে ডুব দিয়ে অরূপের সাক্ষাত পান। ছবির প্রেমিকযুগলের প্রেমের শিহরণ, উত্তেজনা কিটসের মনকে প্লাবিত করে বাস্তবের কবি শিল্পের ভিতর প্রবেশ করে কল্পলোকের বাসিন্দা হয়ে যান। এটা প্রায়ই বলা হয়ে থাকে কিটস বস্তুর ভিতর দিয়ে জীবনকে উপলদ্ধি করেন; সাধারণ চিত্র,বই,নক্ষত্র,পৌরাণিক কাহিনী, গাছ, ফুল, হেমন্তের পরিপুষ্ট রূপ এগুলো অবলোকন করতে করতে কবি নিঃশব্দে মোহলোকে চলে যান : কিন্তু কল্পনার অলীক ভুবন বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়না তাই গ্রেসান আর্নের শেষ অংশে এসে কবি এটাকে ‘শীতল গ্রাম্যগাথা’ (পড়ষফ ঢ়ধংঃড়ৎধষ) বা ‘অদ্ভুত আকৃতি’ বলেন। অনেক প্রশ্ন দিয়ে কবিতাটি শেষ হয়। বাস্তব আর কল্পনার প্রশ্নে কবি শেষ অবধি যেন দ্বিধান্বিতই থেকে যান।

ওড টু আ নাইটিংগেল কিটসের শ্রেষ্ঠতম কবিতা। ছন্দে, গোথিক পরিবেশ সৃষ্টিতে, ইন্দ্রিয়কে চূড়ান্তভাবে পরিতৃপ্ত করতে, বাস্তবের মাঝে অতীন্দ্রিয় সত্তা জাগিয়ে তুলতে, নিরাভরণ প্রকৃতির নিটোল বর্ণনায় , অপ্রাকৃত আবেশ সৃষ্টিতে আর কল্পনার অসামান্য মোহনীয়তায় কবিতাটি শিল্পের মাঝে শিল্প হয়ে যায় ; শিল্পের জন্য শিল্প (ধৎঃং ভড়ৎ ধৎঃং ংধশব) তত্ত্বকে সর্বাঙ্গীণভাবে নাইটিংগেল কবিতা ধারণ করে। গ্রেসান আর্নে যেমন গ্রিক মিথের ব্যবহার আছে নাইটিংগেলেও তেমনি মিথকে বাস্তবের সঙ্গে মিশিয়ে কবি এক পরাবাস্তব, কুহকী আবেশে নিবদ্ধ। রোমান্টিক কবিরা ব্যক্তিক অভিজ্ঞতাকে নৈর্ব্যক্তিকে নিয়ে চেতনার প্রসারণ ঘটান। কিটসের কবিতাগুলোতে সেটি পরিলক্ষিত হয় পুরোমাত্রায়। কবিতাটি বিভীষিকাময়, যন্ত্রণাকাতর জীবন থেকে মুক্তি লাভের তীব্র আকাক্সক্ষা দিয়ে শুরু হয়। গ্রিক মিথ চরিত্র মদের দেবতা বাক্কাসের ইন্ধনে কবি ইন্দ্রিয়কাতর হয়ে বাস্তবকে ভুলে যান নাইটিংগেলের মদির গান শুনে; বেদনাকে ভুলে থাকতে। নাইটিংগেলের গান কবি মন আসক্তিপূর্ণ করে, কবি মন আফিম খেয়ে বিস্মৃতির লিদ নদীতে ডুবে যেতে চায়। কিটসের অসাধারণ উক্তি- ‘কী ব্যথা হৃদয়ে বাজে! সেই সঙ্গে অবশ আবেশ/ চেতনা জড়ায়ে আনে কোন বিষ করেছি কি পান/ অথবা আফিমের সুরাপাত্র করেছি নিঃশেষ।’ এভাবে কবি নাইটিংগেলের গানের মায়ায় স্বপ্নছায়াময় কল্পনার রাজ্যে তলিয়ে যান। কারণ এ পৃথিবী শুধু বেদনার, হতাশার নাম মাত্র। কবি হৃদয় মানুষের সীমাহীন বেদনায় পিষ্ট; তাই নাইটিংগেলের গানে আশ্রয় নিয়ে করুণ জীবনের ছবি আঁকেন কবি- ‘এই ক্লান্তি, এই জ্বরতাপ, এই হাহাকার/ এখানে মানুষ বসে বসে শুনে এক অপরের চিৎকার।’ ‘সুন্দর তার লাস্যময়ী চোখে / ঝরে যাওয়া প্রেম তাই শুধু চেয়ে দেখে।’ কবির বেদনা এক থেকে সার্বজনীন হয়ে যায়। তাই কবি এই নশ্বরলোক ছেড়ে অবিনশ্বরে বিলীন হতে চান। কবিতার পাখায় ভর করে কবি অদৃশ্য লোকে চলে যান- ‘নেশায় মত্ত হয়ে সাথীদের নিয়ে নয়/ চলে যাবো আমি অদৃশ্য কাব্য পাখায়।’ নাইটিংগেলের সুমধুর গান কবির মনে মৃত্যু বাসনা জাগায়। কবি এতো বেশি বেদনাদগ্ধ কবির মনে হয় এই জ্বলন্ত পৃথিবীর চেয়ে মৃত্যুজ্বালাও শ্রেয়তর মনে হয়- ‘কতো কতো সময় আমি অর্ধেক মৃত্যু নিয়ে ছিলাম মগ্ন / কামনায় ছিলাম আরামদায়ক মৃত্যুর জন্য।’ কিন্তু কবির এ মরণ চিন্তা স্থায়ী হয়না; নাইটিংগেলে গান কবিকে নিরাশ করে কবি বুঝেন কল্পনার শক্তি নেই যে কল্পলোককে সত্য বানাবেন। গ্রেসান আর্নে কবি যেমন চিত্রকলাকে স্থায়ী আর মানুষের জীবনকে ক্ষণস্থায়ী ভেবেছিলেন নাইটিংগেলেও কবি নাইটিংগেলের গানকে চিরস্থায়ী বলেন কারণ হাজার বছর ধরে নাইটিংগেলের সুমধুর গান মানুষ শুনে গেছে ; মানুষ মরণশীল কিন্তু নাইটিংগেলের গান অমর। কবির স্বপ্নভঙ্গ হয় যখন নাইটিংগেল উড়ে চলে যায়। নাইটিংগেলের গান শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে কবি মর্তে ফিরে আসেন। কবি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে ভাবেন তিনি স্বপ্নে না জাগরণে ছিলেন। । তাই কবি দ্ধিধাগ্রস্ত হয়ে ভাবেন- ‘এ কি শুধু ভাবনা না ঘুম জাগরণ/ পলাতক গান- এটা কি ঘুম না জাগরণ।’ কবির সমর্পণ ঘটে বাস্তবতার কাছে; কল্পনার এতো শক্তি নেই যে সে তার নিজের সত্য জগত সৃষ্টি করে নিবে। কিটসের আবার স্বপ্ন থেকে, তন্দ্রা থেকে বাস্তবে পদার্পণ ঘটে।

ঙফব ড়হ গবষধহপযড়ষু বেদনার প্রতি গীতি কবিতা কিটসের বাস্তব-কল্পনা দ্বন্দ্বে নতুন মাত্রা যোগ করে। স্বপ্ন বিভোর কবি বেদনা ও আনন্দের নতুন তাৎপর্য খুঁজে পান। তাড়িত কবি বেদানক্লিষ্ট এ ভেবে যে প্রতিটা সুন্দর জিনিস একদিন নিঃশেষিত হয়ে যাবে; আর আনন্দ ক্ষণকালের। কবি বেদনা বুঝতে বেদনার কাছে যেতে নিষেধ করেন; বরং দুঃখ বুঝতে আনন্দের কাছে যেতে বলেন স্ববিরোধী মনে হলেও এটা সত্য। কারণ যে মুখ আনন্দে হাসছে সে মুখ কিছুক্ষণ পরেই আনন্দ হারিয়ে বেদনায় নুয়ে পড়বে; আনন্দ ক্ষণস্থায়ী আর বেদনা চিরন্তন। আনন্দ নিমিষেই উদ্বায়ী হয়ে বেদনা হয়ে যায় ; কবির গুরুত্বপূর্ণ অনুভব আনন্দ আর বেদনার বাস একসঙ্গেই। কবির দারুণ উপলদ্ধি- ‘প্রেমিকার সুন্দর রূপ একদিন শেষ হয়ে যায়/ আনন্দ সবসময় তৈরি বলতে বিদায়।’ ঙফব ড়হ গবষধহপযড়ষু তে কিটস তার কল্পনা আর বাস্তবের সংঘাত থেকে জীবনের বিশেষ অর্থ লাভ করেন। তিনি সুন্দরের পূজারি আর জীবনের ক্ষয়, আনন্দের ক্ষণস্থায়িত্ব তাকে অনন্ত বেদনায় জর্জরিত করছিল কিন্তু মেলাংকলি কবিতায় এসে কবি জীবনকে পরিবর্তিত ভাবনায় দেখতে শেখেন। কবি সুন্দরের ক্ষণস্থায়িত্ব, আর আনন্দের স্বল্পকালীন সত্যকে মেনে নেন - তার বিখ্যাত উক্তি -রহ ঃযব াবরষবফ ঃবসঢ়ষব ড়ভ উবষরমযঃ / ঠবরষবফ গবষধহপযড়ষু যধং যবৎ ঝড়াৎধহ ংযৎরহব- ‘আনন্দের মন্দিরে গুপ্ত বেদনার তীর্থ।’ কবি এই উল্লেখযোগ্য কবিতায় আনন্দ ও বেদনার সহাবস্থান মেনে নেন। ‘গ্রেসান আর্ন ও নাইটিংগেল কবিতায় বাস্তব বিমুখ কবি বুঝতে পারেন কল্পনা হতে পারে বর্ণিল, স্বপ্নিল, মনোরম কিন্তু বাস্তব ক্ষণস্থায়ী হলেও সবচেয়ে সত্য। কবি ধ্যানের যাত্রায় বাস্তবকে মেনে নেন সত্য নির্মম হলেও তা অনস্বীকার্য। কবির ধপযরহম ঢ়ষবধংঁৎব আনন্দ ও বেদনাকে পাশাপাশি রাখার প্রত্যয় দেখায়। রবীন্দ্রনাথের- ভালবাসার ঘায়ে, মধুর বেদনা- জীবনের সুখ-দুঃখকে পাশাপাশি রাখে , কিটসও তেমনি ‘বেদনাময় আনন্দ’ পান এই জীবন থেকে; জীবনের স্বার্থেই আমাদের আনন্দ আর বেদনার সহাবস্থান মেনে নিতে হবে। ‘রূপ নারানের কূলে’ রবীন্দ্রনাথ বাস্তব কঠোর হলেও তা মেনে নেন বাস্তবের প্রতি রবীন্দ্রনাথের অবিচল আস্থা ফিরে আসে ‘সত্য যে কঠিন, সে কঠিনেরে ভালবাসিলাম।’ ঙফব ঃড় অঁঃঁসহ কবিতায় কিটস নাইটিংগেল আর গ্রেসান আর্নের মায়ালোক থেকে মুক্ত হয়ে অলিক কল্পনাকে মুক্তি দিয়ে এই মাটির ডাকে সাড়া দেন। উচ্ছ্বসিত কবি মন হেমন্তের সোনালি একটি দিনে এই বস্তু জগতে পরিতৃপ্ত হয়ে স্বর্গের চিহ্ন খুঁজে পায়। রূপ, যৌবন ভরা হেমন্ত ঋতু তার ফল, ফসল, সৌন্দর্য আর পরিপুষ্টতা নিয়ে কবিকে আলোড়িত করে। যে কবি সত্য পৃথিবীকে ত্যাগ করে শূন্য আকাশে বিহার করে মায়াবী সুধায় মগ্ন হয়ে গিয়েছিলেন মেলাংকলি কবিতায় এসে তার মোহভঙ্গ ঘটে তিনি মেলাংকলি কবিতায় জীবনের বেদনা আর ভঙ্গুরতাকে জীবনের অনিবার্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করেন। এন্ডিমিয়নে কবির বিখ্যাত উক্তি ‘আমি ছিলাম শূন্যে ঝুলন্ত, কিছুই ভালবাসিনী, দেখেছি কেবল মায়া,এটা ছিল শুধুই এক স্বপ্ন।’ (‘ও যধাব পষঁহম ঃড় হড়ঃযরহম, / ষড়া’ফ হড়ঃযরহম, হড়ঃযরহম ংববহ/ঙৎ ভবষঃ নঁঃ ধ মৎবধঃ ফৎবধস!’) কালের অভিযাত্রায় কিটসের চিন্তার বিবর্তন ঘটে অসাড় চেতনা জগতের সীমাবদ্ধতা কবি বুঝতে পারেন ফাঁপা কল্পনাকে বিদায় জানান কবি এর চিহ্ন কবি নাইটিংগেল কবিতাতেই রেখে যান ‘ বিদায়, বিদায় মায়া আর বিভ্রান্ত করবে না আমাকে।’ রবীন্দ্রনাথ যেমন তার কল্পনাকে বলেন ‘ এ শুধু অলস মায়া, এ শুধু মেঘের খেলা’ কিংবা ‘আমি কেবলই স্বপন করেছি বপন বাতাসে / তাই আকাশকুসুম করিনু চয়ন হতাশে।’ কিটসও কুহকের রাজ্য থেকে হতাশ হয়ে এই বস্তু জগতে ফিরে আসেন কিন্তু তার এই কল্পনা ভ্রমণ নিরর্থক হয় না কারণ বাস্তব থেকে কল্পনা আবার কল্পনা থেকে বাস্তবে ফিরে এসে জীবনের জন্য মূল্যবান অভিজ্ঞতা নিয়ে আসেন। কিটসের বিরাট দ্বিধা দূর হয়ে যায় জীবনের মলিনতা জীবনকে আরও সজীব করে ; কিটসের নির্বাণ ঘটে কল্পনা-বাস্তবতা, স্থায়ী-অস্থায়ী, জীবন ও শিল্প, বস্তু ও চেতনা এগুলোর মাঝে মেল বন্ধন ঘটে। জীবন ছোট ও মরণশীল কিন্তু তাৎপর্যহীন নয় মৃত্যু যেমন অমোঘ জীবনও গুরুত্বপূর্ণ আর জীবন পুরোপুরি বস্তুবাদীও নয় ভাববাদীও নয় বরং দু’টোর ভারসাম্যপূর্ণ চমৎকার সংমিশ্রণ এটা কিটসের অন্তর্গত চেতনার কাব্যিক দর্শন।