২০ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৪ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূচনা ও ১১ মার্চ ১৯৪৮


(গতকালের পর)

অফিসগামী জনসাধারণকে ফিরিয়ে দেয় পিকেটাররা। হাইকোর্টের গেটেও ছাত্ররা পিকেটিং করে। এখানে কতিপয় আইনজীবীর সঙ্গে ছাত্রদের বাগ্বিত-া হয়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেক্রেটারিয়েট (তৎকালীন ইডেন বিল্ডিং) ছিল উত্তপ্ত। ছাত্রনেতারা এখানে পিকেটিং করে। পুলিশ ছিল বেপরোয়া, মারমুখী। ছাত্রনেতারা অফিসার-কর্মচারীদের ধর্মঘটে অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানায়। আন্দোলনের নেতা শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ সেক্রেটারিয়েটের প্রথম গেটে এবং কাজী গোলাম মাহবুব, শওকত আলী প্রমুখ দ্বিতীয় গেটে পিকেটিংয়ে নেতৃত্ব দেন। এখানে পুলিশ বেপরোয়া লাঠিচার্জ করে এবং কাজী গোলাম মাহবুব, শেখ মুজিবুর রহমান, শওকত আলী, শামসুল হক, অলি আহাদসহ আরও অনেককে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।

পুলিশী নির্যাতন এবং ছাত্রনেতাদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ওই দিন দুপুরবেলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক বিরাট সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহ্বায়ক নঈমুদ্দিন। সভায় বক্তারা পুলিশী নির্যাতন ও গ্রেফতারের প্রতিবাদ জানান। তারা গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবার উদাত্ত আহ্বান জানান। সভাশেষে এক বিরাট বিক্ষোভ মিছিল কার্জন হল অতিক্রম করে হাইকোর্টের সামনে পৌঁছলে পুলিশ মিছিলে বাধা প্রদান করে। মিছিলটি তোপখানা রোডে না গিয়ে আবদুল গনি রোডে ঢুকে পড়ে এবং সেক্রেটারিয়েটের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এই সময় পুলিশ সুপার আবদুল গফুরের নেতৃত্বে পুনরায় ছাত্রদের ওপর হামলা চালানো হয়। পুলিশের বন্দুকের বাঁটের আঘাতে মোহাম্মদ তোয়াহা আহত হলে তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। পুলিশের পাশাপাশি সরকারের লেলিয়ে দেয়া গু-াবাহিনীও ছাত্রদের ওপর হামলায় অংশ নেয়। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আয়োজিত সেদিনের বিক্ষোভ মিছিলে ছাত্রদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক সরকারী কর্মচারী এবং সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি যে ব্যাপকতর মানুষের মাঝেও আবেদন সৃষ্টি করেছে, তা এ থেকে সহজেই স্পষ্ট হয়ে উঠে।

এ কে ফজলুল হক ও নঈমুদ্দীনের পৃথক বিবৃতি :

হাইকোর্ট থেকে ফেরার পথে সেক্রেটারিয়েট এলাকায় কিছু ছাত্রকে সেøাগান দিতে দেখেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক। তিনি সেখানে ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলে বক্তব্য দেয়া শুরু করলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে এবং এ.কে ফজলুল হক সামান্য আহত হন। ফজলুল হকের আহত হওয়ার ঘটনা এবং বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী গ্রেফতার হওয়ায় সর্বত্রই উত্তেজনা দেখা দেয়। যারা অফিসে এসেছিল, দোকান খুলেছিল-তারাও সবকিছু বন্ধ করে বাড়ি ঘরে ফিরে যায়।

১১ মার্চের সাধারণ ধর্মঘটের দিন ঢাকা শহরে যা ঘটেছিল, সে সম্পর্কে এ. কে ফজলুল হক সংবাদপত্রে এক বিবৃতি প্রদান করেন।

১১ মার্চের ঘটনা সম্পর্কে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহ্বায়ক নঈমুদ্দীন আহমদ সংবাদপত্রে এক বিবৃতি প্রদান করেন। বিবৃতিতে তিনি সে দিনের ঘটনার বর্ণনা, আন্দোলনের যৌক্তিকতা, সরকারের দমন-পীড়ন উপেক্ষা করে ছাত্রসমাজকে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। বিবৃতিতে তিনি বলেন : “পাকিস্তানের শতকরা ৬৬ জন অধিবাসীর মাতৃভাষাকে পাকিস্তান ডোমিনিয়নের সরকারী ভাষা করার দাবি করিয়া যে আন্দোলন শুরু হইয়াছে, নাজিমুদ্দিন মন্ত্রিসভা তাহা দমন করার চেষ্টা করিয়া ফ্যাসিস্ট নীতিই অনুসরণ করিতেছেন। তাঁহারা নিরীহ ছাত্রদের ওপর গুলি ও লাঠি চালাইয়াছেন এবং অনেককে গ্রেফতার করিয়াছেন। ছাত্ররা ইহাতে আতঙ্কিত না হইয়া বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার জন্য তাহারা যে দাবি করিয়াছে সরকার তাহাদের দাবি পূরণ করিবে বলিয়া আমাদের বিশ্বাস। আমাদের ন্যায়সঙ্গত দাবি পূরণের জন্য আমরা যে আন্দোলন শুরু করিয়াছি তাহাতে যোগদানের জন্য পাকিস্তানের সকল ছাত্রকে আহ্বান করিতেছি। গতকালের ঘটনায় ২০০ জন আহত হইয়াছে। তাহাদের মধ্যে ১৮ জন গুরুতর আহত হইয়া হাসপাতালে প্রেরিত হয়। ৯০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাহাদের মধ্যে হইতে পরে অনেককে ছাড়িয়া দেয়া হইয়াছে। ৬৯ জনকে জেল-হাজতে প্রেরণ করা হইয়াছে। গতকালের ঘটনার সময় যাহারা গ্রেফতার হইয়াছে তাহাদের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান, মি. অলি আহাদ এবং সাপ্তাহিক পত্রিকা ইনসান-এর সম্পাদক মি. আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী অন্যতম। অন্যান্য ব্যক্তির সহিত তমদ্দুন মজলিসের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাসেম এবং স্থানীয় বাংলা সাহিত্যিক ‘জিন্দিগী’র সহযোগী সম্পাদক মি. কাজী সামসুল ইসলামও আহত হইয়াছেন।”

[সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৩ মার্চ ১৯৪৮ সংখ্যা ও বাংলা ভাষা আন্দোলন থেকে বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলন, লেখক- মোঃ আইয়ুব আলী, প্রকাশক-খোশরোজ কিতাব মহল, ঢাকা, পৃ. ৬৬-৬৭]

১১ মার্চের সাধারণ ধর্মঘট সম্পর্কে পূর্ববঙ্গ সরকার একটি ইশতেহার প্রকাশ করে। এই ইশতেহারে মিথ্যাচারের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেয়ার একটি সূক্ষ্ম প্রচেষ্টাও পরিলক্ষিত হয়। ১৩ মার্চ ১৯৪৮ দৈনিক আজাদে ইশতেহারটি প্রকাশিত হয়। ইশতেহারে বলা হয়,

“ বাংলা ভাষাকে কেন্দ্রে সরকারী ভাষা করা হবে না বলে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, তার প্রতিবাদে ১১ মার্চ যে সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করা হয়েছিল কতিপয় বিভেদকারী ও একদল ছাত্র তা কার্যকর করার চেষ্টা করে। শহরের সমগ্র মুসলিম এলাকা এবং অমুসলিম এলাকার অধিকাংশ লোক ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করতে অস্বীকার করে। শুধুমাত্র কয়েকটি হিন্দু দোকান বন্ধ করা হয়। কিন্তু আইন আদালতে স্বাভাবিকভাবে কাজকর্ম চলতে থাকে। তবে রমনা অঞ্চলে ধর্মঘটীরা কিছু অফিস কর্মচারীকে নিরস্ত্র করতে সমর্থ হয়। সেক্রেটারিয়েট, হাইকোর্ট ও অন্যান্য অফিসের সামনে পিকেটিং করার জন্য দলে দলে ছাত্ররা সমবেত হতে থাকে। তাদের অনেককেই শান্তভাবে সরিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু অন্যান্যরা অফিসগামী ব্যক্তি ও পুলিশের ওপর পাথর নিক্ষেপ করে আক্রমণ করতে থাকে। ফলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে এবং ৬৫জনকে গ্রেফতার করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে বাধ্য হয়। পুলিশ দু’বার ফাঁকা আওয়াজ করে। শোভাযাত্রায় পুলিশের হস্তক্ষেপের ফলে ১৪জন আহত হয়ে হাসপাতালে আছে, তার মধ্যে কারও আঘাত গুরুতর নয়। কয়েকটি স্থানে খানাতল্লাশির ফলে প্রদেশের মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্য এবং পাকিস্তানের শাসনযন্ত্রে গোলযোগ সৃষ্টি করার এক গভীর ষড়যন্ত্রের তথ্য সরকারের হস্তগত হয়েছে।”

১৪ মার্চ দৈনিক আজাদ পত্রিকার এক সম্পাদকীয়তে পূর্ববঙ্গ সরকারের এই ইশতেহারের সমালোচনা করা হয়। এতে বলা হয়Ñ

“...সরকারী ইশতেহারে বলা হইয়াছে যে, কেবল অমুসলমানদের একাংশ বিক্ষোভসূচক ধর্মঘটে যোগ দিয়েছিল। আমাদের ধারণা এই যে, এই বিবরণ সম্পূর্ণ নহে। রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নজড়িত আন্দোলন কোন বিশেষ সম্প্রদায়ে আবদ্ধ নহে। এ প্রসঙ্গে সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন তোলার কোন কারণ বা সঙ্গতি আছে বলিয়া আমরা মনে করি না।”

১১ মার্চের সাধারণ ধর্মঘটের কর্মসূচি কেবল ঢাকায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তৎকালীন পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ জেলায় এ কর্মসূচি পালিত হয়। বগুড়া, রাজশাহী, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুর, চাঁদপুর, ভৈরব, যশোর, নোয়াখালী, রংপুর, চট্টগ্রাম, মেহেরপুর, পাবনা, খুলনা, দৌলতপুর, মুন্সীগঞ্জ, বরিশালসহ বিভিন্ন জেলায় ধর্মঘট, সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্র এবং শিক্ষিত সমাজের বাইরেও ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি জোরদার হতে থাকে।

১১ মার্চ সাধারণ ধর্মঘট পালনকালে পুলিশী নির্যাতন ও গ্রেফতারের প্রতিবাদে ছাত্রসমাজ ফুঁসে উঠে। ১২ মার্চ জগন্নাথ কলেজে এক প্রতিবাদসভা অনুষ্ঠিত হয়। বহিরাগত শ খানেক লোক বাইরে থেকে এসে সভায় হামলা চালায়- এতে দলিলুর রহমান নামের এক ছাত্র আহত হয়। ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির প্রাক্তন চেয়ারম্যান বি. দাসগুপ্ত হামলাকারীদের বাধা দিতে গেলে তিনিও আক্রান্ত হন।

১৩ মার্চ ঢাকা শহরের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রধর্মঘট পালিত হয়। আন্দোলন ক্রমাগত বিস্তার লাভ করতে থাকে এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এবং সমর্থন বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৪ মার্চ দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। ঐ দিন পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সরকারী বাসভবন বর্ধমান হাউজে বেলা তিনটায় মুসলিম লীগ সংসদীয় দলের সভা শুরু হয়। রাত ৯টা পর্যন্ত ছাত্ররা এখানে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এ দিন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এক সভায় ১৫ মার্চ পূর্ববঙ্গ আইনসভার অধিবেশনের দিন সাধারণ ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। মোহাম্মদ তোয়াহা ও তাজউদ্দীন আহমেদ এ সভায় আন্দোলনের কর্মসূচী গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রেল ধর্মঘট সফল করার জন্য সংগ্রাম পরিষদের কর্মীদের টঙ্গী ও কুর্মিটোলায় পাঠানো হয়।

চলবে...