২০ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বাঁশ, বাঁশি ও দড়ি দিয়ে চলছে শাহজালালের ট্রাফিকিং


বাঁশ, বাঁশি ও দড়ি দিয়ে চলছে শাহজালালের ট্রাফিকিং

আজাদ সুলায়মান ॥ বাঁশ, বাঁশি ও দড়ি। এগুলো কৃষি উপাদান। এগুলো থাকার কথা গ্রামবাংলার ক্ষেত খামারে কিংবা কৃষকের উঠানে। বিস্ময়ের বিষয়- এখন এগুলো দিয়েই চলছে দেশের প্রধান বিমানবন্দর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর গোলচক্করের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। প্রতিদিন সকাল বিকেল এখানে গেলেই চোখে পড়ে এমন অদ্ভুত ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট। সরকারের অন্যান্য খাত যখন ই-ম্যানেজমেন্টের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তখন শাহজালাল বিমানবন্দরের ট্রাফিকিং সিষ্টেম উল্টোরথে। ছোট পরিসরের এই গোলচক্কর দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার দেশী-বিদেশী আকাশ যাত্রীর যাতায়াত ছাড়াও উত্তরাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের যানবাহন রাজধানীতে আসা যাওয়া করে। যারাই এ পথের পথিক তারাই শিকার হচ্ছেন চরম দুর্ভোগের। আকাশপথের দীর্ঘ জার্নির পর বিমানবন্দর থেকে বের হয়েই পড়তে হচ্ছে দীর্ঘ যানজটের। এতে রেহাই মিলছে না বিদেশী নাগরিকদেরও। জীবনে প্রথম ঢাকায় এসেই বিদেশী নাগরিকদের দেখতে হচ্ছে বাঁশ, বাঁশি, দড়ি ও মাইকিংয়ের ট্রাফিক সিষ্টেম। জেমস পিটার তেমনই একজন ভুক্তভোগী। সম্প্রতি তিনি ঢাকায় এসেছিলেন একজন পর্যটক হিসেবে। দীর্ঘ দশ ঘণ্টার জার্নি শেষে ইমিগ্রেশন ও লাগেজের কাজ সেরে যখন গাড়িতে চেপে বসলেন-তখন তাঁর চোখে পড়ে এক নতুন দৃশ্য। শাহজালাল বিমানবন্দরের উত্তর পাশের ভিআইপি গেট থেকে গোলচক্করের দিকে এগিয়ে যেতেই হঠাৎ থেমে যায় তার গাড়ি। দু’পাশে সারি সারি গাড়ি। সামনে সিগন্যাল পোস্ট নেই। তবুও গাড়ি নড়ছে না। তেরো মিনিট বসে থাকার পর গাড়ি আবার কিছুটা এগিয়ে যায়। বাংলাদেশী চালক দ্রুত তার গাড়ি টেনে কোনক্রমে গোলচক্করের সিগন্যালটা পার হবার সর্বাত্মক চেষ্টা করেন। দুর্ভাগ্য তার সামনে একটা থাকতেই আবার সিগন্যাল পড়ে। জেমস বার বার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলেন। সামনের দৃশ্যও দেখছিলেন জীবনে প্রথমবারের মতো ঢাকায় আসা এই ব্রিটিশ নাগরিক। তিনি ভাবলেন তেরো মিনিট পর হয়ত সিগন্যাল ক্লিয়ার হবে। কিন্তু এটা লন্ডনের রাজপথের মতো একই সময়ে একই প্যাটার্নে সিগন্যালিং সিষ্টেম নয়-এটা তার জানা ছিল না। তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে দেখেন-সামনের কোথাও সিগন্যালিং সিস্টেম নেই। আছে দড়ি টেনে দু’পাশের পথচারীদের আটকানোর কৌশল। দুনিয়ার কোথাও এমন দৃশ্য না দেখায় তার কাছে শুধু অদ্ভুতই মনে হয়নি, এটা অবিশ্বাস্যও ঠেকেছে। দুজন টাফিক কনস্টেবল দড়ির দু’পাশে টেনে ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন। বাসের পর বাস, কার, হোন্ডা চলছে অবিরত। আরেক জন মাইকে উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে ট্রাফিক জ্ঞান দিচ্ছে। হঠাৎ বাঁশির ফুঁ। কনস্টেবলের হাত থেকে পড়ে যায় দড়ি। আরেক কনস্টেবল বাঁশ উঁচিয়ে বাস থামায়। অমনিই দৌড় শুরু পূর্ব-পশ্চিমের অপেক্ষমাণ পথচারীদের। গাড়ি যখন থামে-পথচারী ছুটে বেহুঁশ হয়ে। এ সময় জেমসের গাড়িও ছুটছে পশ্চিম থেকে পূর্ব প্রান্তে। ততক্ষণে চল্লিশ মিনিট শেষ। টার্মিনাল থেকে বের হয়ে আসতে গোলচক্কর পার হতেই তার ৪০ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়েছে পশ্চিম প্রান্তে। এটা প্রতিদিনের চিত্র।

দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে হাজার হাজার দেশী-বিদেশী, সাধারণ-অসাধারণ যাত্রী ভুক্তভোগীর শিকার। এমন অদ্ভুত ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট দুনিয়ার কোথাও না থাকলেও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যতিক্রম। কোথাও নজির না থাকলেও কেন ঢাকায় এমন চিত্র দেখতে হচ্ছে কেন তার চটজলদি যৌক্তিক ব্যাখ্যাও দিয়েছেন সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান এয়ারভাইস মার্শাল এহসানুল গনি চৌধুরী। বলেছেন, দুনিয়ার কোথাও তো শহরের ভেতরে আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টও নেই। একদিকে রাস্তা কম-অন্যদিকে যানবাহন বেশি। ঢাকা শহরের আর দশটা স্পটের মতোই এখানেও একই যানজট ঘটছে প্রতিদিন।

এর সমাধান কোথায় প্রশ্ন করা হলে সিভিল এভিয়েশনের মেম্বার অপারেশন এযারকমোডর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গোলচক্করের অংশটুকু সিভিল এভিয়েশনের কর্তৃত্বের বাইরে। সেটা পুলিশ দেখে। বিমানবন্দরের গোলচক্কর নির্বিঘেœ পার হতে চাইলে এখানে একটা ভেহিক্যাল ওভারফ্লাই দরকার। এই মুহূর্তে সে সম্ভাবনাও দেখছি না এজন্যই যে, খুব সহসাই বেশ কটা ব্ড় প্রকল্প হতে যাচ্ছে এ এলাকায়। যেমন একদিকে মেট্রোরেল অন্যদিকে থার্ড টার্মিনাল। মেট্রোরেল ও র‌্যাপিড ট্রানজিট বাস টার্মিনালও হবে গোলচক্কর ঘিরে। এরমধ্যে থার্ড টার্মিনালের কাজ শুরু হচ্ছে আগামী জানুযারি এবং সেটা তিন বছরের মধ্যেই শেষ করতে হবে। থার্ড টার্মিনালের নক্সায় রয়েছে গোলচক্কর থেকে তিনটি টার্মিনালে প্রবেশ ও বের হবার বহুমুখী পথ। ওভার পাস ফ্লাই পাসসহ অন্যান্য সুবিধা। সেজন্য ও্ই সময়টুকু পর্যন্ত অপেক্ষ করতেই হবে। তারপরও বিমানবন্দরের গোলচক্করের পশ্চিমাংশের বাগান ভেঙ্গে জায়গা বাড়ানো হচ্ছে যাতে গাড়িগুলো অবাধে চলাচল করতে পারে। এ সব নিয়ে প্রায়ই এপিবিএন-এর সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ মনিটর করা হয়।

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন ইকবাল করিম যানজটের জন্য বাইরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে বলেছেন, প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে অনেক গাড়ি বিমানবন্দর ক্যানপী এলাকায় প্রবেশ করে। তারা যাত্রী নেয়ার অজুহাতে ভেতরে প্রবেশ করে। তাদের বাধাও দেয়া যায় না। এমনিতেই পর্যাপ্ত কারপার্কিং সুবিধা নেই। তার ওপর এত বেশি গাড়ি ভেতরে আসায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।

উত্তরা জোনের এক ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তা বেশ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, প্রতিদিন শাহজালাল বিমানবন্দরে যে গাড়ি চলাচল করে- ৬০/৭০ ফুট চওড়া এই রাস্তা দিয়ে- পূর্ব প্রান্তে পার হওয়া খুবই কষ্টকর। কষ্ট শুধু যাত্রী সাধারণের নয়, যিনি রাস্তায় গাড়ি চালান, যিনি ট্রাফিক ডিউটি করেন-তাদের সামাল দিতে হয় কঠিন প্রতিকূল পরিস্থিতি। একদিকে রাস্তা কম, জনবল সংকট, রেলগেটের বাধা, অন্যদিকে বিমানবন্দর কারপার্র্র্র্কিংয়ের অপ্রতুলতা ও অত্যাধুনিক ট্রাফিক সিষ্টেম না থাকার মাসুল দিতে হচ্ছে সবাইকে। এটা কি কল্পনা করা যায় দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনের চেকপোস্টে কোন ধরনের ট্রাফিকিং সিস্টেম নেই? সিস্টেম বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে সিগন্যালিং সিস্টেম। ঢাকা শহরের অন্য কোথাও না থাকলেও তো অন্তত শাহ জালাল বিমানবন্দরের সামনের গোলচক্করে ট্রাফিকিং সিগন্যাল সিস্টেম থাকাটা জরুরী। লাল বাতি, সবুজ বাতি কবে থেকে এখানে নেই এটাও কোন পুলিশ কর্মকর্তা বলতে পারছেন না। এটা কতটা লজ্জাকর তা বলাই বাহুল্য।

সম্প্রতি পর পর চারদিন সকাল, বিকেল ও সন্ধ্যায়-সরজমিনে পরিদর্শনে গোলচক্করের পূর্ব

পাশে তিনজন কনস্টেবল, দুজন দারোগা, একজন পরিদর্শক ও সহকারী কমিশনার, পশ্চিম পাশে দুজন কনস্টেবলকে দাঁড়িয়ে ডিউটি করতে। তার উত্তর পাশের ওভারব্রিজের নিচে মাঝে মাঝে একজন সার্জেন্টকে ডিউটি করতে দেখা যায়। গোলচক্করের পূর্ব ও পশ্চিম পাশের সকালে অফিস টাইমে ট্রাফিক পুলিশকে দেখা যায় দড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। মানুষজন যাতে ঝুঁকি নিয়ে দৌড়ে রাস্তা ক্রস না করে, সেজন্য পঞ্চাশ ফুট লম্বা দড়ি টেনে দাঁড়িয়ে থাকে দু’পাশে দু’জন করে চারজন। উত্তরা থেকে মহাখালিগামী যানবাহনগুলোকে লাঠি উঁচিয়ে ইশারা দিয়ে থামানো হয়। তারপর দড়ি ছেড়ে দিলে পূর্ব ও পশ্চিম পাশে রাস্তা ক্রস করার প্রতিযোগিতা নামে।

গত বুধ ও বৃহস্পতিবার সকালে সেখানে দেখা যায় বলাকার সামনে দিয়ে বিমানবন্দরে প্রবেশের মুখে গোলচক্করের কাছাকাছি বাঁশের বেড়া দিয়ে যানবাহন দু’ভাগে চলার নির্দেশিকা দেয়া হচ্ছে। যারা বিমানবন্দরে যাবেন তারা বাঁশের পশ্চিম ও যারা উত্তরার দিকে যাবেন তারা সরাসরি চলে যাবেন। বিমানবন্দরের প্রবেশমুখে সকাল সন্ধ্যায় যানজটে আটকা পড়ে অনেকেই ফ্লাই্ট মিস করারও ঘটনা ঘটছে বলে জানা যায়।

এ প্রস্্্্্ঙ্েগ একজন পুলিশ কনস্টেবল এ প্রতিনিধিকে শৈশবের স্কুলের বার্ষিক উৎসবে বাচ্চাদের এক শ’ মিটার দৌড় প্রতিযোগিতার কথাই স্মরণ করিয়ে বলেন- দড়ি ফেলে দেয়ার পর পথচারীরা যেভাবে দৌড়াতে শুরু করে তা দেখে হাসি পায়। আবার খারাপও লাগে। এ দৃশ্য দেশের মানুষের চোখে অবাক না ঠেকলেও লন্ডন থেকে প্রথমবারের মতো আগত পিটার জেমসের মতো যাত্রীর কাছে অবশ্যই অবাক কা-। তবে সম্প্রতি চলন্ত সিঁড়ির ওভারপাস হওয়ার পর নিচ দিয়ে পথচারীদের ভিড় কমছে। মানুষ এখন উপর দিয়েই পার হয়। এখন আর নিচে এত ভিড় হয় না। তবে পশ্চিম ও পূর্বদিকে যাতায়াতকারী যানবাহনের ভোগান্তি অনেক।

এ সম্পর্কে সিভিল এভিয়েশানের একজন পরিচালক বলেন, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিমানবন্দর পয়েন্টে বড় ধরনের ত্রুটি রয়েছে। উত্তরা পর্যন্ত যথেষ্ট প্রশস্ত ও সোজা থাকলেও বিমানবন্দরের কাছাকাছি এসে বাঁকা ও সরু হয়ে গেছে। সোজার রাস্তার ওপর যেখানে চওড়া হবার দরকার, সেখানে অবৈধভাবে মূল সড়কের ওপর অবৈধভাবে গড়ে উঠছে দোকানপাট ও মসজিদ মাদ্রাসা। যে কারণে এখানে এসে রাস্তা চিকন ও বাঁকা হয়ে গেছে। এজন্য প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও রাস্তা প্রশস্ত করা যাচ্ছে না। এখানে যানজটের অন্যতম কারণ এটাই।

এ বিষয়ে বিমানের পরিচালক (মাকের্টিং) আলী আহসান মোহাম্মদ বাবু নিজের অফিস কার্গোতে সকালে প্রবেশ ও রাতে বের হতে গিয়ে প্রচ- ভোগান্তির বর্ণনা দিয়েছেন। গত ক’বছর ধরেই এপথ চলাচলের তিক্ত অভিজ্ঞতার উদাহরণ টেনে বলেন-যেদিন বিমান এমিরেটস ও কাতারের ফ্লাইট থাকে অর্থাৎ সেদিন সন্ধ্যার পর পিক আওয়ারে কিছুতেই আধাঘণ্টার নিচে টার্মিনাল থেকে গোলচক্করের পূর্ব পাশে পৌঁছা যায় না। গাড়ির ভেতরেই বসে থেকে এ দৃশ্য দেখতে হয়। আবার ঢুকতে গেলেও একই ধরনের যানজটের মুখে পড়তে হয়।

ভুক্তভোগীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়-শাহজালাল বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক টার্মিনাল ছাড়াও-কার্গো হাউজ, কাস্টমস হাউস, র‌্যাব অফিস ও সিভিল এভিয়েশনের সদর দফতরের সব কর্মকর্তা এই গেট দিয়েই বের হয়ে গোলচক্কর পার হয়ে ঢাকার দিকে যায়। আবার কিছু কিছু উত্তরার দিকে যায়। ফলে এমন সরু একটা গলি পথ দিয়ে প্রতিদিন শত শত গাড়ি বের হয়। বিপরীতে উত্তর দক্ষিণের মেইন রোডকে প্রাধান্য দেয়া হয় হাইওয়ে হিসেবে। সঙ্গতকারণেই মেইন রোডের যানবাহন বেশি সময় থামিয়েও রাখা যায় না। ট্রাফিক পুলিশের আচরণেও এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে- বিমানবন্দরের যাত্রীর চেয়ে হাইওয়ের হাজার হাজার যানবাহনের গুরুত্ব বেশি।

উত্তরা পুলিশের একজন দায়িত্ববান কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, উত্তরাঞ্চলের যানবাহনের বেশির ভাগই এখান দিয়েই ঢাকায় প্রবেশ করে এবং বের হয়। যদি মিনিট পাঁচেকের জন্যও গাড়ি থামিয়ে রাখা হয়-তাহলে দক্ষিণের গাড়ির বহর কাওলা পয়েন্ট পর্যন্ত গিয়ে থামে। আর মহাখালিগামী গাড়িগুলো উত্তরার জসীম উদ্দীন মোড় পর্যন্ত বহর লেগে যায়। আবার উত্তর-দক্ষিণের যানবাহন যদি মিনিট দশেক চালু রাখা হয়-তাহলে বিমানবন্দরের টার্মিনাল থেকে আসা গাড়িগুলোর লাইন ভয়ানক জটের শিকার হয়। এই লাইন বিমানবন্দরের ভিআইপি গেট থেকে শুরু করে গোলচক্কর পর্যন্ত একটার পিছে আরেকটা লেগে থাকে। সেই জট তখন দুই সিগন্যালেও ছুটে না। বাধ্য হয়েই ২০/২৫ যাত্রীদের গাড়ির ভেতরেই অপেক্ষা করতে হয়।

অহিদুল নামের এক যাত্রী লন্ডন থেকে সিলেট হয়ে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নেমেই লাগেজসহ একটি সিএনজি চালিত অটো রিক্সায় চাপেন। বিমানবন্দর ক্যানপী থেকে গোলচক্কর পেরিয়ে কয়েকগজ দূরের রেলস্টেশানে পৌঁছে দেখেন মিনিট তিনেক আগে তার ট্রেন চলে গেছ্।ে ট্রেন মিস করায় ছুটতে হয় তাকে রেলস্টেশনেই পরবর্তী ট্রেনের জন্য।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ আশীষ রায় চৌধুরী জনকণ্ঠকে বলেন, দীর্ঘ জার্নির পর কোন যাত্রী বিমানবন্দরে যদি এমন কঠিন যানজটের শিকার হয়- তাহলে দেশের সরকার ও প্রশাসন ও সিভিল এভিয়েশান সম্পর্কে মানুষের ধারণাই বিরূপ হতে বাধ্য। পৃথিবীর কোথাও এ ধরনের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর খোঁজে পাওয়া যার নাকের ডগায় যানজট লেগে থাকে। পাঁচশত গজ রাস্তা পার হতে কখনো কখনও আধা ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। এখানে জরুরীভিত্তিতে একটি ভেহিক্যাল ওভারপাস নির্মাণ করে এ জটিলতার অবসান ঘটানো সম্ভব। এটা তো খুব কঠিন কিছু নয়। তেমন ব্যয়বহুলও নয়। কিন্তু পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে এদিকে কারোর নজরই নেই।

বিমানবন্দরে কর্মরত একজন পুলিশ কর্মকর্তা এ সমস্যার জন্য দূষলেন ট্রাফিক পুলিশকে। গোলচক্করের পূর্ব-পশ্চিম দু’ পাশেই রাস্তা জুড়ে যত্রতত্র গাড়ি একের পর এক পার্কিং করা থাকলেও তাদের বিরদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না। এমনকি রাস্তার কিনার ঘেঁষে পথচারীরা হাঁটতেও পারে না। পথচারীদের দাঁড়ানোর জায়গায় গাড়ি থামিয়ে যাত্রী তোলার দরুণ জটলা বাঁধে। এজন্য সামনের সিগন্যাল ক্লিয়ার থাকার পরও পেছনের প্রাইভেট কার অগ্রসর হতে পারে না।

প্রাইভেট কার চালক গোলাপ বলেন, সমস্যা এক জায়গা ট্রাফিক ডিউটি করে অন্য জায়গায়। সুষ্ঠুু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অভাবের দরুন এই সংকট। পুলিশ কঠোরভাবে চালকদের যেখানে সেখানে দাঁড়াতে না দিলেই পরিস্থিতি অনেকটাই ভাল রাখা সম্ভব।

সিভিল এভিয়েশনের প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা যায়-গোলচক্করের ট্রাফিক সমস্যার সহসাই দূর করার কোন উপায় নেই। ইচ্ছে করলেও এখন এই পয়েন্টে কোন ধরনের ওভার পাসও নির্মাণ করা যাবে না। কেননা এই এলাকায় ইতোমধ্যে র‌্যাপিড ট্রানজিট বাস, মেট্রোরেল ও থার্ড টার্মিনালের ওভার পাস আন্ডারপাস তৈরি করার প্ল্যান রয়েছে। এসব মেগাপ্রকল্প কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া গোলচক্কর সড়কের আশপাশে কোন ধরনের সংস্কার করা যাবে না।

তবে এসব অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে এয়ারপোর্ট বিটের ট্রাফিক পরিদর্শক মোহাম্মদ আমির চৌধুরী জনকণ্ঠকে বলেন, আগে পরিস্থিতি অনেক নাজুক ছিল। বাঁশ বাঁশি দড়ি ও মাইক দিয়ে পথচারীদের নিয়ন্ত্রণ করতে হতো। নতুন চলমান সিঁড়ির ওভারপাস হওয়ার পর এখন অনেকটাই উন্নতি হয়েছে। ওভারব্রিজের উত্তর পাশে এখন কোন যানবাহন দাঁড়াতে দেয়া হচ্ছে না।

তিনি বলেন, মূল সমস্যা হচ্ছে-হযরত শাহ জালাল বিমানবন্দরের কারপার্কিংয়ের অপ্রতুলতা, রেল সিগন্যাল ও রাস্তার স্বল্পতা। বিমানবন্দরের কারপার্কিংয়ে মাত্র আড়াই হাজার গাড়ির ধারণ ক্ষমতা। ্এর বিপরীতে প্রতিদিন গাড়ি আসে কমপক্ষে চার হাজার। যদি লাগেজ পেতে তিনঘণ্টা দেরি হয়-তাহলে ওই সময়ে গাড়িকেও অপেক্ষা করতে হয়। এতে কারপার্কিংয়ের বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখতে হয় অনেক যানবাহন। এতে স্বাভাবিক চলাচল বিঘিœত হয়। তারপর আসে রেল লাইন। গোলচক্কর সংলগ্ন রেলগেট। এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। যখন একটা ট্রেন পার হয় রেল গেট বন্ধ করা হয়। তখন পূর্ব পশ্চিমমুখী দু’ প্রান্তেরই গাড়ি চলাচল থামিয়ে রাখতে হয়। এতে বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে ঢাকামুখী গাড়িগুলোকে অপেক্ষা করতে ট্রেন না যাওয়া পর্যন্ত। একটি ট্রেনে দশ থেকে বিশ মিনিট সময় নেয়। পর পর যখন দুটো ট্রেন পারাপার করে তখন কমপক্ষে আধ ঘণ্টা বসে থাকতে হয় গোলচক্করের পূর্ব পাশের আশকোনাবাসীকে আর পশ্চিম পাশের বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের।

পুলিশ ঠিকমতো ডিউটি করে না- অভিযোগ সম্পর্কে আমির চৌধুরী বলেন-এটা ঠিক নয়। প্রতি মুহূর্তে পুলিশের কঠোর নজরদারি চলে। প্রতিদিনই মামলা করা হচ্ছে আইন অমান্যকারী চালকদের বিরু্েদ্ধ। জরিমানা করা হচ্ছে অনেককে। রেকার লাগিয়ে ডাম্পিং করা হচ্ছে অবৈধ গাড়ি। মামলা এত বেশি করা হয় বলেই তো অধিকাংশ বাস মিনিবাসের কাগজপত্র থাকে না চালকের কাছে। ট্রাফিক উত্তর জোনের ডিসি, এডিসি ও এসি স্যারদের সার্বক্ষণিক তদারকিতে এখন ট্রাফিক সদস্যরা কাজ করছেন। দায়িত্ব পালনে কারোর কোন গাফিলতি করার প্রশ্নই ওঠে না।

এ সম্পর্কে সিভিল এভিয়েশান প্রকৌশল বিভাগ জানায়, শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের কাজ শুরু হবে আগামী জানুয়ারিতে। ওই প্রকল্পের নক্সায় রয়েছে থার্ডটার্মিনালে প্রবেশ ও বের হবার জন্য আলাদা আলাদা ভেহিক্যাল ফ্লাইওভার, ও ওভারপাস। এগুলো হয়ে গেলে আর গাড়ি নিয়ে গোলচক্কর থামতে হবে না। থার্ড টার্মিনাল ও বর্তমান টার্মিনালের সব যাত্রীই এ সুবিধা পাবেন। কাজেই আপাতত এ সময়টুকু পর্যন্ত সবাইকে কিছুটা ভোগান্তির শিকার হতেই হবে।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: