২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

স্বচ্ছ শরীরের ব্যাঙ


ব্যাঙ আমাদের অতি পরিচিত প্রাণী। গ্রামাঞ্চলে পুকুর-ডোবায় তো বটেই, সন্ধ্যার পর বাড়ির উঠোনেও নিশ্চিন্তে লাফিয়ে বেড়ায় ব্যাঙ। ব্যাঙের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ ডাক তাই সবার কাছেই খুব পরিচিত। কিন্তু এই ব্যাঙই যদি হয় একদম অপরিচিত? কথাটা অদ্ভুত লাগছে তো?

আসলে আমরা সচরাচর যেই ব্যাঙ দেখি, তার বাইরেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে রয়েছে নানা ধরনের ব্যাঙ। তাদের মধ্যে কিছু আবার খুব বিস্ময়কর। সে রকমই এক ধরনের বিস্ময়কর ব্যাঙ হচ্ছে গ্লাস ফ্রগ। একবার ভাবুন, একটা ব্যাঙ লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছে, আর আপনি তার শরীরের ভেতরে হৃৎপিণ্ডটাকেও লাফাতে দেখছেন বাইরে থেকেই। শুধু হৃৎপিণ্ড নয়, তার শরীরের ভেতরের সবকিছুই আপনি দেখতে পাচ্ছেন স্পষ্ট। কেমন হবে বিষয়টা?

কল্পনা নয় কিন্তু! সত্যিই এমন এক প্রজাতির ব্যাঙ রয়েছে, যাদের শরীর কাচের মতোই স্বচ্ছ। বাইরে থেকে শরীরের ভেতরের সবকিছু স্পষ্টভাবে দেখা যায়। আর এই কারণেই এদের বলা হয় গ্লাস ফ্রগ বা কাচ ব্যাঙ।

গ্লাস ফ্রগ সচরাচর দেখা যায় না। এই শব্দটা এবং এই প্রাণীটা- দুটোই আমাদের কাছে অপরিচিত। আমাদের দেশে এই প্রাণীটি নেই। গ্লাস ফ্রগ পাওয়া যায় মেক্সিকো থেকে পানামা, ভেনিজুয়েলা, টোবাগো দ্বীপ, বলিভিয়া, এ্যামাজন জঙ্গল, দক্ষিণ-পূর্ব ব্রাজিল এবং উত্তর আর্জেন্টিনায়। অবশ্য বিশ্বের আরও কিছু প্রান্তে নানা প্রজাতির গ্লাস ফ্রগ দেখা যায়।

গ্লাস ফ্রগ ঈবহঃৎড়ষবহরফধব পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত যেই প্রজাতিটি প্রথম আবিষ্কৃত হয়, সেটি হলো ঈবহঃৎড়ষবহব মবপশড়রফবঁস। ১৮৭২ সালে ইকুয়েডরে প্রথম এই প্রজাতির গ্লাস ফ্রগ খুঁজে পাওয়া যায়।

প্রথমদিকে সাধারণ গেছো ব্যাঙের সঙ্গে একই পরিবারে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও ১৯৪৫ সালে গ্লাস ফ্রগের জন্য আলাদা পরিবার প্রস্তাব করেন এডওয়ার্ড এইচ টেইলর।

পুরো পৃথিবীতে গ্লাস ফ্রগের প্রায় ৫০টি প্রজাতি রয়েছে। এই ব্যাঙগুলোর গায়ের রং সাধারণ উজ্জ্বল সবুজ হয়। তাদের পেটের দিকটা থাকে স্বচ্ছ কাচের মতো। ফলে সহজেই তাদের হৃৎপিণ্ড, যকৃৎ ইত্যাদি বাইরে থেকেই দেখা যায়।

মজার বিষয় হলো, অনেক গবেষণা করার পরেও বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত হতে পারেননি ঠিক কী কারণে গ্লাস ফ্রগের পেটের দিকের চামড়া স্বচ্ছ।

গ্লাস ফ্রগ আকারে ছোট হয়। এরা সাধারণত ৩ সেন্টিমিটার থেকে ৭.৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে।

গ্লাস ফ্রগ দেখতে অনেকটা সাধারণ ব্যাঙের মতোই। তবে পেটের কাছে স্বচ্ছ হওয়া ছাড়াও সাধারণ ব্যাঙের সঙ্গে এই ব্যাঙগুলোর আরও কিছু পার্থক্য রয়েছে। সাধারণ ব্যাঙের চোখ দুই পাশে থাকলেও গ্লাস ফ্রগের চোখ থাকে সাধারণত সামনের দিকে। ইনফ্রারেড কালার ফটোগ্রাফি দিয়ে পরীক্ষা করা হলে দেখা যায় গ্লাস ফ্রগ পরিবারের দুটি প্রজাতির ব্যাঙ ইনফ্রারেডের কাছাকাছি আলো (৭০০-৯০০ ন্যানোমিটার) প্রতিফলন করতে পারে।

গ্লাস ফ্রগ সাধারণত গাছেই থাকে। তবে প্রজননের সময়ে তারা নদী-নালা বা হ্রদের পাশে বসবাস করে। গ্লাস ফ্রগ ডিম পাড়ে গাছের পাতায় কিংবা হ্রদ বা নদীর ওপর ভাসমান লতাপাতায়। তবে একটা প্রজাতি ডিম পাড়ে হ্রদের কাছাকাছি পাথরের ওপরে। গ্লাস ফ্রগ সাধারণত বর্ষাকালের পর ডিম পাড়ে। এরা একসঙ্গে ২০-৩০টি ডিম পাড়ে। ডিম পাড়ার পর সেই ডিম পাহারা দেয়। তবে মেয়ে ব্যাঙ ডিম পাহারা দেয় না। ডিম পাড়ার পর তারা চলে যায় এবং সমস্ত দায়িত্ব গিয়ে পড়ে পুরুষ ব্যাঙের ওপর। তারা ডিম ফোটার আগ পর্যন্ত দিন-রাত সেগুলো পাহারা দেয়। কোন পোকামাকড় ডিমের খুব কাছাকাছি এলে সেগুলোকে তাড়িয়ে দেয়। ডিম ফুটতে সাধারণত দুই সপ্তাহ সময় লাগে। ডিম ফুটে ব্যাঙ্গাচি বেরুলে সেগুলো পানিতে গিয়ে পড়ে।

প্রজননের সময় ছাড়া কিছু প্রজাতির গ্লাস ফ্রগ বনে-জঙ্গলে থাকে। এই ধরনের ব্যাঙদের মূল খাবার ছোট ছোট পোকা এবং মাকড়সা। গ্রাস ফ্রগের মূল শত্রু সাপ, পাখি এবং কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণী। তবে সাধারণত এরা রাতের বেলায় বাইরে বের হয়। তাই তারা শিকারী প্রাণীর কাছে ধরা পড়ে না। দিনের বেলায় বেরোলেও তারা তাদের সবুজ শরীর গাছের পাতার সঙ্গে মিশিয়ে নিজেদের আলাদা করতে পারে।

একটি গ্লাস ফ্রগ ১০ থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত বাঁচে।

গ্লাস ফ্রগ বায়ো-ইন্ডিকেটর হিসেবে কাজ করে। বায়ো-ইন্ডিকেটর হচ্ছে সেসব প্রাণী যারা নিজেদের বাসস্থানের পরিবেশের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। গ্লাস ফ্রগ মূলত ক্লাউড এবং রেইন ফরেস্টের বাসিন্দা। এদের পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা এ ধরনের বনের ওপর বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাব সম্পর্কে জানতে পারেন। বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে এ ধরনের বনগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। ফলে গ্লাস ফ্রগের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে।

প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি গ্লাস ফ্রগ। প্রকৃতি যে কতটা বিস্ময়কর ও রহস্যময়, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এই ছোট্ট প্রাণীটি।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এ্যান্ড কলেজ

একাদশ শ্রেণি (ইংরেজি ভার্সন)

সূত্র : ন্যাশনাল জিওগ্রাফি