১৯ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট পূর্বের ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

বিদেশে নারী শ্রমিকরা নানাভাবে নির্যাতিত, দেখার কেউ নেই!


জান্নাতুল মাওয়া সুইটি ॥ সংসারে সচ্ছলতা আনতে গৃহকর্মী হিসেবে আরিফা জর্দানে কাজ করতে যান। কিন্তু তিনি মানসিক ও শারীরিক অত্যাচারের ক্ষত বয়ে নিয়ে ফিরে আসেন দেশে। তার গৃহকর্তা প্রায়ই তাকে নির্যাতন করতেন। তিনি অসুস্থ স্বামীর জন্য টাকা চাইলে তাকে তা দেয়া হয়নি। এমনকি দেশে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেয়া হতো না। প্রায়ই আরিফাকে মারধর করা হতো। গায়ে গরম পানি ঢালা হতো। খাবার পর্যন্ত খেতে দেয়া হতো না। এভাবে এ নারী শ্রমিককে ৬ মাস আটকে রাখা হয়। তার ওপর দেড় বছর অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। আরিফা জানান, সুযোগ পেয়ে একদিন জর্দান দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাকে তেমন সাহায্য করা হয়নি। উল্টো দুই বছর পর যোগাযোগ করতে বলা হয়। পরে বিএমইটি কর্তৃপক্ষের সহায়তায় আরিফা তার বন্দীজীবন থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে আসেন।

বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং কর্মসূচী থাকা সত্ত্বেও অভিবাসী নারী শ্রমিকদের নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। সময়ের সঙ্গে নারীদের জন্য বিদেশে কর্মসংস্থানের নতুন নতুন সম্ভাবনা যেমন তৈরি হচ্ছে তেমনি দেখা দিচ্ছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ। গৃহপরিচারিকা হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত নারী কর্মীদের মধ্যে অনেকেই নিয়োগকর্তার অত্যাচারের শিকার। শ্রম শক্তি গ্রহণকারী বিভিন্ন দেশে অভিবাসী শ্রমিকদের কল্যাণ ডেস্ক থাকলেও জর্দানে নারী শ্রমিকদের প্রয়োজন, সমস্যা, ঝুঁকির বিষয়গুলো পৃথকভাবে বিবেচনায় নিয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় না বলে জানায় বিভিন্ন সূত্র।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের নারী শ্রমিকরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বল্প মজুরিতে কাজ করেন। বিশেষ করে গৃহপরিচারিকা হিসেবে, সেখানে তারা প্রায়ই নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হন। যৌন হয়রানি, দৈহিক নির্যাতনের পাশাপাশি কখনও কখনও নিয়োগকর্তা ও সহকর্মী পুরুষরা তাদের মৌলিক অধিকারগুলো পর্যন্ত হরণ করেন। নানা রকমের প্রবঞ্চনা, প্রতারণা তাদের বিদেশবাসকে অসহনীয় করে তোলে। অদক্ষ এবং স্বল্পদক্ষ নারী কর্মীরা স্বল্প বেতনে কাজ করলেও নিজেরা কষ্টের জীবন যাপন করে উপার্জনের পুরো টাকা দেশে পাঠান পরিবার পরিজনদের সুখ-স্বাচ্ছন্দের জন্য। দেশের বৈদেশিক আয়ে যুক্ত হয় বিরাট অঙ্ক। অভিবাসী নারী শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তারা।

এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. নমিতা হালদার বলেন, ‘এসডিজির ১০ নং লক্ষ্যের সঙ্গে সিডও দলিলের সম্পর্ক রয়েছে। তিনি বলেন, যখন বাংলাদেশ থেকে নারী কর্মীদের অভিবাসন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হলো তখন থেকে সরকারের ওপর দায় চলে আসে।

৩৪ টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার এই মন্ত্রণালয়ে রয়েছে যেখানে মেয়েদেরকে প্রশিক্ষিত করা হচ্ছে, ১ মাসের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে, ছোট ছোট এ্যাপস তৈরি করে তাদের মোবাইল ফোনে দেয়া হয়েছে। জর্দান, ওমানে মেয়েরা ভাল আছে কিন্তু সবচাইতে খারাপ আছে সৌদি আরবে। চুক্তির বাইরেও তাদের পাচার করে দেয়া হচ্ছে, তারা তাদের শ্রমের মূল্যও পাচ্ছে না এবং রিক্রুটিং এজেন্সির যথাযথ সহায়তাও এই ক্ষেত্রে পাওয়া যাচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, অভিবাসন বন্ধ করে দেয়া সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে নারীদের শুধু গৃহকর্মী নয় অন্যান্য পেশার জন্য যথাযথ শিক্ষা এবং দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্বও আমাদের সকলকে নিতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। অবশ্য হংকংয়ে যাওয়ার আগে নারীদের ৬ মাসের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এবং সেখানে তারা ভাল আছেন। কিন্তু প্রক্রিয়াটি সহজতর হতে হবে এবং নারী শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে একশ’রও বেশি দেশে অভিবাসীরা নানা ধরনের কাজে নিয়োজিত। বিএমইটির রিপোর্ট অনুসারে শুধু জানুয়ারি থেকে জুলাই এই ৭ মাসে বাংলাদেশ থেকে ৭৩ হাজার ১০ নারী অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। ২০১৬ সালে মোট ১ লাখ ১৮ হাজার ১৮ নারী কাজের জন্য দেশের বাইরে গেছেন। বিদেশে বাংলাদেশের নারীরা এখনও স্বল্প দক্ষতা নির্ভর গৃহসেবা খাতেই সবচেয়ে বেশি নিয়োজিত। পাশাপাশি গার্মেন্টস, অন্যান্য ফ্যাক্টরি ও নার্সিং পেশায় নিয়োজিত হচ্ছেন। এর বাইরে অভিবাসী নারী শ্রমিকরা পরিচ্ছন্নতা কর্মী, শিশু ও বয়স্কদের পরিচর্যাকারী, দোকানে বিক্রয় সহযোগী এবং বিউটি পার্লারে কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। এসব ক্ষেত্রে কাজের জন্য উপসাগরীয় অঞ্চল এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশী নারী কর্মীদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

একাত্তরে স্বাধীনতা অর্জনের পর এদেশে অভিবাসন প্রক্রিয়া শুরু হলেও ৭৬ থেকে আনুষ্ঠানিক শ্রম অভিবাসনের সূচনা ঘটে। তখন অভিবাসীদের সংখ্যা ছিল প্রায় ছয় হাজার ৭৮। ১৯৮০ সাল থেকে পুরুষদের পাশাপাশি বৈশ্বিক শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ শুরু হলেও তখন তাদের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত সীমিত। দক্ষ নারী শ্রমশক্তির সঙ্গে সঙ্গে আংশিক এবং স্বল্প দক্ষতাসম্পন্ন নারীরাও কাজের জন্য বিদেশে যাওয়া শুরু করলে সরকার তাদের সুরক্ষার প্রশ্নে তাদের ওপর কখনও আংশিক, কখনও পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা বহাল করে। ২০০৩ সালে সরকার আংশিক এবং স্বল্প দক্ষ নারীদের অভিবাসনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। ১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত অভিবাসীদের মধ্যে নারী অভিবাসীদের শতকরা হার ছিল মাত্র ১ শতাংশ। কিন্তু ২০০৩ সালে নারী অভিবাসন বিষয়ে নীতিমালায় পরিবর্তনের কারণে ২০০৯ সালে নারী অভিবাসীদের হার উন্নীত হয় ৫ শতাংশে। অভিবাসী নারীদের এই হার এখন ক্রমবর্ধমান। অভিবাসী শ্রমিকরা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেন ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। ২০১৩ সাল থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী দেশ হিসেবে পৃথিবীতে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। অভিবাসী নারী শ্রমিকরা পুরুষ অভিবাসী শ্রমিকদের চাইতে কম উপার্জন করলেও তারা তাদের আয়ের ৯০ শতাংশ টাকা দেশে পাঠিয়ে দেন। পুরুষ শ্রমিকরা পাঠান তাদের আয়ের ৫০ শতাংশ। এর থেকেই প্রতীয়মান হয় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বাংলাদেশের নারীদের রয়েছে অনেক বড় ভূমিকা।

নারী শ্রমিকদের সার্বিক সুরক্ষার বিষয়ে ইউএন উইমেনের উইমেন্স ইকোনমিক এমপাওয়ারমেন্টের প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর তপতী সাহা বলেন, মহিলা পরিষদ নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে তার জন্মলগ্ন থেকেই। তিনি আরও বলেন, ইউএন উইমেনের যে আত্মপ্রকাশ সেখানে সমগ্র নারী আন্দোলনের অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে। সিডও দলিলে নারীর অধিকারের কথা বলা হয়েছে। আমাদের কাছে নীতিমালা আছে, কর্মপরিকল্পনা আছে কিন্তু সেগুলো আমাদের বাস্তবায়ন করতে হবে। একজন নারী শ্রমিক যখন থেকে সিদ্ধান্ত নেন তিনি দেশের বাইরে যাবেন সেখান থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর সঙ্গে পুরুষের পার্থক্য রয়েছে। দেখা যায় অভিবাসন বিষয়ে একজন পুরুষ ও তার পরিবার সবাইকে আনন্দের সঙ্গে সংবাদটি দেন কিন্তু একই কাজে গিয়েও একজন নারী সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তা লুকিয়ে রাখে। তিনি আরও বলেন, একজন পুরুষের মতো নারীরও অধিকার শ্রমিক হিসেবে অভিবাসী হওয়ার। কাজেই নারীকে সুরক্ষা দিতে সম্মিলিতভাবে প্রবাসী কল্যাণ, নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সকলকে কাজ করতে হবে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: