১৯ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট পূর্বের ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

প্রকল্পের খপ্পরে পানি ব্যবস্থাপনা


এ ভূ-খণ্ডের জনজীবনকে পানি প্রতিনিয়ত প্রভাবিত করেছে, কিন্তু পানির ওপর মানুষ সেভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। নদীকে ভক্তি করেছে। তার ধ্বংসযজ্ঞে ভীত হয়ে দেবীর আসনে বসিয়ে পুজো করেছে। কিন্তু বন্যা সমস্যা সমাধানের যৌক্তিক কারণ খোঁজেনি। গঙ্গা, যুমনা, সরস্বতী নিয়ে বহু পৌরাণিক কাহিনী রচিত হয়েছে কিন্তু ‘দ্য হিস্টোরিস’-এর মতো বই লেখা হয়নি। খ্রিস্টের জন্মের প্রায় পাঁচ শ’ বছর আগে গ্রীক দার্শনিক হেরোডোটাস এ বইয়ে নীলনদের বন্যার কারণ, তার গতি-প্রকৃতির যৌক্তিক ব্যাখ্যা খুঁজেছেন অথচ প্রাচীন ভারতের মতো প্রাচীন গ্রীসের সংস্কৃতিও মিথনির্ভর। গ্রীসের দার্শনিক বা জ্ঞানীরা সেই সুদূরকালেও ছিলেন নগররাষ্ট্রের নাগরিক আর আঠারো শতক পর্যন্ত ভারতবর্ষের জনজীবন আবর্তিত হয়েছে সমাজকে কেন্দ্র করে, রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে নয়। সে সমাজে যাঁরা জ্ঞান চর্চা করতেন তাঁরা অন্ত্যজ বা শ্রমজীবীশ্রেণীর শ্রমের ওপর বেঁচে থাকলেও উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত এ মানুষগুলোর সঙ্গে তাঁদের দূরত্ব ছিল সীমাহীন। শিক্ষার অধিকারবঞ্চিত মাটিলগ্ন এ মানুষরা খাল কেটে শস্যক্ষেতে পানি আনার কৌশল রপ্ত করেছিলেন। কূল ছাপিয়ে নদীর পানি যাতে ফসলের ক্ষেত ভাসিয়ে না নেয় সে জন্য বাঁধ দিতে শিখেছিলেন। দিঘি খুঁড়ে পানি মজুদ রাখার ব্যবস্থা করতেন। এসব করার প্রযুক্তি বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে তাঁরা নিজেরাই উদ্ভাবন করেছিলেন। কিন্তু পানি ব্যবস্থাপনার এ বাস্তব জ্ঞান ও প্রযুক্তি জ্ঞানচর্চার সঙ্গে সেকালের ব্রাহ্মণরা উদ্ভাবন যুক্ত করতে পারেননি। সমাজের ধনিকশ্রেণীর দয়া-দাক্ষিণ্যে এরা ঘরে বসে শাস্ত্রচর্চা করেছেন। পরে শাসকদের আনুকূল্যে থেকে তাদের গুণকীর্তন বা প্রশস্তি রচনা করেছেন। অবহেলিত থেকে গেছে প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিকাশের সম্ভাবনা।

তবে এ নিয়ে ব্রাহ্মণদের কাছ থেকে লিখিত কিছু না পেলেও কিছু পরের পানি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ব্রিটিশ সেচ বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম উইলকক্সের লেখা থেকে জানা যায়, গঙ্গা ও দামোদর নদীর উর্বর বন্যার পানি এবং প্রচুর পরিমাণ মৌসুমী বৃষ্টি হলেও জমির উর্বরতা বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। উর্বরতা বাড়াতে সেচের প্রচলন করা হয়। খালের পাড় কেটে সেচের ব্যবস্থা করা হতো। বন্যা শেষ হলে সেগুলো বন্ধ করা হতো। খাল কাটার পর পানি বণ্টনের দায়িত্ব পড়ত কৃষকদের ওপর। প্রতিটি ক্ষেতে ঠিকমতো পানি পৌঁছালো কিনা, তারা তা তদারক করতেন। পর্যাপ্ত পানি পেতেন কৃষকরা, যা অনেক সময় প্রয়োজন ছাপিয়ে যেত। উইলকক্সের মতে, প্রাচীন বাংলার জনগণের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব তৈরি হয়েছিল এই পানি বিতরণের মধ্য দিয়েই, কিন্তু পানি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা এতে পাওয়া যায় না।

