২০ জানুয়ারী ২০১৮,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ফার্মেসি থেকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিচ্ছেন ৭০ ভাগ নগরবাসী


নিখিল মানখিন ॥ সত্তর শতাংশ নগরবাসী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করছেন ফার্মেসি থেকে। নিজেদের বাসার আশপাশের ফার্মেসিগুলো থেকে তারা এ সেবা নিয়ে থাকেন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন স্তরের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গড়ে উঠলেও বিভাগীয় পর্যায়ে তা নেই। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ছাড়াও নগর স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে পরোক্ষভাবে শিল্প মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়সহ আরও বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের সম্পৃক্ততা রয়েছে। নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণেই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান ব্যাহত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা প্রতিষ্ঠান-বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর’বি)-এর এক প্রতিবেদনে এ চিত্র বেরিয়ে এসেছে।

আইসিডিডিআর’বির সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচীর অংশ হিসেবে একটি প্রতিনিধি দল রাজধানীর পাশে টঙ্গী এলাকায় গবেষণা চালান। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭০ শতাংশ মানুষ ফার্মেসি থেকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিচ্ছেন। চিকিৎসকদের চেম্বার থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন ১০ শতাংশ, সরকারী হাসপাতাল থেকে ৭ শতাংশ, বেসরকারী হাসপাতাল বা ক্লিনিক থেকে ৫ শতাংশ, এনজিও ক্লিনিক থেকে ১ শতাংশ এবং অন্যান্য থেকে ৭ শতাংশ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিচ্ছেন।

প্রতিবেদনের বিষয়ে আইসিডিডিআর’বির সহকারী বিজ্ঞান কর্মকর্তা ও ডেপুটি প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর ডাঃ সোহানা শফিক জনকণ্ঠকে জানান, নগরবাসী মা ও শিশুদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার মতো কিছু ব্যবস্থা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের থাকলেও অন্যান্য বয়সের মানুষের জন্য তা নেই। এজন্য শুধু টঙ্গীই নয়, ঢাকাসহ অন্যান্য শহরাঞ্চলের মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নেয়ার ভরসা হচ্ছে নিকটের ফার্মেসিগুলো। তবে ফার্মেসিগুলো অদক্ষ লোকজন দিয়ে পরিচালিত হওয়ায় ভুল ওষুধ গ্রহণের সংখ্যা বেশি। এতে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেশি।

আইসিডিডিআর’বির বিজ্ঞানী ড. এলেন এ্যাডামস এক গবেষণায় বলেছেন, নগরবাসীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা বাংলাদেশে নেই। তবে টারসিয়ারি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া টিকাদান কর্মসূচী, মাতৃ-নবজাতক ও শিশু স্বাস্থ্যসেবায় স্থানীয় সরকার কিছুটা কাজ করছে। সরকারী স্বাস্থ্যসেবা কম থাকার সুযোগে শহরে বেসরকারী স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো আধিপত্য বিস্তার করছে। স্বাস্থ্যসেবার ৮০ শতাংশই হচ্ছে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে বলে জানান এলেন এ্যাডামস।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রাজধানীর স্বাস্থ্যসেবার মাত্র ১ শতাংশ সেবা সরকারী খাত থেকে আসে। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার ১ শতাংশ সরকার করে থাকে। ৫ শতাংশের ব্যবস্থাপনায় রয়েছে বিভিন্ন বেসরকারী সংগঠন (এনজিও) এবং বাকি ৯৪ শতাংশ সেবা দিয়ে থাকে বিভিন্ন ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। গবেষণায় ঢাকার দুই সিটির স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি মানচিত্রও তৈরি করা হয়। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এবং রাজশাহী, নারায়ণগঞ্জ ও সিলেট শহরের কোথায় কোন স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যাবে, তা চিহ্নিত করা হয়েছে এই ম্যাপে। প্রায় ৮০ জন কর্মী ১৩ মাস গবেষণা করে এ ফলাফল তুলে এনেছে বলে জানানো হয়েছে। গবেষণায় স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৬৬টি হাসপাতাল, ৫৭৭টি ক্লিনিক, ২৭৪টি ডায়গনস্টিক সেন্টার, ১৭৭৯টি চিকিৎসকের চেম্বার, ৩৪৫৮টি ফার্মেসির সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসকের চেম্বার, ২০৮টি চশমার দোকানের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসকের চেম্বার, ১০২টি ডেলিভারি সেন্টার, ১২টি ব্লাড ব্যাংক, ৫১৮৩টি ফার্মেসি, ২৯১টি অপটিকাল সেন্টার, ৪০টি ড্রপ ইন সেন্টার এবং ১০৬টি ট্রাডিশনাল স্পিরিচুয়াল প্র্যাকটিশনারকে দেখানো হয়েছে। এর বাইরে ৫৩০টি স্যাটেলাইট ক্লিনিক এবং ৮৩ ইপিআই সেন্টারের কথাও গবেষণায় বলা হয়েছে। ঢাকা উত্তরে ২১৬৪টি চেম্বারের চিকিৎসকের এমবিবিএস, বিএইচএমএস, বিইউএমএস বা বিএএমএস-র মতো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী রয়েছে। বাকি ১০০৪ জন চিকিৎসকের প্রাতিষ্ঠানিক কোন ডিগ্রী নেই। ঢাকা দক্ষিণে ১৫১৪টি চেম্বারের চিকিৎসকের প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী রয়েছে। বাকি ৭৫৩টি চেম্বারের চিকিৎসকের তা নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে দ্রুত নগরায়ন হলেও স্বাস্থ্যসেবায় পিছিয়ে রয়েছে নগরবাসী। এর অন্যতম কারণ নগর বাসিন্দাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার দায়িত্ব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু ওই মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও লোকবল নেই। ফলে বেসরকারী সংস্থার (এনজিও) মাধ্যমে তারা মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এর ফলে নগরের স্বাস্থ্যসেবায় আধিপত্য বিস্তার করছে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। নগরে একে একে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। যা মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে সেবা দিচ্ছে। এতে মানুষের স্বাস্থ্য ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ অবকাঠামো অনুযায়ী একজন স্বাস্থ্যকর্মী মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগব্যাধি ও রোগীর খোঁজখবর নিচ্ছেন। কিন্তু শহরাঞ্চলে সেটি কিছু এনজিওর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য। শহরাঞ্চলে মা ও শিশুদের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার জন্য কিছু প্রতিষ্ঠান থাকলেও অধিকাংশ জনগোষ্ঠী এই সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে ফার্মেসি বা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে ছুটে যাচ্ছেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ন্যাশনাল হেলথ বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবায় কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন ও পরিবার কল্যাণ সেন্টার, উপজেলা ও জেলা হাসপাতাল ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু শহরাঞ্চলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে চলছে। মন্ত্রণালয়ের অধীনে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, সীমিত আরবান ডিসপেনসারী, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে ক্ষুদ্র ও মাঝারি হাসপাতাল, দাতাসংস্থার সহায়তায় প্রাইমারি হেলথকেয়ার ডেলিভারি প্রজেক্ট, আরবান হেলথকেয়ার শক্তিশালীকরণ প্রকল্প ও এনজিও হেলথ সার্ভিস ডেলিভারি প্রোগ্রাম ও অন্যান্য প্রাইভেট সেক্টরের মাধ্যমে সেবা দেয়া হচ্ছে। নগরের স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, অস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা, পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের অদক্ষতা, অকার্যকর আরবান হেলথকেয়ার গাইডলাইন, স্থানীয় সরকারের রাজস্বে গাফিলতি ও পরিকল্পনা অনুযায়ী তা বাস্তবায়নের দুর্বলতাকে চ্যালেঞ্জ বলে মনে করা হচ্ছে।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: