১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

শৌখিন জমিদার শশীকান্তের বাড়ি


রাত প্রায় দেড়টা- মাথায় চাপে ঘোরার নেশা। রাত জাগা মানুষ- দুইজন ঘুরবাজকে- রিং দেই, আর মাত্র তিন ঘণ্টা পরে ঘর হতে বের হব শুনে একজনের পিছুটান আরেকজন প্রস্তুত। সময় বেঁধে দেই ভোর সাড়ে চারটা -মাশাআল্লাহ্ সে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আমাদের বাড়ি বাদামতলী বিলাসে এসে হাজির। সেই গার্ড রুম থেকে ড্রাইভারকে ডেকে তুলে সঙ্গে কলিংবেল চেপে আমাকেও- কি অদ্ভুত! এ রকম ভ্রমণ পাগলা আছে বলেই তো ‘এদেশ এখনও স্বপ্ন দেখে’ পর্যটন শিল্পে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে আমার বাংলাদেশ। ঘুরবাজের সরব উপস্থিতিতে আমি ঝটপট রেডি কিন্তু ঘুম কাতুরে চালকের জন্য কিছুটা দেরী। এর পরেও সকাল ৬টার মধ্যে বেরিয়ে পড়ি। ছুটি ধান-নদী- মহিষের শিং এই তিনে মিলে গড়া ময়মনসিংহ, যেখানে খুশি সেখানে থামি, সুযোগ বুঝে দু-চারটা ছবি তুলি। ছুটির দিন হওয়াতে চিরচেনা যানজটের গাজীপুর সড়ক, রয়েছে অনেকটাই ফাঁকা। ফোরলেনের সড়ক পেয়ে গাড়ি চলে ১১৫ কি.মি. স্পিডে। ময়মনসিংহ শহরের কর্মব্যস্ত মানুষগুলোর ঘুম ভাঙ্গার আগেই আমরা পৌঁছে যাই একদা জমিদার শশীকান্ত আচার্যের প্রায় দুই শত বছর পুরনো শশীলজ নামক বাড়িতে যা ময়মনসিংহের রাজবাড়ী নামে সমাধিক খ্যাত। শশীলজের ফটকে নিরাপত্তার দায়ীত্বে থাকা উপস্থিত আনসার সদস্যর নিকট অনুমতি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করি।