ড. নীহার রঞ্জন রায় বলছেন, ‘প্রাচীন বাংলার পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ইতিহাসের অকীর্তিত জনগণের ভূমিকা স্পষ্ট হয়, কিন্তু জনগণের এই সৃজনশীলতার সঙ্গে সংসার থেকে দূরে অবস্থানরত মঠবাসী বৌদ্ধ সন্ন্যাসী আর শুদ্ধি-সচেতন ব্রাহ্মণদের জ্ঞানচর্চা যুক্ত হতে পারেনি। ফলে প্রাচীন বাংলার তথা ভারতবর্ষের জ্ঞান ও প্রযুক্তি ইতিহাসের প্রথম যুগে বিকাশের সম্ভাবনা দেখা গেলেও পরবর্তীকালে তা নির্জীব হয়ে পড়ে। এ নির্জীবতার কারণ সম্বন্ধে ঐতিহাসিক উপাদানের অভাবে পঞ্চম শতকের আগে নিশ্চিত কিছু বলা প্রায় অসম্ভব।’ যে কারণেই নির্জীব হোক জ্ঞান ও রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা উচ্চশ্রেণীর একটি গোষ্ঠীর কাছে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ায় জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ থেমে গেল।

এ তো গেল প্রাচীন ভারত বা বাংলার কথা। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির চরম বিকাশের এই সময়ে এসেও কি পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সম্ভব হয়েছে? যা হয়েছে তাতে ওই পরগাছা ব্রাহ্মণদের মতো সুবিধাভোগী গোষ্ঠীরই ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে, তার চেয়ে বেশি তেমন কিছু হয়নি। নিজস্ব প্রযুক্তির স্বাভাবিক বিকাশ না হওয়ায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি ব্যবস্থাপনার পুরো বিষয়টি আজও পরনির্ভরশীল হয়ে আছে। একটু পেছন ফিরে দেখা যাক।

উনিশ শ’ চুয়ান্ন সালের বন্যার পর ক্রুগ মিশন পূর্ব পাকিস্তান সফর করে পানি ও বিদ্যুত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (ওয়াপদা) গঠনের সুপারিশ করে। উনিশ শ’ ঊনষাট সালে ওয়াপদা গঠিত হয়। একই সঙ্গে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ প্রকল্প নেয়া হয় অনেক। এর পাঁচ বছর পর পানি সম্পদ উন্নয়নে বিশ বছর মেয়াদী একটি মাস্টারপ্ল্যানের কাজ শুরু হয়। ওয়াপদাকে বন্যা, সেচ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেয়ার সময় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)কে উফশী ধানের বীজ, রাসায়নিক সার, কীটনাশক বিতরণ জনপ্রিয় ও বাজারজাতকরণের দায়িত্ব দেয়া হয়। কাজগুলো ষাট দশকে ঢাক-ঢোল পেটানো ‘সবুজ বিপ্লব’-এর আওতাভুক্ত ছিল। বলার অপেক্ষা রাখে না, এসবই হচ্ছিল বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ মতো। স্বাধীনতার পর এসব প্রকল্পের মূল্যায়নের তেমন কোন উদ্যোগ কোন সরকারই নেয়নি বরং একে সমর্থন দিয়ে এগিয়ে নিয়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন এবং সেচ প্রকল্পের উদ্যোগ ও কার্যপ্রণালী বর্ণনার দলিলদস্তাবেজ রচিত হয়েছে প্রচুর। কিন্তু মেয়াদ শেষে এসব কী সুফল বয়ে এনেছে তা খতিয়ে দেখা হয়েছে খুব কম। বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এর পর পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় ভূমির ওপরের পানি প্রকল্প এবং বিএডিসির আওতায় ভূ-গর্ভের পানি প্রকল্পের প্রতি মনোযোগী হয়। পানিসংক্রান্ত এসব প্রকল্পের শতকরা সত্তর ভাগ আশির দশকের প্রথমভাগ পর্যন্ত এ সংস্থা দুটোর অধীনে ছিল। পরে তা প্রায় আশি ভাগে উন্নীত হয়। কিন্তু এসব প্রকল্পের ‘প্রকল্প সমাপ্তি’ মূল্যায়ন হয়েছে একেবারে কম। অর্থাৎ প্রকল্পের পর প্রকল্প নেয়া হয়েছে-তার জন্য প্রচুর ফান্ড এসেছে কিন্তু কাজ হয়েছে অশ্বডিম্ব। উনিশ শ’ আটাশি সালে এ্যালেন সি লিন্ডকুইস্ট কিছু বড় প্রকল্পের তিরিশ বছরের প্রকল্প সমীক্ষা করতে গিয়ে বড় বড় শুভঙ্করের ফাঁকি দেখতে পান। তাঁর নিরীক্ষায় বেরিয়ে আসে- ঢাকার এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক অফিস পানি সম্পদ উন্নয়নবিষয়ক একটি প্রকল্পেরও সমাপ্তি রিপোর্ট দেখাতে পারেনি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রকল্পের অর্থনৈতিক লাভের ওপর নির্ভর করে প্রকল্পের বিন্যাস হয়েছে। মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্প এবং বরিশাল সেচ প্রকল্পের মতো বড় দুটো প্রকল্পে খরচের ব্যাপক তারতম্য দেখতে পান তিনি। এ দুটো প্রকল্পের খরচ হেক্টরপ্রতি যথাক্রমে চার হাজার মার্কিন ডলার এবং তিন শ’ ষাট মার্কিন ডলার। সাহায্যনির্ভর এসব প্রকল্পে দাতারা তাদের পছন্দমতো কনসালট্যান্ট নিয়োগ দেয়। যোগ্যতা মুখ্য নয়, দাতাদের পছন্দই এখানে শেষ কথা। প্রকল্প ব্যয়ের বড় একটি অংশ কনসালট্যান্টদের ফি হিসেবে দেয়া হতো। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় কনসালট্যান্টদের তুলনায় বিদেশী কনসালট্যান্টদের ব্যয় পঁচিশ গুণ বেশি। পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার নামে এ ধরনের সাহায্যনির্ভর প্রকল্পের প্রতি কনসালট্যান্ট, আমলা, প্রকৌশলী সবার লোভনীয় দৃষ্টি থাকে। পানি ব্যবস্থাপনা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে স্বাধীনতার আগে-পরের উদ্যোগে এ ধরনের ধারাবাহিকতাই চলছে। বিশ্বব্যাংক বন্যা সমস্যার দাওয়াই হিসেবে সব সময়ই খুব ব্যয়বহুল কাঠামোগত সমাধান সুপারিশ করে আসছে এবং বলতেই হয়-এ ধরনের সুপারিশের টোপ গেলার জন্য দেশী-বিদেশী সুযোগসন্ধানীরা আগ্রহভরে অপেক্ষা করে থাকেন।

পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করা পানি সম্পদ রক্ষা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের প্রচারের ঢাক-ঢোল উনিশ শ’ সাতাশি ও আটাশি সালের ব্যাপক বন্যার হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে পারেনি। অথচ মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে এ খাতে। আশির দশকের ওই বন্যার পর করিৎকর্মা বিশ্বব্যাংক আবার নড়েচড়ে বসে। ‘বন্যা নিয়ন্ত্রণ’ এবং পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্যাপক তোড়জোড় শুরু হয়। দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞরা নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, লন্ডনে একাধিক বৈঠকে মিলিত হন। গুরুত্বপূর্ণ নানা আলোচনা, গুরুগম্ভীর পর্যালোচনা শেষে বাংলাদেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য যুগান্তকারী দাওয়াই ফ্লাড এ্যাকশন প্ল্যান (ফ্যাপ) প্রণয়ন করেন এবং অল্প সময়ে প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতিকর প্রভাব বেরিয়ে পড়ায় দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ফ্লাড এ্যাকশন প্ল্যান বাতিল করা হয়। অবশ্য এর বদলে যা গ্রহণ করা হয় তা নতুন আঙ্গিকে ওই ফ্যাপেরই ভিন্ন সংস্করণ। সুতরাং বন্যা নিয়ন্ত্রণে কাজ কী হচ্ছে তা সহজেই অনুমান করা যায়।