বাড়ি ভেতর ঢুকতেই ফুলেল সুবাসে মন জুড়িয়ে যায়। প্রথমেই চোখ আটকায় গ্রিক দেবী ভেনাসের স্বল্পবসনা ¯œানরতা মর্মর মূর্তির প্রতি। এর নির্মাণ শৈলীই জমিদারের রুচি বহন করে আসছে যুগ যুগান্তর। ঢাকা থেকে এসেছি জেনে একজন আনসার সদস্য ঘুরে ঘুরে বাড়ির বিভিন্ন স্থাপনাসমূহের তথ্য জানালেন। মোট নয় একর জায়গার উপরে লালচে-হলুদ রঙা ইট দিয়ে গাঁথা ১৬টি গম্বুজ বিশিষ্ট দ্বীতল বাড়িটি নির্মিত। বাড়ির সম্মুখে উঠোনজুড়ে রয়েছে বাগান। শশীলজ নামক বাড়িটির মূল প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী। তাঁর একচল্লিশ বছর শাসন আমলে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে ময়মনসিংহ শহর পেয়েছিল নান্দনিক সৌন্দর্য। ১৮৯৭ সালের ১২ জুন গ্রেট ইন্ডিয়ান ভূমিকম্পে বিখ্যাত শশীলজ বাড়িটি বিধ্বস্ত হলে অত্যন্ত মানসিকভাবে কষ্ট পান জমিদার সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী। ১৯০৫ সালে ঠিক একই স্থানে নতুনভাবে শশীলজ নির্মাণ করেন পরবর্তী জমিদার শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী। নবীন জমিদারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় শশীলজ হয়ে উঠে আনিন্দ্য সুন্দর আরো বেশি দৃষ্টিনন্দন। শশীলজের বিশাল ফটকসহ মার্বেল পাথর দিয়ে ঘাটলা বাঁধা পুকুর রয়েছে। শুনেছি সেই পুকুরে নাকি বড় বড় কিছু মাছ রয়েছে যা ঠিক সন্ধ্যার সময় টিপ টিপ বৃষ্টি ঝড়লে তখন ভেসে উঠে। মাছগুলোর মধ্যে নাকি একটা অন্ধ। বিষয়টা হয়ত সত্য নয়ত কল্পকাহিনী। বাড়ির পেছনে ¯œান ঘরের পাশেই রয়েছে একটি সুড়ঙ্গ পথ- ধারণা করা হয় ওই সুড়ঙ্গ পথে মুক্তাগাছার বাড়িতে যাবার ব্যবস্থা ছিল। এখানে বেশকিছু দুর্লভ ও দুষ্প্রাপ্য প্রাচীন গাছ গাছালি রয়েছে। ওর মধ্যে অন্যতম নাগলিঙ্গম বা নেগুরাবৃক্ষ যার গোটা জতীয় ফল হাতির খাবার হিসেবে ব্যবহার হতো। নাগলিঙ্গম গাছে সাড়া বছরজুড়েই ফুল ফুটে। শশীলজে কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ স্যার তার জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক ‘অয়োময় নাটকের জমিদার বাড়ির দৃশ্যগুলো ধারণ করেছিলেন, সেই থেকে স্থানীয়দের নিকট শশীলজ জমিদার বাড়ি হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। ১৯৫২ সাল থেকে বাড়িটি মহিলা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হয়ে এসেছে তবে বর্তমানে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সঙ্গে সীমানা প্রাচীর নির্ধারণ করে শশীলজ ০৪/০৫/২০১৫ সালে প্রতœতত্ত্ব বিভাগের আওতাধীন করে সংস্কারের কাজ চালাইতেছে। খুব শীঘ্রই তা সর্ব সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। এবার যাই চলে যাই অল্প কিছু দূরে ময়মনসিংহ জাদুঘরে। মুক্তাগাছা ও গৌরীপুর জমিদার বাড়ির বিভিন্ন তৈজসপত্র দিয়ে জাদুঘরটি সজ্জিত। জাদুঘরে বিশালাকারের হাতির মাথা, বন্য মহিষের সিং ও জমিদার পরিবারের ব্যবহার করা বিভিন্ন দুর্লভ সামগ্রী নজড় কেড়ে নেয়। এরপর ব্রহ্মপুত্র নদের উপর বাংলাদেশ- চীন মৈত্রি সেতু পাড় হয়ে চলে যাই ‘বালিশ খ্যাত শহর নেত্রকোনা। শহরের বড় বাজারে দুপুরের আহার শেষে গরু হাট্টা রোডে অবস্থিত হিন্দু বাবুর মিষ্টির দোকানের সুস্বাদু মিষ্টি ‘বালিশ’ খেয়ে ঢাকার পথ ধরি। উল্লেখ্য ‘বালিশ’ হলো এক প্রকার মিষ্টির নাম যা আপনাকে ময়মনসিংহ অঞ্চলে সারাদিন ভ্রমণ শেষে, ফেরার সময় চোখে না এলে আফসোস রয়ে যাবে।

তথ্য- শশীলজ এখনও দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত না হলেও কর্তব্যরত আনসার সদস্যদের সঙ্গে আলাপ করলে অনুমতি মিলে যায়।

যোগাযোগ- ছুটির দিনগুলোতে খুব সকালে নিজস্ব বা ভাড়া করা গাড়ি নিয়ে বের হলে একদিনেই ঘুরে আসা যাবে। এছাড়া গুলিস্তান ও মহাখালী হতে বিভিন্ন পরিবহনে বাস ছেড়ে যায় ময়মনসিংহ। ভাড়া ২৩০ টাকা। বাসে গিয়ে শহরের চরপাড়া হতে অটো বা রিক্সায় ময়মনসিংহ শহরের প্রাণকেন্দ্র জিরো পয়েন্টের পাশেই শশীলজের অবস্থান। স্থানীয়রা অনেকে জমিদার বাড়ি বা মহিলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নামে চিনে থাকে। ময়মনসিংহ প্রতœতত্ত্ব জাদুঘর সপ্তাহের রবিবার বন্ধ ও সোমবার অর্ধবেলা এবং প্রবেশ ফি জনপ্রতি ১৫ টাকা। জাদুঘর ঘুরে ফেরার পথেই সেতুর পাশে নেত্রকোনার বাসস্ট্যান্ড। বাস ভাড়া জনপ্রতি ৫৫ টাকা।বাস স্ট্যান্ড থেকে অটো’তে গরুহাট্টা রোডে বালিশ মিষ্টির দোকান মিলবে।